১৭ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

চীনের সঙ্গে ১৭ চুক্তি ॥ বাস্তবায়নের উদ্যোগ

  • প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় নজর রাখবে

এম শাহজাহান ॥ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর চীনের সঙ্গে বাণিজ্য-বিনিয়োগ সংক্রান্ত যতগুলো চুক্তি হয়েছে তা বাস্তবায়নে এবার জোর দেয়া হচ্ছে। শুধু পাঁচ বছরে চীনের সঙ্গে ১৭টি চুক্তি ও সমঝোতা (এমওইউ) স্বাক্ষর হয়েছে। এসব চুক্তির মধ্যে রাজশাহী ওয়াসা সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট, কর্ণফুলী নদীর ওপর প্রস্তাবিত দ্বিতীয় রেল সেতু, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার, ভায়া রামু ও রামু থেকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের ঘুনধুম পর্যন্ত প্রস্তাবিত ডুয়েল গেজের রেললাইন নির্মাণ এবং তৃতীয় পর্যায়ে বাংলাদেশ সরকারের আইসিটি নেটওয়ার্কের সহায়তা প্রকল্প রয়েছে। কিন্তু গত কয়েক বছরে এসব চুক্তির তেমন কোন অগ্রগতি লক্ষ্য করা যায়নি। এই বাস্তবতায় এবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে চুক্তি বাস্তবায়নে উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশ চায়না-ইন্ডিয়া-মিয়ানমার নিয়ে গঠিত (বিসিআইএম) ফোরাম কার্যকর করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। নতুন কানেকটিভিটি চালু হবে এই চারদেশের মধ্যে। এতে করে বাড়বে আঞ্চলিক বাণিজ্য। সূত্রমতে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সর্বশেষ চীন সফরের সময়ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও বাণিজ্য সম্পর্ক জোরালো করার লক্ষ্যে উভয় দেশের মধ্যে পাঁচটি চুক্তি করা হয়। এর মধ্যে দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার নিশ্চয়তা কথা বলা হয়েছে। এই চুক্তি অনুযায়ী চীন প্রতিবছর বাংলাদেশকে ৩০০ মিলিয়ন চীনা মুদ্রা সহায়তা দেয়ার কথা, চায়না ন্যাশনাল মেশিনারি ইমপোর্ট এ্যান্ড এক্সপোর্ট কর্পোরেশন এবং নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি লিমিটেডের যৌথ উদ্যোগে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণ, চট্টগ্রামে চাইনিজ ইকোনমিক এ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট জোন নির্মাণে সমঝোতা স্মারক, বাংলাদেশের বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও অন্যান্য দুর্যোগকালে দ্বিতীয় দফায় ব্যবহৃত উদ্ধারকারী যন্ত্র ক্রয় ও ব্যবহারে সহায়তা ও কর্ণফুলী নদীতে আন্ডারগ্রাউন্ড টানেল নির্মাণে সমঝোতা স্মারক করা হয়। এসব চুক্তি বাস্তবায়নেও তৎপর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়।

জানা গেছে, চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম তৃতীয় বাণিজ্যিক অংশীদার ও আমদানির উৎসে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এ বাণিজ্য খুবই ভারসাম্যহীন। বাংলাদেশ চীন থেকে ৬০০ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করছে। বিপরীতে বাংলাদেশ থেকে চীনে রফতানি হচ্ছে মাত্র ৫০ কোটি ডলারেরও কম। বড় অঙ্কের এই বাণিজ্য ঘাটতি দূর করতে চীনে রফতানি বাড়ানোর পাশাপাশি এদেশে তাদের বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব জনকণ্ঠকে বলেন, বিনিয়োগ আকর্ষণে সরকার এ মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছে। এক্ষেত্রে ভারত, চীন এবং জাপানের বিনিয়োগ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। তিনি বলেন, চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সংক্রান্ত যতগুলো চুক্তি রয়েছে সরকার তা দ্রুত বাস্তবায়ন করতে চায়। রূপকল্প-২১ এবং দেশকে মধ্যম আয়ের দেশের কাতারে নিতে হলে বিনিয়োগের কোন বিকল্প নেই। তাই উল্লিখিত এসব দেশের পাশাপাশি অন্যান্য দেশকে বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে। এদেশে এখন বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ বিরাজ করছে।

এদিকে, চীনের আর্থিক সহযোগিতায় মুন্সীগঞ্জে গার্মেন্টস পল্লীর কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। এই পল্লী নির্মাণের কাজ শেষ হলে দেশের পোশাক রফতানি আরও বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া চীনের সহযোগিতায় ঢাকার পূর্বাচলে স্থায়ী মেলা কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হবে।

আমদানি-রফতানি ॥ বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে জানা যায়, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক দিন দিন বাড়ছে। তবে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের প্রায় পুরোটাই চীন থেকে আমদানির মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে। রফতানির পরিমাণ খুব সামান্য। চীন হচ্ছে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ আমদানিকারক দেশ। দেশের মোট আমদানির ১৮-২০ শতাংশ আসে চীন থেকে। প্রধান প্রধান আমদানি-পণ্যের মধ্যে আছে তুলা, বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি, শিল্প মেশিনারি ও যন্ত্রপাতি, ভোজ্যতেল ও চর্বি, লোহা ও স্টিল, ইলেক্ট্রিক্যাল মেশিনারি ও যন্ত্রপাতি, প্রসাধনী সামগ্রীর কাঁচামাল, জাহাজ ও অন্যান্য জলযান, চিনি, প্লাস্টিক, গম ও কর্ন, যানবাহন, বস্ত্র, জৈব ও অজৈব রাসায়নিক পদার্থ, কাগজ, ট্যানারি শিল্পের কাঁচামাল, পশুখাদ্যের কাঁচামাল, তৈলবীজ, ডেইরি প্রোডাক্টস, তৈরি পোশাকের সহায়ক সামগ্রী, চশমার সামগ্রী, রাবার, এ্যালুমিনিয়াম সামগ্রী ও কফি। অপরদিকে চীনে রফতাানি পণ্যের মধ্যে আছে নিট ও ওভেন পোশাক, পাট ও পাটজাত পণ্য, চামড়া, হিমায়িত খাদ্য, কৃষিপণ্য, রাসায়নিক সামগ্রীসহ বিভিন্ন পণ্য। গত অর্থবছরে চীন থেকে পণ্য আমদানি বাবদ ব্যয় করতে হয়েছে ৬৩০ কোটি ৭০ লাখ ডলার। কিন্তু রফতানি সেভাবে বাড়ছে না। তবে বিসিআইএম কার্যকর করা গেলে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমে আসতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। এছাড়া চীন বাংলাদেশের ৪ হাজার ৭৮৮টি পণ্য রফতানিতে শুল্ক ও কোটামুক্ত সুবিধা দিলেও এতে প্রধান পণ্যগুলো নেই। ফলে দেশটির সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ কমছে না। এই পরিপ্রেক্ষিতে এবার ওই সুবিধার বাইরে থাকা প্রধান প্রধান রফতানি পণ্যের মধ্য থেকে ১৭টির ক্ষেত্রে শুল্ক কোটামুক্ত রফতানি সুবিধা পেতে চায় বাংলাদেশ।

বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ ইতোমধ্যে জানিয়েছেন, ভারত ও চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি বাণিজ্য হয়ে থাকে। কিন্তু এ দুটি দেশের সঙ্গেই বাণিজ্য ঘাটতি বাংলাদেশের অনুকূলে নয়। এ কারণে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে ভারত ও চীন বাংলাদেশকে বাণিজ্য সুবিধা দিয়ে যাচ্ছে। তবে বিসিআইএম কার্যকর হলে এ বাণিজ্য ঘাটতি উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে। তিনি বলেন, বিশ্ব বাণিজ্যে সার্কভুক্ত দেশসমূহের অবদান কম। বাংলাদেশ চায়না-ইন্ডিয়া-মিয়ানমার যোগাযোগ স্থাপিত হলে এ বাণিজ্যের পরিমাণ অনেক বেড়ে যাবে।