১৭ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

এটিএম বুথে ভিড়, ব্যালান্সের খোঁজ নিচ্ছেন সবাই

রহিম শেখ ॥ তিনটি বেসরকারী ব্যাংকের ছয়টি এটিএম বুথে ‘স্কিমিং ডিভাইস’ বসিয়ে দুই শতাধিক গ্রাহকের লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়ার ঘটনায় আতঙ্ক কাটছে না সাধারণ গ্রাহকের মনে। বুধবার রাজধানীর অন্তত ৪০টি এটিএম বুথে উৎকণ্ঠিত গ্রাহকদের ভিড় দেখা গেছে। তারা প্রত্যেকেই নিজেদের এ্যাকাউন্টে ব্যালান্সের খোঁজ নিয়েছেন। কেউ কেউ এটিএম বুথে কার্ড দিয়ে তাদের এ্যাকাউন্টে থাকা অর্থ ঠিক আছে কি-না তা যাচাই করছেন। ঘটনাটি নিয়ে উদ্বিগ্ন বাংলাদেশ ব্যাংকও। এদিকে অনলাইন ব্যাংকিং জালিয়াতি রোধে ও করণীয় নির্ধারণে আজ বুধবার বিকেল ৩টায় কার্যরত দেশের সব ব্যাংককে নিয়ে বৈঠক করবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এন্টি স্কিমিং ডিভাইস থাকলে ব্যাংকের বুথগুলোয় ডেবিট কিংবা ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি হতো না বলে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। দ্রুত এ বিষয়ে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন বলেও পরামর্শ দেন তারা। ইতোমধ্যে কার্ড জালিয়াতির মাধ্যমে টাকা হাতিয়ে নেয়া চক্রটিকে শনাক্ত করতে মাঠে নেমেছেন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন গোয়েন্দা ইউনিটের সদস্যরা। শীঘ্রই তাদের শনাক্ত করা সম্ভব হবে বলেও জানান তারা।

জানা গেছে, গত এক দশকে অত্যন্ত জনপ্রিয়তা পেয়েছে অনলাইন ব্যাংকিং। শহর ছেড়ে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত পৌঁছেছে দেশের প্রায় সবকটি ব্যাংকের কমপক্ষে ৯৫ লাখ এটিএম কার্ড ব্যবহারকারী। কিন্তু গত কয়েক দিনে শীর্ষস্থানীয় তিনটি ব্যাংকের কয়েকটি বুথে এটিএম কার্ড জালিয়াতির চাঞ্চল্যকর ঘটনা প্রকাশিত হওয়ায় দেশজুড়ে গ্রাহকদের মাঝে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়েছে। বুধবারও রাজধানীর অন্তত ৪০টি এটিএম বুথে উৎকণ্ঠিত গ্রাহকদের ভিড় দেখা গেছে। তারা প্রত্যেকেই নিজেদের এ্যাকাউন্টে ব্যালান্সের খোঁজ নিয়েছেন। কেউ কেউ এটিএম বুথে কার্ড দিয়ে তাদের এ্যাকাউন্টে থাকা অর্থ ঠিক আছে কি-না তা যাচাই করছেন। বুথ থেকে টাকা উত্তোলনের ক্ষেত্রেও তাদের অধিক সতর্ক থাকতে দেখা গেছে। বুথে ঢুকেই অনেককে মাথার ওপর স্থাপিত সিসি ক্যামেরা খুঁজতে দেখা গেছে। অনেককেই বাটনে পিন নাম্বার চাপার ক্ষেত্রে হাত দিয়ে আড়াল করতে দেখা গেছে। এদিকে গ্রাহকদের এ আস্থার সঙ্কট কাটাতে মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ব্যাংকগুলোর জন্য এক সচেতনতামূলক সার্কুলার জারি করা হয়। ওই সার্কুলারে আগামী এক মাসের মধ্যে এটিএম কার্ড জালিয়াতির প্রতিরোধমূলক আধুনিক ব্যবস্থা (ডিভাইস) স্থাপন করতে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে এন্টি স্কিমিং ডিভাইস স্থাপন, নিয়মিত ভিডিও ফুটেজ পর্যবেক্ষণ ও এটিএম বুথে যেন কোনভাবে কেউ কোন যন্ত্র বসাতে না পারেন, সে বিষয়েও সতর্ক থাকতে বলেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

অনলাইন ব্যাংকিং জালিয়াতি রোধে ও করণীয় নির্ধারণে আজ বুধবার বিকাল ৩টায় কার্যরত দেশের সব ব্যাংককে নিয়ে বৈঠক করবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র শুভঙ্কর সাহা জনকণ্ঠকে বলেন, এটিএম কার্ড জালিয়াতির ঘটনায় উদ্বিগ্ন কেন্দ্রীয় ব্যাংক। একই সঙ্গে ঘটনাটি কঠোরভাবে মনিটরিং করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তিনি বলেন, আজ (বুধবার) অনলাইন ব্যাংকিং বা কার্ড জালিয়াতি নিয়ে ব্যাংকগুলোর সঙ্গে বৈঠক ডাকা হয়েছে। বৈঠকে ব্যাংকগুলো কী ধরনের ব্যবস্থা নেবে তা জানতে চাওয়া হবে। বৈঠকে আগামী এক মাসের মধ্যে সবগুলো বুথে এন্টি স্কিমিং ডিভাইস বসানোর বিষয়ে আলোচনা হবে। এ ঘটনায় কোন ব্যাংকের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ঘাটতি থাকলে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে তিনি জানান। তবে ঘটনাটি নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই দাবি করে ওই কর্মকর্তা বলেন, ইতোমধ্যে এটিএম কার্ডের নিরাপত্তায় সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এদিকে আগের দিনের মতো বুধবারও বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত দল সিটি ব্যাংক, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবিএল) ও ইস্টার্ন ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত দলের একজন কর্মকর্তা জনকণ্ঠকে বলেন, ঠিক কত গ্রাহকের এটিএম কার্ডের গোপন নম্বর এভাবে পাচার হয়েছে তা কেউ জানেন না। বিশেষ করে যাদের এ্যাকাউন্টে বেশি অর্থ রয়েছে তারাই বেশি আতঙ্কিত। একটি বেসরকারী ব্যাংকের কার্ড ইস্যুকারী বিভাগের কর্মকর্তা জনকণ্ঠকে বলেন, প্রতিদিনই সারাদেশ থেকে গ্রাহকের টেলিফোন আসছে। তারা ব্যাংকের এটিএম কার্ড জালিয়াতি প্রতিরোধে বাড়তি কোন পদক্ষেপ নিচ্ছে কি-না তা জানতে চেয়েছেন। একই সঙ্গে অনেকেই এটিএম বুথে গিয়ে তাদের এ্যাকাউন্টে যাচাই করে আসছেন। তবে কার্ড ইস্যুকারী বিভাগ থেকে গ্রাহকদের আতঙ্কিত না হতে পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, এটিএম বুথগুলোয় স্কিমিং ডিভাইস বসানোর ক্ষেত্রে ব্যাংকের লোকজনও জড়িত থাকতে পারেন। তবে সর্বশেষ ঘটনায় এর সম্ভাবনা কম বলেও মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ বাংলাদেশে বিষয়টি নতুন হলেও অন্য অনেক দেশে স্কিমিংয়ের বিষয়টি পুরনো। প্রায় আড়াই বছর আগে এটিএম লেনদেন নিরাপদ রাখার জন্য সব ধরনের ঝুঁকি মোকাবেলায় ব্যাংকগুলোর করণীয় বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক নির্দেশনা জারি করে। কিন্তু সেটাও সঠিকভাবে আমলে নেয়নি ব্যাংকগুলো। এছাড়া স্কিমিংয়ের বিষয়ে ব্যাংকগুলোর সংশ্লিষ্ট উর্ধতন কর্মকর্তাদের জানা থাকলেও কেন তারা এর প্রতিরোধে এন্টি স্কিমিং ডিভাইস ব্যবহার করেননি সেটাই এখন রহস্যের বিষয়। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় তদন্ত শেষে সবকিছুই খোলাসা হয়ে যাবে বলে মনে করেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। ক্রেডিট ও ডেবিট কার্ড জালিয়াতির মাধ্যমে গ্রাহকের টাকা হাতিয়ে নেয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের সাইবার নিরাপত্তা কর্মসূচীর ফোকাল পয়েন্ট তানভীর হাসান জোহা জনকণ্ঠকে বলেন, জালিয়াতির বিষয়টি ব্যাংক সংশ্লিষ্ট লোক ছাড়া সম্ভব নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে সরকারের তথ্য ও প্রযুক্তি বিভাগের কাছে সহায়তা চাওয়া হয়েছে। এরপর তারা কার্ড জালিয়াত চক্রকে শনাক্ত করতে কাজ শুরু করেছেন। জোহা বলেন, এ ঘটনার সঙ্গে হয়ত ব্যাংকের লোকজন জড়িত নেই। কিন্তু ঘটনার পর পরই বিষয়টি বিদেশী ক্রিমিনালরা করেছে বলে একটি ব্যাংকের পক্ষ থেকে যে তথ্য দেয়া হয়েছে, সেটাও রহস্যজনক। দেশীয় চক্র জড়িত না থাকলে বিদেশী চক্রের দ্বারা এমন জালিয়াতি সম্ভব নয়। জালিয়াতদের শনাক্ত করতে সরকারের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থাও কাজ করছে বলে জানান তিনি।