১৮ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আগামীর তারকা মিরাজ

  • বিউটি পারভীন

একজন সাকিব আল হাসান অনেক অর্জন এনে দিয়েছেন। দেশকে করেছেন গর্বিত স্বীয় নৈপুণ্যে উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হয়ে। কিন্তু ভবিষ্যতের ‘সাকিব’ পাওয়াটা জরুরী বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য। সেই পথেই কি এগোচ্ছেন মেহেদী হাসান মিরাজ? এখন পর্যন্ত এ ১৮ বছর বয়সী তরুণ ব্যাট-বলে যা করে দেখিয়েছেন সবাই সেই প্রত্যাশাই করছেন। অনেকে বলছেন বাংলাদেশের জন্য আগামীর ‘সাকিব’ হয়ে আসছেন খুলনার এ ছেলেটি। টানা দুটি অনুর্ধ ১৯ বিশ্বকাপে দলকে নেতৃত্ব দিয়ে বিরল কৃতিত্বের নজির স্থাপন করেছেন, এবার বাংলাদেশ যুবাদের পাইয়ে দিয়েছেন বিশ্বকাপ ইতিহাসের সেরা সাফল্য। উদ্ভাসিত নৈপুণ্যের পুরস্কারটাও পেয়েছেন। সদ্যসমাপ্ত যুব বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড় হয়েছেন অলরাউন্ড নৈপুণ্যে সবাইকে পেছনে ফেলে। বাংলাদেশের জন্য সেটি আরেক গৌরবময় অধ্যায়ের সূচনা। এর আগে কোন বাংলাদেশী ক্রিকেটার আইসিসির কোন টুর্নামেন্টের সেরা হতে পারেননি। তার এমন নৈপুণ্যের কারণে দেশ-বিদেশের সাবেক ক্রিকেটাররা দেখতে পাচ্ছেন পরবর্তী প্রজন্মের আন্তর্জাতিক এক তারকাকে। সবাই প্রশংসায় ভাসিয়ে যাচ্ছেন এ তরুণকে। এমনকি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের সভাপতি, পাকিস্তানী ক্রিকেট কিংবদন্তি জহির আব্বাসও প্রশংসা করলেন তার। বাদ যাননি বাংলাদেশ জাতীয় দলের ক্রিকেটাররাও। মিরাজকে অভিনন্দন জানিয়েছেন, করেছেন প্রশংসা। কিন্তু মিরাজ বুঝতে পারছেন তাকে আরও পরিণত হতে হবে। এখানেই শেষ নয়, যেতে হবে অনেকটা দূর। একসময় জাতীয় দলের হয়ে খেলে দেশকে বড় গৌরব এনে দিতে হবে। এমন ইচ্ছাই ব্যক্ত করেছেন তিনি।

বাংলাদেশ যুব ক্রিকেট দলের অভূতপূর্ব সাফল্যটা আরও বড় হতে পারত। সেমিফাইনালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ অনুর্ধ ১৯ দলের কাছে হেরে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন ভঙ্গ হয়। কিন্তু মিরাজ অধিনায়ক হিসেবে যেমন পরিণত তেমনি মানসিকভাবেও যথেষ্ট শক্ত। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন হেরে গেলেও আশাহত হলে চলবে না। তিনি সেমিতে পরাজয়ের পর বলেছিলেন, ‘চ্যাম্পিয়ন বা রানার্সআপ আমরা হতে পারিনি, কিন্তু এখনও বিশ্বের তিন নম্বর দল হতে পারি। টেস্ট খেলুড়ে যে কোন দেশের মধ্যে সেরা দলগুলোর হিসেব করতে হলে আমাদের ভাবতে হবে। আমরা তৃতীয় স্থান অর্জন করলে সেটা ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্যও বড় উদাহরণ হবে। মুশফিক ভাইরা পঞ্চম হয়েছিলেন (২০০৬ যুব বিশ্বকাপে)। আমরা তৃতীয় হতে পারলে পরবর্তী প্রজন্ম এটাকে উদাহরণ হিসেবে নিয়ে আরও অনুপ্রাণিত থাকবে এবং তারা আগেভাগেই চ্যাম্পিয়ন হওয়ার লক্ষ্যে খেলতে পারবে।’

মিরাজের কথায় যে পরিণত ক্রিকেটারের পেশাদার মনোভাব ফুটে উঠেছে সেটা সত্যিই দারুণ এক বিষয়। সে কারণেই অনুর্ধ ১৯ দলকে নেতৃত্ব দিয়ে দারুণ এক অর্জন এনে দিতে সক্ষম হয়েছেন। স্বপ্ন ভঙ্গে হতাশায় মুষড়ে না পড়ে, শক্ত মানসিকতা নিয়ে লড়ে তৃতীয় স্থান পাইয়ে দিয়েছেন বাংলাদেশের যুবাদের। শুধু ব্যাট-বল হাতেই দুরন্ত বিষয়টি এমন নয়। অনুর্ধ ১৯ বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে দলকে টানা দুই আসরে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এবার তিনি দলকে দারুণ নেতৃত্ব যেমন দিয়েছেন, ব্যক্তিগত নৈপুণ্যেও দলকে জিতিয়েছেন তিনটি ম্যাচ। তিনি যে আগামীর আন্তর্জাতিক তারকা এতেও কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। সে কারণেই মিরাজ এবার বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত অনুর্ধ ১৯ বিশ্বকাপের প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে হয়েছেন টুর্নামেন্ট সেরা।

ব্যাটে-বলে ধারাবাহিক নৈপুণ্য দেখিয়ে যাওয়ার কারণে অনেকেই তাকে পরবর্তী প্রজন্মের ‘সাকিব’ বলেও অভিহিত করতে শুরু করে দিয়েছেন। বর্তমানে বিশ্বের সেরা ওয়ানডে ও টি২০ অলরাউন্ডার বাংলাদেশ জাতীয় দলের অপরিহার্য ক্রিকেটার সাকিবও বৃহত্তর খুলনা অঞ্চলের (মাগুড়া) ক্রিকেটার। জাতীয় দলের হয়ে সাকিবের যে অবদান, ঠিক একই অবদান মিরাজের যুবাদের হয়ে। সেটা এবার বিশ্বকাপেও প্রমাণ দিয়েছেন তিনি। ব্যাটে-বলে দুর্দান্ত নৈপুণ্য দেখিয়ে এবার তিনি বাংলাদেশ যুবাদের ৩ ম্যাচ জিতিয়ে হয়েছেন ম্যাচসেরা। সবমিলিয়ে ৬ ম্যাচের ৫ ইনিংস ব্যাট করে চার অর্ধশতকসহ করেছেন ৬০.৫০ গড়ে ২৪২ রান। আর বল হাতে ৫৬.৩ ওভার বোলিং করে ৯ মেডেনসহ ১২ উইকেট শিকার করেছেন ১৭.৬৬ গড় ও মাত্র ৩.৭৫ ইকোনমি রেটে ১২ উইকেট। টুর্নামেন্টের বোলিং নৈপুণ্যে তার অবস্থান ৭ নম্বরে। আর ব্যাটিংয়ে ১২ নম্বর। সাকিবের সঙ্গে আপাতত একটিই পার্থক্য মিরাজের। সাকিব বাঁহাতি স্পিনার আর মিরাজ ডানহাতি অফস্পিনার। আর বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ওই একটিই মাত্র ঘাটতি আছে। সেটা হচ্ছে ডানহাতি অফস্পিনার। বাঁহাতি স্পিনারের প্রজননকেন্দ্রে পরিণত হওয়া বাংলাদেশে ডানহাতি ও নির্ভরযোগ্য স্পিনারের বড়ই অভাব। তবে মিরাজ টুর্নামেন্টজুড়ে যে সাফল্য দেখিয়েছেন বল হাতে তাকে দিয়েই হয়ত বাংলাদেশ দলের সেই অভাবটা পূরণ হবে। ব্যাটে-বলে যুব বিশ্বকাপে এমন অসাধারণ নৈপুণ্যের কল্যাণেই তিনি সেরা খেলোয়াড় হয়েছেন। যা এর আগে কোন বাংলাদেশী ক্রিকেটার করতে পারেননি। এছাড়াও প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ দলকে সেমিফাইনালে তুলেছেন নেতৃত্ব দিয়ে, বিশ্বকাপের ইতিহাসে সেরা সাফল্য হিসেবে বাংলাদেশ হয়েছে তৃতীয়। সবমিলিয়ে তাই দারুণ উচ্ছ্বসিত এ তরুণ। পুরস্কার হাতে নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি সত্যিই খুব উদ্বেলিত। আমার লক্ষ্যটা অনেক বড় ছিল। আমি সেরা অলরাউন্ডার হতে চেয়েছিলাম। পরবর্তী লক্ষ্য পরের বিশ্বকাপ জেতা। ভবিষ্যত পরিকল্পনা জাতীয় দলের হয়ে খেলা।’

দীর্ঘদিন দলকে নেতৃত্ব দিয়ে একটা বড় শিক্ষা পেয়েছেন মিরাজ, সেটি হচ্ছে কোন কাজই সহজ নয়। এবারই শেষ হয়ে যাচ্ছে তার অনুর্ধ ১৯ দলের হয়ে খেলা। এর আগেই দেশের জন্য গৌরব করার মতো অনেক কিছুই পেলেন মিরাজ। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এখানে ১৬ দল খেলেছে। আর এখানে আমি সেরার পুরস্কার পেয়েছি। এটা শুধু আমার জন্য না; আমি বলব এটা পুরো দেশের অর্জন। পুরো বিশ্ব দেখেছে বাংলাদেশ ভাল ক্রিকেট খেলেছে এবং প্রতিদিনই উন্নতি করেছে।’ ফোনে, ফেসবুক ও টুইটারে প্রচুর মানুষের অভিনন্দন পেয়েছেন। তবে স্বাভাবিকভাবেই মিরাজ বেশি রোমাঞ্চিত জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের অভিনন্দন পেয়ে। তিনি এ বিষয়ে বলেন, ‘মাশরাফি ভাই, সাকিব ভাই, মুশফিক ভাইরা ফেসবুকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। অনেকে ফেসবুক স্ট্যাটাস দিয়েও অভিনন্দন জানিয়েছেন। তাদের অভিনন্দন পেয়েই বেশি ভাল লাগছে।’ জাতীয় দলের অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময়ও অভিনন্দনে সিক্ত করেছেন অনুজ এই ক্রিকেটারকে। বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পরদিন চট্টগ্রামে অনুশীলনের আগে মাশরাফি বলেন, ‘এই দলের ৫-৭ ক্রিকেটার আছে, যারা ভবিষ্যতে জাতীয় দলে খেলার যোগ্যতা রাখে। মিরাজকে আলাদাভাবে অভিনন্দন। ও ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্ট হয়েছে। এটা অনেক বড় বিষয়।’ ফাইনালে উঠতে না পারলেও মেহেদীর দলের পারফর্মেন্সে দারুণ খুশি বড়দের অধিনায়ক। কিন্তু চ্যালেঞ্জটা সামন্ েআরও কঠিন। নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে আগামীতে বড় অর্জন বয়ে আনার জন্য। এ বিষয়ে মিরাজ বলেন, ‘জাতীয় দলে খেলার জন্য পরিপূর্ণ ক্রিকেটার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। আমার সামনে অনেক সময় আছে। এ সময়টা আমি কাজে লাগিয়ে পরিপূর্ণ হতে চাই। অনুর্ধ ১৯ পর্যায় থেকে দেশের মানুষ আমাদের খেলা দেখেছে। আমার প্রতি সবাই প্রত্যাশা করছে। আমাদের এখন তাই আরও ভাল খেলতে হবে। আমি ব্যক্তিগতভাবে অনেক দূরে যেতে চাই। বাংলাদেশকে অনেক কিছু দিতে চাই।’