১৪ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বাঙালীর ভাষা আন্দোলন এবং একজন হালিমা খাতুন

  • শাহনেওয়াজ চৌধুরী

প্রগতিশীল মানসিকতার অধিকারী হলেই জাতিকে আলোর পথ দেখানো সম্ভব। তিনি যে পরিবেশে বড় হয়েছেন, সেখানে নারীশিক্ষা নিষিদ্ধ ছিল। মেয়েদের স্কুলে যাওয়া যেন হারাম ছিল! কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে- তাঁর বাবা একজন মাওলানা হয়েও মেয়েকে পর্দার আড়ালে রাখেননি। এমনকি তিনি এবং তাঁর এক বোন স্কুলে যাওয়ার কারণে সমাজের ধর্মান্ধ গোঁড়া লোকেরা তাঁদের একঘরে করে রেখেছিল। তবু শত বাধা মাড়িয়ে ঠিকই বিদ্যার্জন করেছিলেন। তিনি হালিমা খাতুন।

তবে হালিমা খাতুনের বিদ্যার্জনের এই সুযোগ মেলে মূলত তাঁর বাবার কারণে। তাঁর বাবা মৌলভী আব্দুর রহমান কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসা থেকে গ্র্যাজুয়েশন করেছিলেন। ছিলেন গুরু ট্রেনিং স্কুলের প্রশিক্ষক। নারীশিক্ষা প্রসারের জন্য নিজ গ্রামে একটি পাঠশালা প্রতিষ্ঠা করেন। এমন মানসিকতা ছিল বলেই মেয়েদের সুশিক্ষিত করতে পেরেছিলেন তিনি। সুশিক্ষিত হওয়ার কারণেই নিজ ভাষার অধিকার রক্ষার মানসিকতা দেখাতে পেরেছেন হালিমা খাতুন।

বাগেরহাটের সদর থানার বাদেকাড়াপাড়ায় ১৯৩৩ সালের ২৫ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন হালিমা খাতুন। সাত বোন এক ভাইয়ের মধ্যে তিনি অষ্টম। গ্রামের পাঠশালায় তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তালপাতা আর বাঁশের কঞ্চি দিয়ে লেখা শেখার পর শ্লেট আর কাগজে লেখার অনুমতি মেলে। ১৯৪০ সালে বাগেরহাট শহরের মনোমোহিনী বালিকা বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণীতে ভর্তি হয়ে ১৯৪৭ সালে মেট্রিকুলেশন পাস করেন। ওই বছর পাস করা ছয়জন মুসলিম, ছয়জন হিন্দু ছাত্রীর মধ্যে হালিমা খাতুন একজন। তারপর ভর্তি হন বাগেরহাট প্রফুল্ল চন্দ্র (পিসি) কলেজে। এই কলেজ থেকেই ১৯৪৯ সালে আইএ, ১৯৫১ সালে বিএ পাস করে একই বছরের শেষের দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজী সাহিত্যে এমএ ভর্তি হন। ১৯৫৩ সালে এমএ ডিগ্রী লাভ করেন। ১৯৫৪ সালে হালিমা খাতুনের বিয়ে হয় অধ্যাপক শামসুল হুদার সঙ্গে। তখন খুলনা করোনেশন গার্লস হাই স্কুলে শিক্ষকতা করতেন তিনি। এই সময়েই আর কে গার্লস কলেজে ইংরেজীর খ-কালীন প্রভাষক ছিলেন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫৭ সালে বাংলায় এমএ এবং রাজশাহী টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে বিএড ডিগ্রী লাভ করেন। ১৯৬২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএড ডিগ্রী লাভ করেন। এরপর স্কলারশিপ নিয়ে আমেরিকার ইউনিভার্সিটি অব নর্দান কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করতে যান ১৯৬৩ সালে এবং ১৯৬৮ সালে প্রাথমিক শিক্ষা ও শিশুসাহিত্যে ডক্টরেট ডিগ্রী লাভ করেন।

পড়াশোনার মাঝেই বিপ্লবে জড়িয়ে পড়েন হালিমা খাতুন। কিন্তু এর পেছনে অনুপ্রেরণার উৎসটা মজার। তাঁর ভাষ্যে- ‘বিপ্লবের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার অনুপ্রেরণাটা প্রথমে ঠিক পড়া থেকেই এসেছে- রবীন্দ্রনাথ থেকে এসেছে। এছাড়া শরৎচন্দ্র, নজরুল। শরৎচন্দ্রের ‘পথের দাবী’ সব সময় আন্দোলনের দিকে ধাবিত করেছে। সেকালে তো বিনোদন বলতে কিছুই ছিল না। শুধু বই পড়া। কেমন করে বিপ্লবী সাহিত্য আমার কাছে চলে আসত! এছাড়া আমাদের পরিবারের অনেকে কংগ্রেস আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আমার দুলাভাইয়ের অনেক বন্ধু ছিলেন, যারা জেল খেটেছেন। ...আমার বাবাও কংগ্রেস সমর্থন করতেন। ...সাতচল্লিশে যখন দেশ স্বাধীন হলো, তখন স্বাধীনতা গ্রহণ করতে পারিনি মনে মনে। ওই পাকিস্তানী স্বাধীনতাকে মেনে নিতে পারিনি। সেই জন্য বিপ্লবী সংগঠনের সঙ্গে, কংগ্রেসের আন্দোলন এবং কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হই স্কুলে পড়ার সময় থেকেই। কলেজের শিক্ষকরাও ছিলেন বামপন্থী। তারাও অনেক অনুপ্রাণিত করেছেন।’

গ্রামে থেকেই আইএ-বিএ পাস করেছেন হালিমা খাতুন। ’৫১ সালের শেষের দিকে ঢাকায় পড়তে আসেন। ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন তারও আগে, ১৯৪৮ সালে। তবে ভাষা আন্দোলনের তীব্রতা শুরু হয় ’৪৮-এরও আগে। এই বছরই ভাষা আন্দোলনের তীব্রতা ছড়াতে থাকে, যার রেশ বাগেরহাটেও পৌঁছেছিল। হালিমা খাতুন তখন বাগেরহাট কলেজের ছাত্রী। তখন থেকেই মিটিং-মিছিলে অংশ নিতেন। মওলানা ভাসানীর আদর্শে অনুপ্রাণিত হালিমা খাতুন আরও অনেকের সঙ্গে বাংলা ভাষার শত্রুদের বিরুদ্ধে এক রকম যুদ্ধ ঘোষণা করলেন। আর ’৫১ সালের শেষ দিকে ঢাকায় এসে ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়লেন সরাসরি।

বলা যায়, ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে পরোক্ষভাবে রাজনীতির সঙ্গেই জড়িয়েছিলেন হালিমা খাতুন। যুক্তফ্রন্টের প্রার্থীর হয়ে কাজ করেছেন তিনি। সেবার মুসলিম লীগের পতন ঘটল।

১৯৫২ সালের জানুয়ারি থেকে ভাষা আন্দোলন আরও বেগবান হলো। হালিমা খাতুনের সঙ্গে ছিলেন- সাদিয়া খাতুন, রোকেয়া খাতুন, সোফিয়া খান, হোসনে আরা জুলি প্রমুখ। ছেলেদের সঙ্গে তারাও পিকেটিং করতেন! লেখিকা লায়লা সামাদ, রোকেয়া রহমান কবীর, আফসারী খানম প্রমুখদের বাড়িতে সভা বসত।

বিশ্ববিদ্যালয়ের হল থেকে রাতে মেয়েদের বের হওয়ার অনুমতি ছিল না। ছেলেদের সঙ্গে কথা বলার অনুমতি ছিল না। ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণের জন্য ছাত্রীরা গোপনে ছাত্রদের সঙ্গে কথা বলত। হালিমা খাতুন স্থানীয় অভিভাবকের বাসায় দাওয়াত খাওয়ার কথা বলে হল থেকে বেরিয়ে সভায় যোগ দিতেন। সেই সময়ে রক্ষণশীল পরিবারের মেয়েদের এমন সাহসী ভূমিকা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। হালিমা খাতুন সেসব উপেক্ষা করার সাহস রাখতেন বলেই আমরা আজ মায়ের ভাষায় কথা বলতে পারছি।

‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’- এই ঘোষণা শুনে ছাত্ররা সিদ্ধান্ত নিল ২১ ফেব্রুয়ারি সারাদেশে ছাত্র ধর্মঘটের সমর্থনে ভোরবেলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় সমবেত হবে। সভা ও মিছিল বন্ধে সরকার ১৪৪ ধারা জারি করে।

২১ ফেব্রুয়ারি আমতলার সমাবেশে যোগ দেয়ার জন্য বাংলাবাজার গার্লস স্কুল ও মুসলিম গার্লস (বর্তমান আনোয়ারা খাতুন) স্কুলের শিক্ষার্থীদের আনার দায়িত্ব দেয়া হয় হালিমা খাতুনকে। তাঁদের বাধা দেয় বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। প্রধান শিক্ষকের বাধা উপেক্ষা করে শিক্ষার্থীদের নিয়ে আমতলায় এসে তাঁরা দেখলেন- আমতলায় ছাত্রছাত্রীর ভিড়। সেখানে হাজির হলেন মিটফোর্ড হাসপাতালের হোস্টেলের ছাত্রীরাও। উপস্থিত ছাত্রছাত্রীরা আব্দুল মতিনের নেতৃত্বে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত নেন। সভায় প্রিসাইড করেন গাজীউল হক। চারজন ছাত্রী প্রথমে পুলিশের ব্যারিকেড ভাঙতে ফটক পেরিয়ে বেরিয়ে আসেন। হালিমা খাতুন ছাত্রীদের প্রথম সারিতে ছিলেন। একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীর সঙ্গে তিনজন বিদ্যালয়ের ছাত্রী। হালিমা খাতুনের সঙ্গে ছিলেন- জুলেখা, আখতারী, পারুল (অলি আহাদের বোন)। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ সেøাগান দিতে দিতে রাজপথে বেরিয়ে আসেন হালিমা খাতুন। পুলিশ প্রথম দুই দলকে বাধা দেয় না। কিন্তু পরের দুই দলকে গ্রেফতার করল। দুই দল ছাত্রীকে পুলিশ গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়ার খবরে হোস্টেল থেকে অন্য ছাত্রীরাও বেরিয়ে আসেন। পুলিশের সামনে দিয়ে তারা ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ সেøাগান দিতে দিতে আমতলার সমাবেশের দিকে এগোতে থাকলে পুলিশ ছাত্রছাত্রীদের গ্রেফতার করতে থাকে। একপর্যায়ে টিয়ারগ্যাস, লাঠিচার্জ চালায় মিছিলের ওপর। ছাত্রছাত্রীদের চোখ জ্বালা করতে থাকে। অন্যদের সঙ্গে হালিমা খাতুন ভলান্টিয়ারদের বালতি ভরে আনা পানি চোখেমুখে দিয়ে আবার এগোতে থাকেন। কিন্তু একটু এগিয়েই টিয়ারগ্যাস আর লাঠিচার্জের কারণে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের হোস্টেলে ঢুকে পড়েন ছাত্রছাত্রীরা। ততক্ষণে মেডিক্যাল কলেজ ক্যাম্পাসের ভেতরে অনেক ছাত্র জড়ো হয়েছেন। নির্মাণ কাজের জন্য মেডিক্যাল কলেজ প্রাঙ্গণে অনেক ইট স্তূপাকারে জমা ছিল। ছাত্ররা পুলিশের দিকে ইট ছুড়ে মারতে থাকেন। এরপরই বিকেল তিনটায় পুলিশ ছাত্রদের লক্ষ্য করে গুলি চালাতে শুরু করে। ছাত্রছাত্রীরা আর এগোতে পারেনি। মেডিক্যাল কলেজের ভেতরেই থাকতে হয়েছে। এদিকে পুলিশের গুলিতে আহত-নিহতদের স্ট্রেচারে করে নিয়ে আসতে লাগল। হালিমা খাতুন অন্যদের সঙ্গে ইমার্জেন্সিতে ঢুকে পড়েন।

গোলাগুলি থামলে সবাই বর্তমান শহীদ মিনারস্থলে যান। তখন এখানে ছিল ছাত্রদের হোস্টেল। বাঁশের তৈরি ঘর। হোস্টেল থেকে একজন পিঠে করে গুলিবিদ্ধ বরকতকে মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসেন। হালিমা খাতুন সেখানে গিয়ে দেখেন- মেডিক্যাল হোস্টেলের অনেক জায়গাজুড়ে রক্ত। বাঁশের খুঁটিতে ঝোলানো শহীদের রক্তভেজা জামা-কাপড়গুলো থেকে রক্ত পড়তে পড়তে তা প্রায় শুকিয়ে আসছে। এছাড়া পুলিশের গুলিতে একজনের মাথার খুলি উড়ে গিয়ে মগজ ছড়িয়ে পড়েছিল সেখানে।

পরের রাতে মেডিক্যাল কলেজের ছাত্ররা শহীদ মিনার স্থাপন করেন। কন্ট্রাক্টররা তাদের ইট-বালি-সিমেন্ট সরবরাহ করে। পুলিশ রাতের অন্ধকারে অনেক লাশ গুম করে ফেলে। এখনও পর্যন্ত সে হিসাব মেলেনি।

মাত্র ২২ বছরে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের সাক্ষী হালিমা খাতুন দেশের জন্য আরও কিছু করার উৎসাহ, প্রেরণা পান।

বাংলা শিশুসাহিত্যে হালিমা খাতুন কিংবদন্তি। তাঁর ঝুলিতে শিশুসাহিত্যে ডক্টরেট থাকায় শিশু মনস্তত্ত্ব জানা। তাঁর শিশুতোষ রচনাগুলো তাই সুন্দর স্বপ্নের মতো সাজানো। তিনি নিজেও বলেন- ‘স্বপ্নে যে গল্প পাই, তা-ই কাগজে সাজাই।’ অসংখ্য পাঠকপ্রিয় শিশুতোষ গ্রন্থের জননী হালিমা খাতুন।

এই মহান শিল্পী ভূষিত হয়েছেন পঞ্চাশের অধিক গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কারে। এর মধ্যে- শিশুসাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য পেয়েছেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার, বাংলাদেশ শিশু একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯৯, ১৪০৫), পেয়েছেন- একুশে সম্মাননা ২০০৯, জাতীয় মহিলা সংস্থা, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের শ্রদ্ধাঞ্জলিসহ আরও অনেক পুরস্কার।

ভাষাসৈনিক হালিমা খাতুনের বাংলা ভাষার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে আক্ষেপ রয়েছে। তিনি বলেন, ‘বাংলা ভাষা, মাতৃভাষা একটা বিপদের সম্মুখীন হয়েছিল; সেই বিপদ থেকে আমরা উদ্ধার করেছি। তবে এখনও বাংলা ভাষা অনেক সঙ্কটের মধ্য দিয়ে চলছে। সর্বস্তরে বাংলা ভাষা সঠিকভাবে চালু হয়নি। চীন, জাপান, কোরিয়ায় তাদের মাতৃভাষায় সব কাজ হলে আমাদের দেশে হতে পারবে না কেন? বাংলা ভাষা বোধ হয় পৃথিবীর পঞ্চম স্থানে রয়েছে। এ ভাষাকে আমাদেরই রক্ষা করতে হবে। সর্বস্তরে বাংলা ভাষার চর্চা বাড়াতে হবে।’

লেখক : চিকিৎসক ও গবেষক