১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

রিজার্ভের টাকা হ্যাকিং নয়, ব্যাংকে ডিজিটাল জালিয়াতি

রিজার্ভের টাকা হ্যাকিং নয়, ব্যাংকে ডিজিটাল জালিয়াতি

স্টাফ রিপোর্টার ॥ বাংলাদেশ ব্যাংকের অথরাইজড পারসন জড়িত না থাকলে রিজার্ভের টাকা সরানো সম্ভব নয় উল্লেখ করে বিএনপি অভিযোগ করেছে, এটি হ্যাকিং নয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিজিটাল ডাকাতি। দলের পক্ষে বলা হয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের অথরাইজড পারসন বা আন্তঃব্যাংকের লেনদেনের মাধ্যম সুইফট সিস্টেমের পাসওয়ার্ড ব্যবহারকারী কর্মকর্তাকে জিজ্ঞেস করলেই রিজার্ভ চুরির রহস্য উদ্ঘাটন হবে। কারণ, সুইফট সিস্টেমের কম্পিউটারে পেন ড্রাইভের মতো যন্ত্র ‘অনন্য চাবি’ ও অনুমোদিত ব্যবহারকারীর পাসওয়ার্ড ছাড়া লগইন করা সম্ভব নয়। তাই রিজার্ভ ডাকাতির ঘটনা তদন্ত করে সরকারকে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করে জাতির সামনে তুলে ধরতে হবে এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।

মঙ্গলবার দুপুরে বিএনপি চেয়ারপার্সনের গুলশান কার্যালয়ে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের ১০১ মিলিয়ন ডলার (৮০০ কোটি টাকা) লুণ্ঠন একটি বিশ্লেষণাত্মক পর্যালোচনা’ শীর্ষক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে প্রজেক্টরের মাধ্যমে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ও তথ্য-প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ শামা ওবায়েদ। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ বেশ ক’জন সিনিয়র নেতা।

কিভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের টাকা সরানো সম্ভব সে সম্পর্কে বিভিন্ন ভিডিও চিত্র প্রদর্শনকালে শামা ওবায়েদ বলেন, এ বিষয়টি এখন সারা বিশ্বের জন্য গবেষণার বিষয় হয়ে গেছে। আমরাও এ বিষয়ে গবেষণা করতে গিয়ে যারা বিশ্বব্যাপী সাইবার ক্রাইম নিয়ে কাজ করেন এমন বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়েছি। এ সময় তিনি ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও সাইবার ক্রাইম বিশেষজ্ঞ ম্যাট বিশপসহ ক’জনের বক্তব্য শোনান বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে টাকা সরিয়ে নেয়া সম্পর্কে।

অধ্যাপক ম্যাট বিশপ বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে রিজার্ভের টাকা বাইরের কেউ হ্যাক করার চেষ্টা করলে কেন বাংলাদেশ ব্যাংক জানল না। এটা অনেকদিন যাবত চেষ্টা করা হয়েছিল। এ ঘটনা বাংলাদেশ ব্যাংকের ভেতর থেকেই করা হয়েছে, বাইরে থেকে সম্ভব নয়। এটা স্পষ্ট যে, কোথাও না কোখাও খারাপ লোকদের দুরভিসন্ধি জড়িত। যে কোন ব্যক্তি যার সুইফট সিস্টেমটি ব্যবহারের অনুমতি আছে এবং তিনি ছাড়া অন্য কেউ এই সিষ্টেমে প্রবেশ করার অনুমতি নেই এমন কেউ এতে জড়িত ছিল। ‘ম্যালওয়ার’ এর মাধ্যমে ওই অর্থলোপাটের সম্ভাবনাকে নাকচ করে দেন তিনি।

ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক সাইবার ক্রাইম বিশেষজ্ঞ শেইন শকের উদ্ধৃতি দিয়ে শামা ওবায়েদ বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের ভেতরের কেউ বাইরের কারও সঙ্গে যোগসাজশ করে রিজার্ভ থেকে টাকা চুরি করেছে। ভেতরকার মানুষ জড়িত না থাকলে এটি অসম্ভব। যদি ভেতরকার লোকজন জড়িত না থাকে, তাহলে আক্রমণকারীদের কে ভেতর থেকে সহায়তা করা হয়েছে?। এ ধরনের অপরাধ করার জন্য যেকোন ব্যক্তির ব্যাংকিং শিল্প সম্পর্কে গভীর জ্ঞান থাকতে হবে।

মিডিয়া ব্রিফিংয়ের সূচনা বক্তব্যে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, শেয়ারবাজার, হলমার্ক ও ডেসটিনি কেলেঙ্কারির পর বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ ৮০০ কোটি টাকা চুরি কেবল আর্থিক ক্ষতি নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ। রাজকোষের এই লুণ্ঠন আমাদের ব্যাংকিং ব্যবস্থার নিরাপত্তা ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে জনগণ আস্থা হারাবে। তিনি বলেন, সরকারের অযোগ্যতার কারণে দেশের ব্যাংকিং খাত থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা লুট হয়েছে।

ফখরুল বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের টাকা চুরির কারণে এ সরকার জনগণের আস্থা হারিয়েছে। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিপুল পরিমাণ টাকা চুরির জন্য শুধু গবর্নরের পদত্যাগই যথেষ্ট নয়, এর দায় নিয়ে সরকারকেও পদত্যাগ করতে হবে। কারণ, সরকার কোনভাবেই এ দায় এড়াতে পারে না। তারা এখন পর্যন্ত এ ঘটনার কোন বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যাও দিতে পারেনি। বিএনপি একটি দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দল। তাই আমরা তথ্য-প্রযুক্তি ও আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে গবেষণার ভিত্তিতে কিছু জরুরী তথ্য দেশবাসী কাছে তুলে ধরছি।

প্রশ্নোত্তর পর্বে বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরিতে যারা বেনিফিশিয়ার, সেই ফিলিপিন্সে তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে। এ বিষয়ে সে দেশের সিনেটে শুনানি হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশ নীরব। এ নীরবতার কারণ কি তা আমাদের খতিয়ে দেখতে হবে। তিনি বলেন, রিজার্ভের টাকা চুরির ঘটনা উদ্ঘাটনে সরকার কাজ না করে এ বিষয়ে পানি ঘোলা করছে।

বিএনপির মিডিয়া ব্রিফিংকালে আরও উপস্থিত ছিলেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব) আ স ম হান্নান শাহ, ড. আব্দুল মঈন খান, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ভাইস চেয়ারম্যান শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, আব্দুল্লাহ আল নোমান, চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ, আলতাফ হোসেন চৌধুরী, সেলিমা রহমান, বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা ইনাম আহমেদ চৌধুরী, রিয়াজ রহমান, ড. ওসমান ফরুক, আব্দুল আউয়াল মিন্টু অধ্যাপক আব্দুল মান্নান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. মাহবুব উল্লাহ, সাংবাবিদক মাহফুজ উল্লাহ প্রমুখ।

মিডিয়া ব্রিফিংয়ের মূল প্রজেক্টর উপস্থাপনায় শামা ওবায়েদ দেখান ৪ ও ৫ ফেব্রুয়ারি সোসাইটি ফর বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়ার্ল্ডওয়াইড ইন্টারব্যাংক ফাইন্যান্সিয়াল টেলিকমিউনিকেশন (সুইফট) সিস্টেম ব্যবহার করে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ১০১ মিলিয়ন ডলার (৮০০ কোটি টাকা) ফিলিফিন্স ও শ্রীলংকায় স্থানান্তর করা হয়। এর মধ্যে ফিলিফিন্স ৮১ মিলিয়ন ও শ্রীলংকায় গেছে ২০ মিলিয়ন ডলার। তিনি বলেন, সুইফট বিশ্ব পরিসরে ফাইন্যানসিয়াল ইনস্টিটিউশনসমূহের মাধ্যমে আর্থিক লেনদেনের তথ্য পেয়ে থাকে। এর জন্য রয়েছে মানসম্পন্ন নেটওয়ার্ক। প্রত্যেক সদস্য ব্যাংক লাইসেন্স প্রাপ্ত হয়ে একটি একক পরিচিত কোড, সফটওয়্যার এবং সেবা পায় যার দ্বারা সুইফটনেটের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। এটি প্রতিদিন ২ কোটি আর্থিক বার্তা আদান-প্রদান করে এবং এর সঙ্গে বিশ্বের ১০ হাজারের বেশি আর্থিক প্রতিষ্ঠান জড়িত।

শামা ওবায়েদ বলেন, এ লুণ্ঠন বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ কারও কাজ। যাদের কাছে সুইফট কমপিউটারের পাসওয়ার্ড, ফিজিক্যাল কীসহ ডংগল, বায়োমেট্রিকস শনাক্তকরণের মাধ্যমে প্রবেশাধিকার রয়েছে। সকল প্রামাণিক সাক্ষ্য, সুইফট নেট আর্কিটেচার ও বিশেষজ্ঞ মতামতের ভিত্তিতে এটা পরিষ্কার যে এ অর্থ লুণ্ঠন কোন হ্যাকিং কিংবা ম্যালওয়ার এর কারণে ঘটেনি। এটি বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি ‘ডিজিটাল রাবারিং’। এছাড়া আরও ৮৫০ মিলিয়ন ডলার চুরির চেষ্টা হয়। কিন্তু প্রাপকদের পাঠানো তথ্যের অপ্রতুলতার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক ওই ট্রানজেকশন প্রসেস করেনি।

শামা ওবায়েদ বলেন, এ ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গেই ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক ও সুইফট থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকে অসংখ্য নোটিফিকেশন পাঠিয়েছে। কিন্তু এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংক কোন উদ্যোগ নেয়নি। বিষয়টি অর্থ মন্ত্রণালয় বা সংবাদ মাধ্যমকেও বাংলাদেশ ব্যাংককে অবহিত করেনি। ঘটনার তিন সপ্তাহ পর খ- খ-ভাবে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এ বিষয়ে তথ্য প্রকাশিত হয়। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক সুইফট’র নিরাপত্তাগত সহযোগিতা গ্রহণ করে। বাংলাদেশ ব্যাংকে রয়েছে সুইফট কর্তৃক সরবরাহ করা একটি নেটওয়ার্ক টার্মিনাল। এ টার্মিনালে মাত্র তিনটি কম্পিউটার ব্যবহার হয়। এ কম্পিউটারগুলো বাংলাদেশে ব্যাংকে ব্যবহৃত অন্যসব কম্পিউটার থেকে একেবারে ভিন্ন। একটি নিরাপত্তা দেয়ালের মধ্যে এ কম্পিউটার ৩টি রাখা। এ কম্পিউটার দিয়ে অন্য কোন কাজ করা হয়স না। এটি কেবল সুইফটের সঙ্গে যোগাযোগ বার্তা আদান-প্রদানের জন্য ব্যবহার হয়। আর এটি যিনি ব্যবহার করেন, তিনি বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক অথরাইজ পার্সন। আমরা সুইফটের সিআইও মাইক ফিশ’র সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। তিনি বলেছেন, আমাদের তথ্য ভা-ারে আজ পর্যন্ত অননুমোদিত তথ্য ঢোকেনি।

দুই মন্ত্রীর পদত্যাগ করা উচিত-এমাজউদ্দীন : জাতীয় মর্যাদার প্রশ্নে দুই মন্ত্রীর অবিলম্বে পদত্যাগ করা উচিত বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ। মঙ্গলবার দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবে বাংলাদেশ ইয়ুথ ফোরাম নামক একটি সংগঠন আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। কুমিল্লায় কলেজ ছাত্রী তনু হত্যার নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেন, এ হত্যাকা-ের বিচারে প্রয়োজনে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতার ব্যবহার করতে হবে।

এমাজউদ্দীন বলেন, ২০০৪ সালে একজন পুলিশের আইজিকে দুই হাজার টাকা জরিমানা করে আদালত। তিনি সঙ্গে সঙ্গেই চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন। এ ধরনের ঘটনা আত্মমর্যাদা ও আত্মসম্মানের ব্যাপার। আমাদের মন্ত্রীদের আত্মসম্মান ও আত্মমর্যাদাবোধ থাকবে না, এটি আমি বিশ্বাস করি না। তাদের অবশ্যই আত্মসম্মান ও আত্মমর্যাদাবোধ আছে।

আয়োজক সংগঠনের সভাপতি সাইদুর রহমানের সভাপতিত্বে আলোচনাসভায় আরও বক্তব্য রাখেন জাগপা সভাপতি শফিউল আলম প্রধান, বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য হেলেন জেরিন খান প্রমুখ।