১৭ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সংগীতস্বাতী গীতিকার মাসুদ করিম

সংগীতস্বাতী গীতিকার মাসুদ করিম

লিটন আব্বাস : ‘সজনী গো ভালোবেসে এত জ্বালা’, ‘শত্রু তুমি বন্ধু তুমি’, ‘তোমরা যারা আজ আমাদের ভাবছ মানুষ কিনা’, ‘কিছু বলো, কিছু বলো’, ‘তন্দ্রা হারা নয়নও আমার’, ‘যখন থামবে কোলাহল’, ‘শিল্পী আমি তোমাদের গান শোনাব’ এসব হৃদয়ছোঁয়া গানের স্রষ্টা গীতিকার মাসুদ করিম। অমর অনেক সংগীতের এই স্রষ্টা বাংলাদেশের সঙ্গীত জগতে অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি নাম।

গীতিকার মাসুদ করিম কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী উপজেলার দুর্গাপুর কাজীপাড়ায় ১৯৩৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা রেজাউল করিম ছিলেন একজন সরকারী চাকরিজীবী, মা নাহার গৃহিনী। মাসুদ করিমের সহধর্মিনী দিলারা আলোও একজন সুনামধন্য সঙ্গীত শিল্পী। বাংলাদেশ রেডিও ও টিভিতে তিনিও কয়েক যুগ ধরে সংগীত পরিবেশন করে এসেছেন। মাসদু করিম প্রোগ্রাম অফিসার হিসেবে প্রথম কর্মজীবন শুরু করেন ঢাকা ও চট্টগ্রাম রেডিও’তে। কয়েক বছর চাকরি করেন ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাইস চ্যান্সেলরের সেক্রেটারি হিসেবে।

১৯৬০ সাল থেকে তিনি রেডিও ও টেলিভিশনের জন্য গান রচনা শুরু করেন। ষাট, সত্তর ও আশির দশকে তিনি চলচিত্রের জন প্রচুর গান লিখেছেন। রচনা করেছেন অনেক গীতি নকশা, যার মধ্যে অন্যতম স্বাধীনতা দিবস, একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষ্যে গানের অনুষ্ঠান, ঈদের অনুষ্ঠান ইত্যাদি। ১৯৮২ সালে ‘রজনীগন্ধা’ এবং ১৯৯৪ সালে ‘হৃদয় থেকে হৃদয়’ ছবির গানের জন্য গীতিকার মাসুদ করিম শ্রেষ্ঠ গীতিকার হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন দুইবার। গীতিকার মাসুদ করিম চলচ্চিত্র প্রযোজনা করেন। তার প্রযোজিত ছবিগুলো- ‘অচেনা অতিথি’, ‘ওয়াদা’, এবং ‘ভালো মানুষ’।

বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত ছিলেন তিনি। বাংলাদেশ লায়ন্স ক্লাবের ছিলেন আজীবন সদস্য। বাংলাদেশ গীতিকবি সংসদের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং সভাপতি ছিলেন। অনেক তরুণ এবং প্রবীণ গীতিকার, কবিদের তিনি সাহায্য করতেন গান ও কবিতা লিখতে। বাংলাদেশ সংগীত পরিষদেও তিনি যুক্ত ছিলেন সহ সভাপতি হিসেবে।

মাসুদ করিম গান লিখতে শুরু করেন ১৯৫৫ সাল থেকে। তাঁর গানের সংখ্যা অনেক। তার মধ্যে কিছু প্রিয় গান গুণী শিল্পীরা গেয়েছেন। বশীর আহমেদের কণ্ঠে-‘সজনী গো ভালোবেসে এত জ্বালা’, আব্দুল জব্বারের কন্ঠে-‘শত্রু তুমি বন্ধু তুমি’, খুরশিদ আলমের কন্ঠে- ‘তোমরা যারা আজ আমাদের ভাবছ মানুষ কিনা’, সৈয়দ আব্দুল হাদীর কন্ঠে- ‘কিছু বলো, কিছু বলো’, মুহাম্মদ আলি সিদ্দিকীর কন্ঠে-‘বাঁশি বাজে ওই দূরে, হাসিনা মমতাজের কন্ঠে-‘তন্দ্রা হারা নয়নও আমার, ফেরদৌসী রহমানের কন্ঠে- ‘দুটি চোখে চোখ রেখে’। রুনা লায়লার কন্ঠে- ‘যখন থামবে কোলাহল’, ‘শিল্পী আমি তোমাদের গান শোনাব’, 'যখন আমি থাকবো নাকো' 'আমি সুজন দেখে ভাব করেছি', শাহনাজ রহমতুল্লার কন্ঠে-‘ওই আকাশ ঘিরে সন্ধা নামে’, মাহমুদুন্নবীর কন্ঠে-‘সঙ্গীতা যদি ডাকি’,‘বাতাসে তোমার সংলাপ শুনি’, ‘তোমরা যারা আজ আমাদের’, সাবিনা ইয়াসমিনের কন্ঠে-‘আমি রজনী গন্ধ ফুলের মতো গন্ধ বিলিয়ে যাই’, ‘সন্ধারও ছায়া নামে’, ‘সামিনা নবীর কন্ঠে- ‘বেইমান বাঁশি, দিলারা আলোর কন্ঠে- ‘জোনাক জোনাক রাত, আনোয়ার উদ্দিনের কন্ঠে-‘যদি নীল সাগরের মুক্ত তুমি চাও, মাকসুদের কন্ঠে- ‘ঘর ছেড়েছি দুজনে, শুভ্র দেবের গাওয়া ' যে বাঁশি ভেঙে গেছে’ এমন অসংখ্য কালজয়ী গানের গীতিকার মাসুদ করিম।

প্রখ্যাত গজলসম্রাট মেহেদি হাসান, ভারতের শ্যামল মিত্র, ভূপেন হাজারিকা, ঊষা উত্থুপ, কুমার শানু, অনুরাধা পাড়োয়াল, উদিত নারায়ণও তাঁর লেখা গান করেছেন। এসব গানগুলো বই আকারে প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গীতিকার মাসুদ করিম যাঁর শত শত গান জনপ্রিয়তার সাথে সাথে লাখো-লাখো ভক্ত-শ্রোতাদের মনও ছুঁয়ে যায়।

মাসুদ করিম আজ নেই, কিন্তু তিনি বেঁচে আছেন তাঁর সৃষ্টিকর্মে। নতুন প্রজন্মের অনেকেই তাঁর গান সম্পর্কে জানে না। সে কারণে মাসুদ করিমের স্ত্রী প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী দিলারা আলো তাঁর লেখা গানগুলো সংগ্রহের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। এ বিষয়ে তাকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করছেন শাহনাজ রহমতউল্লাহ, ফরিদা ইয়াসমীন, হাসিনা মমতাজ, সৈয়দ আবদুল হাদী, গাজী মাজহারুল আনোয়ার ও রুবাইয়াত ঠাকুর রবিন।

মাসুদ করিমের স্মৃতির উদ্দেশ্যে তাঁর স্ত্রী কন্ঠ শিল্পী দিলারা আলো,তার ছেলে ও তিন মেয়ে মিলে গঠন করেছেন ‘মাসুদ করিম মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশন’। এই মহৎ প্রাণ গীতিকার এর স্মৃতি ধরে রাখার জন্য তাদের এই আন্তরিক প্রয়াস হিসাবে শিল্পী, কবি, সাহিত্যিক, গীতিকারদের মাসুদ করিম অ্যাওয়ার্ড দিয়ে সম্মানিত করার উদ্যোগ নিয়েছে। ইতোমধ্যে মাসুদ করিম অ্যাওয়ার্ড এর শুভ উদ্বোধনও হয়েছে। ১৯৯৬ সালের ১৬ নবেম্বর কানাডার মন্ট্রিয়েলে খ্যাতিমান এ গীতিকার মৃত্যুবরণ করেন।

সংষ্কৃতির স্বার্থে সংগীতের প্রয়োজনে দেশের খ্যতিমান এ গীতিকারের যথার্থ মূল্যায়ন এবং তাঁর অমর গানগুলো রক্ষাণাবেক্ষণও ভীষণ জরুরী হয়ে পড়েছে প্রজন্মের জন্য-কালের জন্য।