২০ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মিয়ানমার ॥ গণতন্ত্রের পথচলা শুরু

  • ওয়াইজ করনী

এক নতুন যুগে প্রবেশ করেছে মিয়ানমার। নতুন এক ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে জেগে উঠেছে দেশটি। প্রায় অর্ধশতাব্দী পর গত ৮ নবেম্বর অনুষ্ঠিত প্রথম অধিবেশন সাধারণ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গঠিত পার্লামেন্ট নিয়ে ১ ফেব্রুয়ারি নবরূপে যাত্রা শুরু করেছে মিয়ানমার। এ যেন প্রথম দিন স্কুলে যাওয়ার মতো ঘটনা। ওই দিন রাজধানী নাইপিডোর পার্লামেন্ট ভবনে বসে নবনির্বাচিত গণপ্রতিনিধিদের প্রথম অধিবেশন।

কিছু কিছু এমপির জন্য উদ্বোধনী দিনে পার্লামেন্টে আসা চাট্টিখানি ব্যাপার ছিল না। অনেককে বহু কষ্টে দুর্গম পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। দু’জন এমপির হেঁটে, অশ্বপৃষ্ঠে সওয়ার হয়ে ও বাসে চেপে তাদের গ্রামের নিকটতম বিমানবন্দরে পৌঁছতে লেগে গেছে ১৫ দিন। তাদের সেই গ্রামগুলো তিব্বতের কাছে বন্ধুর পাহাড়ী এলাকায়। অন্যরা এর চেয়েও বেশি কষ্ট স্বীকার করেছেন। আউং সান সুচির দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্র্যাসির (এনএলডি) শতাধিক এমপি এতদিন কেবল খেটেছেন। কেউ কেউ তো ২০ বছর ধরে খেটেছেন। পার্লামেন্ট অধিবেশনে এসে এখন গোটা ব্যাপারটাই তাদের কাছে স্বপ্নের মতো লেগেছে।

৫০ বছরেরও বেশি সেনা নিয়ন্ত্রণে থাকা দারিদ্রক্লিষ্ট মিয়ানমারকে রূপান্তরের প্রতিশ্রুতি দিয়ে এনএলডি ৩২৯টি আসন তথা ৮০ শতাংশ আসনে জয়ী হয়। এতে অবশ্য জনগণের মধ্যে বিশাল প্রত্যাশার এবং কারোর ভাষায় অবাস্তব আশার জন্ম হয়েছে। মানুষের মধ্যে এমন প্রত্যাশার সৃষ্টি হয়েছে যে, এনএলডি তার সব সমস্যার সমাধান এনে দেবে। কিন্তু এনএলডির হাতে যে আলাদীনের চেরাগ নেই সবাই জানেন। দলের এক নেতা রো বো ও বলেন, সত্যিকারের পরিবর্তন দেখতে গেলে অন্তত এক দশক সময় লেগে যাবে। একই কথার প্রতিধ্বনি করেছেন এলএলডির যুগ্ম-প্রতিষ্ঠাতা ৮৮ বছর বয়স্ক সাবেক জেনারেল তিন উ। তিনি পার্লামেন্টের উদ্বোধনী অধিবেশনকে সামনের দীর্ঘ সংগ্রামের পথে স্রেফ প্রথম পদক্ষেপ বলে অভিহিত করেছেন।

এ যাবত পদ্ধতিগুলো, ইস্যুগুলো নয়া পার্লামেন্টের এজেন্ডায় প্রাধান্য পেয়েছে। যেমন নতুন সদস্যদের শপথগ্রহণ এবং পার্লামেন্টের উভয়পক্ষের স্পীকার নির্বাচন। সামনে আছে ঢের বড় ইস্যুÑ প্রেসিডেন্ট কে হবেন তা ঠিক করা। ৬৬৪ সদসস্যের পার্লামেন্ট ২৫ শতাংশ আসন আইন অনুযায়ী সেনাবাহিনীর জন্য সংরিক্ষত থাকা সত্ত্বেও নির্বাচনে এনএলডির বিজয় উভয় কক্ষে দলটিকে স্বস্তিকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা এনে দিয়েছে। পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ, নিম্নকক্ষ ও সেনাবাহিনী একজন করে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী মনোনীত করবে। এই তিন প্রার্থীর মধ্যে একজন পার্লামেন্ট সদস্যদের ভোটাভুটিতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবেন। বাকি যে দুই প্রার্থী থাকবেন তারা আপনা থেকেই ভাইস প্রেসিডেন্ট নিযুক্ত হবেন। নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট এরপর মন্ত্রিসভা গঠন করবেন। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনটা হবে আগামী মার্চ মাসের শেষ দিকে। অর্থাৎ তখন থেকেই বর্তমান প্রেসিডেন্ট থেইন সেইনের শাসনের অবসান হবে এবং নয়া সরকারের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হবে।

পার্লামেন্টের উভয় কক্ষে এনএলডির সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় দেশের প্রেসিডেন্ট কে হবেন সে ব্যাপারে এই দলটির নির্ধারক শক্তি হওয়ার কথা। কিন্তু সেই ব্যক্তিটি কে হবেন তা এখনও রহস্যেই রয়ে গেছে। সংবিধান অনুযায়ী সুচির প্রেসিডেন্ট হওয়ার সুযোগ নেই। কারণ তার সন্তানরা বিদেশী নাগরিক। তবে তিনি সংবিধান তার অনুকূলে পরিবর্তনের চেষ্টা করতে পারেন। এদিকে নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নয়া সরকারের কাঠামো কেমন হবে তা নিয়ে সেনাবাহিনীর সঙ্গে সুচির দলের ইতোমধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। সুচি যাতে প্রেসিডেন্ট হতে পারেন তার জন্য দলটি চেষ্টা করে যাচ্ছে বলে জানা গেছে। তবে তিনি যদি প্রেসিডেন্ট হতেও পারেন তাহলে তার ক্ষমতার রাশ যে টেনে ধরা হবে তাতে কোন সন্দেহ নেই।

এনএলডি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পরও মিয়ানমারে প্রত্যাশিত গণতন্ত্র আসতে সময় লাগবে এটা বলাই বাহুল্য। সেনাবাহিনী এখনও যথেষ্ট শক্তিশালী। তাদের হাতে আছে স্বরাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা ও সীমান্তবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং সিভিল সার্ভিস। এনএলডি সেনাবাহিনীর স্বার্থের পরিপন্থী কোন সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিতে গেলে সেনাবাহিনী তা বানচাল করে দিতে পারে। তাছাড়া সংবিধান সংশোধনও সোজা কথা নয়। এতে তিন-চতুর্থাংশেরও বেশি সদস্যের সমর্থন লাগবে। তদুপরি সংরক্ষিত আসনের জোরে সেনাবাহিনী ভেটো ক্ষমতারও অধিকারী। আপাতত এটুকু স্পষ্ট যে, জাতীয় সঙ্কট দেখা দিলে সেনাবাহিনী আবার দেশের নিয়ন্ত্রণভার আইনসম্মতভাবেই নিজের হাতে তুলে নিতে পারে। এ অবস্থায় সুচি যে সেনাবাহিনীর সঙ্গে সংঘাত এড়িয়ে চলার চেষ্টা করবেন সে কথা বলাই বাহুল্য। এই মুহূর্তে তার লক্ষ্য হবে শান্তি ও স্থিতি। দেশবাসীকে সত্যিকারের গণতন্ত্রের স্বাদ পাইয়ে দেয়ার যে ওয়াদা তিনি করেছেন তা পূরণ করতে সুচিকে এখনও যথেষ্ট বন্ধুর পথ পাড়ি দিতে হবে।

সূত্র ঃ দ্য ইকোনমিস্ট

এই মাত্রা পাওয়া