১৭ জুলাই ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

তনু হত্যার বিচার দাবিতে শাহবাগ অবরোধ, তীব্র যানজট

তনু হত্যার বিচার দাবিতে শাহবাগ অবরোধ, তীব্র যানজট

বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার ॥ কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্রী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনু হত্যার বিচারের দাবিতে সারাদেশে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ কর্মসূচী অব্যাহত রয়েছে। ঘটনার পর নয়দিন পার হলেও জড়িতদের গ্রেফতার করতে না পারায় বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে আসছে নানা আলটিমেটাম এবং কর্মসূচী। মঙ্গলবার দুপুরে জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার ও বিচারের দাবিতে প্রায় চার ঘণ্টা শাহবাগ মোড় অবরোধ করে রাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে সাড়ে চারটা পর্যন্ত এই অবরোধ কর্মসূচী চলে। এ সময় একই দাবিতে আগামী ৩ এপ্রিল দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র ধর্মঘট পালনের ঘোষণা দেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, তনু হত্যার বিচারের দাবিতে মঙ্গলবার দুপুরে বিক্ষোভ মিছিল বের করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্ধশতাধিক সাধারণ শিক্ষার্থী। মিছিলটি ক্যাম্পাসে বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে শাহবাগ মোড়ে গিয়ে অবস্থান নেয়। এ সময় পুলিশ বাধা দিলে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সেখানে ধস্তাধস্তি হয়। এতে আশিকুল ইসলাম এবং মন্টু নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দু’ শিক্ষার্থী আহত হন বলে জানা যায়।

একপর্যায়ে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা শাহবাগের মূল সড়কে গিয়ে অবরোধ করলে সে স্থান দিয়ে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহনও ওই সড়ক দিয়ে চলাচল করতে পারেনি। অবরোধ কর্মসূচিতে ভিকারুননেসা নূন স্কুল এন্ড কলেজ, ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজ, ঢাকা কলেজ, উদয়ন স্কুল ও কলেজ, নটরডেম কলেজ, ইব্রাহীম মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থীরা সংহতি জানিয়ে অংশ নেন। এতে ঢাকায় বৃহত্তর মুরাদনগর ছাত্র কল্যাণ পরিষদ, জাগরণের আহ্বানসহ বিভিন্ন সংগঠনের শিক্ষার্থীরাও যোগ দেন। দুটি বাম ছাত্র সংগঠনের জোট প্রগতিশীল ছাত্র জোট এবং সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ছাত্র ঐক্যও সংহতি জানিয়ে অংশ নেয়।

এদিকে দুপুরে শাহবাগ মোড় অবরোধের কারণে ওই এলাকা দিয়ে সব ধরনের যান চলাচল চার ঘণ্টা বন্ধ থাকে। ফলে রাজধানীতে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। পরে বিকেল সাড়ে চারটার দিকে শিক্ষার্থীরা অবরোধ তুলে নিলে যানচলাচল শুরু হয়।

আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের বহন করা ব্যানার এবং প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, ‘তনু হত্যার বিচার চাই’, ‘আপনার চুপ করে থাকাটাই একটার পর একটা ধর্ষণ খুনের বৈধতা’, ‘আর কোন তনুর লাশ দেখতে চাই না, ধর্ষকের লাশ দেখতে চাই’, ‘এখনো কেন পাই তনুর লাশ, তবে দেশ কি করছে ধর্ষক চাষ?’, ‘স্বাধীন দেশে পূর্ণ মুক্তি চাই চাই চাই’ প্রভৃতি।

বিকেল সাড়ে চারটার দিকে অবরোধ তুলে নিয়ে আন্দোলনকারীরা একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। মিছিলটি রূপসী বাংলা হোটেলের মোড় ঘুরে পুনরায় শাহবাগে গিয়ে শেষ হয়।

সাংস্কৃতিক জোটের সমাবেশ থেকে আল্টিমেটাম ও নতুন কর্মসূচী ॥ একই দাবিতে এদিন বিকেলে দেশের বিভিন্ন জেলায় সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল করে সাংস্কৃতিক কর্মীরা। এই কর্মসূচীর অংশ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি ভবনের সামনে অনুষ্ঠিত সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সমাবেশ থেকে তনু হত্যার বিচারের দাবিতে পাঁচ দিনের আল্টিমেটাম দেয়া হয়। যদি আগামী ৩ এপ্রিলের মধ্যে এই ঘটনার কোন দৃশ্যমান অগ্রগতি না হয়, তবে আগামী ৪ এপ্রিল বেলা ১১টায় একই স্থানে আবারও প্রতিবাদ সমাবেশ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অভিমুখে মিছিল ও স্মারকলিপি প্রদান করবে সংগঠনটি।

জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছের সভাপতিত্বে এবং সাংস্কৃতিক কর্মী রফিকুল ইসলামের উপস্থাপনায় এতে বক্তব্য রাখেন জোটের সাবেক সভাপতি নাসিরুদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু, বর্তমান সাধারণ সম্পাদক হাসান আরিফ, কবি অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সামাদ, নাট্য ব্যক্তিত্ব মান্নান হীরা, গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের সভাপতি আখতারুজ্জামান, নৃত্য শিল্পী নিগার চৌধুরী, আবৃত্তি শিল্পী মুনমুন আহমেদ প্রমুখ। সমাবেশ শেষে একটি প্রতিবাদী মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থান ঘুরে আবার টিএসসি ভবনের সামনে এসে শেষ হয়।

সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যের শুরুতেই তনু হত্যার নিন্দা ও এ ঘটনার দ্রুত বিচারের দাবি জানিয়ে জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ বলেন, এটি শুধু দেশের সংস্কৃতিকর্মীদের দাবি নয়, এই ঘটনার বিচারের দাবিতে সারা দেশের আপামর জনগণ, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আজ রাস্তায় নেমে এসেছে। দেশে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের মৃত্যু হয়, কিন্তু সকল মৃত্যু নিয়ে দেশ কখনো উত্তাল হয় না। কিছু কিছু মৃত্যু আছে যা কখনও কল্পনাও করা যায় না। সেই মৃত্যুতে মানুষ আতঙ্কিত হয়। তনুকে সবাই নিজের সন্তান মনে করছে। যদি আগামী ৩ এপ্রিলের মধ্যে তনু হত্যাকা-ের কোন দৃশ্যমান অগ্রগতি না হয়, তাহলে পরদিন এই টিএসসিতে বেলা ১১টায় সংস্কৃতি কর্মীদের সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। এই সমাবেশ থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অভিমুখে মিছিল ও স্মারকলিপি দেয়া হবে বলেও জানান তিনি।

তিনি আরও বলেন, তনুর হত্যাকারী সে পরিচয়েরই হোক, সে একজন খুনী। তাকে শাস্তি দিতেই হবে। যাতে ভবিষ্যতে এই ধরনের হত্যাকা- আর যাতে না ঘটে। এই ঘটনার দ্রুত সমাধান হওয়া প্রয়োজন। যারা প্রকৃত অপরাধী তাদের চিহ্নিত করে দ্রুত বিচারের মধ্য দিয়ে এই সমস্যার ন্যায্য সমাধান হতে পারে। কারও অবহেলার কারণে দেশে একটি বিশৃঙ্খল অবস্থার সৃষ্টি হোক এটি আমরা চাই না। তনুর হত্যাকারীদের ক্ষমা করব রেহাই পাক এটি আমরা চাই না। কেউ যদি তাদেরকে রক্ষা করতে চায়, সংস্কৃতিকর্মীরা শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে তাদেরকে প্রতিরোধ করব।

সংগঠনের সাবেক সভাপতি নাসিরুদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু বলেন, ঘটনা ঘটার নয় দিনেও কোন তথ্য-উপাত্ত পাওয়া গেল না, এটি আমাদের কাছে অবিশ্বাস্য। এই ঘটনার আইন প্রক্রিয়া সঠিক ও দ্রুততার সঙ্গে করতে হবে। তনুকে কেন্দ্র করে সারা দেশ অগ্নিগর্ভে পরিণত হয়েছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, সব বিষয়কে নিয়ে রাজনীতি করবেন না। এটি নিয়ে রাজনীতির খেলা খেলে সংঘর্ষের পরিবেশ সৃষ্টি করবেন না। দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের অধীনে এই ঘটনার বিচারের দাবি জানান তিনি।

জোটের সাধারণ সম্পাদক হাসান আরিফ বলেন, আমরা আন্দোলনের শক্তি হিসেবে এই বিষয়ের উপর পর্যবেক্ষণ রাখছি। কিন্তু আমরা দিন দিন ক্ষুব্ধ হচ্ছি, হতাশ হচ্ছি। এই সংকটের সমাধানের জন্য তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

হাসান আরিফ আরও বলেন, দ্রুত বিচার আইনে এই হত্যাকা-ের বিচার হতে হবে। যদি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া যায়, তাহলে অপরাধের মাত্রা সংকুচিত হবে। তা না হলে অপরাধের মাত্রা দিন দিন বেড়েই যাবে। একই সঙ্গে অপরাধীরা উপহাস করবে। আমরা এই বোনের পাশে দাঁড়িয়ে বলতে চাই, শ্রেণী-বর্ণ নির্বিশেষে বাংলাদেশের কোন মানব সমাজ যেন আর কোন মৃত্যুকে নিয়ে উপহাস করতে না পারে। তাহলে সংস্কৃতি কর্মীরা তাদের আন্দোলন অব্যাহত রাখবে। আমরা সবাই তনুর মতো নিজের জীবন উৎসর্গ করতে রাজি আছি, যদি না আমাদের মা-বোনদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হয়।

গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের সভাপতি আখতারুজ্জামান ধর্ষিত ও খুন হওয়ার নয়দিন পেরিয়ে গেলেও দোষীরা গ্রেফতার না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং এ ঘটনার দ্রুত বিচারের দাবি জানান।