১৫ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো

আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো

স্টাফ রিপোর্টার ॥ মাতৃভাষা হচ্ছে সেই ভাষা, চেষ্টা করে যা শিখতে হয় না। শিশু জন্ম নেয়ার পর থেকেই এই ভাষাতেই তার মনের ভাব প্রকাশ করে। পৃথিবীর ইতিহাসে একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা মাতৃভাষাকে রক্ষা ও প্রতিষ্ঠা করার জন্য নিঃশেষে প্রাণদান এবং এ আত্মত্যাগের মাধ্যমে জাতিসত্তার উপলব্ধি। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা-আন্দোলনের শহীদদের তাজা রক্তে রাজপথ যখন রঞ্জিত হয় তখন এ দেশের মানুষ মাতৃভাষাকে নতুনভাবে অর্জন করে। এ অর্জন দিয়েছিল অদম্য সাহস, যুগিয়েছিল সীমাহীন প্রেরণা। ২১ ফেব্রুয়ারি একুশ নামে পরিচিত হলো। একুশ পূর্ব-বাংলার রাজনীতিতে মৌলিক পরিবর্তন ঘটায়। একুশ থেকে সৃষ্টি হয় ২১ দফা। এই ২১ দফা একটি ঐতিহাসিক দলিল। ২১ দফার চারটি দফা ছিল ভাষা ও একুশ সংক্রান্ত। ২১ দফা যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী ইশতেহার হিসেবে জনমনে এতই আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল যে, ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে মুসলিম লীগের ভরাডুবি হয় এবং যুক্তফ্রন্ট ক্ষমতায় আসে।

১৯৫৫ সালের ৩ ডিসেম্বর বর্ধমান হাউসে বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠিত হয়। এই একাডেমি বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে শুরু করে। ধীরে ধীরে একুশের চেতনায় বাঙালী জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটে। ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’ এমন একটি গান বাংলার জনগণকে ক্রমাগত নাড়া দিয়েছে। এই গানের প্রবল আবেগ বাঙালী মানসিকতায় পাকিস্তান রাষ্ট্রকে অবিশ্বাস করতে শুরু করে। তাদের শৃঙ্খল ভাঙতে বাঙালীর চেতনায় প্রথম চলে আসে ’৫২ ভাষা আন্দোলন। এ কারণেই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে শহীদ মিনার গড়ে ওঠে। প্রতিটি শহীদ মিনার যেন ভাষা শহীদদের অগ্নিশিখা। মাতৃভাষাকে কেবল অসৎ অভিসন্ধির হাত থেকে রক্ষা করেই এ দেশের মানুষ ক্ষান্ত হয়নি, তার জাতিসত্তার পরিচয়কে সাহিত্যের প্রতিটি ক্ষেত্রে এবং শিল্পকর্ম, সঙ্গীত ও নৃত্যে সমৃদ্ধতর করে বাঙালী মননশীলতাকে গতিময় করে তোলে। মাতৃভাষার উৎকর্ষ ও বিকাশে ক্রমাগত সক্রিয় এবং ঐতিহ্য সচেতন ছিল বলেই বাংলাদেশের জনগণ পরাধীনতার নাগপাশ থেকে স্বাধীনতাকে ছিনিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছিল ১৯৭১ সালে। বাংলাদেশের জনগণের এ সাফল্যের মহত্তম স্বীকৃতি আসে ১৯৯৯ সালে। ওই বছর কানাডায় বসবাসরত একটি বহুভাষিক ও বহুজাতিক মাতৃভাষা প্রেমিক গ্রুপের আবেদনে এবং তৎকালীন বাংলাদেশ সরকারের প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে জাতিসংঘ পৃথিবীর প্রত্যেক জাতির মাতৃভাষার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য প্রতিবছর ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালনের ঘোষণা দেয়।

ভাষা-আন্দোলন তথা একুশে ফেব্রুয়ারি একটি চেতনার নাম। যে চেতনা আমাদের বাঙালী জাতিসত্তার বিকাশ এবং জাতির মেধা, মনন ও সৃজনশীলতার পথকে বিস্তৃত করেছে। ভাষা-আন্দোলনের প্রভাবে সাহিত্য, সঙ্গীত, চিত্রকলাসহ সৃষ্টিশীলতার প্রতিটি ক্ষেত্রে গুণগত ও পরিমাণগত পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। আমাদের জাতীয় চেতনা বিকাশেও ভাষা-আন্দোলনের অবদান অনস্বীকার্য। ভাষা-আন্দোলন তার বহুমাত্রিক চরিত্র নিয়ে জাতীয় জীবনে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। বাংলা একাডেমি ভাষা-আন্দোলনেরই ফসল। বাংলা একাডেমি তাই জাতির মননের প্রতীক হয়ে উঠেছে। জাতীয় আশা-আকাক্সক্ষার সঙ্গে সঙ্গতি বজায় রেখে ভাষা-আন্দোলনের ঐতিহাসিক গুরুত্বকে বর্তমান ও ভবিষ্যত প্রজন্ম এবং বিশ্বের কাছে তুলে ধরার মূল দায়িত্ব বাংলা একাডেমির। তাই বাংলা একাডেমি ভাষা-আন্দোলনের ওপর জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করেছে। ২০১০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউসের দ্বিতীয় তলায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ জাদুঘর উদ্বোধন করেন। ভাষা-আন্দোলন জাদুঘর পৃথিবীর কোন দেশে নেই। সেদিক থেকে এই জাদুঘরটি অনন্য।