১৭ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

কর ফাঁকি দেয়ার সুযোগ খোদ কর আইনেই

মোখলেছুর রহমান, পটুয়াখালী ॥ পটুয়াখালী জেলার ৮ টি উপজেলার ব্যবসায়ীরা কর না দেয়া কিংবা কর ফাঁকি দিচ্ছে খোদ কর আইনের কারণে। এর সাথে রয়েছে কতিপয় অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশ। রয়েছে জনবলের অভাব। আর এভাবেই ১শ’ কোটি টাকার পরিবর্তে কর আদায় হচ্ছে মাত্র ১০ কোটি টাকা।

সূত্রমতে পটুয়াখালী জেলার পটুয়াখালী সদর, মির্জাগঞ্জ, দুমকি, বাউফল, দশমিনা, গলাচিপা, কলাপাড়া ও রাঙ্গাবালিসহ ৮ টি উপজেলায় সরাসরি কর দেয় মাত্র তিন হাজার মানুষ। আর নিবন্ধিত কর দাতার সংখ্যা প্রায় ৭ হাজার। সরাসরি করদাতা যার বড় একটা অংশ, প্রায় তিন ভাগের দুই ভাগ হচ্ছে ঠিকাদাররা। তাদের কাজের বিল ছাড় করাতে বাধ্যতামূলক ভ্যাট-ট্যাক্স পরিশোধ করতে হয়। বাকি এক ভাগ হলো চাকরিজীবী-ব্যবসায়ীসহ অন্যান্য। অর্থাৎ সাধারণ ব্যাবসায়ীদের ট্যাক্স পরিশোধের হিসাবটা বলতে গেলে প্রায় শূন্যই। অথচ পুরো জেলায় কর দাতার এ সংখ্যার কয়েকগুণ বেশি থাকলেও কিছুই করার নেই কর বিভাগের। আইনের বেড়াজাল ও জনবলের অভাবে আটকে আছে তাদের আদায় কার্যক্রম। এ সুযোগ নিচ্ছে কর বিভাগের কেউ কেউ।

কর আইনের ’৮২’র বিবি (ইউনিভার্সাল সেলফ এ্যাসেসমেন্ট) বা সর্বজনীন স্বনির্ধারণী কর পদ্ধতিতে বলা আছে, কোন ব্যক্তি স্বেচ্ছায় রিটার্ন দাখিল করলে তার বিষয় নিয়ে আয়কর বিভাগ কোন প্রকার খোঁজখবর করার সুযোগ নেই। যদি কেউ তার আয়কর দেয়া নিয়ে অভিযোগ করে তবেই উর্ধতন কর্তৃপক্ষের অনুমতিক্রমে অভিযুক্ত ব্যক্তির ব্যাপারে খোঁজখবর নিতে পারবে উপকর কমিশনার। অপর কর আইন ১৯৮৪’র ধারা-১৬৩, চ্যাপ্টার-২০, ‘প্রোটেকশন অব ইনফর্মেশন’ (তথ্য সংরক্ষণ), ইনকাম ট্যাক্স মেনুয়াল পার্ট-০১ এ বলা আছে রিটেন দাখিলকারীর কোন তথ্য কাউকে প্রদান করা যাবে না। এ আইনের কারণে করদাতার কোন তথ্য সংশ্লিষ্ট দফতর কাউকে দিতে পারবে না। সে ক্ষেত্রে কারও বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ কিংবা গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ করার সুযোগ থাকে না। যাকে বলা যায় কর আদায়ে স্ববিরোধী আইন। আর তথ্য অধিকার আইন-২০০৯ তো সেখানে পুরোপুরি অচল। যদিও তথ্য অধিকার আইনে সুনির্দিষ্ট করে বলা হয়েছে কোন্ কোন্ তথ্য দেয়া যাবে না। সেখানে রিটার্নের বিষয়টি উল্লেখ না থাকলেও কর আইনের ধারা-১৬৩, চ্যাপ্টার-২০, ‘প্রোটেকশন অব ইনফর্মেশন’ (তথ্য সংরক্ষণ), ইনকাম ট্যাক্স মেনুয়াল পার্ট-০১ এর কারণে কর্তৃপক্ষ তথ্য দিতে পারছে না। এ ছাড়া তথ্য অধিকার আইনের ৭ ধারার দোহাই দিয়ে সন্তুষ্ট রাখা হয়েছে তথ্য অধিকার আইনকেও। আর এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে করদাতারা যুগ যুগ ধরে কর ফাঁকি দিচ্ছে কিংবা দিচ্ছেই না। এ তো গেল আইনের বিষয়।

আইনের এ দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে কর আদায় সংশ্লিষ্ট কেউ কেউ আবার কর দাতাদের সাথে ব্যক্তিগত পর্যায়ে যোগাযোগের মাধ্যমে নিজেরা লাভবান হচ্ছেন। এতে সরকার বঞ্চিত থাকছে কর আদায় থেকে। আর বছরে কোটি কোটি টাকা চলে যাচ্ছে কতিপয় ব্যক্তির পকেটে। এ ছাড়া সাধারণভাবে হিসেবে করলে দেখা যায় যে, বর্তমানে আদায়কৃত করের ১০ গুণেরও বেশি কর আদায় সম্ভব পটুয়াখালীর ৮ টি উপজেলা থেকে। এর জন্য আইনী জটিলতা দূর করা ও রিটার্নের তথ্য সবার জন্য উন্মুক্ত রাখা দরকার। এতে যেমন আদায় বাড়বে তেমনি স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতাও বাড়বে। কারণ রিটার্নের থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ‘তথ্য অধিকার আইন-২০০৯’ এর মাধ্যমে এখন সাধারণ মানুষ পাচ্ছে।

এ ব্যাপারে খুলনার যুগ্ম কর কমিশনার ও বরিশালের অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত আইন কর্তা গণেশ চন্দ্র ম-লের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ওই সব আইনের কারণে কর ফাঁকি কিংবা কর না দেয়ার প্রবণতাকে সমর্থন করে বলেন, আইনের বাইরে কাজ করার কোন সুযোগ তাদের নেই। এ সংক্রান্তে ওই ধারা তুলে সংসদে যদি নতুন কোন আইন প্রণয়ন কখন হয় তবেই রিটার্নের তথ্য উন্মুক্ত করার সুযোগ হবে।

এ ব্যাপারে পটুয়াখালী জজ কোর্টের আইনজীবী এ্যাডভোকেট কালাচান সাহা জানান, বিদ্যমান কর আইন অনেক পুরনো, যা সময় উপযোগী নয়। কর আইনের অনেক ধারাই আছে যাতে সংশোধনী আনলে করদাতাদের সংখ্যা বাড়ানো সহজ হবে। আর তাতে সমৃদ্ধ হবে সরকারী কোষাগার।