১৭ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

জনতার মঞ্চ-ফিরে দেখা

  • ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর

দ্বিতীয় অংশ

(গতকালের পর)

স্বেচ্ছাসেবক লীগের বাহাউদ্দীন নাছিম, হাবিবুর রহমান, ছাত্রলীগের সভাপতি এনামুল হক শামীম ও তার সহযোগী সালাউদ্দীন রতন, তাদের বহুসংখক কর্মী অতন্দ্র প্রহরীর ন্যায় জনতার মঞ্চকে পাহারা দিতে থাকেন।

২৮ মার্চ জনতার মঞ্চ অব্যাহতভাবে অনৈতিকতা ও নির্বাচনে কারচুপির ঘটনা এবং তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সোচ্চার থাকে। মেয়র হানিফ খালেদার পতন পর্যন্ত ঢাকাবাসীর অবস্থান ধর্মঘট চলবে বলে ঘোষণা করেন। তিনি আরও বলেন যে, পুলিশ ও অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনী জনতার ওপর দমননীতি চালালে ঢাকার ৮৬ লাখ নাগরিক তাদেরকে প্রতিহত করবে। আমি প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা সমন¦য় পরিষদের সদস্য ও সহযোগীদের সঙ্গে বেলা ১১টার দিকে জনতার মঞ্চে এসে আবার ঘোষণা দেই যে, আমরা সংবিধান ও জনগণের স্বার্থের পরিপন্থী কোন কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হতে পারি না। আমাদের দাবি ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বাতিল করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নতুন করে নির্বাচন অনুষ্ঠিত করতে হবে। এই সময়ে আমাদের স্বাগত জানান আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল মান্নান, আমীর হোসেন আমু, ডাঃ মোস্তফা জালাল মহীউদ্দীন, ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহমান প্রমুখ। আমরা সারা দিন-রাত ধরে খবর পাই দেশের সর্বত্র ঢাকার জনতার মঞ্চে উচ্চারিত দাবি সোচ্চারিত হচ্ছে। কুমিল্লার তৎকালীন জেলা প্রশাসক কাতেবুর রহমান অন্যদের মধ্যে আমাকে জানান যে, সারাদেশ এখন জনতার মঞ্চের দাবি নিয়ে একাত্ম হয়ে গেছে। আমরা তখন বুঝতে পারি যে, খালেদার পতন কেবল সময়ের ব্যাপার এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন আসবেই। এই সন্ধ্যায় পেশাজীবী সংগ্রাম পরিষদ বিশিষ্ট আইনজীবী শামসুল হক চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান করে। বক্তব্য রাখেন অধ্যাপক কবীর চৌধুরী, শিক্ষক সমিতির সভাপতি কামরুজ্জামান, সব্যসাচী লেখক কবি সৈয়দ শামসুল হক, এডাবের সভাপতি কাজী ফারুক আহমেদ, বিএমএর মহাসচিব ডাঃ কাজী শহীদুল আলম, শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আবদুল মান্নান চৌধুরী, ঢাকা নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া ও মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের সভাপতি আবদুল আহাদ চৌধুরী। অধ্যাপক কবীর চৌধুরী বলেন যে, আজ সেøাগান উঠেছে দেশব্যাপী ‘একাত্তরের ইয়াহিয়া, ’৯৬-এর খালেদা জিয়া’। সৈয়দ শামসুল হক আহ্বান জানান, ‘আসুন একাত্তরের রণহুঙ্কার দিয়ে আবার সবাই বলি জয় বাংলা’। এই পটভূমিকায় খালেদা জিয়ার ২৮ মার্চ দিবাগত রাতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠা সম্পর্কিত আইন সংসদে অনুমোদন করিয়ে নেন এবং ৩০ মার্চ তার সরকারের পদত্যাগপত্র রাষ্ট্রপতি বিশ্বাসের কাছে উপস্থাপন করবেন বলে জানিয়ে দেন। এর আগে রাষ্ট্রপতি অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি হাবিবুর রহমানকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নিযুক্তি দেয়ার জন্য জননেত্রী শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার সম্মতি নেন।

২৯ মার্চ ছিল শুক্রবার। জনতার মঞ্চ ঘিরে এই দিন সমাবেশ বিস্তৃত হয় দুপুরের পর থেকে। বিভিন্ন সার্ভিস এ্যাসোসিয়েশন ও জনগণের সংগঠনের প্রতিনিধিরা একে একে এসে ঘোষণা করেন যে, তারা জনগণের দাবির সঙ্গে একাত্ম হয়ে খালেদা জিয়ার অবিলম্বে পদত্যাগ চাচ্ছেন। বিসিএস আনসার, বিসিএস কাস্টম, রেডিও বাংলাদেশের (’৭৫-এর পর তখনও পর্যন্ত বাংলাদেশ বেতার নাম পুনর্বহাল হয়নি) কর্মকর্তা ও কর্মচারীবৃন্দ, টিভির কুশলীরা, বিজিএমএ’র কর্মচারী সংসদ, ব্যাংক ও অর্থলগ্নি প্রতিষ্ঠানাদির অফিসার ও কর্মচারী সমন্বয় পরিষদ, জাতীয় শ্রমিক লীগ, বাংলাদেশ টিএ্যান্ডটি কর্মচারী ইউনিয়ন ও অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন সংস্থার কর্মচারীরা একে একে এসে জনতার মঞ্চে উত্থাপিত দাবির সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেন। খবর আসে যে, ড. মনজুর হোসেনের নেতৃত্বে ঢাকা শিশু হাসপাতালসহ অন্য বেশ কয়েকটি সরকারী অফিস ও স্থাপনা থেকে খালেদা জিয়ার ছবি নামিয়ে ফেলা হয়েছে। ঢাকা ও দেশের অন্যান্য শিক্ষা বোর্ডের কার্যালয় থেকে একই খবর আসে। প্রথিতযশা শিল্প ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা আগের দিনগুলোর মতই গান ও দেশাত্মবোধক সঙ্গীত গেয়ে সমাবেশকে উজ্জীবিত রাখেন। এদিন সন্ধ্যায় খালেদা জিয়া রাষ্ট্রপতি বিশ্বাসের সঙ্গে দেখা করে পরের দিন অর্থাৎ ৩০ মার্চের মধ্যেই সংসদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার সম্পর্কিত আইন পাস করার পর সেই সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত করার লক্ষ্যে পদত্যাগ করবেন বলে জানিয়ে আসেন। এই সংবাদ জনতার মঞ্চে পৌঁছলে জনগণ স্বস্তি ও আনন্দে উদ্বেলিত হন। খবর আসে যে, এই দিন রংপুরে খালেদা জিয়ার ছবিতে আগুন দেয়া হয়, ফেনী জেলার সব অফিস থেকে খালেদা জিয়ার ছবি নামিয়ে ফেলা হয়। মোহনপুরে বিক্ষুব্ধ জনতা খালেদা জিয়ার কুশপুত্তলিকা দাহ করে। এই প্রেক্ষিতে জননেত্রী শেখ হাসিনা বিজ্ঞ রাষ্ট্রনায়কের মতো বিজয়ের মুহূর্তে সকলকে ধৈর্য ধরতে এবং আইন নিজের হাতে তুলে না নিতে আহ্বান জানান।

এই সময়ে ৪টি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে। এক. আমাকে ও পাট সচিব সফিউর রহমানকে বরখাস্ত করার এক নির্দেশ জারি করার জন্য তৎকালীন সংস্থাপনমন্ত্রী ব্যারিস্টার আমিনুল হক সংস্থাপন সচিব হাবিবুর রহমানকে নির্দেশ দেন। সংস্থাপন সচিব এই নির্দেশ মানতে অস্বীকার করেন। দুই. খালেদা জিয়া কয়েকবার আমার সঙ্গে টেলিফোনে ও লোক পাঠিয়ে যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা করেন। একবার টেলিফোনে যোগাযোগ স্থাপিত হলে তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করেন যে, আমি কি চাই। তিনি বলেন, যদি আন্দোলন হতে সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সরিয়ে নেই আমি যা চাই তাই তিনি আমাকে দেবেন। আমি সবিনয়ে তার দেয়া প্রলোভন প্রত্যাখ্যান করি। এর পরে আমার সঙ্গে বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব ব্যারিস্টার সালাম তালুকদার ও কর্নেল (অব) আকবর (প্রয়াত) রাতে দেখা করে একই প্রলোভন দেখান এবং সম্ভবত আগ বাড়িয়ে বলেন যে, খালেদা জিয়া ক্ষমতায় থাকলে মন্ত্রিসভার যে পদ আমি চাইব সে পদে আমাকে স্থান দেবেন। এ সময়ে বনানীর ১৮ নম্বর সড়কের যে বাড়িতে আমি থাকতাম তার উল্টোদিকে সালাম তালুকদার থাকতেন। তাদের বলি যে, আমি বা কোন সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারী কোনক্রমেই কোন লোভে পড়ে বিএনপি সরকার কর্তৃক ক্রমাগত সংবিধান লঙ্ঘন ও জনগণের অধিকার ক্ষুণœœকরণকে সমর্থন করবে না। তারা এই বলে আমার কাছ থেকে বিদায় নেনÑ যদি কোন কারণে আমি মত পরিবর্তন করি এবং তাদের দেয়া সহযোগিতার হাত ধরতে চাই তাহলে যেন তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করি। ওরা আমার সঙ্গে আমার বাসায় দেখা করার সময় ওদেরকে সৌজন্যমূলক চা দিতে আমার স্ত্রী অস্বীকার করেন। ওদের সঙ্গে এর পর আমার কোন যোগাযোগ ঘটেনি। তিন. খালেদা জিয়ার গু-া বাহিনী এই আন্দোলনে আমাদের সহযোগী সৈয়দ মহিউদ্দীন, আতাউর রহমান, আবু আলম শহীদ খান, ইব্রাহিম ও অন্যদের বাসায় ২৫ মার্চের রাতে বোমা ও গুলিবর্ষণ করে। একই রাতে আমার বাসায় আমার অবর্তমানে বোমা হামলা হয় এবং পরের দিন সচিবালয়ে ঢোকার পথে কার্জন হলের মোড়ে আমার গাড়িতে গুলিবর্ষণ করা হয়। আমরা আত্মরক্ষার্থে সেই রাত থেকে নিজেদের বাসস্থানে না থাকতে, একই পথে আসা-যাওয়া না করতে এবং অন্য সময়ে সহযোগীবেষ্টিত হয়ে যাতায়াতের সিদ্ধান্ত নেই। এই প্রেক্ষিতে প্রবল প্রতিবাদসহ আমরা দুর্বৃত্তদের হুঁশিয়ার করি এবং পুলিশের মহাপরিদর্শক ও ঢাকার পুলিশ কমিশনারকে যথাযথ আইনি কর্তব্য পালনে আহ্বান জানাই। চার. জননেত্রী শেখ হাসিনা আমাকে তিনবার টেলিফোনে অভিনন্দন জানিয়ে দৃঢ়তার সঙ্গে জনতার আন্দোলন সমর্থন করা এবং

একই সঙ্গে সাবধানে চলাফেরা করার অনুশাসন দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ছাত্রদল ও বিএনপির গু-াদল আমার ওপর হামলা করবে। সঙ্গে সঙ্গে তিনি এও বলেছেন যে, আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ কর্মীরা আমার নিরাপত্তার জন্য যথা প্রয়োজন পাহারার ব্যবস্থা করবে। তিনি মোক্তাদির চৌধুরীর মাধ্যমে বলে পাঠানÑ এ পর্যায়ে কোন বিশেষ প্রয়োজন হলে আমি যেন সরাসরি বা মোক্তাদিরের মাধ্যমে তার সঙ্গে দেখা বা যোগাযোগ করি। জননেত্রী থেকে পাওয়া এই অভিনন্দন আমাকে যেমন দ্বিগুণ মাত্রায় উৎসাহিত করে তেমনি আমাদের নিরাপত্তার বিষয়ে তার উৎকণ্ঠা তার প্রতি শ্রদ্ধা ও সমর্থনের গভীরতা বাড়িয়ে দেয়। বলা প্রয়োজন, এক্ষেত্রে মোক্তাদির চৌধুরী ও তার সহযোগীরা সাহসী, দেশপ্রেমী ও গভীর সংবেদনশীল ভূমিকা পালন করেন। পাঁচ. সেনাবাহিনী, পুলিশ ও আনসারের কতিপয় অফিসার আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে নিশ্চয়তা দেন যে, তাদের তরফ থেকে আমাকে অন্তরীণ বা বাধা দেয়ার কোন অপচেষ্টা করা হবে না। পুলিশ বাহিনীর নগর পর্যায়ে কর্মরত বেশ কয়েকজন উর্ধতন ও অধস্তন অফিসার তাদের তরফ থেকে আমাকে সমর্থন করেছিলেন এবং আমার নিরাপত্তার প্রয়োজনে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। ২৮ মার্চ ব্রিগেডিয়ার (অব) শামসুদ্দিন আহম্মেদ জনকণ্ঠে প্রকাশিত এক আবেগধর্মী নিবন্ধে আমাদের ভূমিকাকে দেশপ্রেমিক, সাহসী ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন সরকারী কর্মকর্তা হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

আন্দোলন চলাকালীন সময়ে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ভারতীয় দূতাবাসের রাজনৈতিক বিষয়ক কর্মকর্তারা আমার সঙ্গে দেখা করেছেন। তাদের কাছে আমি সংবিধানের ১৩৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারী হিসেবে সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীর দায়িত্ব, মর্যাদা রক্ষা এবং তাদের নিয়ে জনগণের প্রত্যাশা ব্যাখ্যা করেছি। গণতন্ত্রকে স্থায়ী রূপ দেয়ার লক্ষ্যে সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সংবিধানসম্মত আইনানুগ পদক্ষেপ নেয়ার যৌক্তিকতা বিশদভাবে ব্যাখ্যা করার পর তারা এই বিষয়ে তাদের তরফ থেকে প্রাথমিক উৎকণ্ঠা শেষ হয়েছে বলে জানিয়েছেন। এই কারণেই সম্ভবত সেই সময় ১৫ ফেব্রুয়ারীর নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা কিংবা সেই নির্বাচনে তথাকথিত বিজয়ের পর খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সরকার গঠনের আইনিকরণ বা ভিত্তির অনুকূলে তারা কোন অবস্থান নেননি, বরং তিন দেশের তরফ থেকেই এ দেশের সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এ ধরনের পদক্ষেপ এই দেশে গণতান্ত্রিকতা সম্প্রসারণে সময়ের ব্যাপ্ত পরিসরে কার্যশীল থাকবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। উল্লেখ্য যে, ১৫ ফেব্রুয়ারির প্রহসনমূলক নির্বাচনের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত জাতীয় সংসদের উদ্বোধনী অধিবেশনে ও বঙ্গভবনে নতুন মন্ত্রী পরিষদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে বিদেশী কূটনীতিকদের ডিন ছাড়া আর কোন রাষ্ট্রদূত উপস্থিত থাকেননি।

৩০ মার্চ জনতার মঞ্চভিত্তিক আন্দোলন জনতার মঞ্চকে বিজয়ের মঞ্চে রূপান্তরিত করে। ৩০ মার্চ রাষ্ট্রপতি বিশ্বাস খালেদা জিয়ার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেন এবং পরবর্তী ১৫ জুন নিরপেক্ষ নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে বলে ঘোষণা দেন। ৩০ তারিখ সকালে আমরা প্রজাতন্ত্রের সকল বিভাগের কর্মকর্তা ও কর্মচারী জনতার মঞ্চে পৌঁছে যাই। আমরা খালেদার পদত্যাগ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন বিষয়ক সংবাদ যখন তুলে ধরি তখন মঞ্চে বসে থাকা এবং তার চারপাশে সমবেত মানুষ আনন্দে ও স্বস্তিতে উদ্বেলিত হয়ে উঠেন। গতকাল থেকেই সচিবালয়সহ রাজধানীর প্রতিটি সরকারী অফিস, অধিদফতর, পরিদফতর ও রাষ্ট্রায়ত্ত কর্পোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিজ নিজ অফিস বা এলাকায় সমবেত হয়ে জনতার মঞ্চে উপস্থাপিত জনতার দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন এবং সকল দেয়াল থেকে খালেদার ছবি সরিয়ে ফেলেছেন। তারপর তারা আসতে শুরু করেছিলেন জনতার মঞ্চের দিকে। তাদের সঙ্গে যোগ দেন ঢাকার অগণিত মানুষ। আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ কর্মীদের নগরের প্রতিটি এলাকা থেকে খ- খ- মিছিলে জনতার মঞ্চের দিকে আসাকে পুলিশ বা অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনী কোনরকম বাধা দেয়নি। বেলা সাড়ে ১১টার মধ্যে জনতার মঞ্চের চারদিকে দেখা যায় কর্মকর্তা-কর্মচারী ও জনগণের বিশাল সমুদ্র। জনতার মঞ্চকেন্দ্রিক এই সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন কর্মচারী সংযুক্ত পরিষদের সভাপতি সৈয়দ মহীউদ্দীন। বক্তৃতা করেন মেয়র হানিফ ও উপ-সচিব আবদুস সালাম, একে শামসুদ্দিন, আবদুল হাই, মোক্তাদির চৌধুরী, আবু আলম শহীদ খান ও বিসিক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতিনিধি উপ-ব্যবস্থাপক নার্গিস বেগম। অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন পাট মন্ত্রণালয়ের সচিব সফিউর রহমান, সাবেক সচিব ডাঃ মির্জা এ জলিল ও যুগ্ম সচিব আজিজুর রহমান। মেয়র হানিফ ঢাকাবাসীর পক্ষ থেকে সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, গণতন্ত্র রক্ষার্থে তাদের ভূমিকা কোন দিন ভুলবার নয়। সবশেষে আমার বক্তব্যে আমি বলি যে, অবৈধ সরকারের পতনের আগে দুষ্টচক্র আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটাতে পারে। সে জন্য আমি সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সচেতন থেকে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে দায়িত্ব পালনে জননেত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশ অনুযায়ী এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানাই। আমি সকল সরকারী, আধাসরকারী অফিসে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর ছবি টানাতে নির্দেশ দেই। আমার বক্তৃতা শেষ হওয়ার আগেই টিভি ও রেডিওতে কর্মরত সকল কর্মচারী বিশাল মিছিল নিয়ে জনতার মঞ্চের পাদদেশে উপস্থিত হন এবং বলেন যে, তারা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে জনতার স্বার্থবিরোধী কোন সংবাদ বা অনুষ্ঠান প্রচার করবেন না। গণতন্ত্র স্থাপনে এই বলিষ্ঠ ভূমিকার সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা এবং উন্নয়নমূলক কাজ অব্যাহত রাখার অনুকূলে আমাদের অবস্থান দেশের সুধী সমাজ ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ স্বাগত জানান। সেদিন সন্ধ্যায় আমি মোক্তাদির চৌধুরীসহ জননেত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করে জনতার মঞ্চ স্থাপন ও পরিচালনায় তার রাষ্ট্রনায়কোচিত দৃঢ় ও নির্ভীক ভূমিকার জন্য কৃতজ্ঞতা জানাই। তিনি জনতার মঞ্চকে জনগণের বিজয়ের মঞ্চে রূপান্তরের জন্য আমাদের অভিনন্দন জানান। বিজয়ের গৌরব নিয়ে জনগণ ও সরকারী কর্মচারীদের একাত্মবোধের চেতনাবোধ ছড়িয়ে দিয়ে শেষ হয় জনতার মঞ্চের কার্যক্রম।

জনতার মঞ্চকেন্দ্রিক আন্দোলন ও কার্যক্রম বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি কথা সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয় : ১. এই মঞ্চভিত্তিক আন্দোলন সরকারী কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ঔপনিবেশিক ঐতিহ্যের বিকল্পে অগণতন্ত্রিক শাসনের হাতিয়ার থেকে পৃথক সত্তা হিসেবে পরিচয় দিয়ে জনগণের স্বার্থের অনুকূল শক্তি হিসেবে প্রতিভাত করে। প্রশাসনিক সার্ভিসের মহাসচিব হিসেবে ১৯৮৮ সাল থেকে স্বৈরশাসক এরশাদের আমলে আমরা প্রজাতন্ত্রের সংবিধান অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে যে স্বীকৃতি আদায়ের জন্য দাবি জানিয়ে এসেছি তার নৈতিক প্রসারণে ও জনগণ কর্তৃক গ্রহণকরণের অগ্রযাত্রা জনতার মঞ্চভিত্তিক আন্দোলন হয়েছিল এক বিরাট মাইলফলক; ২. জনতার মঞ্চে সরকারী কর্মচারীদের ভূমিকা অগণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে প্রহসনমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠিত করে স্বৈরতান্ত্রিকতার ধারক ও বাহক হিসেবে ফায়দা লোটার প্রতিকূলে সংশ্লিষ্ট সকল রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠীকে সচেতন করে; ৩. কঠিন বিপর্যয়ের সামনে ও সময়ে সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যে পন্থা ও প্রক্রিয়া অবলম্বন করে দেশকে অরাজকতা থেকে মুক্তি দিতে পারেন তার উদাহরণ জনতার মঞ্চকেন্দ্রিক আন্দোলন সারাদেশে প্রতিষ্ঠিত করে; এবং ৪. সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীগণ সংবিধানের ১৩৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারী হিসেবে নিজেদের ভূমিকা সম্পর্কে সচেতন হন এবং সকল রাজনৈতিক দল, সুধী সমাজ ও জনসাধারণের কাছে তাদের তরফ থেকে সংবিধান ও আইন অনুযায়ী দেশ পরিচালনায় ব্রত অবলম্বন এবং এর ভিত্তিতে তাদের রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালনে সহায়ক আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন ও চেতনাবোধ সৃষ্টি করেন।

(সমাপ্ত)

লেখক : সংসদ সদস্য, সাবেক মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতা