১৭ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

চরম দুরবস্থায় নতুন ১৩ জীবন বীমা কোম্পানি

  • বিনিয়োগ ভেঙ্গে খাচ্ছে ৫ কোম্পানি

জনকণ্ঠ রিপোর্ট ॥ চরম দুরবস্থা বিরাজ করছে নতুন অনুমোদন পাওয়া ১৩টি জীবন বীমা কোম্পানির প্রায় সবগুলোতেই। বিনিয়োগ ও ব্যবসা সংগ্রহ উভয় ক্ষেত্রেই বিরাজ করছে নেতিবাচক পরিস্থিতি।

নতুন বীমা কোম্পানিগুলোর আর্থিক চিত্রের বিভিন্ন দিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, ব্যবসা শুরুর পর দুই বছর পেরিয়ে গেলেও ১০টি কোম্পানির প্রিমিয়াম এখনও ১০ কোটি টাকার নিচে। ঋণাত্মক হয়ে পড়েছে ৮টি কোম্পানির লাইফ ফান্ড। ফলে ব্যবসা চালু রাখতে মূলধন ভেঙে খেতে হচ্ছে কোম্পানিগুলোকে। এর মধ্যেই আগের বছরের বিনিয়োগ ভেঙে খেয়েছে ৫টি কোম্পানি।

নতুন ব্যবসা শুরু করা ১৩টি কোম্পানি সর্বশেষ ২০১৫ সালে আইন লঙ্ঘন করে ৪৬ কোটি টাকার অধিক ব্যয় করেছে। অন্যদিকে আগের বছরের তুলনায় প্রথম বর্ষ প্রিমিয়াম আয় কমেছে ৩টি কোম্পানির।

২০১৫ সাল শেষে লাইফ ফান্ড ঋণাত্মক হয়ে যাওয়া ৮টি কোম্পানিগুলো হলো- জেনিথ লাইফ, যমুনা লাইফ, এনআরবি গ্লোবাল লাইফ, প্রোটেক্টিভ লাইফ, বেস্ট লাইফ, চাটার্ড লাইফ, ট্রাস্ট ইসলামী লাইফ ও স্বদেশ লাইফ। এর মধ্যে জেনিথ লাইফের ৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা, যমুনা লাইফের ৪ কোটি ১২ লাখ টাকা, এনআরবি গ্লোবাল লাইফের ২ কোটি ৬৭ লাখ টাকা, প্রোটেক্টিভ লাইফের ২ কোটি ৫৫ লাখ টাকা, বেস্ট লাইফের ১ কোটি ৯২ লাখ টাকা, চার্টার্ড লাইফের ১ কোটি ৩৮ লাখ টাকা, ট্রাস্ট ইসলামী লাইফের ১ কোটি ১৮ লাখ টাকা ও স্বদেশ লাইফের ৭৩ লাখ টাকা লাইফ ফান্ড ঋণাত্মক হয়েছে।

লাইফ ফান্ড ঋণাত্মক হয়ে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে চার্টার্ড লাইফের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘প্রাথমিক ব্যয় মেটাতে গিয়েই লাইফ ফান্ড ঋণাত্মক হয়ে গেছে।’

বিনিয়োগ ভেঙে খাওয়া ৫টি কোম্পানি হলো- মার্কেন্টাইল লাইফ, জেনিথ লাইফ, স্বদেশ লাইফ, ডায়মন্ড লাইফ ও বেস্ট লাইফ। এর মধ্যে সব থেকে বেশি বিনিয়োগ ভেঙ্গে খেয়েছে জেনিথ। ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠানটির বিনিয়োগ আগের বছরের তুলনায় কমেছে ২ কোটি ২০ লাখ টাকা। বাকি কোম্পানিগুলোর মধ্যে স্বদেশ লাইফ ২ কোটি ৮ লাখ টাকা, মার্কেন্টাইল লাইফ ২ কোটি টাকা, ডায়মন্ড লাইফ ১ কোটি টাকা এবং বেস্ট লাইফ ১ কোটি টাকা বিনিয়োগ ভেঙে খেয়েছে।

বিনিয়োগ ভাঙার কারণ জানতে চাইলে জেনিথ লাইফের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা আমজাদ হোসেন খান বলেন, ‘লাইফ ফান্ড ঋণাত্মক হয়ে যাওয়ার কারণ হলো প্রথম বর্ষ প্রিমিয়াম আয় যা হয়েছে, খরচ হয়েছে তার থেকে বেশি। বিনিয়োগ করার কারণ হলো প্রয়োজনের সময় কাজে লাগানো। তাই খরচ মেটাতে বিনিয়োগ ভাঙা হয়েছে।’

এদিকে সার্বিকভাবে নতুন জীবন বীমা কোম্পানিগুলোর এ দুরবস্থার কারণে গ্রাহকদের অর্থ ফেরত প্রাপ্তির বিষয়টি চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বলে মনে করছেন এ খাতের বিশেষজ্ঞরা। ন্যাশনাল লাইফের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা জামাল এ নাসের বলেন, ‘একসঙ্গে অনেকগুলো কোম্পানির অনুমোদন দেয়া হয়েছে। ফলে ব্যবসা সংগ্রহে কোম্পানিগুলো বড় ধরনের প্রতিযোগিতায় পড়তে হচ্ছে। এ জন্য ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব দেখা যাচ্ছে।’

প্রাইম লাইফের সাবেক মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী মোরতুজা আলী বলেন, ‘যখন একসঙ্গে অনেকগুলো নতুন কোম্পানির অনুমোদন দেয়া হয়, তখনই বিভিন্ন মহলে এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কোম্পানির লাইফ ফান্ড ঋণাত্মক হয়ে যাওয়া মানে কোম্পানি যে প্রিমিয়াম আয় করছে, ব্যয় করছে তার থেকে বেশি। এতে গ্রাহকের টাকা এক প্রকার ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যায়।’

ডেল্টা লাইফের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) উত্তম কুমার সাধু বলেন, ‘কোন কোম্পানি নতুন ব্যবসা শুরু করলে খরচ একটু বেশি হয়। তবে কোম্পানির লাইফ ফান্ড ঋণাত্মক হয়ে গেলে সেটি চিন্তার বিষয়। এতে বীমা পলিসির মেয়াদ শেষে গ্রাহকরা মুনাফা তো দূরের কথা, আসল টাকাও ফেরত পাবে না।’

তবে নতুন জীবন বীমা কোম্পানিগুলোর দুরবস্থার কারণে গ্রাহকদের ঝুঁকির বিষয়ে একমত নন এসব কোম্পানির কর্মকর্তারা। জেনিথ লাইফের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা আমজাদ হোসেন খানের দাবি, ‘লাইফ ফান্ড ঋণাত্মক হয়ে যাওয়া ও বিনিয়োগ কিছু ওঠানোর জন্য গ্রাহকদের কোন সমস্যা হবে না। কারণ ভবিষ্যতে যখন বর্তমান গ্রাহকদের পলিসির মেয়াদ পূর্ণ হবে, তখন লাইফ ফান্ড শত শত কোটি টাকা হয়ে যাবে।’

অন্যদিকে চার্টার্ড লাইফের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম গ্রাহকের আর্থিক ঝুঁকির বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ‘লাইফ ফান্ড ঋণাত্মক হলে গ্রাহকের অর্থ কিছুটা ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যায় এটা ঠিক। আগে যারা ব্যবস্থাপনা পর্ষদে ছিলেন মূলত তাদের কারণেই এটি হয়েছে। তবে আমরা চেষ্টা করছি, ভবিষ্যতে এ সমস্যা আর থাকবে না।’