২০ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

শিশু হত্যা- অপরাধ জগতে নতুন মাত্রা

শংকর কুমার দে ॥ একের পর এক ফুলের মতো নিষ্পাপ শিশুদের নির্যাতন, অপহরণ, জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায় ও হত্যার ক্রমবর্ধমান ঘটনার ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে অপরাধ জগতে। ২০১৫ সালে কেবলমাত্র গত এক বছরে সারাদেশে ১৩৩ শিশু হত্যার ঘটনা ঘটেছে। গত ১৫ বছরে সারাদেশ থেকে ২ সহস্রাধিক নারী ও শিশু অপহরণকারীকে গ্রেফতার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পাচারকারী চক্রের হাত থেকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে ৯৭ শিশুকে। পূর্ব শত্রুতার জের ধরে জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায়ের মতো ঘটনায় কোমলমতি অসহায় অবুঝ শিশুদেরই টার্গেটে পরিণত করে চলেছে দুর্বৃত্তরা। সিলেটের রাজন হত্যার ঘটনার রেশ না কাটতেই আবারও এক সঙ্গে সিলেটের হবিগঞ্জে চার শিশুর লাশ উদ্ধারের ঘটনায় পরিবার পরিজনের মধ্যে আতঙ্ক, উদ্বেগ, ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। পুলিশের সদর দফতর ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সূত্রে এ খবর জানা গেছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, খুব সহজেই শিশুরা টার্গেটে পরিণত হচ্ছে। সন্ত্রাসী, অপরাধী এমনকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের হাত থেকেও রেহাই পাচ্ছে না শিশুরা। কারণ শিশুদের টার্গেট করা ঝুঁকি কম। তারা প্রতিবাদ করতে পারে না। প্রতিরোধ করার ক্ষমতা নেই তাদের। তাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এখন দুর্বৃত্তরা টার্গেট করছে কোমলমতি অবুঝ অসহায় শিশুদেরই। একের পর এক এমন মর্মন্তুদ ঘটনায় সন্তানকে ঘিরে মা-বাবার রঙিন স্বপ্ন তছনছ হয়ে যাচ্ছে। সাজানো সংসারে নেমে আসছে অমানিশার অন্ধকার। বেশিরভাগ শিশুকে পারিবারিক কলহ, প্রতিহিংসা, লালসা ও অপহরণের পর খুন করছে দুর্বৃত্তরা।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৫ সালে দেশে ১৩৩ শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। এর আগের বছর ২০১৪ সালে হত্যার শিকার হয়েছিল ৯০ শিশু। চলতি ২০১৬ সালের দেড় মাসেই হত্যার শিকার হয়েছে ১৫ শিশু।

র‌্যাব সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ বছরে অপহরণের পর ৪৩ শিশুকে হত্যার করার পর শিশুর লাশ উদ্ধার করেছে তারা। আলোচ্য সময়ে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে অপহৃত হওয়া ২১০ শিশুকে। নারী-শিশু অপহরণকারী দুই হাজার ৩৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়। এ সময়ে পাচারকারী চক্রের কাছ থেকে ৯৭ শিশুকে উদ্ধার করে র‌্যাব।

পুলিশ সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন মাসে দেশে অপহরণের পর আট শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। আর একই সময়ে অপহৃত ৭৩ শিশুকে জীবিত উদ্ধার করা হয়।

মানবিকবোধসম্পন্ন মানুষ এখন শিশু হত্যার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন। দেশের বিভিন্ন স্থানে মানববন্ধন, বিক্ষোভও অব্যাহত রয়েছে। সবাই চান, আর যেন কোন মায়ের বুক খালি না হয়। অচিরেই বন্ধ হোক শিশু নির্যাতন, অপহরণ, হত্যার মতো জঘন্য বর্বরোচিত এই নৃশংসতা। হবিগঞ্জের বাহুবলে সুন্দ্রাটিকি গ্রামে নিখোঁজ চার শিশুর মৃতদেহ উদ্ধার করার পর হত্যাকারী সম্পর্কে এখনও নিশ্চিত হতে না পারায় হত্যাকারীদের ধরিয়ে দিতে পারলে এক লাখ টাকার পুরস্কার ঘোষণা করেছে পুলিশ প্রশাসন।

গত ১৩ ফেব্রুয়ারি রাজশাহীর পবা উপজেলার বাগসারা গ্রামে মোবাইল ফোন চুরির অভিযোগ এনে নির্যাতন করা হয় দুই শিশুকে। মামলায় বগুড়া সেনানিবাসে কর্মরত সেনাসদস্য নাসির উদ্দিন, র‌্যাব সদস্য ও পুলিশ কনস্টেবল সাগরসহ ১৩ জনকে আসামি করা হয়। দুই শিশুকে নির্যাতনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়।

গত বছর সিলেটে রাজন নামের এক শিশুকে একই কায়দায় মোবাইল চুরির অভিযোগ এনে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এই হত্যার ঘটনার রেশ না কাটতেই আবারও সিলেটের হবিগঞ্জে এক সঙ্গে চার শিশুর লাশ উদ্ধার ও শিশু হত্যাকারীদের ধরিয়ে দিতে পারলে পুরস্কার ঘোষণা করার মধ্য দিয়ে শিশু নির্যাতন, অপহরণ, হত্যার ঘটনাগুলো সামনে চলে এসেছে।

গত ১৫ জানুয়ারি চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ পৌর এলাকার কংগাইশ গ্রামের পাল পুকুরিয়ায় খড়ের গাদায় ৫ ঘণ্টা বেঁধে রাখা হয় তিনটি শিশুকে। চুরির অভিযোগে তিন শিশুকে তার বাড়িতে বেঁধে রাখেন, যাদের মধ্যে একটি মেয়ে শিশুও রয়েছে।

ঢাকার কেরানীগঞ্জে গত ২৯ জানুয়ারি আবদুল্লাহ নামের একটি শিশুকে অপহরণ করা হয়। তার মুক্তিপণ হিসেবে দুর্বৃত্তরা ৫ লাখ টাকা দাবি করে। বিকাশের মাধ্যমে দুই লাখ টাকাও দুর্বৃত্তদের কাছে পাঠায় শিশুটির পরিবার। এর পরও শিশুটিকে মেরে ফেলে দুর্বৃত্তরা। গত ২ ফেব্রুয়ারি এক প্রতিবেশীর বাড়ির ছাদ থেকে উদ্ধার করা হয় শিশুটির লাশ। আবদুল্লাহ অপহরণের এক দিন আগে-পরে রূপগঞ্জ, পাবনা ও মানিকগঞ্জে আরও চার শিশুকে মুক্তিপণের দাবিতে অপহরণ করা হয়। এসব ঘটনায় রীতিমতো তোলপাড় সৃষ্টি হয়।

গত ১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর বেইলি রোডের এক বাসা থেকে সদ্যজাত সন্তানকে নিচে ফেলে দেন কিশোরী মা বিউটি। প্রসবের পর পরই শিশুটিকে ৫ তলা থেকে মা ছুড়ে ফেলে দেন। এর এক দিন পরে গত ২ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর মিরপুরের মনিপুর থেকে নবজাতকের খ-িত মস্তক উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনার শিশুটির মা সোনিয়াকে আটক করে পুলিশ।

রংপুরের নিউ আদর্শপাড়ার মোছাদ্দেক হোসেন রাঙার শিশু সস্তান রহিমুল ইসলাম রওনক (৪) গত ১ ডিসেম্বর নিখোঁজ হয়। দুই মাস পর গত ৩০ জানুয়ারি রংপুরের মিঠাপুকুর থেকে রওনকের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

নোয়াখালীর চরজব্বারের সুবর্ণচর এলাকার আনোয়ার হোসেনের মেয়ে মুন্নি আক্তার (১৩) প্রায় চার বছর রাজধানীর বনশ্রী এলাকার এক বাসায় গৃহকর্মীর কাজ করত। গত ২৪ জানুয়ারি পুলিশ তার লাশ উদ্ধার করে।

ঢাকার ধামরাইয়ের চৌহাট এলাকার দেলোয়ার হোসেনের ছেলে শাকিল (১১) এবং আবু বকরের ছেলে ইমরান হোসেনকে (১১) অপহরণ করা হয়। পরে টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে শিশু দুটির গলাকাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

হবিগঞ্জের নবীগঞ্জে দবির হোসেন (১৩) নামের এক পত্রিকা হকারকে গাছের সঙ্গে বেঁধে নির্যাতন করা হয়। পত্রিকা বিক্রির টাকা চাইতে গেলে তার ওপর নির্যাতন চালানো হয়।

চলতি বছরের প্রথম সাত দিনে চট্টগ্রামে ১১ বছরের আজিমকে গলা কেটে হত্যা, খুলনায় প্রতিবন্ধী মেয়েকে হত্যার পর বাবার আত্মহত্যা। এ ছাড়া গাজীপুরের ১২ বছরের শিশু শ্রমিক মোজাম্মেলকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ করেছে তার পরিবার।

গত ১৪ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় গাইবান্ধা ও গাজীপুরে অভিযান চালিয়ে অপহৃত শিশু মোবারককে (৬) উদ্ধার করে। এ সময় অপহরণকারী মোঃ আবদুল জব্বার ওরফে ঠাকুর ওরফে বাবলু ও তার স্ত্রী নাজমা আক্তারকে গ্রেফতার করা হয়। মোবারককে গত ২৯ ডিসেম্বর উত্তরা ৯ নম্বর সেক্টরের ৬ নম্বর রোডে বাসার সামনে থেকে অপহরণ করা হয়।

অপরাধ বিশেষজ্ঞরা অভিমত ব্যক্ত করেন যে, শিশুদের ওপর যখন নির্যাতন হয় তখন তারা প্রতিবাদ করতে পারে না, কাউকে বলতে পারে না। এ কারণেই শিশু নির্যাতনের অধিকাংশ ঘটনা ঘটছে। তাদের সহজে অপহরণ করা যায়, গুম করা যায়, খুন করা যায় বলেই তাদের ওপর নির্যাতনও বেশি। সামাজিক অস্থিরতা, বিচারহীনতার সংস্কৃতি এ ক্ষেত্রে অনেকাংশে দায়ী। শিশুদের সুরক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক শিশু সনদের আদলে ২০১৩ সালে যে আইনটি করা হয়েছিল, তা শিশুদের রক্ষাকবচ হিসেবে ব্যবহার করার কথা থাকলেও মূলত হচ্ছে না। অসহিষ্ণু সমাজে শিশুরা ভীতিকর পরিস্থিতির মধ্যে বড় হচ্ছে।

গোয়েন্দা সংস্থার একজন উর্ধতন কর্মকর্তা বলেন, শিশুদের ওপর নির্যাতন বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পরিচিতরাই করে থাকে। টাকার জন্য কাউকে অপহরণ করা হবে সে ক্ষেত্রে শিশুদেরই টার্গেট করা হয়। দেখা যায় সেখানে গাড়ির ড্রাইভারও জড়িত। আপনজন যখন একটি শিশুকে ডাক দেয় তখন শিশুটি তার সঙ্গে চলে যায়। শিশুরা বোঝে না কোথায় তার বিপদ হতে পারে। তিনি বলেন, দেখা যায় পরিচিত লোকেরা যখন অপহরণ করে তখন চিনে ফেলায় শিশুটিকে মেরে ফেলছে।

পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, যে কোন বিপদগ্রস্ত শিশু ও তার পরিবারের পাশে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে পুলিশ। শিশু অপহরণের সঙ্গে জড়িত অনেক চক্রকে কৌশলে আটক করে শিশুদের উদ্ধারের পর পরিবারের কাছে দেয়া হচ্ছে। যারা শিশুদের টার্গেট করে অপরাধ করছে, তাদের বিন্দুমাত্র ছাড় দেয়া হচ্ছে না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী শিশু নির্যাতন, অপহরণ, হত্যার ঘটনাগুলোকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে অপরাধীদের বিচারের কাঠ গড়ায় দাঁড় করানোর সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাচ্ছে।