১৮ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

এখনও গেল না আঁধার...

মানুষ সভ্য ও শিক্ষিত হলেও এখনও অনেক মানুষের ভেতরেই আগ্নেয়গিরির মতো সুপ্ত রয়ে গেছে অবজ্ঞা ও ঘৃণার আগুন। তার সামান্য উদ্গিরণেই আহত কিংবা নিহত হতে পারে অপর ব্যক্তি। শুধু কথা আর আচরণ দিয়ে মানুষের মনে যন্ত্রণার অনুভূতি তীব্রভাবে জাগিয়ে তোলাও অসম্ভব নয়। ভাবলে বিস্মিত হতে হয়, এখনও বাংলাদেশের সমাজে নারীদেহের রং নিয়ে ভ্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি বিরাজ করছে। শারীরিক কোন সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় নিয়ে যেমন কোন মানুষকে সংবোধন কিংবা অন্যের সঙ্গে বৈষম্য সৃষ্টি করা সমীচীন নয়, তেমনি গায়ের রং দিয়েও কারও ব্যক্তিত্বের বিচার হতে পারে না। মেয়েটি কালো কিংবা ফর্সা- এমন কথা আমাদের চারপাশে আমরা অহরহ শুনি। অনেকটা অভ্যস্তও হয়ে পড়েছি এতে। কিন্তু বিষয়টি যে অরুচিকর ও গর্হিত- এটা আমাদের অনেকের পক্ষেই অনুধাবন অসম্ভব হয়ে ওঠে। এখনও বহু শিক্ষিত মানুষের মনের ভেতর বর্ণবাদ সুপ্ত অবস্থায় বিরাজ করে। স্বার্থে আঘাত লাগলে সেই বর্ণবাদী মানসিকতা বিশ্রীভাবে প্রকাশিত হয়ে পড়ে। এখনও আমাদের এই আপাত স্মার্ট সমাজে ছেলে বিয়ে দেয়ার জন্য কনে খুঁজতে পাত্রপক্ষ ফর্সা মেয়েকেই প্রাধান্য দেন। এমনকি সংবাদপত্রেও এই মর্মে বিজ্ঞাপন দেয়া হয়, সন্ধান চাওয়া হয় ফর্সা পাত্রীর। নির্মিত হয় গায়ের রং ফর্সা করার অবমাননাকর বিজ্ঞাপন।

‘বর্ণবাদ’ সমর্থনযোগ্য হতে পারে না। তবু এটি অনেক সমাজেই দাপট বজায় রেখেছে। বর্ণবাদবিরোধী মহান নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার দেশেও পুরোপুরি বর্ণবাদের অবসান ঘটেনি। দক্ষিণ আফ্রিকায় ও নামিবিয়ায় প্রাক-উপনিবেশ যুগে বর্ণবাদ নীতির সবচেয়ে নগ্ন বহির্প্রকাশ ঘটে এবং সেখানে ১৯৪৮ সালে সাদা-কালো বৈষম্যের মানবতাবিরোধী নীতি পাস হয়। ’৬০-এর দশকের পর থেকে ‘নিগ্রো’ শব্দটির ব্যবহার প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। কারণ এর সঙ্গে রয়েছে শত বছরের দাসপ্রথা, অত্যাচার, শোষণ ও বৈষম্যের ইতিহাস।

চামড়ার কোষে মেলানিন নামক যে রঞ্জক পদার্থ থাকে, সেটার জন্যই মানুষ সাদা বা কালো হয়। মেলানিনের মাত্রা বেশি থাকাতে চামড়ার রং গাঢ় হলেও এর একটা বিরাট উপকার আছে। সূর্যালোকে যে অতিবেগুনি রশ্মি থাকে, তা ওই মেলানিন কর্তৃক বাধাপ্রাপ্ত হয়ে শরীরের ভেতরে ঢোকে না, ফলে তাদের চর্ম ক্যান্সার রোগ হয় না। সে কারণে শীতপ্রধান দেশে যেখানকার মানুষের চামড়া সাদা, তাদের চর্ম ক্যান্সারের মাত্রা বহু গুণ বেশি।

জাতিতে জাতিতে বিদ্বেষ থেকে কোন অংশে কম নয় নারীর গাত্রবর্ণ বিষয়ে পুরুষের মোহগ্রস্ততা কিংবা বিকর্ষণ। বাংলাদেশের সমাজে শিক্ষিত-শিক্ষাবঞ্চিত নির্বিশেষে এখনও মেয়েদের গায়ের রংকে গুরুত্ব দেয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। সংবাদপত্রে ‘কালো মেয়ের’ আত্মহননের ইতিবৃত্ত বিভিন্ন সময়ে উঠে আসতে দেখি আমরা। স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজনের কাছ থেকে ‘কালো’ মেয়েটি তার গাত্রবর্ণের জন্য নানা লাঞ্ছনা ও গঞ্জনা সহ্য করে থাকেন। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে অবস্থানের উন্নয়নের জন্য নারীকে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে হয়। সেখানে গায়ের রঙের জন্যও তার ভোগান্তির শেষ নেই। পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হলে ‘কালো মেয়ের’ কষ্ট ও বিড়ম্বনা হয়ত কমবে। তবে তার আগে জরুরী নারীর আত্মশক্তি অর্জন। আসলে ব্যক্তিত্বের সৌন্দর্যই আসল কথা। নিজেকে সত্যিকারের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারলে যারা মানুষ হয়েও অমানুষ, তাদের অন্ধকার মন থেকে উঠে আসা নিকষ কালোকেও উপেক্ষা করা সম্ভব। তাই আত্মধিক্কার কিংবা আত্মবিনাশ নয়, চাই আত্ম উন্নয়ন। আধুনিক যুগে কেন থাকবে হীনম্মন্যতা? কবি তো বলে গেছেন- জাগো নারী জাগো বহ্নিশিখা।