১৯ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

চাই আইনের সঠিক প্রয়োগ

আবুল বাশার শেখ

যে কোন দেশের সুশাসনের জন্য যে জিনিসটির খুব বেশি প্রয়োজন তা হলো ঐ দেশের আইন। সকল ক্ষেত্রে সময়োপযোগী কঠোর আইন প্রয়োগ করলে অবশ্যই দেশটিতে শান্তি বিরাজ করবে। বর্তমানে বাংলাদেশে জনসংখ্যা ১৬ কোটির উপরে হওয়ায় সর্বত্রই এখন নানাবিধ অপরাধ ছাড়াও আইন অমান্যের তীব্র প্রতিযোগিতা সংক্রামক রোগের মতো দিনকে দিন বাড়ছে। এ দেশে এখন বাস্তবতা এমন হয়েছে যে যানবাহন কৌশলে ট্রাফিক আইন অমান্য করতে পারবে, সে তত তাড়াতাড়ি তার গন্তব্যে পৌঁছবে, আর যে ড্রাইভার আইনের প্রতি যত শ্রদ্ধাশীল হবে গন্তব্যে পৌঁছতে তার তত বেশি সময় লাগবে। যে কারণে এ দেশে এখন যে যেভাবে পারছে, আইনের প্রতি তোয়াক্কা না করে ‘ফ্রি-স্টাইলে’ কাজ করতে চাইছে বলে ট্রাফিক আইনে মামলা তেমন দৃশ্যমান নয়।

আমাদের দেশের মহানগর ও জেলা শহরগুলোতে এখন যানজটের জন্য জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। গন্তব্যে সময়মতো পৌঁছানো যাচ্ছে না। কেবল ট্রাফিক আইন না মানার কারণে বাড়ছে নানা ধরনের দুর্ঘটনা। আইনের প্রতি যেন কারও কোন শ্রদ্ধাবোধ নেই অথচ বাইরের দেশগুলোয় দেখা যায় জনগণ আইনের প্রতি খুবই শ্রদ্ধাশীল।

‘লালবাতি’ জ্বলার পরও ট্রাফিক আইন ভেঙ্গে গাড়ি চালালে সৌদি আরবে ন্যূনতম বাধ্যতামূলক শাস্তি হচ্ছে হাজার টাকা জরিমানা ও ২৪ ঘণ্টার জেল। আমাদের দেশে এ অপরাধের শাস্তি হচ্ছে শুধু ৫০ টাকা জরিমানা, যার কারণে কোন ড্রাইভারই সিগন্যাল ভাঙতে দ্বিধা করছে না। জেব্রা ক্রসিং ছাড়া যেখানে-সেখানে রাস্তা পারাপারের জন্য সিঙ্গাপুরে আছে আর্থিক জরিমানা ও জেল। এ দেশে তা না থাকায়, সারা রাস্তা ধরে সর্বত্র মানুষ পার হচ্ছে পিঁপড়ার সারির মতো। নিয়মবহির্ভূত রাস্তা পারাপারের কারণে অধিকাংশ দুর্ঘটনা ঘটছে।

ট্রাফিক আইনের ১৩৭ ধারা- অনুযায়ী যদি কোন ব্যক্তি ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালায়, গাড়িতে মেটালিক নাম্বার প্লেট ব্যবহার করে, ট্যাক্স টোকেনের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়, নাম্বার প্লেট অস্পষ্ট, বাম্পার দ্বারা নাম্বার প্লেট আবৃত থাকে এবং রং পার্কিং করে; তাহলে উক্ত ধারা মোতাবেক ড্রাইভার বা মালিকের ২০০ টাকা জরিমানা হবে। আবার ১৫২ ধারায় আছে যে, রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট, ফিটনেস সার্টিফিকেট, রুট পারমিট (যে সকল যানবাহনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য) না থাকলে, ফিটনেস সার্টিফিকেট অথবা রুট পারমিটের মেয়াদ শেষ হলে, রুট পারমিটের শর্ত অমান্য করলে, সিএনজিচালিত অটোরিক্সা, ট্যাক্সিক্যাবের চালক গন্তব্যস্থলে যাত্রী বহনে অস্বীকার করলে, অনটেস্ট, এ্যাপ্লাইড রেজিস্ট্রেশন (এএফআর), ড্রাইভার ব্যতীত আট আসন বিশিষ্ট গাড়ির রুট পারমিট না থাকলে, গ্যারেজ নাম্বার দিয়ে গাড়ি চালালে-এ ধরনের প্রতিটি অপরাধের জন্য পৃথক পৃথকভাবে ৭০০ টাকা মাত্র জরিমানা করার বিধান আছে। এ রকম আরও কিছু ধারা আছে বাংলাদেশের ট্রাফিক আইনে।

এখন কথা হচ্ছে এই ধারাগুলো আমরা কতটুকু পালন করছি। সড়ক পরিবহনে আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে গেলেই নানা দিক থেকে বাধা আসে। প্রশাসনে পুলিশ ও আমলাদের অনেকেই গাড়ির মালিক। তারা নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। এছাড়া দুর্নীতিপরায়ণ ও চাঁদাবাজ প্রকৃতির কিছু মালিক ও শ্রমিক নেতা এবং ঘুষখোর সরকারী কর্মচারীদের একটি মাফিয়া চক্র গড়ে উঠেছে। তারা ভুয়া লাইসেন্স ও ত্রুটিপূর্ণ গাড়ির বিরুদ্ধে যখন অভিযান চালায় অথবা ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করার চেষ্টা হয় তখন সর্বশক্তি দিয়ে তারা বাধা সৃষ্টি করে। এর সমাধান করতে হলে গোটা সমস্যাকে তার সামগ্রিকতায় দেখতে হবে এবং জরুরী ভিত্তিতে সমাজের সংশ্লিষ্ট সকল অংশকে নিয়ে বহুমাত্রিকতায় তার সমাধানে ব্রতী হতে হবে। সড়ক দুর্ঘটনা, যানজট প্রভৃতি সমস্যা এখন এত ভয়াবহ হয়ে উঠেছে যে উচ্চ পর্যায়ে শক্তিশালী স্ট্যান্ডিং কমিটি ২৪ ঘণ্টা মনিটরিং না করলে সমস্যার কোন সমাধান করা যাবে না।

আমাদের দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে ট্রাফিক আইন সংশোধনসহ এর বাস্তবায়নে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ এবং জরিমানার পরিমাণ ৪ গুণ বৃদ্ধি করলে মনে হয় রাস্তায় অপরাধ ও যানজটের মাত্রা কমবে।

ভালুকা, ময়মনসিংহ থেকে