১৯ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

কমিউনিটি ক্লিনিকে মাসে ব্যয় হচ্ছে ৫০ কোটি টাকা

  • স্বাস্থ্যসেবা আরও এগিয়ে নেয়া হচ্ছে

সমুদ্র হক ॥ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) পূরণে দেশের স্বাস্থ্য সেবাকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে এগিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হচ্ছে। চিকিৎসা খরচ মেটাতে গিয়ে দারিদ্র্য মোচন করা কোন পরিবার যেন ফের দারিদ্রের মধ্যে না পড়ে সে জন্য ইউনিভার্সাল হেলথ কভারেজ বা সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচী হাতে নেয়া হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে পাইলট প্রকল্পের আওতায় টাঙ্গাইলের মধুপুর ঘাটাইল ও কালিহাতি উপজেলায় কর্মসূচীটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। ইতোমধ্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম কালিহাতি উপজেলায় ‘শেখ হাসিনা হেলথ কার্ড’ নামে বিনামূল্যে স্বাস্থ্য সেবা কার্ড বিতরণ করেছেন।

সূত্র জানায়, বর্তমানের স্বাস্থ্য সেবার কাঠামোয় সর্বনি¤œ ধাপ গ্রামে প্রতি ৬ হাজার মানুষের জন্য একটি করে কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (কমিউনিটি ক্লিনিক নামে পরিচিত)। এ জন্য প্রতি মাসে ব্যয় হচ্ছে ৫০ কোটি টাকা করে। এরপর পর্যায়ক্রমে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য সেবা, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, জেলার জেনারেল হাসপাতাল, মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় ও সকল বিশেষায়িত হাসপাতাল।

কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে কোন ডাক্তার থাকেন না। একজন স্বাস্থ্য সহকারী, একজন পরিবার পরিকল্পনা সহকারী ও কম্যুনিটি হেলথ প্রোভাইডার থাকেন। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা ও ৩০ ধরনের ওষুধ দেয়া হয়। জটিল অসুখে রেফার করা হয় উপজেলায়। বর্তমানে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্র বেহাল হয়ে আছে। তবে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে ওপরের দিকে চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আছেন। এক জরিপে দেখা গেছে গ্রামের অধিকাংশ মানুষ এখনও উপজেলা ও হাটবাজারের ফার্মেসি, কবিরাজি টোটকা, আয়ুর্বেদী ও ইউনানী চিকিৎসা নেয়। রোগ জটিল হলে হাসপাতালমুখী হয়। সরকারী হাসপাতাল ও বিশেষায়িত সরকারী হাসপাতালের চিকিৎসা সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠলে প্রাইভেট ক্লিনিক ও হাসপাতালে যায়।

এ অবস্থায় সাধারণ মানুষের জীবন জীবিকার চেয়ে চিকিৎসা খরচ বেড়ে গেলে অনকে মধ্যবিত্ত গরিবের কাতারে নেমে আসে এবং গরিব হতদরিদ্রে পরিণত হয়। গত বছর সেপ্টেম্বরে শেষ হওয়া জাতিসংঘ ঘোষিত মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোলে (এমডিজি) দেশ দারিদ্র্য বিমোচনে অনেক এগিয়ে গেছে। এই অবস্থা যেন আর নিচে নেমে না আসে এবং দারিদ্র্যের হার আরও কমে ২ হাজার ২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ ও ২ হাজার ৪১ সালে উন্নত দেশের তালিকায় নাম ওঠে সেই লক্ষ্যে সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচীকে এগিয়ে নেয়া হচ্ছে। এমডিজি পূরণে যেভাবে কর্মসূচীগুলোকে আন্দোলনে পরিণত করা হয়েছিল এসডিজি পূরণেও সেই স্ট্রাটেজি নেয়া হয়েছে।

সূত্র জানায়, সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষায় যে বিষয়গুলোকে বাস্তবায়িত হবে তা হলো- বিনামূল্যের চিকিৎসা সেবায় অর্থায়ন, প্রত্যেক মানুষ প্রয়োজনের সকল সেবা পাবে, অর্থ নেই বলে কেউ সেবা থেকে বঞ্চিত হবে না, চিকিৎসা সেবার জন্য অর্থ প্রাপ্তির খাত সরকার, জাতিসংঘ সহায়তা, বিদেশী সহায়তা, ব্যক্তি গোষ্ঠী ধনাঢ্য ব্যাক্তির সহযোগিতা বাড়াতে হবে, স্বাস্থ্যের মানসম্মত সকল সেবা দেশের প্রত্যেক নাগরিক পাবে, চিকিৎসা নিতে গিয়ে যেন কোন মানুষ দরিদ্র না হয় সেদিকে দৃষ্টি থাকবে। সরকারী ও বেসরকারী প্রতিটি সেক্টরে অতি সহজলভ্য চিকিৎসা সেবার খাত তৈরি করতে হবে।

বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউটের (পিআইবি) এক আয়োজনে ভারতের ব্যাঙ্গালুরুতে বিশ্বখ্যাত কার্ডিয়াক চিকিৎসক দেবী শেঠী কিভাবে তার এলাকায় সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা করেছেনে তার দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হয়। ডাঃ দেবী শেঠী চিকিৎসার পাশাপাশি গবেষণা ও সমাজকর্ম করেন। তার এলাকায় কত মানুষ কি ধরনের রোগে ভুগছে এবং কত লোক হৃদরোগে আক্রান্ত হচ্ছে তার হিসাব বের করেন। এরপর প্রত্যেক শিশুর হৃদরোগ নিজে বিনে পয়সায় সার্জারি করেন ও চিকিৎসা দেন। সেবার ফান্ডে যে সকল ব্যক্তি সামান্য সহযোগিতা করেন অর্ধেকেরও কম খরচে তাদের পরিবারের সকল সদস্যের সুচিকিৎসা দেন। এভাবে তিনি ব্যাঙ্গালুরুতে স্বাস্থ্য সেবায় বিপ্লব ঘটিয়েছেন। সেখানকার প্রত্যেক মানুষ সুচিকিৎসা পাচ্ছে। চিকিৎসা করতে গিয়ে কেউ গরিব হচ্ছে না। বরং সরকারী ও বেসরকারীভাবে সুচিকিৎসা পেয়ে গরিব তার জীবনমান উন্নত করতে পারছে।

বাংলাদেশেও এ ধরনের উদ্যোগ তৈরি করা যায় কিনা তা খতিয়ে দেখার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। পিআইবি এই বিষয়ে সাংবাদিকদের সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। দেশের স্বাস্থ্য বিভাগের প্রতিটি ক্ষেত্রে কি ঘটছে তা তুলে ধরে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করা যায়। এদিকে আরেক সূত্র বলেছে টাঙ্গাইলের পাইলট প্রকল্পটি সফল হলে পর্যায়ক্রমে দেশের প্রতিটি এলাকায় তা ছড়িয়ে দেয়া হবে। প্রকল্পের সাফল্যে দেশের প্রত্যেক মানুষ বিনে পয়সায় ৫০ ধরনের স্বাস্থ্য সেবা পাবে। সূত্র জানায়, দেশ স্বাস্থ্য সেবায় বিশেষ করে টিকাদান কর্মসূচী ও কমিউনিটি হেলথ প্রোভাইডারে বিশ্বে সুনাম কুড়িয়েছে। জল বসন্ত ও পোলিও নির্মূল করা গেছে। ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) প্রতিষ্ঠার পর বলা হয়েছিল, প্রত্যেক দেশে প্রতি দশ হাজার মানুষের জন্য ২৩ জন করে চিকিৎসক থাকবে। বাংলাদেশও সেই দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে। এদিকে আরেক সূত্রে বলা হয়েছে, বর্তমানে চিকিৎসা খাতে ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই রোগ-ব্যাধি নিরাময়ে রোজগারের ৬০ শতাংশ পর্যন্ত চিকিৎসা খরচে চলে যায়। এই অবস্থা চলতে থাকলে দারদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারীর হার ফের বেড়ে যেতে পারে। এই অবস্থার অবসানে সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচী প্রতিটি স্থানে দ্রুত বাস্তবায়ন দরকার।