২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আকাশছোঁয়া উচ্চতায় মুস্তাফিজ

  • লিটন আব্বাস

কাটারের জন্য আমি বিশেষ কিছু করি না। এটা আমার স্বাভাবিক বৈশিষ্ট। এটা প্রকৃতিপ্রদত্ত। কথাগুলো বিস্ময় জাগানো বাংলাদেশী পেসার মুস্তাফিজুর রহমানের। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেকের পর থেকেই একের পর এক বিস্ময় উপহার দিয়ে চলেছেন তরুণ এই বাঁহাতি পেসার।

সবশেষ টি২০ বিশ্বকাপেও নিজেকে মেলে ধরেন। সাতক্ষীরার এই তরুণের বল কোন ব্যাটসম্যানই ঠিকমতো খেলতে পারছেন না। বিশেষ করে তাঁর ‘কাটার’ প্রতিপক্ষের ব্যাটসম্যানদের জন্য আতঙ্ক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

ওয়ানডে ক্রিকেটে জীবনের প্রথম দুই ম্যাচে পাঁচ বা তার চেয়ে বেশি উইকেট নিয়ে ইতিহাস গড়েন মুস্তাফিজুর রহমান। ২০১৫ সালের জুনে ভারতের বিরুদ্ধে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে ১৩ উইকেট নিয়ে রেকর্ড গড়েন। ওই সিরিজে তিনি গড়েন দারুণ একটি রেকর্ডও। ১২টি করে উইকেট নিয়ে তিন ম্যাচের সিরিজে সফল বোলারের তালিকায় যৌথভাবে শীর্ষে ছিলেন বাংলাদেশের অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের ভ্যাসবার্ট ড্রেকস। দু’জনকে পেছনে ফেলে মুস্তাফিজ অনন্য উচ্চতায় উঠেন। বিশ্বের একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে তিনি নিজের প্রথম দুই ম্যাচেই ১১ উইকেট পাওয়ার দৃষ্টান্ত গড়েন।

অভিষেকের পর থেকেই ধারাবাহিকতা ধরে রেখে দুর্দান্ত বোলিং করে চলেছেন ২০ বছর বয়সী মুস্তাফিজ। টি২০ বিশ্বকাপে ২৬ মার্চ নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে বাকি সব বোলারকে ছাড়িয়ে সেরা বোলিংয়ের রেকর্ড গড়েন। ২২ রানে নেন ৫ উইকেট। এর আগে ৫ উইকেট নিয়েছেন মাত্র একজন। মাত্র ৪ ওভারের বোলিং কোটা দিয়ে টি২০ তে ৫ উইকেট পাওয়া অত্যন্ত কঠিন। টি২০ বিশ্বকাপের ছয় আসর মিলিয়ে ইনিংসে ৫ উইকেট এর আগে ছিল মাত্র ছয়বার। বিশ্বকাপে মাত্র তিন ম্যাচ খেলেই নিয়েছেন ৯ উইকেট, মুস্তাফিজকে কতটা মিস করেছে বাংলাদেশ! চোটের কারণে টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই দলের বাইরে। কবে, কখন ফিরবেন মুস্তাফিজ, কিছুদিন অপেক্ষা। অবশেষে ফেরেন বেঙ্গালুরুতে, অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে। ৩০ রানে নেন ২ উইকেট। বর্তমান সময়ের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান স্টিভেন স্মিথকে করেন বোল্ড। তার কাটারে বোকা বনে যাওয়া মিচেল মার্শ আউট হন সাকিব আল হাসানের ক্যাচ দিয়ে।

একই মাঠে ভারতের বিরুদ্ধেও সপ্রতিভ মুস্তাফিজকেই দেখা যায়। নেন ৩৪ রানে ২ উইকেট। উইকেট দুটির মধ্যে একটি এই সময়ে ভারতের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান রোহিত শর্মা। আরেকটি রবীন্দ্র জাদেজার। নামটা মুস্তাফিজ বলেই এমন পারফরম্যান্সে পূর্ণ তৃপ্ত হওয়া কঠিন। টেস্ট, ওয়ানডেতে বিস্ময়ের পর বিস্ময় উপহার দিয়েছেন। টি২০ জয় করাটা বাকি ছিল। অন্য ম্যাচগুলোয় ‘আংশিক’ দেখা গেলেও ইডেনে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে দেখা যায় মুস্তাফিজের ‘পূর্ণদৈর্ঘ্য’ পারফর্মেন্স। কাটার, ইয়র্কার, সেøায়ার আর নিখুঁত লেন্থে বোলিংয়ে ১, ২ করে নেন কিউইদের পাঁচ উইকেট। চূড়ায় উঠতে না পারলেও ৪ ওভারে ২২ রান ৫ উইকেট নিয়ে রেকর্ড বইয়ের বেশ কিছু অধ্যায়ে আনেন পরিবর্তন।

টি২০ ক্রিকেটে এটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় সেরা বোলিং। ২০১২ সালে আয়ারল্যান্ডের বিরুদ্ধে ১৩ রানে ৫ উইকেট নিয়ে এখনও সবার ওপরেই আছেন ইলিয়াস সানি। এই ঘরানায় সবচেয়ে কম বয়সে ৫ উইকেট নেয়া দ্বিতীয় বোলার মুস্তাফিজ। কিছুদিন আগে হল্যান্ডের বিরুদ্ধে ১৯ বছর ১৯১ দিনে ৫ উইকেট নিয়ে শীর্ষে স্কটল্যান্ডের মার্ক ওয়াট। মুস্তাফিজ নিয়েছেন ২০ বছর ২০২ দিনে। তবে একটি জায়গায় ওপরেই আছেন মুস্তাফিজ। তবে টুর্নামেন্টে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ২৭ রানে ৫ উইকেট নেয়া জেমস ফকনারকে ছাপিয়ে ইনিংসে সেরা বোলিং এখন মুস্তাফিজের। বিশ্বকাপে বাংলাদেশের সামান্য প্রাপ্তির মধ্যে নতুন সংযোজন কিউইদের বিরুদ্ধে মুস্তাফিজের এই বোলিং জাদু।

সাতক্ষীরার তেঁতুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণকারী মুস্তাফিজুর ২০১২ সালে ফাস্ট- বোলারদের ক্যাম্পে অংশগ্রহণের উদ্দেশে ঢাকায় আসেন। নিজ শহর সাতক্ষীরায় অনুষ্ঠিত অনুর্ধ-১৭ প্রতিযোগিতায় চৌকস নৈপূণ্য প্রদর্শন করেন। এরপর তাকে বিসিবি’র পেস ফাউন্ডেশনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বাংলাদেশ অনুর্ধ-১৯ দলে থাকাকালীন নির্বাচকরা ২০১৫ সালের বিশ্বকাপের জন্যও তিনি মনোযোগ আকর্ষণ করেন। ২০১৩-১৪ মৌসুমে খুলনার পক্ষে প্রথম-শ্রেণীর ক্রিকেটে তার অভিষেক ঘটে। এরপর সংযুক্ত আরব আমিরাতে অনুষ্ঠিত অনুর্ধ-১৯ ক্রিকেট বিশ্বকাপে আট উইকেট লাভ করেন। যে কারণে ওয়েস্ট ইন্ডিজে বাংলাদেশ ‘এ’ দলের সফরে সুযোগ পান। সংক্ষিপ্ত সফরের পর অন্যতম সেরা বোলার হিসেবে তিনি বিবেচিত হন ও ধীরে ধীরে বলের বৈচিত্রতা বৃদ্ধিতে সচেষ্ট হন। শুরুতে তার বলে পেস কম থাকলেও ২০১৪-১৫ মৌসুমে ১৯.০৮ গড়ে ২৬ উইকেট দখল করেন। ধারাবাহিক নৈপূণ্যের সুবাদেই জাতীয় দলে অভিষেক হয় মুস্তাফিজের। এর ফলটা কি হয়েছে তা এখন সবারই জানা।

গত বছর ভারতের বিরুদ্ধে প্রথম ওয়ানডে সিরিজেই ১৩ উইকেট নেয়ার রেকর্ড গড়ে ক্রিকেট বিশ্বের প্রশংসা কুড়ান মুস্তাফিজ। এরপর বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চেও নিজেকে নতুন করে চিনিয়েছেন। দুর্দান্ত বোলিংয়ের পর ক্রিকেট বিশ্ব আরেকবার মেতেছে মুস্তাফিজ-বন্দনায়। ইনজুরির কারণে বিশ্বকাপের শুরু থেকে মাঠে নামতে পারেননি। খেলেছেন মাত্র তিনটি ম্যাচ। অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের বিপক্ষে প্রথম দুই ম্যাচে দুটি করে উইকেট পান। কিন্তু এতেও যেন ঠিক চেনা যাচ্ছিল না বাঁহাতি পেসের নতুন জাদুকরকে। তবে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ম্যাচে আর সেই আক্ষেপ করতে হয়নি মুস্তাফিজভক্তদের। দুর্দান্ত বোলিং করে আরেকবার চেনান নিজের জাত। বাংলাদেশ ম্যাচটা ৭৫ রানের বড় ব্যবধানে হেরে গেলেও মুস্তাফিজ ঠিকই প্রশংসা কুড়িয়েছেন ক্রিকেট-বিশ্বের।

ভারতের সাবেক স্পিনার অনিল কুম্বলে টুইটারে লিখেন, ‘দারুণ বোলিং করেছে মুস্তাফিজ। বাংলাদেশের পক্ষে সে-ই আলো ছড়িয়েছে পাঁচ উইকেট নিয়ে।’ ইংল্যান্ডের ক্রিকেটার লুক রাইট লিখেন, ‘অসাধারণ প্রতিভা। টেলিভিশনে দেখেও তার সেøায়ার বল চিনতে পারা কঠিন।’ ইংল্যান্ডের ঘরোয়া ক্রিকেটে মুস্তাফিজকে সতীর্থ হিসেবে পাবেন রাইট। বিশ্বকাপের আগে ইংল্যান্ডের ক্লাব সাসেক্সের সঙ্গে চুক্তি করেছেন বাংলাদেশের এই বাঁহাতি পেসার। সাবেক ভারতীয় ব্যাটসম্যান ভি ভি এস লক্ষণ টুইটারে লিখেন, ‘মুস্তাফিজ প্রত্যেকবারই আমাদের মুগ্ধ করে চলেছেন। তাঁর বলে দারুণ বৈচিত্র্য, আর বলের ওপর দারুণ নিয়ন্ত্রণ। অরেঞ্জ আর্মি কী বলবে?’ নিউজিল্যান্ডের স্কট স্টাইরিশও মুস্তাফিজের বোলিংয়ে মুগ্ধ। সাবেক এই অলরাউন্ডার লিখেন, ‘কী চমৎকার বোলিংই না করলেন মুস্তাফিজুর রহমান। ২২ রানে পাঁচ উইকেট। প্রথমবারের মতো ওকে লাইভ দেখলাম, ওর সেøায়ারগুলো সৌন্দর্যময়।’