২০ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

একটি ঐতিহাসিক পোস্টারের রূপকার নূরুল ইসলাম

  • হাশেম খান

১৯৭০ সালের এক সন্ধ্যায় পায়চারি করছি খোলা বারান্দায়। বিদ্যুত নেই অনেকক্ষণ ধরে। ঢাকা শহরে বিদ্যুত থাকা না থাকা বা একবার গেলে কখন আসবে, বিদ্যুতের অনিশ্চিত সংস্কৃতির ইতিহাস দীর্ঘকালের। সে সময় আলোর জন্য বিকল্প ছিল হারিকেন। এটা সব বাড়িতেই দুই-তিনটা রাখতে হতো। হারিকেন জ্বালিয়ে কাজে বসেছিলাম। ছবি আঁকতে গিয়ে দেখি হারিকেনের আলোতে কুলোচ্ছে না। বাসায় মোমবাতিও পেলাম না। হারিকেন ও তার সঙ্গে তিনটা মোমবাতি জ্বালালে বেশ আলো হয়। পায়চারি করছিলাম যদি এখুনি বিদ্যুত চলে আসে!

ইত্তেফাকের সাহিত্য পৃষ্ঠার ৩টি গল্পের ছবি ও বেশকিছু প্রবন্ধের শিরোনাম লিখে আজ রাত ৮টার মধ্যে দিতে হবে। সাহিত্য বিভাগের সম্পাদক আমার জন্য অপেক্ষা করছেন। বেশিরভাগ কাজই হয়ে গেছে। সামান্য কিছু বাকি। না, বিদ্যুত আসবে না। মোমবাতি কেনার জন্য বারান্দা থেকে সিঁড়িতে মাত্র পা দিয়েছি এমন সময় বাড়ির প্রধান ফটকের বড় লোহার কড়া দুটো বেশ শব্দ করে জানান দিল কেউ একজন এসেছে। একটু জোরেই বললাম- দরজা খোলা আছে। ঠেলে চলে আসুন।

ছোটখাটো মানুষটি বেশ দ্রুত ঢুকে পড়ল। আলো-আঁধারিতে চিনতে অসুবিধে হলো না। কিছু মানুষ আছে যারা সহজেই আপন হয়ে যায়। যাদের সান্নিধ্য সুখকর ও আনন্দের। এই মানুষটিও তাই। ইনি নূরুল ইসলাম। সহজেই হয়ে উঠেছেন নূরুল ইসলাম ভাই। আওয়ামী লীগের নিষ্ঠাবান এক কর্মী। প্রচার কাজে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি সামনে এসে বললেন- বাইরে যাচ্ছেন? যাওয়া হবে না, জরুরী কাজে আসছি। খুবই জরুরী। আসার পথেই বুঝলাম বিদ্যুত নেই। তাই বিদ্যুত নিয়েই এসেছি। এই নেন। কথাগুলো বলে আমার হাতে তুলে দেন চারটি বড় ও মোটা মোমবাতি। আমি অবাক! এগুলো বিদ্যুত? পরক্ষণেই তার রসিকতা বুঝে হেসে ফেললাম। তিনিও হাসলেন।

-ঘরে চলেন। জরুরী কাজটা বুঝাই। খুবই জরুরী। মুজিব ভাই পাঠাইছেন। নূরুল ইসলাম যেন খানিকটা উত্তেজিত। তার ত্রস্ততা লক্ষ্য করি। হারিকেনের আলোতে ফুলস্কেপ কাগজের ভাঁজ করা পৃষ্ঠাটা তুলে ধরে বলেন, পড়ে দেখেন। বৈষম্য বিষয়- পূর্ব পাকিস্তান পশ্চিম পাকিস্তান, তারপর বিভিন্ন বিষয়ের একটি তালিকা ছক করে লেখা। উপরে লেখা সোনার বাঙলা শ্মশান কেন? পড়লাম। দুই পাকিস্তানের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে যে বৈষম্য চলেছে তার একটি তালিকা। তবে নূর ইসলাম ভাই শিরোনামের বক্তব্যটা খুবই সময় উপযোগী হয়েছে।

-হুররে। আমাদের শিল্পীরও পছন্দ হয়েছে। নূর ইসলাম ভাই হাততালি দিয়ে আনন্দ প্রকাশ করেন এবং বলতে থাকেনÑ

-হাশেম ভাই নির্বাচনের প্রচারের জন্য গত দু-তিন মাস ধইরা কত পোস্টার বানাইছি, কত লিফ্লেট তৈরি করছি; কিন্তু আপনাকেও কত কষ্ট দিচ্ছি। কমতো আঁকেন নাই। কিন্তু জুতসই একটা পোস্টারের কথা ভাবতে ভাবতে গত দুই রাত জাইগা এই বিষয়টা তৈরি করছি। এই বিষয়টা আইজ মুজিব ভাইরে দেখালাম (নূরুল ইসলাম শেখ মুজিবুর রহমানকে মুজিব ভাই বলেই সম্বোধন করতেন)। মুজিব ভাই পুরোটা পড়লেন। একবার না দুবার। তারপর তালিকাটা মেলে ধরে বললেন- তালিকা থেকে এই দুটা বাদ দিয়া বাকি দশটা রাখ। খুব ভাল বিষয়। পোস্টারটা আমাদের জনগণ ভালভাবে নেবে। দেশের মানুষের কাছে পাকিস্তানের স্বৈরশাসকদের আসল চেহারাটা বেরিয়ে যাবে। ওরা যে কত রকমভাবে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষদের ঠকাচ্ছে, পূর্ব পাকিস্তানের সম্পদ লুট করে পশ্চিম পাকিস্তানের শহর-বন্দরকে গড়ে তুলছে, রাস্তাঘাট নতুন করে সুন্দর করে তৈরি করছে। চাকরি-বাকরি ও অন্যান্য অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে উন্নত থেকে উন্নততর অবস্থানে পৌঁছে দিচ্ছে। পূর্ব পাকিস্তানের মানুষরা এই পোস্টারের মাধ্যমে বুঝতে পারবে স্বৈরশাসকরা বাঙালীদের কত অবহেলা করে।

নূরুল ইসলাম জানতে চাইলেন- পোস্টারের বিষয়টা আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটিতে আলোচনার জন্য তোলা হবে কিনা। বঙ্গবন্ধু বললেন- ওয়ার্কিং কমিটিতে তোলা যায়। বিষয়টা নিয়ে কেউই আপত্তি করবে না। দেরি করলেও চলবে না। পোস্টারটা ছেপে ফেলা যাক। তারপর সবাই দেখুক। নূর ইসলাম যত তাড়াতাড়ি পারস আজ রাতেই প্রেসে দিয়ে ছাপিয়ে ফেল।

এরপর মুজিব ভাই আমার খসড়া করা কাগজটা নিয়ে এই যে দেখেন কোনায় কি লিখেছেন- বলে নূর ইসলাম কাগজের কোনাটা নির্দিষ্ট করে দেখায়। আমি ফুলস্কেপ কাগজের পাতাটা হারিকেনের খুব কাছে নিয়ে ভাল করে দেখলাম। লেখা আছে, নূর ইসলাম- পোস্টারটি খুবই জরুরী ও গুরুত্বপূর্ণ তাই আজ রাতেই ছাপার ব্যবস্থা কর। প্রেসকে বলবা কাগজের টাকা আজ রাতে দিবার পারুম না। আগামীকাল দুপুরের পর দিব। প্রেসকে আমার এই নোটটা দেখাবা। আপাতত ১০ হাজার পোস্টার ছাপ। তারপর ছিল তাঁর সই- শেখ মুজিবুর রহমান।

সময় দ্রুত এগুচ্ছে। বিদ্যুতের তখনও দেখা নেই। আমাকে ইত্তেফাক অফিসে পৌঁছাতে হবে। পোস্টারে তালিকাটা অনেক বড়-অনেক লেখা। হাতে লিখতে হলে অনেক সময় লাগবে। বিপদেই পড়ে গেলাম। নূরুল ইসলাম ভাইকে আম্তা আম্তা করে বলি, ইত্তেফাকের কাজটা আমাকে এক্ষুনিই শেষ করতে হবে- ওরা অপেক্ষায় আছে। অবশ্য খুব বেশি বাকি নেই।

-কতক্ষণ লাগবে?

-আধা ঘণ্টা

-তাহলে ওদের কাজটা শেষ করেন। তারপর সবগুলো কাজ আমারে বুঝাইয়া দেন- আমি গিয়া দিয়া আসি। আপনার ইত্তেফাকে যাইয়া সময় পার করার দরকার নেই।

গোপীবাগ থেকে ইত্তেফাক অফিস অবশ্য খুব কাছে। হারিকেন ও ৪টা বড় মোমবাতি জ্বালিয়ে ইত্তেফাকের ইলাস্টেশন ও শিরোনামগুলো এঁকে শেষ করলে নূর ইসলাম ইত্তেফাকে বলে গেলেন। আমি তিরিশ ইঞ্চি লম্বা এবং পাশে বিশ ইঞ্চি একটি কার্টিজ কাগজ নিয়ে মেঝেতে বসে গেলাম। পোস্টারের সাধারণ মাপ এই ডবল ক্রাউন। বড় টেবিল আমার নেই, তাই মেঝেতে বসেই আঁকতে হবে।

পোস্টারটা কিভাবে আকর্ষণীয় করি ভাবতে থাকি। কাগজে ছোটখাটো ড্রইং করতে থাকি। অনেক বক্তব্য লেখা সর্বস্ব। এতো লেখা সমন্বয় করে পোস্টারের জন্য আকর্ষণীয় কোন নকশা করা খুবই কষ্টকর। কতটুকু পারব- তা একটার পর একটা খসড়া করতে থাকি। এদিকে সময় নেই, তাই খুব বেশি চিন্তা করে যে কয়েকটা খসড়া করে বেঁধে নেব তার উপায় নেই।

কিছুক্ষণের মধ্যেই নূর ইসলাম ফিরে এসেই বললেন-

-কিছু একটা দাঁড় করাতে পারলেন? আজকে আর বিদ্যুত আসবে না। পাকি সরকার পূর্ব পাকিস্তানরে আন্ধারে রাইখা পশ্চিম পাকিস্তানরে আলোতে ভাসাইয়া দিচ্ছে। সারা রাইতে অগো শহর বন্দর অলি গলি এমনকি গ্রাম পর্যন্ত বিদ্যুতের বাতি দিনের মতো আলো দিতাছে। সামনের ইলেকশনে পশ্চিমাদের গদি থেকে নামাইয়া আওয়ামী লীগরেই বসাইতে হইব।

নূরুল ইসলামের হাতের প্যাকেট থেকে সুস্বাদু খাবারের গন্ধ বেরুচ্ছে। আমার পাশে বসে পড়ে বললেন- দেশ প্রিয় মিষ্টান্ন ভা-ার থেকে নিয়ে এসেছি। গরম পরোটা আর সবজি। এ খাবারটা ওদের খুব জনপ্রিয়। আমরা অনেকেই দেশ প্রিয়র খাবারের ভক্ত। খুশী হয়েই বললাম-

-একটু পরেই রাতের খাবার খাব। আপনি খাবেন সেটাও রুস্তমকে বলে দিয়েছি। কি দরকার ছিল আবার দোকান থেকে খাবার কেনার।

-এই পোস্টারটা আঁকতে আঁকতেই দু’জনে মিলে খাব। তিনি আয়েস করে বসে রুস্তমকে ডাকেন- প্লেট দিয়ে যা চামচ দিয়ে যাও পানি দিয়ে যাও ইত্যাদি।

-নূর ইসলাম ভাই মাথায় যে কোন নকশা-টক্শা আসছে না। এতো লেখা-হাতে লিখতে গেলে অনেক সময়-অন্তত কালকের দিনটা সময় দেন। প্রেসের টাইপ বসিয়ে অফসেট মেশিনের বড় ক্যামেরায় টাইপগুলো বড় ছোট একটা প্রতীকী ‘থীম’ তৈরি করে পোস্টারটা বানাই।

-সব্বনাশ-মুজিব ভাইকে বলেছি আপনাকে দিয়ে পোস্টারের নকশা করিয়ে আজকেই প্রেসে দেব। প্রেসের টাইপ দিয়া না, শিল্পীর হাতের লেখা যাবে পোস্টারে, আপনার কথা শুইনা মুজিব ভাই খুব খুশী হইছে। বলেছে একদম ঠিক আছে।

তবে দেরি করা যাইব না। আজ রাইতেই প্রেসে দিতে হইবো। কেন আপনাকে দেখালাম না মুজিব ভাই লেইখা দিছে আজ রাইতেই ছাপতে দাও।

এমন সময় বারান্দা থেকে কিছু পায়ের আওয়াজ কানে আসে। কারা আসল এ সময়। খোলা দরজা দিয়ে ঢুকলেন আমার বড় ভাই ডাঃ সুলেমান খান ও স্বপন ভাবী। আমাদের বাড়ির ঠিক উল্টোদিকের একতলায় থাকেন।রোজই একবার সময় করে ছোট ভাই-বোনদের খোঁজ-খবর নিয়ে যান। নূরুল ইসলাম ভাইকে দেখে বললেন-

-কিছু একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে মনে হচ্ছে? তা নূরুল ইসলাম সাহেব নির্বাচন তো খুবই কাছে। সারাদেশে নির্বাচনমুখী একটা জোয়ার এসে গেছে। গণতন্ত্রের দিকে দেশ ধীরে ধীরে এগুচ্ছে। শেষ রক্ষা হলে ভাল। কারণ সামরিক শাসকদের বিশ্বাস করা যায় না। গত ১৪ বছরে দেশে রাজনৈতিক আন্দোলন গণজাগরণে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৬ দফা স্বায়ত্তশাসনের দাবি। স্বায়ত্তশাসনের বিষয়টা শেখ মুজিবের কারণেই মানুষ বুঝতে পেরেছে- বেঁচে থাকার জন্যই তাই এবারের নির্বাচনে শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগকে সমর্থন দিয়ে ক্ষমতায় নিয়ে আসতে হবে। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের প্রতি আমাদের কম্যুনিস্ট পার্টিসহ প্রগতিবাদী রাজনীতিকরা আস্থাশীল।

নুরুল ইসলাম পোস্টারের বিষয় লেখা কাগজটা ডাঃ সুলেমানের হাতে দিয়ে বললেন- একটা নতুন পোস্টার তৈরি করছি আমরা। বিষয়টা দেখুন। পোস্টারের বিষয়টা ভাল করে পড়ে নিয়ে সুলেমান বললেন-

-করেছেন কী। অসাধারণ বিষয়। ২২ বছর ধরে পাকিস্তানের মৌলবাদ ও স্বৈরাচার সরকারের অমানুষিক দুঃশাসনের তালিকা। পূর্ব পাকিস্তান এই বৈষম্যের শিকার হয়েও এখন আরও শক্তিশালী হবে এবং সামরিক শাসনকে সহজেই বিদায় জানাবে। নুরুল ইসলাম সাহেব আওয়ামী লীগকে বলুন এই বৈষম্যের পোস্টারের খবর। ইংরেজী পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে সারা বিশ্বকে জানিয়ে দিক- পাক সামরিক সরকার পূর্ব পাকিস্তানের মানুষকে যে মানুষ বলে গণ্য করে না এবং কিভাবে অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে। আমরা কম্যুনিস্ট পার্টি থেকেও এ কাজটা করব। আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ নূর ইসলাম সাহেব, আপনারা কাজ করুন, আমি আসছি।

এবার পোস্টারটা আঁকতে হয়। সময় একদম নেই। সাড়ে দশটার মধ্যে না হলে প্রেস ধরতে অসুবিধা হবে। আড়াই ঘণ্টা হয়ে গেল বিদ্যুত তখনও নেই। মোমবাতিও ধীরে ধীরে পুড়ে কমে যাচ্ছে। নূরুল ইসলাম ভাই হঠাৎ উঠে দাঁড়ালেন। একটা জরুরী বিষয় মনে পড়েছে। তার হাব-ভাবে তাই মনে হলো। বললেন-

-হাশেম ভাই, আপনার পকেটে ২০টা টাকা আছে? আগামীকাল দিয়ে দেব, একটা কাজ ভুলে গিয়েছিলাম। আপনি কাজটা শেষ করেন, আমি অল্পক্ষণের মধ্যেই আসছি।

হঠাৎ তার ২০ টাকা কেন জরুরী প্রয়োজন হলো বুঝতে পারলাম না। যা হোক, ফিরে আসলে জানা যাবে। সে সময় ২০ টাকা দিয়ে অনেক কাজ করা যেত।

পোস্টারটি আঁকার একটি সহজ ও স্বাভাবিক চিন্তা মাথায় এসে যায়। আঁকতে ও লিখতে শুরু করি। নিবিষ্ট মনে লিখে যাচ্ছি, একটা একটা করে বৈষম্যের বিষয়। নির্দিষ্ট নকশা ও ছকের মধ্যে সেগুলোকে সাজাচ্ছি। একটা সময়ে এসে শেষ হলো আমার পোস্টার আঁকা। বসা থেকে উঠে দাঁড়ালাম। পা বাড়ালাম। অনেকক্ষণ বসে থাকাতে পা খানিকটা আড়ষ্ট হয়ে গিয়েছিল।

হঠাৎ আলো জ্বলে উঠল। চারদিক ঝলমলে উজ্জ্বল। আর তখুনি ঘরে পা রাখল নূরুল ইসলাম। তিনিও চলে এসেছেন। ঘড়ি দেখলাম। রাত ১০টা ২০ মিনিট।

-বাহ্, আমিও ঢুকলাম আর সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুত এসে গেল। তারপর আমার আঁকা পোস্টারের দিকে তাকিয়ে পরক্ষণে উল্লসিত হয়ে বলে উঠলেন,

-আপনার আঁকাও শেষ। খুব সুন্দর, খুব সুন্দর...

আমার দিকে তাকিয়ে একটু থেমে হাসি হাসি মুখেই কিছু একটা বলতে গিয়ে থামলেন। ভুরুটা একটু কুঁচকালেন। আমি বুঝে ফেললাম তিনি কি বলতে চান।

-বলুন না নুরুল ইসলাম ভাই, কি বলতে চান। আমি বুঝতে পেরেছি। পোস্টারের শুধুই লেখা। সাদামাটা লেখা। নকশা কই, ছবি নেই। কেমন লাগবে তাই না?

- না না আপনি যা আঁকছেন সেটাই তো নকশা। ছবির কথা নকশার কথা আপনিই বলেছিলেন হাশেম ভাই।

-নুরুল ইসলাম ভাই এই বৈষম্য দীর্ঘ তেইশ বছর ধরে। সাড়ে সাত কোটি মানুষের দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ, যন্ত্রণা ও শাসকদের প্রতি ঘণ্টার প্রকাশ প্রত্যেকটি বর্ণে, প্রত্যেকটি বৈষম্যের কথায়। আমি অক্ষরগুলোকে খুব সহজ ও সাবলীলভাবে লেখেছি। কোথাও কাঁপা কাঁপা একটু নড়ে-চড়ে যেন ওরাও ক্ষোভ প্রকাশ করছে। এই ক্ষোভের মধ্যে আছে স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও প্রতিবাদ। ছক আঁকতে গিয়েও কোন স্কেল ব্যবহার করিনি। লেখাগুলোও সে জন্য ধরে ধরে লিখিনি। স্বাভাবিকভাবে লিখেছি। এর মধ্যে কোন নকশা, ছবি ব্যবহার করলে উপরের বৈশিষ্ট্যগুলো নষ্ট হতো বলে আমি মনে করি। তাই পোস্টারটির বিষয়ের আবেগ ও প্রতিক্রিয়াকেই গুরুত্ব দেয়ার জন্য সাদামাটা নকশায় পোস্টারটি তৈরি করেছি।

-এত ব্যাখ্যার দরকার কি হাশেম ভাই। আপনি শিল্পী, আপনি স্বাধীনভাবেই নিজের চিন্তাকে প্রকাশ না করলে এই পোস্টার বলেন বা যে কোন ছবির আবেদন সফল হবে না।

-আপনি ২০ টাকা নিয়ে হঠাৎ হাওয়া হয়ে গেলেন কোথায়?

-আরে প্রেসে ৪-৫ জনকে বসিয়ে রেখে এসেছিলাম। ওরা তো সারারাত ধরে পোস্টারটা ছাপবে। প্রেসের মালিক যে রকম কিপ্টা ওদের ঠিকমতো খাওয়াবে না। বলে, ওরা তো বাড়তি খাটার জন্য টাকা পাবে, সেখান থেকেই খরচ করে খাবে। ওরা তো সন্ধ্যা থেকেই বসে আছে। বসে বসে বিরক্ত হয়ে যদি চলে যায়? তাই ছুটে গেলাম- সবাইকে পেট ভরে খাওয়ার জন্য মোরগ পোলাও দিলাম, সারারাতের কাজের ফাঁকে ফাঁকে চা-বিস্কুট খাওয়ার জন্য সব কিনে দিয়ে এলাম। প্রেস মালিক পোস্টার ছাপার কাগজ নিয়ে এসেছে-সেটাও দেখে এলাম।

নুরুল ইসলামের সব দিকেই খেয়াল। খেটে খাওয়া মানুষ, সাধারণ মানুষ, তাদের প্রতি তিনি সব সময়ই যতœবান তা নূরুল ইসলাম ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয়ের পর থেকেই দেখে এসেছি। রিকশায় কখনও দরদাম ঠিক করে উঠতেন না। ভাড়া দেয়ার সময় প্রায়শ ঠক্তে হতো। রিকশাওয়ালারা প্রায়ই সুযোগ বুঝে বেশি ভাড়া চাইত। হাসিমুখেই তিনি সাধ্যমতো বেশি ভাড়াই দিতেন, কখনও কখনও রিকশাওয়ালার চেহারা স্বাস্থ্য, তার ক্লান্ত দেহ, ঘাম ইত্যাদি বিচার করে যা চাইত তাই দিতে দিতে বলতেন- বেশি ভাড়া দিলাম-একটা কলা কিন্না খা, এক গেলাস দুধ খাবি, একটা আন্ডা খাবি যা। পারলে বৌ-বাচ্চার জন্য কলা কিন্না নিস। নে আরো দিলাম। অথচ অবাক হওয়ার বিষয়- নূরুল ইসলাম কখনই সচ্ছল ছিলেন না। জীবনভর তার ধ্যান-ধারণা, কাজ- দেশের মানুষের জন্য, রাজনীতি করেছেন-বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্নেহধন্য হয়ে, বিশ্বাসভাজন ও আস্থাশীল কর্মী হিসেবে। আওয়ামী লীগের সব নেতার কাছেই তার গ্রহণযোগ্যতা অপরিসীম। বেগম ফজিলাতুননেছা তাঁকে সন্তানের মতো স্নেহ করতেন। ‘নূরুল ইসলামও মুজিব ভাই’ বলতে ছিলেন অজ্ঞান- ছায়ার মতো তাঁর পাশে থেকেছেন সারাজীবন। বেগম মুজিবকে সম্বোধন করতেন ভাবী বলে। প্রায়শ গল্প করেই বলতেন মুজিব ভাই তো জেলেই থাকতেন। পুরো সংসার, ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া সব ঝামেলা একাই সামলাতেন ভাবী। কী পরিমাণ কষ্ট যে তিনি করেছেন- তা কাউকে বলতে চাইতেন না। অন্যদিকে শুধু নিজের সংসার নয়, আত্মীয়স্বজনের, এমনকি আওয়ামী লীগের অনেক কাজই তিনি নীরবে করে যেতেন। ‘সোনার বাংলা শ্মশান কেন’ পোস্টারটি প্রথম দিন ছাপা হয় দশ হাজার কপি। রাস্তার দেয়ালে লাগানোর পর মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ে। অনেক মহিলা ও কিশোর-কিশোরীকে দেখেছি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাগজে বৈষম্যের বিষয়টি টুকে নিচ্ছে।

নূরুল ইসলামের নেতৃত্বের পর পোস্টারটি লিফলেট আকারে কয়েক লাখ ছেপে বাংলার মানুষের ঘরে ঘরে পাকিস্তান স্বৈরশাসকদের হঠকারিতা ও অমানবিকতার মুখোশটি তুলে ধরা হয়। ধীরে ধীরে এই পোস্টারের আবেদন দেশে-বিদেশে বিপুল আলোড়ন তোলে। যার ফল দেখেছি ১৯৭০-এর নির্বাচনে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর পতন- যারা ছিল স্বৈরশাসকদের ও সাম্রাজ্যবাদী সাম্প্রদায়িক আধিপত্যবাদী মোর্চার লালিত-পালিত দল। পক্ষান্তরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জললাভ করে। পরবর্তীকালে এই ‘সোনার বাংলা শ্মশান কেন’ শিরোনামের পোস্টার আমাদের নয় মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের সংগ্রামী মানুষদের প্রেরণা ও শক্তি হিসেবে বিজয়ের লক্ষ্যে এগিয়ে নিয়ে যায়।