২৩ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

তিন দশকেও ভূমি জরিপ কাজ শেষ হয়নি কোথাও

  • ভূমি বিরোধ নিয়ে মামলা বাড়ছে, মালিকদের ভোগান্তি

ফিরোজ মান্না ॥ সিলেট ও বরিশাল বিভাগের ১০ জেলাসহ দেশের আরও কয়েকটি জেলায় ভূমি জরিপের কাজ শুরু হয় ১৯৮৫ সালে। এরপর তিন দশক কেটে গেছে। জরিপের কাজ শেষ হওয়া তো দূরের কথা, মাঠ জরিপের কাজই শেষ করতে পারেনি ভূমি অধিদফতর। ৩ হাজার ৫৫৬টি মৌজার মধ্যে ১১৪টি মৌজায় জরিপকারীরা যেতেই পারেননি। মাঠপর্যায়ে ৯৬ শতাংশ জরিপ সম্পন্ন হলেও জরিপের ভিত্তিতে রেকর্ড হস্তান্তর হয়েছে মাত্র ৪০ শতাংশ জমির। ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদফতর বলছে, প্রয়োজনীয় জনবলের অভাবে জরিপ কাজ শেষ করা সম্ভব হচ্ছে না। এটা কবে শেষ হবে তাও পরিষ্কার করে বলা যাচ্ছে না। দিন দিন ভূমি বিরোধ নিয়ে বাড়ছে মামলা। আর এমন অবস্থায় ভূমির মালিকদের ভোগান্তি আরও দীর্ঘায়িত হচ্ছে। এখান থেকে পরিত্রাণের জন্য জমি জরিপ ও রেকর্ড সম্পন্ন করার জন্য মন্ত্রণালয়ের তাগিদ থাকলেও মাঠপর্যায়ে কাজের গতি কচ্ছপের গতির মতোই।

সূত্র জানিয়েছে, ৩০ বছর আগে বরিশাল জেলায় জরিপ কাজ শুরু হয়। একই সঙ্গে নোয়াখালী, কুমিল্লা, টাঙ্গাইল, বগুড়া, খুলনা, যশোর, ফরিদপুর, রংপুর জোনের কাজের অবস্থাও একই অবস্থায় রয়েছে। তবে চট্টগ্রামে ও রাজশাহীতে জরিপ কাজ শেষ হয়েছে। দিনাজপুরে জরিপ কাজ শুরুই করা হয়নি। কুষ্টিয়া ও ময়মনসিংহে জরিপ কাজ ঝুলে আছে। ময়মনসিংহে বনভূমি থাকার কারণে জরিপ কাজ পিছিয়েই যাচ্ছে। যদিও আতিয়া বন অধ্যাদেশ নিয়ে সৃষ্ট সমস্যা (১৯৬৭ সাল) অনেক আগেই সমাধান হয়েছে। এরপরও ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইলের ভূমি জরিপ কাজ শেষ করতে পারেনি।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসের মাধ্যমে এ কাজগুলো করা হচ্ছে। জরিপ কাজ শেষ করার জন্য সিলেট ও বরিশালে আরও চারটি নতুন সেটেলমেন্ট অফিস স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু এরপরও নানা জটিলতার কারণে ভূমি জরিপের কাজ শেষ করা যাচ্ছে না। ভূমি মানেই এমন এক জটিল বিষয় যে, একই জমির মালিকানা একাধিক লোকে দাবি করার কারণে ওই সব জমি বিরোধপূর্ণ হিসেবে জরিপ কাজ বন্ধ রেখে দেয়া হচ্ছে। সঠিক মালিকানা নির্ধারণ হতেও অনেক সময় লেগে যায়। কারণ ভূমি মামলা নিষ্পত্তি হতে বছরের পর বছর চলে যাচ্ছে। একটা ভূমি অফিসে ১৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রয়োজন থাকলেও অনেক অফিসে এই সংখ্যক জনবল নেই। স্বাধীনতার পর দেশের অনেক এলাকায় ভূমি জরিপের প্রথম উদ্যোগটিই আজও রয়ে গেছে অসম্পন্ন। টানা প্রায় তিন দশক ধরে চলছে এ জরিপ। সেই সঙ্গে দীর্ঘায়িত হয়ে চলেছে জমির মালিকদের ভোগান্তি। সারাদেশে সর্বমোট ৪১ হাজার ৬৭০টি মৌজার মধ্যে ৪০ হাজার ৯৩৬টি মৌজার মাঠ জরিপ সম্পন্ন হলেও এ পর্যন্ত মাত্র ২৮ শতাংশ জমির রেকর্ড হস্তান্তর করা সম্ভব হয়েছে। গেজেট বিজ্ঞপ্তি জারি হয়েছে মাত্র ৩৩ শতাংশ জমির।

তবে ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদফতরের মহাপরিচালক জানিয়েছিলেন, যে করেই হোক ২০১৪ সালের জুন মাসের মধ্যে দেশজুড়ে জরিপযজ্ঞ শেষ করতে চান তারা। এজন্য নানারকম পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। লোকবল বৃদ্ধি এবং ছাপাখানার সক্ষমতা বৃদ্ধির ব্যবস্থা করা হয়েছে। অধিদফতরের সামগ্রিক সক্ষমতা বিবেচনায় না নিয়েই জরিপ প্রক্রিয়াটি শুরু করা হয়েছিল। সে কারণে কাক্সিক্ষত গতিতে কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদফতরের মহাপরিচালকের ওই বক্তব্যের পর আরও দুই বছর চলে গেছে। কিন্তু কাজের অগ্রগতি যা থাকার তাই রয়েছে। এগোয়নি জরিপ কাজ।

সূত্র জানিয়েছে, দেশের ভূমি ব্যবস্থাপনা, জমির মালিকানা নির্ণয় ইত্যাদি কাজের ক্ষেত্রে বর্তমানে যেসব জরিপ-রেকর্ড আমলে নেয়া হয়, তার সবই স্বাধীনতার আগের। স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর দেশে প্রথমবারের মতো ভূমি জরিপ শুরু হয় ১৯৮৫ সালে। ওই বছর জরিপ কাজ হাতে নেয়া হয় বৃহত্তর ফরিদপুর, বৃহত্তর যশোর ও বৃহত্তর বগুড়া জেলায়। পরবর্তীকালে পর্যায়ক্রমে অন্যান্য অঞ্চলেও ভূমি জরিপের কার্যক্রম শুরু করা হয়। এর মধ্যে ১৯৯৫ সালে শুরু হওয়া ঢাকা মহানগরী জরিপ ছাড়া বাকি কোন জরিপই এখনও শেষ হয়নি। ঢাকা মহানগরী জরিপ ইতোমধ্যেই শতভাগ সম্পন্ন হলেও এ জরিপে বেশকিছু সরকারী সম্পত্তি ব্যক্তি বিশেষের নামে রেকর্ড হওয়ার অভিযোগের প্রেক্ষিতে বিষয়টি নিয়ে নতুন করে তদন্ত শুরু হয়েছে। এ কারণে ঢাকা মহানগরের জরিপটিও অপ্রকাশিতই রয়ে গেছে। এমন এক পরিস্থিতিতে জমি নিয়ে বিরোধ দিন দিন বেড়েই চলেছে।

ভূমি মন্ত্রণালয় এবং ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদফতরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১৯৮৫ সালে জরিপ শুরু হওয়া অঞ্চলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে পিছিয়ে আছে বৃহত্তর যশোর জেলা। সেখানে জরিপের পর এ পর্যন্ত ২১ শতাংশ জমির মালিককে জরিপ রেকর্ড হস্তান্তর করা সম্ভব হয়েছে। যদিও যশোর অঞ্চলে মাঠ জরিপের কাজ ৯৯.৪ শতাংশ ইতোমধ্যেই সম্পন্ন হয়ে গেছে। বৃহত্তর বগুড়া জেলায় মাঠ জরিপের কাজ শতভাগ সম্পন্ন হলেও রেকর্ড হস্তান্তর করা গেছে মাত্র ৩১ শতাংশ। অন্যদিকে বৃহত্তর ফরিদপুর জেলায় মাঠ জরিপের কাজ এখনও অনেকটা বাকি রযেছে। সেখানে ৪০ শতাংশ রেকর্ড হস্তান্তর করা সম্ভব হয়েছে। ভূমি জরিপের ক্ষেত্রে জমির মালিকের কাছে রেকর্ড হস্তান্তরে প্রক্রিয়ায় অনেক ধাপ অতিক্রম করতে হয়। এর মধ্যে মাঠ জরিপ শেষ হওয়ার পর রয়েছে তসদিক প্রক্রিয়া। এরপর কোন জরিপের বিষয়ে কারও আপত্তি থাকলে তা নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া। আপত্তি নিষ্পত্তির পরও কেউ অসন্তুষ্ট থাকলে তার জন্য রয়েছে আপীল প্রক্রিয়া। এরপর চূড়ান্ত রায় শেষে ছাপাখানায় প্রেরণ, মুদ্রণ। এরপর চূড়ান্ত গেজেট বিজ্ঞপ্তি জারি এবং রেকর্ড বাঁধাইয়ের পর জমির মালিককে সেটি হস্তান্তর করা হয়।

ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদফতরের উচ্চ পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, এটা ঠিক যে, ভূমি জরিপের ক্ষেত্রে গত তিন দশকে কাক্সিক্ষত অগ্রগতি অর্জিত হয়নি। আশা করা হয়েছিল যে, ১২ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে সারাদেশের জরিপ সম্পন্ন করা হবে। কিন্তু বাস্তবে তা করা যায়নি। ইতোমধ্যেই ২৮-২৯ বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। কিন্তু কাজ শেষ করা যায়নি। জরিপ প্রক্রিয়াটি শুরুই করা হয়েছিল অধিদফতরের সামগ্রিক সক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনায় না নিয়ে। জরিপ শুরুর পর থেকে, অর্থাৎ ১৯৮৫-৮৬ সালের পর আজ পর্যন্ত অধিদফতরে আর কোন লোক নিয়োগ দেয়া হয়নি। এমনকি নিয়োগ বিধিও তৈরি করা হয়নি। ফলে দীর্ঘকাল ধরে প্রায় ৫০ শতাংশ পদ খালি রয়েছে। সম্প্রতি নিয়োগবিধি চূড়ান্ত করে সেটি অনুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এটি অনুমোদন সাপেক্ষে প্রায় ৪ হাজার ২০০ শূন্যপদ পূরণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। লোকবল নিয়োগের পর আর সমস্যা থাকবে না।

নির্বাচিত সংবাদ