১৮ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মামলা সঙ্কটে পুঁজিবাজার বিশেষ ট্রাইব্যুনাল

  • দ্রুত নিষ্পত্তি হচ্ছে না

অপূর্ব কুমার ॥ পুঁজিবাজার বিষয়ক মামলা দ্রুত নিষ্পত্তিতে ২০১৫ সালের জুনে কার্যক্রম শুরু করেছে পুঁজিবাজার বিশেষ ট্রাইব্যুনাল। তবে পুঁজিবাজার কেলেঙ্কারি নিয়ে পাঁচ শতাধিক মামলা থাকলেও দ্রুত নিষ্পত্তি হচ্ছে না। বিশেষ উদ্দেশ্য গঠিত এই ট্রাইব্যুনাল গঠনের ৬ মাসের মাথায় মামলার অভাবে এখন একটি মামলা নিয়ে বিচার কার্যক্রম চলছে। যে কারণে মাসে ৩-৪ দিন চলছে বিচারিক কার্যক্রম। এমতাবস্থায় ট্রাইবু্যুনালটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ট্রাইব্যুনাল সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫ সালে গঠিত বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বিচারিক কার্যক্রমের জন্য এ পর্যন্ত ২৩টি মামলা এসেছে। এর মধ্যে ৫টি মামলার রায় হয়েছে, বিচারিক ক্ষমতা না থাকায় ২টি মামলা মহানগর দায়রা জজ আদালতে ফেরত দেওয়া হয়েছে, ১৫টি মামলা উচ্চ আদালতের নির্দেশে স্থগিত আছে ও বাকি মাত্র একটি মামলা চালু আছে। সে মামলাটিও স্থগিত করার জন্য উচ্চ আদালতে আবেদন করা হবে বলে জানা গেছে।

পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট পাঁচ শতাধিক মামলার মধ্যে ফৌজদারি মামলার সংখ্যা কম। এর মধ্যে সার্টিফিকেট মামলার সংখ্যাই বেশি। সার্টিফিকেট মামলা ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরযোগ্য নয় বলে কমিশন সূত্রে জানা গেছে।

বিএসইসি’র নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মোঃ সাইফুর রহমান বলেন, যেগুলো ফৌজদারি মামলা, শুধু সেগুলোই ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হবে। উচ্চ আদালতের নির্দেশে স্থগিত মামলাগুলো দ্রুত নিয়ে আসার চেষ্টা করা হচ্ছে। বিজ্ঞ আদালত থেকে মামলাগুলো আবারও ট্রাইব্যুনালে নিয়ে আসার জন্য বিএসইসি চেষ্টা করছে।

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, ১টি মামলা নিয়ে যদি চলে তাহলে ট্রাইব্যুনাল পুঁজিবাজারের জন্য কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। বিএসইসির আরেক সাবেক চেয়ারম্যান মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, শেয়ার কেলেঙ্কারির মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি হওয়া উচিত।

ট্রাইব্যুনাল সূত্রে জানা গেছে, জানুয়ারি মাসে মামলার অভাবে ৪দিন বিচারিক কার্যক্রম চলেছে। এর মধ্যে আবার রয়েছে স্থগিতাদেশের কপি দাখিলের কার্যক্রম। জানুয়ারি মাসের ৪, ১০, ১৮ ও ২০ তারিখে ট্রাইব্যুনালে বিচারিক কার্যক্রম চলে।

এদিকে ফেব্রুয়ারি মাসেও মামলার অভাবে বিচারিক কার্যক্রমের একই অবস্থা। এ মাসের ১ ও ৮ তারিখ বিচারিক কার্যক্রম হয়েছে। আর বিচারিক কার্যক্রমের জন্য পরবর্তী তারিখ হিসেবে ২৩ তারিখ নির্ধারিত রয়েছে।

ট্রাইব্যুনালের প্রথম রায় ॥ গত ৩ আগস্ট ফেসবুকের ছয়টি ওয়েব পোর্টালে বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার কেনা- বেচার আগাম মিথ্যা তথ্য প্রচারকারী মাহাবুব সারোয়ারকে দুই বছরের কারাদ- দিয়েছে পুঁজিবাজার বিশেষ ট্রাইব্যুনাল। পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের বিভ্রান্ত করার জন্য আসামি এ কাজ করেছেন বলে যে অভিযোগ ছিল, তা প্রমাণিত হয়েছে বলে ট্রাইব্যুনাল মনে করে। বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক (বিশেষ জেলা জজ) হুমায়ুন কবীর বাদী পক্ষ (বিএসইসি) ও বিবাদী পক্ষের (মাহাবুব সারোয়ার) সাক্ষ্য গ্রহণ, জেরা এবং যুক্তিতর্ক শুনে সার্বিক দিক বিবেচনা করে এ রায় দেন। এটাই পুঁজিবাজার বিশেষ ট্রাইব্যুনালের প্রথম রায়। এই রায় ঘোষণার পরে বিনিয়োগকারীদের মাঝে আশার সঞ্চার হয়েছিল যে, ১৯৯৬ সাল এবং ২০১০ সালের শেয়ার কেলেঙ্কারির হোতাদের বিচার করা সম্ভব হবে। কিন্তু পরে মামলার অভাব ও উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে প্রায় নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম।

ফেসবুকে শেয়ার কেনা-বেচার তথ্য প্রদানকারীর রায় ঘোষণা ছাড়াও গত ৬ সেপ্টেম্বর ১৯৯৬ সালের শেয়ার কেলেঙ্কারিতে কারসাজির মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে শেয়ার দর বাড়ানোয় চিক টেক্সটাইলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও অন্য এক পরিচালককে চার বছর করে কারাদ- দেয় ট্রাইব্যুনাল। একই সঙ্গে আসামিদের প্রত্যেককে ৩০ লাখ টাকা করে জরিমানাও করা হয়েছে। এ ছাড়া জরিমানা পরিশোধ না করলে আসামিদের আরও ছয় মাস কারাদ- দিয়েছে পুঁজিবাজার বিষয়ক বিশেষ ট্রাইব্যুনাল।

জানা গেছে, চিক টেক্সটাইলের শেয়ার কেলেঙ্কারি মামলার আসামিরা হলেন Ñ কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার মোঃ মাকসুদুর রসূল ও পরিচালক ইফতেখার মোহাম্মদ। এ ছাড়া মামলায় চিক টেক্সটাইল কোম্পানিকেও আসামি করা হয়। ট্রাইব্যুনালের অপর আলোচিত প্লেসমেন্ট শেয়ার কেলেঙ্কারির মামলায় সাত্তারুজ্জমান শামীমকে বেকসুর খালাস দেয়। মামলার প্রধান আসামি ছিলেন গ্রিন বাংলা কমিউনিকেশন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রয়াত নবীউল্লাহ নবী। ২০১৩ সালের জুন মাসে নবীউল্লাহ নবী ট্রেনের নিচে চাপা পড়ে মারা যান। সাত্তারুজ্জামান শামীমকে নবী উল্লাহ নবীর সহযোগী হিসেবে মামলায় আসামি করা হয়েছিল।

সম্প্রতি পুঁজিবাজারের ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত চিটাগাং সিমেন্ট কেলেঙ্কারির মামলাটি রায় ঘোষণার ঠিক আগ মুহূর্তে উচ্চ আদালতের নির্দেশে স্থগিত হয়ে যায়। ১৯৯৬ সালের আলোচিত এই মামলার অন্যতম আসামি হলেন ডিএসইর সাবেক সভাপতি মোঃ রকিবুর রহমান ও শহীদুল হক বুলবুল। শহীদুল হক বুলবুল বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বিচার প্রক্রিয়া প্রায় শেষ হওয়ার আগে উচ্চ আদালতে আপীল করেন। মূলত তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতেই উচ্চ আদালত রায় ঘোষণার ঠিক আগ মহূর্তে স্থগিতাদেশ দেয়।

এছাড়া শেয়ার বাজারে অন্যতম আলোচিত একটি মামলা ছিল পিপলস লিজিংয়ের শেয়ার দর বাড়ানোর মামলা। এই মামলায় আসামি ছিলেন সিরাজউদ্দৌলা, তার স্ত্রী রাশেদা আক্তার মায়া এবং মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান মোল্লা। ২০১১ সালে ২১ আগস্ট কমিশনের নির্বাহী পরিচালক শেখ মাহবুবুর রহমান চৌধুরী বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেছিলেন। মাত্র কয়েকদিন মামলার শুনানি হওয়ার পরই আসামিরা উচ্চ আদালতে যান। উচ্চ আদালত মামলাটিতে স্থগিতাদেশ দেয়।

অন্যদিকে আদালতে চলমান একমাত্র মামলাটি হলো প্রিমিয়াম সিকিউরিটিজের শেয়ার প্রতারণার মামলা। ১৯৯৬ সালের এই মামলায় প্রিমিয়াম সিকিউরিটিজের পাশাপাশি আসামি করা হয়েছে কোম্পানির চেয়ারম্যান এম এ রউফ চৌধুরী, ব্যবস্থাপনা পরিচালক মশিউর রহমান, পরিচালক সৈয়দ এইচ চৌধুরী ও অনু জাহাঙ্গীর।

মামলা সূত্রে জানা যায়, আসামিরা প্রিমিয়াম সিকিউরিটিজের নামে ১৯৯৬ সালের জুলাই মাস থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে প্রতারণার মাধ্যমে বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার লেনদেন করেছেন। আলোচ্য সময়ে তারা মিতা টেক্সটাইল, প্রাইম টেক্সটাইল, বাটা সুজ ও বেক্সিমকো ফার্মার শেয়ার লেনদেন করেছেন। যার মধ্যে ছিল বেক্সিমকো ফার্মার ১৩ লাখ ২৪ হাজার ৯৭৫টি শেয়ার। এই মামলার আসামিরাও উচ্চ আদালতে আপীল করতে যাচ্ছেন বলে জানা গেছে।

এদিকে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের পরে মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি না হওয়া এবং নতুন মামলা সেখানে না পাঠানোয় বিনিয়োগকারীদের মাঝে এক ধরনের হতাশা বিরাজ করছে। তাদের মতে, ১৯৯৬ এবং ২০১০ সালের শেয়ার কেলেঙ্কারির মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি হলে বিনিয়োগকারীদের মাঝে আস্থা ফিরে আসতো।