১৫ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

এক কিংবদন্তির বিদায়

  • মাহমুদা সুবর্ণা

ক্যান্সারের বিপক্ষে লড়াই করে অবশেষে হেরে গেলেন ফুটবল কিংবদন্তি জোহান ক্রুইফ। গত বৃহস্পতিবার ৬৮ বছর বয়সে চলে গেলেন না ফেরার দেশে। নিজের সময়ের তো বটেই। সর্বকালেরই অন্যতম সেরা ফুটবলারের ছোট্ট তালিকায় থাকবেন ক্রুইফ। হল্যান্ডের এই কিংবদন্তি শুধু একজন ফুটবলারই নন বরং একটা যুগের প্রতিনিধি, টোটাল ফুটবল নামের এক বিপ্লবের নাম। আয়াক্সে যে ক্যারিয়ারের শুরু করেছিলেন, সেটির পূর্ণতা পেয়েছিল স্প্যানিশ ক্লাব বার্সিলোনায়। তার এমন মৃত্যুতে ফুটবল অঙ্গনে নেমে আসে শোকের ছায়া।

আয়াক্স ফুটবল ক্লাব স্টেডিয়াম থেকে মাত্র পাঁচ মিনিটের দূরত্ব। হেরমানুস কোরনেলিস ক্রুইফ আর পেত্রোনেলা ড্র্যাইজের কোল আলোকিত করে আসলেন জোহান ক্রুইফ। দরিদ্র-শ্রমিক পরিবারে ফুটবল পাগল বাবার স্পর্শে শৈশব থেকেই খেলাটির প্রতি অপার্থিব ভালবাসা নিয়ে বেড়ে উঠতে থাকা। স্কুলের সঙ্গী আর বড় ভাইয়ের সঙ্গে যখন খেলতেন, স্বপ্ন দেখতেন একদিন ফাস উইলকেসের মতো ড্রিবলার হবেন। ১২ বছর বয়সে হার্ট এ্যাটাকে চলে গেলেন অন্তহীন অনুপ্রেরণার উৎস বাবা। সবার প্রিয় মানুষটিকে শ্রদ্ধা জানাতে পেশা হিসেবে ফুটবলকে বেছে নিতেই সায় দিল ক্রুইফের কিশোর মন। পাশে এসে দাঁড়ালেন মা। ক্লিনার হিসেবে কাজ করতেন আয়াক্সে। ক্লাবকে প্রভাবিত করলেন ১২ বয়সী ক্রুইফকে তাদের যুব ব্যবস্থায় নিয়ে নেয়ার। সেই দিনটিই আসলে ফুটবলের ইতিহাসকে বদলে দিল। ফুটবলকেই যিনি পাল্টে দিয়েছিলেন তার বিচার আসলে শিরোপা দিয়ে সম্ভব নয়। ফুটবল মহানায়কের খেলোয়াড়ী জীবনটা সবচেয়ে ভাল ফুটিয়ে তুলতে পারে দুটি শব্দবন্ধ: ‘টোটাল ফুটবল’ আর ‘ক্রুইফ টার্ন’। গোলরক্ষক ছাড়া অন্য দশজন খেলোয়াড়ই মাঠের যে কোন অবস্থানে স্বাচ্ছন্দ্যে খেলতে সক্ষম-কোচ রাইনাস মিশেলসের মস্তিষ্কপ্রসূত এমন দর্শনে সত্তরের দশকের শেষ থেকে কাঁপছে ফুটবল দুনিয়া। আর টোটাল ফুটবলের এই ভাবনাটিকে আত্মস্ত করে মাঠে যিনি সৌন্দর্য ছড়ালেন তার নাম ক্রুইফ। পশ্চিম জার্মানির সঙ্গে ১৯৭৪ ফাইনালে ২-১ ব্যবধানে হারের হতাশা হয় তো আছে। কিন্তু সুইডেনের বিপক্ষে সেই ‘ক্রুইফ টার্ন’ কী কোনদিন ভুলতে পারবে ফুটবল দুনিয়া? ডান পায়ের নিপুন দক্ষতায় কী ভাবেই না বোকা বানালেন সুইডিশ ডিফেন্ডার জ্যান অলসনকে! প্রায় ৪২ বছর পর অলসন বলছিলেন, ‘খেলা শেষে আমরা একে অপরের দিকে তাকালাম। তারা হাসতে শুরু করল। আমিও। এরপর যখনই তিনি বল পেয়েছেন তখন ভেবেছি, ‘অনুরোধ, পুনরায় এটা কর না।’ আয়াক্স এবং বার্সিলোনাতেও ছড়িয়ে দিয়েছিলেন সেই সৌন্দর্য। আশির দশকের প্রথম দিকে ইউরোপ জুড়ে আয়াক্সের দাপটের মূল কারিগর ছিলেন ক্রুইফ। ভাবমূর্তিটা তৈরি করে নিয়েছিলেন ১৯৬৬ সালেই। ইউরোপিয়ান কাপে বিল শ্যাঙ্কলির সেই বিখ্যাত লিভারপুলকে ৫-১ গোলে বিধ্বস্ত করার পর। পাঁচ বছর পর আয়াক্সকে ইউরোপের রাজায় পরিণত করেন ডাচ কিংবদন্তি। ১৯৭১-৭৩ সালে টানা তিন বছর দলকে এনে দিয়েছেন ইউরোপিয়ান কাপের শিরোপা। বিখ্যাত ব্রিটিশ ক্রীড়া সাংবাদিক ডেভিড মিলার তাকে চিহ্নিত করেছিলেন এভাবে, ‘পিথাগোরাস ইন বুটস।’

বার্সাতে দাপটটা খেলোয়াড় হিসেবে যতটা না তার চেয়ে বেশি বোধহয় কোচ হিসেবে। ‘ভাল খেলোয়াড় ভাল কোচ হতে পারে না’-ফুটবলের এমন আপ্তবাক্যকে পরিবর্তন করে দিলেন ডাচ কিংবদন্তি। প্রায় আট বছরে ক্লাবকে টানা চারটি লা লীগা এবং একটি ইউরোপিয়ান কাপসহ ১১টি শিরোপা এনে দিয়েছিলেন। কিন্তু এখানেও শিরোপা ফুটিয়ে তুলতে পারে না ক্রুইফকে। তিনি না থাকলে বার্সা হয়ত পেত না একজন লিওনেল মেসি, একজন জাভি কিংবা একজন ইনিয়েস্তাকে। কোচ হয়ে ক্রুইফ সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়েছিলেন বার্সার যুব একাডেমি লা ম্যাসিয়াকে। বার্সিলোনার যে প্রজন্মটা ফুটবল জাদুতে পুরো ফুটবল দুনিয়াকে মোহিত করে রেখেছে তার মূল স্বপ্নদ্রষ্টা এই ডাচ কিংবদন্তি। পেপ গার্ডিওলা ভালই বলেছিলেন, ‘জোহান ক্রুইফই মূল ভিত্তিটা তৈরি করেছিলেন। বার্সিলোনার পরবর্তী কোচরা সেটাকে শুধু মেরামত করেছেন কিংবা বিকাশ ঘটিয়েছেন।’ ৪৩ বছর আগে ন্যু ক্যাম্পে প্রথম পা পড়েছিল ‘বিটলস-কাট’ চুলের নীলচোখা ফুটবলারটির। এসেই এক আশ্চর্য জাদুতে বার্সিলোনাকে বদলে দিলেন।