২৪ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ইংলাক সিনাওয়াত্রা রাজনীতি থেকে সবজি বাগানে

  • মু. আব্দুল্লাহ আল আমিন

তাকে রাজনীতি নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে বারণ করেছে থাই জান্তা। তিনি এক সময় দেশটির প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তাকে এখন দুর্নীতি মামলা মোকাবেলা করতে হচ্ছে। মাটি ও মানুষের টানে তিনি ফের জনতার মাঝে এসেছেন। আক্ষরিকভাবেই এসেছেন মাটির কাছে, জানিয়েছেন ক্ষেত-খামার ও সবজির প্রতি তার ভালবাসার কথা। থাইল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রার কথাই বলছি। ১২ ফেব্রুযারি তার ব্যাংককের সবজির বাগানটি তিনি দেখতে আসেন। দেশী-বিদেশী সাংবাদিকদের তিনি তার নতুন শখের বিষয়টি অবহিত করেন।

এর আগে গত মাসের ১৫ তারিখ ইংলাক তার বিরুদ্ধে আনা মামলার শুনানিতে হাজিরা দেন। ধানচাষে ভর্তুকির বিতর্কিত প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগে গত বছর ফেব্রুয়ারিতে দায়ের করা মামলাটি এদিন আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার ১০ বছর পর্যন্ত কারাদ- হতে পারে। তিনি ২০১১ সালের আগস্ট থেকে ১৪ সালের মে পর্যন্ত দেশটির প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। সেনাবাহিনীপ্রধান প্রায়ুথ চান ওচা তাকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। ইংলাক ছিলেন দেশটির প্রথম নারী ও ২৮তম প্রধানমন্ত্রী।

সাংবাদিকদের ইংলাক বলেন, ‘আমি আমার সবজি বাগানটির জন্য গর্বিত।’ জনগণের উদ্দেশে তিনি বেশি করে সালাদ খাওয়ার আহবান জানান। রাজনীতিবিষয়ক প্রশ্নের উত্তর তিনি সরাসরি এড়িয়ে গেলেও পরোক্ষভাবে বলেন, সেনাপ্রণীত সংবিধানটির ওপর জুলাইয়ে যে গণভোট হওয়ার কথা রয়েছে ভোটাররা যেন তাতে চিন্তাভাবনা করে সিদ্ধান্ত নেন। তিনি বলেন, ‘এই সংবিধান অনুযায়ী দেশ চলবে। তাই সংবিধানটি যেন জনমুখী এবং থাইল্যান্ডের জন্য উপযোগী হয় সেদিকে আপনারা লক্ষ্য রাখবেন।’

ক্ষমতা অপব্যবহারের অভিযোগে ক্ষমতাচ্যুত করার পর ইংলাকের বিরুদ্ধে করা দুর্নীতির মামলায় বলা হয়েছে, ধানচাষে ভর্তুকি প্রকল্পের আওতায় সরকার কৃষকদের কাছ থেকে বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি দামে ধান কিনেছিল। এতে সরকারের বিপুল অঙ্কের রাজস্ব ব্যয় হয়। নিজ দলের সমর্থকদের মন জয় করতেই ইংলাক ওই প্রকল্প নেন বলে সমালোচকদের অভিযোগ। তাদের মতে, ইংলাকের সরকার কৃষকদের কাছ থেকে বাজারদর থেকে দ্বিগুণ দরে চাল কিনেছিল। ফলে সরকারী গুদামগুলোতে চালের বিশাল মজুদ তৈরি হয়। ভর্তুকি প্রকল্পটি ইংলাক দেখেও না দেখার ভান করেন। তবে ইংলাক বলেছেন, কৃষকদের স্বার্থ রক্ষার বাইরে তার আর কোন উদ্দেশ্য ছিল না। ধানচাষীদের বেশিরভাগেরই বসবাস দেশটির উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে। অর্থনৈতিকভাবে অনগ্রসর অঞ্চলটিতে সিনাওয়াত্রা পরিবারের প্রচুর জনসমর্থন রয়েছে। ২০০১ সালের পর থেকে দেশটিতে যতগুলো সাধারণ নির্বাচন হয়েছে প্রত্যেকটি হয় সিনাওয়াত্রা পরিবার অথবা তাদের সমর্থিত দল জয়লাভ করেছে। এর অন্যতম কারণ এই অঞ্চলের ভোট।

এর আগে গত বছর জানুয়ারিতে ইংলাককে রাজনীতি থেকে পাঁচ বছরের জন্য নিষিদ্ধ করে দেশটির সামরিক সরকার। ইংলাক পরিবারের অন্যসব সদস্যের ওপরও এ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। তারা সরকারের অনুমতি ছাড়া বিদেশ সফরেও যেতে পারবে না। ইংলাকের মতো তার ভাই সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রাও সেনা অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিলেন। তারা উভয়ই গ্রামীণ ও দরিদ্র মানুষের কাছে এখনও বেশ জনপ্রিয়। এমনকি বরাবরই বিভিন্ন কারণে ক্ষমতাচ্যুত হলেও ২০০১ সাল থেকে প্রত্যেকটি নির্বাচনেই জয়লাভ করে আসছে রেডশার্ট পার্টি। থাই রাজনৈতিক মূল দুটি ধারা হলো ইয়েলোশার্ট ও রেডশার্ট। সেনাবাহিনীর মদদপুষ্ট ইয়েলোশার্ট শহুরে ধনিক শ্রেণী ও রেডশার্ট মধ্যবিত্ত ও গ্রামীণ সমাজের প্রতিনিধিত্ব করে থাকে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সিনাওয়াত্রা পরিবারকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে থাই সেনাবাহিনী যে বদ্ধপরিকর ইংলাকের বিরুদ্ধে বিচার শুরু করা সে ইঙ্গিতই দিচ্ছে। কিন্তু ইংলাক এখনও জনগণের একটি বড় অংশের কাছে যথেষ্ট জনপ্রিয়। শুক্রবার ব্যাংককের সুপ্রিমকোর্ট চত্বরে তারা তাকে হর্ষধ্বনি দিয়ে স্বাগত জানায়। তারা এ সময় ‘আমরা ইংলাককে ভালবাসি’ লেখা প্ল্যাকার্ড উঁচিয়ে ধরে। সামরিক জান্তা ইংলাককে ক্ষমতাচ্যুত করেই ক্ষান্ত হয়নি। তার রাজনৈতিক দল ফিউ থাই পার্টির (দলটির প্রথমে নাম ছিল থাই রাক থাই পরে এটি নিষিদ্ধ হওয়ার পর পিপলস পাওয়ার পার্টি নাম নিয়ে পুনর্গঠিত হয়। তারপর এটি ফিউ থাই পার্টি নাম নিয়ে আবারও পুনর্গঠিত হয়) ওপরও দমন নিপীড়ন চালিয়েছে। দলের সদস্যদের রাজনৈতিক সমাবেশের ওপর জারি হয়েছিল নিষেধাজ্ঞা। শুক্রবার সেই নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেই তারা আদালত অঙ্গনে জড় হয়। সমর্থকদের ইংলাক বলেন, আদালতে তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হবেন এ আত্মবিশ্বাস তার রয়েছে। তিনি আরও বলেন, গরিব ধানচাষীদের স্বার্থেই তিনি ভর্তুকি দেন। ব্যাংককের ধনিক শ্রেণী বিষয়টি যুগ যুগ ধরে উপেক্ষা করে এসেছিল।

ব্যাংকক কেন্দ্রিক রাজতন্ত্রের সমর্থকগোষ্ঠীর সমর্থনে সেনাবাহিনী এ পর্যন্ত থাকসিন ঘনিষ্ঠ তিনটি সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করেছে। কারাদ- এড়াতে থাকসিন এখন স্বেচ্ছা নির্বাসনে রয়েছেন। তবে ইংলাক দেশেই আছেন। ব্যক্তিগতভাবে থাকসিন ও তার বোন উভয়ই ধনকুবের ব্যবসায়ী।

ইংলাকের বিচার শুরু করে জান্তা ঝুঁকিপূর্ণ পথে পা বাড়িয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।

তারা বলছেন, ইংলাকের সমর্থক রেডশার্ট শিবিরকে ক্ষুব্ধ করার আগে সরকারকে আরও চিন্তা করা প্রয়োজন ছিল। জাপানের কিয়োটো ইউনিভার্সিটির থাই রাজনীতিবিষয়ক বিশেষজ্ঞ পাভিন চাচাপালপঙ্গুন মনে করেন, বিচারের উদ্দেশ্য ইংলাককে সাজা দেয়া নয়। বরং তাকে বা সিনাওয়াত্রা পরিবারকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখা। তার ধারণা, ইংলাককে সিনাওয়াত্রা পরিবারের বিরুদ্ধে ‘সস্তা দর কষাকষির’ আড়কাঠি হিসেবে করা হতে পারে। জান্তা একদিকে উত্তরের পল্লী অঞ্চলে ভর্তুকি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে অন্যদিকে দক্ষিণের রাবারচাষীদের কাছ থেকে ভর্তুকি দিয়ে বেশি দরে রাবার কিনছে। রাবারচাষীদের বেশিরভাগই রাজতন্ত্র ও সেনা সমর্থক। ৮৮ বছর বয়সী রাজা ভূমিবল অদুলাদেজের অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে সেনাবাহিনী ক্ষমতা সুসংহত করার চেষ্টা করছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। তারা বলছেন, রাজনৈতিক সংঘাতের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে এ রকম একটি দেশে নেতৃবৃন্দ অনেক ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত।