২০ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

উদ্বাস্তু নিয়ে আবারও বিপদে ইউরোপ

  • এনামুল হক

সিরিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সঙ্কট যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পাশ্চাত্যের তৈরি। সেই সঙ্কট বিশেষত সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে ঐ অঞ্চলে ভয়াবহ বিপর্যয়ই কেবল নেমে আসেনি এতে ইউরোপেরও হাত পুড়ছে। সিরিয়ার ৫ বছরের গৃহযুদ্ধে ইতোমধ্যে লক্ষাধিক লোক নিহত এবং আরও লাখ লাখ লোক উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়েছে। এই উদ্বাস্তুরা আশপাশের দেশগুলিতে ছড়িয়ে পড়ে নতুন সঙ্কটের জন্ম দিয়েছে। উদ্বাস্তুদের অনেকে পাড়ি জমিয়েছে ইউরোপের দেশগুলিতে।

৫০ কোটি লোক অধ্যুষিত ইউরোপে গত বছর ১০ লাখ উদ্বাস্তু গিয়ে ঠাঁই নিয়েছে। উদ্বাস্তুর ঐ ঢল নিয়ে মুষ্টিমেয় কিছু ধনী দেশে যে বিশৃঙ্খলা ও অন্যান্য সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে তা আর বলার মত নয়। উদ্বাস্তু সঙ্কটকে কেন্দ্র করে ইউরোপজুড়ে উগ্র দক্ষিণপন্থী শক্তি মাথাচাড়া দিচ্ছে। তারা উদ্বাস্তুদের ওপর হামলা করছে। আশ্রয় কেন্দ্রগুলো আক্রান্ত হচ্ছে। ভয়ঙ্কর ঝুঁকি নিয়ে উদ্বাস্তুরা ইউরোপে আসছে। গত মাসে ইজিয়ান সাগর পাড়ি দিয়ে তুরস্ক থেকে গ্রীসে পৌঁছাতে গিয়ে প্রচ- শীতে ৩৬৫ জন মারা গেছে। তারপরও তাদের ঢল থামছে না। এই ঢল থামানোর একমাত্র পথ যে সিরীয় সঙ্কটের সমাধান সেটাও সুদূর পরাহত রয়ে গেছে।

উদ্বাস্তুর ঢল থামাতে ইউরোপীয় দেশগুলো একতরফাভাবে নিজেদের সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছে এবং আশ্রয় সংক্রান্ত নিয়ম কড়াকড়ি করেছে। এতে উদ্বাস্তু সঙ্কট আরও জটিল রূপ নেয়ার পাশাপাশি আরেক সঙ্কটেরও উৎপত্তি হয়েছে যার শিকার খোদ ইউরোপীয়রাই। ইউরোপের কোন কোন এলাকা ছিল সীমান্ত মুক্ত। ফলে ইউরোপের ২৬টি দেশের মধ্যে অবাধে পর্যটক ও পণ্যবাহী ট্রাক চলাচল করত। উদ্বাস্তুর ঢল নামায় পণ্যবাহী ট্রাকের সঙ্গে উদ্বাস্তুরাও আসছিল। এখন উদ্বাস্তুর প্রবাহ ঠেকাতে অস্ট্রিয়া, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, জার্মানি, নরওয়ে ও সুইডেন আবার সাময়িকভাবে সীমান্তে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। অন্যরা তল্লাশি বাড়িয়েছে। ফলে আরেক সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে ইউরোপে।

শেনঝেন চুক্তি বলে সীমান্ত উন্মুক্ত থাকায় প্রতি বছর ১৩০ কোটি লোক ইউরোপের অভ্যন্তরীণ সীমান্ত পাড়ি দেয়। সেই সঙ্গে ৫ কোটি ৭০ লাখ ট্রাকে করে ৩.৭ ট্রিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য পরিবাহিত হয়। পারস্পরিক প্রয়োজনে এই দেশগুলোর মধ্যে নানা ধরনের কাজ তথা কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়। এখন নতুন করে নিয়ন্ত্রণ আরোপের ফলে পর্যটন, বাণিজ্য ইত্যাদি ব্যাহত হওয়ায় শুধু ফ্রান্সেরই বছরে ক্ষতি হবে একশ’ থেকে দুশ’ কোটি ইউরো। আর শেনঝেন ব্যবস্থা ভেঙ্গে গেলে এর অর্থনৈতিক পরিণতি তো আরও ভয়াবহ রূপ নেবে। অবাধ পণ্য চলাচল স্থায়ীভাবে খর্ব হলে শেনঝেন অঞ্চলের ভেতরে বাণিজ্যের ওপর কর বাড়বে ৩ শতাংশ এবং আগামী দশকে ঐ অঞ্চলে উৎপাদন হ্রাস পাবে ০.৮ শতাংশ বা ১১ হাজার কোটি ইউরো। কর্মসংস্থান, মজুরি ও পর্যটন আয় হ্রাস এগুলো তো আছেই। তাছাড়া দীর্ঘ সীমান্তে টহল ব্যবস্থা পুনরায় চালু করার জন্য এই খাতে খরচ বাড়বে।

সবচেয়ে বড় সঙ্কটে পড়বে রফতানিকারকরা বিশেষ করে যারা পচনশীল পণ্যের ব্যবসা করে। টহল ব্যবস্থা কড়াকড়ি হলে প্রতিটি লরির পিছনে যে এক ঘণ্টা বাড়তি সময় ব্যয় হবে তাতে শুধু জার্মানিরই এক বছরে অতিরিক্ত খরচ হবে ১ হাজার কোটি ইউরো। সোজা কথায় শেনঝেন অঞ্চলে উল্মুক সীমান্তের বদলে কড়াকড়ি সীমান্ত ফের চালু হলে দারুণ বিপর্যস্ত হবে ইউরোপ।

তাই ইউরোপ উদ্বাস্তুর প্রবাহ ঠেকাতে উঠে পড়ে লেগেছে। তারা চাইছে উদ্বাস্তুরা প্রথমে যেখানে এসে সমবেত হচ্ছে সেখান থেকে যাতে অন্যত্র ছড়িয়ে না পড়তে পারে সে ব্যবস্থা করা। সেজন্য তারা প্রথমে তুরস্ককে বেছে নিয়েছে। কারণ তুরস্কই হলো থোস্ট কান্ট্রি যেখানে ২৭ লাখ উদ্বাস্তু আশ্রয় নিয়েছে। এদের সিংহভাগ সিরীয়। এরা তুরস্কেই এসে প্রথমে জড়ো হচ্ছে এবং সেখান থেকে অন্যান্য দেশে চলে যাওয়ার চেষ্টা করছে। এই অন্যান্য দেশে পাড়ি জমানোর ব্যাপারটা তুরস্ক যাতে কমাতে পারে তার পুরস্কার স্বরূপ দেশটিকে ইইউ ৩৩০ কোটি ডলার সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

কিন্তু সমস্যা থেকে যাচ্ছে অন্যত্র। তুরস্ক, জর্দান ও লেবানন এই তিন দেশে ২০ লাখ শিশুসহ ৫০ লাখেরও বেশি শরণার্থী আছে। বেশির ভাগই দরিদ্র। উদ্বাস্তুর প্রবল চাপের ধকল সইতে না পেরে এই তিন দেশের সরকার উদ্বাস্তুদের বাইরে ঠেকিয়ে রাখার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছে। প্রায় ২০ হাজার সিরীয় জর্দান সংলগ্ন মরুভূমিতে ধুঁকছে। এদের বেশির ভাগকে জর্দান ঢুকতে দিচ্ছে না। লেবানন তার সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছে। এই তিন দেশের অবস্থা এমনিতে খারাপ এবং তা আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। এ অবস্থা যতই বিঘœসঙ্কুল হোক এই উদ্বাস্তুদের কাছে ইউরোপ যাত্রা অধিকতর আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। জর্দানে অবস্থানরত সিরীয়দের অর্ধেক চলে যেতে চায়। ওদিকে দেড় লাখ সিরীয় গত গ্রীষ্মে লেবানন থেকে সমুদ্রপথে পাড়ি জমিয়েছে তুরস্কে যাতে করে সেখান থেকে তারা ইউরোপে উদ্বাস্তুর ভিড়ে মিশে যেতে পারে। ইউরোপে যাওয়ার প্রথম পথটা হলো গ্রীস। সেখানে পৌঁছাতে পারলে বাকি দেশগুলোতে যাওয়া সহজ। এজন্যই ইজিয়ান সাগর পাড়ি দিয়ে গ্রীসে পৌঁছার জন্য গড়ে উঠেছে বেশ কিছু রুট এবং সেই সঙ্গে মানব পাচারকারী বেশ কিছু চক্র যারা মোটা টাকার বিনিময়ে উদ্বাস্তুদের পৌঁছে দিচ্ছে কাক্সিক্ষত গন্তব্যে।

সূত্র : দি ইকনোমিস্ট

এই মাত্রা পাওয়া