১৮ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ছয় হুজি জঙ্গী গ্রেফতার ॥ বড় নাশকতার ফন্দি আঁটছিল

স্টাফ রিপোর্টার ॥ ঢাকা থেকে এক কমান্ডারসহ নিষিদ্ধ জঙ্গী সংগঠন হরকত-উল-জিহাদের (হুজি) ছয় ৬ সদস্যকে গ্রেফতার করেছে পুলিশের নবগঠিত কাউন্টার টেরোরিজম এ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম বিভাগ। তাদের কাছ থেকে হুজির কার্যক্রম চালানোর জিহাদী বইপত্র, মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপ উদ্ধার হয়েছে। গ্রেফতারকৃতরা একুশে ফেব্রুয়ারিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে বড় ধরনের নাশকতা চালাতে গোপন বৈঠক করছিল। তারা অস্ত্রগোলাবারুদ মজুদের চেষ্টা করছিল।

মঙ্গলবার রাতে পুরান ঢাকার কোতোয়ালি থানাধীন জিন্দাবাহারের সিরাজ-উদ-দৌলা পার্ক থেকে তাদের গ্রেফতার করা হয়। অভিযানের নেতৃত্ব দেন কাউন্টার টেরোরিজম এ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম বিভাগের সিটি ও গোয়েন্দা ইউনিটের জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ কমিশনার মাহমুদা আফরোজ লাকী।

বুধবার দুপুরে ডিএমপির মিডিয়া বিভাগের এক সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম জানান, গ্রেফতারকৃত সাজ্জাদুল আলম ওরফে মুক্তি (৪৪) কুষ্টিয়া জেলার কমান্ডার। তিনি কুষ্টিয়া লাহিনীর উচ্চ বিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের শিক্ষক। চাকরির পাশাপাশি প্রাইভেট পড়িয়ে তিনি মোটা অঙ্কের টাকা রোজগার করেন। টাকার অধিকাংশই তিনি হুজিকে সংগঠিত করতে ব্যয় করে থাকেন। মেজবাউর রহমান ওরফে প্রদীপ (৩৮) কুষ্টিয়ার মিরপুর থানা ফায়ার স্টেশনের চালক পদে কর্মরত। আবুল বাশার (৩৭) একটি মসজিদের ইমাম। তিনি এমএ পাস। আশরাফুল আলম (৩৪) কম্পিউটার অপারেটর।

এ চারজনকে গ্রেফতারের পর তাদের দেয়া তথ্যমতে উত্তরার মাসকট প্লাজার সামনে থেকে আজিজুর রহমান ওরফে বাবু (৩৩) ও শফিকুল ইসলাম ওরফে পলাশ ওরফে বিজয়কে (৩৪) গ্রেফতার করা হয়। এ দুজন উত্তরার একটি গার্মেন্টসের পদস্থ কর্মকর্তা। তাদের মাসিক বেতন প্রায় লাখ টাকা। গ্রেফতারকৃতরা একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় কারাবন্দী মুফতি হান্নানের ঘনিষ্ঠ অনুচর। কারাগারে আটক হুজির শীর্ষ নেতা জাহাঙ্গীর আলমের ঘনিষ্ঠ সহযোগী। মুফতি হান্নান গ্রেফতারের পর জাহাঙ্গীর আলম হুজির নানা দায়িত্ব পালন করে আসছিল। জাহাঙ্গীর গ্রেফতার হওয়ার পর সাজ্জাদুল আলম সেই দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করছিল।

তারা সংগঠিত হওয়ার পাশাপাশি কারাবন্দী হুজি নেতাকর্মীদের মুক্তির জন্য অর্থ সংগ্রহ, হুজির প্রকাশনা থেকে নিয়মিত বই প্রকাশ, সংগঠনের জন্য অর্থ সংগ্রহের কাজ করছিল। তাদের প্রকাশিত বই ইতোমধ্যেই তাদের অনুসারী অনেককেই বিনামূল্যে দেয়া হয়েছে। গ্রেফতারকৃতরা পাকিস্তানীভিত্তিক জঙ্গী সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়বার অনুসারী। তারা বাংলাদেশে সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে ইসলাম কায়েম করতে নানা ধরনের নাশকতামূলক কর্মকা- চালানোর পরিকল্পনা করছিল। গ্রেফতারকৃতদের প্রায় সবাই বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ। তারা মারাত্মক ধ্বংসষজ্ঞ চালিয়ে হুজির আগের অবস্থার জানান দিতে চেয়েছিল। গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে কোতোয়ালি থানায় মামলা হয়েছে। ইতোপূর্বে তাদের গ্রেফতারের কোন তথ্য প্রমাণ মেলেনি। তারা কোন নাশকতামূলক কর্মকা-ে জড়িত ছিল কিনা সে বিষয়ে অনুসন্ধান চলছে।

গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, ১৯৮৯ সালে হুজি নেতা মুফতি আব্দুস সালাম বাংলাদেশে ফিরে ‘হরকাতুল জিহাদিল ইসলামী’ নামে একটি দল গঠন করেন। ১৯৯২ সালে মুফতি হান্নান আফগানিস্তান থেকে দেশে ফেরেন। তিনি ঢাকার তালতলায় জাগো মুজাহিদ নামের একটি অফিস খুলেন। পরবর্তীতে তিনি হুজিতে যোগ দেন। এক পর্যায়ে তিনি হুজির কর্ণধার হিসেবে আবির্ভূত হন। ১৯৯৮ সালে হুজি নেতৃবৃন্দ সরকারের চোখ ফাঁকি দিতে হুজিকে বিলুপ্ত ঘোষণা করেন। এ সময় হুজির জঙ্গী কার্যক্রম আড়াল করতে বিভিন্ন সময় ইসলামী জিহাদী আন্দোলন, তা আমির উদ্ দ্বীন, ইসলামী দাওয়াতে কাফেলা, ইসলামী গণআন্দোলন নাম ধারণ করে। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় গেলে আবার পুরোদমে মাঠে নামে আফগান ফেরত মুজাহিদরা। ২০০২ সালে ‘ইসলামী গণআন্দোলন’ নামে একটি দল গঠন করে। কিন্তু নামটিতে বিপ্লবের গন্ধ থাকায় ২০০৮ সালে আফগান ফেরত মুজাহিদ কাজী আজিজুল হকের পরামর্শে ইসলামী গণআন্দোলন নামটি পরিবর্তন করা হয়। ইসলামী গণআন্দোলনের পরিবর্তে নাম রাখা হয় আইডিপি। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে একটি বিদেশী গোয়েন্দা সংস্থা আইডিপিকে রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধন পাইয়ে দিতে মোটা অঙ্কের টাকাও খরচ করেছিল।

হুজি নেতা আব্দুল হান্নানকে শেখ হাসিনাকে হত্যার দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। আর তাতে মদদ যোগাচ্ছিল জামায়াত ইসলামী ও একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দল, লস্কর-ই-তৈয়বা ও পার্শ¦বর্তী একটি মুসলিম দেশের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া নসাৎ করতেই শেখ হাসিনাকে হত্যার চূড়ান্ত পরিকল্পনা হয়। তারই ধারাবাহিকতায় ২০০০ সালের ২০ জুলাই গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় শেখ হাসিনার সমাবেশস্থলে ৫৬ কেজি ওজনের বোমা পুঁতে রাখা হয়েছিল। সে মিশন গোয়েন্দাদের কারণে ব্যর্থ হয়ে যায়। তার দুইদিন পর ২৩ জুলাই শেখ হাসিনার সমাবেশস্থলের অদূরে ৭৬ কেজি ওজনের বোমাসহ আরও একটি শক্তিশালী বোমা পুঁতে রাখা হয়েছিল। সে মিশনও ব্যর্থ হয়। এরপর শেখ হাসিনাকে হত্যার জন্য হুজি ও জেএমবিকে একত্রে দায়িত্ব দেয়া হয়। পরবর্তীতে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে শেখ হাসিনার ওপর গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। প্রাণে বেঁচে গেলে শেখ হাসিনাকে হত্যা নিশ্চিত করতে নাইন এমএম পিস্তল থেকে গুলিও ছুড়া হয়েছিল। এরপর সে মামলার তদন্তের ধারাবাহিকতায় গ্রেফতার হয় মুফতি হান্নান।

২০০৫ সালের শেষ দিকে হুজি নিষিদ্ধ হয়। তবে গত সাত বছরে হুজি অন্তত ১০১ জনকে হত্যা করেছে। আর আহত করেছে ছয় শতাধিক মানুষকে।