২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে খ্যাত টেকনাফের ৬ ইউপিতে ভরাডুবি

স্টাফ রিপোর্টার, কক্সবাজার ॥ বিএনপি-জামায়াত চার দলীয় জোট ক্ষমতায় থাকতে উন্নয়ন মূলক কর্মকান্ডে সরকারী বরাদ্দে লুটপাট, গণপূর্তের প্লট বড় নেতাদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা, দলীয় কোন্দল, ত্যাগীদের অবমূল্যায়ন, পরস্পরের মধ্যে অবিশ্বাস, প্রার্থী নির্বাচনে স্বজনপ্রীতি ও অদূরদর্শীতার কারণে টেকনাফের ৬ ইউপিতে চরম ভরাডুবি হয়েছে বিএনপি মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থীদের। ৬টি ইউপিতে একজনও বিএনপি সমর্থিত চেয়ারম্যান জয়লাভ করতে পারেনি। শুধু চেয়ারম্যান পদে নয় মেম্বার পদেও সাধারণ জনগণ বিএনপি সমর্থিতদের দূরে ঠেলে দিয়েছে। ৬ ইউনিয়নের ৫৪ ওয়ার্ডের মধ্যে মাত্র ৫টি ওয়ার্ড ছাড়া বিএনপি সমর্থিত মেম্বার পদপ্রার্থীদের চরম ভরাডুবি হয়েছে। এমনকি অনেক ওয়ার্ডে মেম্বার প্রার্থীও দিতে পারেনি বিএনপি। শেষ পর্যন্ত যারা ভোটের মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে, তারাও জনবিচ্ছিন্ন হওয়ায় তৃণমূলের সমর্থন আদায় করতে পারেনি। বিএনপি টেকনাফে চরমভাবে হেরেছে ভোটের মাঠে। ফলাফল পক্ষে না আসায় পরাজয়ের কারণ বিশ্লেষণ করছেন নেতা-কর্মীরা। কেন এমন হলো? এ প্রশ্ন এখন ঘুরেফিরে আলোচনায় আসছে দলের অভ্যন্তরে এবং বাইরে। অনেকে বলছেন, এমপি বদির সহযোগিতায় সরকারের দেয়া বরাদ্দে উন্নয়নের ধরাবাহিকতা বজায় রাখায় বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত টেকনাফের সাধারণ ভোটারগণ সহজে বিদায় দিয়েছেন বিএনপিকে।

গত ২২ ও ২৭ মার্চ দুই দফায় অনুষ্টিত হয়েছে টেকনাফের ছয়টি ইউপি নির্বাচন। কক্সবাজার জেলা জুড়ে বিএনপি কর্মী সমর্থক ছাড়াও সাধারণ মানুষের মধ্যে বইছে ব্যাপক আলোচনা- সমালোচনার ঝড়। টেকনাফের মত জায়গা এক সময়ের বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিগণিত এলাকায় বিএনপি তাদের সমর্থন ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দুই বার সাংসদ নির্বাচিত হয়ে আবদুর রহমান বদি এমপি সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকান্ড জনগণের নিকট তুলে ধরে ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এতে ভোটের ফলাফল ভাল হয়েছে ক্ষমতাসিন আওয়ামী লীগের। আর বিএনপি ও তার অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা নিজেদের মধ্যে দলীয় কোন্দলে জড়িয়ে পড়ে হাবুডুবু খাচ্ছে। বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মী ও একাধিক সমর্থক নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ ব্যাপারে দায়ী করেছেন জেলা নেতৃত্ব ও পরিবার তন্ত্রকে। তাদের অভিযোগ হল, মাঠের অবস্থান বিবেচনা না করে নিজের পছন্দমত প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছেন জেলা সভাপতি। উপেক্ষা করেছেন তৃণমূলের মতামত। যে কারণে তুলনামূলক সুষ্ঠু ভোটেও ধানের শীষের মনোনীত প্রার্থীরা চরমভাবে পরাজিত হয়েছে।

হোয়াইক্যং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদটি দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির ঘরেই ছিল। এখানে সর্বশেষ চেয়ারম্যান ছিলেন সাবেক উপজেলা বিএনপির সভাপতি মোস্তাক আহমদ চৌধুরী। বাবার মৃত্যুর পর উত্তরসুরী হিসেবে বিএনপির মনোনয়ন পান জুনায়েদ আলী চৌধুরী। এতেও তৃণমূলের মতামত উপেক্ষা করার অভিযোগ উঠেছে। পরিশেষে ভোটের হিসাব যা হবার তাই হয়েছে। ভোটাররা জানিয়েছে, দলের অনেক নেতাকর্মী জুনাইদ আলী চৌধুরীর পক্ষে সরাসরি কাজ করেনি। ফলে দুইবারই পরাজিত হয়েছেন জুনায়েদ আলী চৌধুরী।

হ্নীলা ইউনিয়নে প্রতিদ্বন্দ্বি ৪ প্রার্থীর মধ্যে বিএনপির ধানের শীষের প্রার্থী জাফর আলম সবচেয়ে কম ভোট পেয়ে তার স্থান হয়েছে চতুর্থ। তিনি উপজেলা বিএনপির সভাপতি হলেও তাকে মেনে নেয়নি অনেকেই। তাছাড়া বিগত তিন ইউপি নির্বাচনে জাফর আলম বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীর বিপক্ষে সরাসরি অবস্থান নিয়েছিলেন। গত নির্বাচনে অল্প ভোটে হেরে যাওয়া প্রার্থী সাবেক চেয়ারম্যান জালাল উদ্দিন চৌধুরী মাঠের অবস্থা ভাল থাকলেও তাকে মনোনয়ন না দেয়ায় তৃণমূলের মাঝে হতাশা ছিল। অনেক বিএনপি নেতাকর্মী বলেছেন, জালাল উদ্দিন চৌধুরী নৌকার পক্ষে সরাসরি কাজ করেছেন। যার প্রভাব ভোটের মাঠে পড়েছে বলে জানিয়েছেন ক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা।

বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে চিহ্নিত টেকনাফের উপকূলীয় ইউনিয়ন বাহারছড়ায়ও প্রবাস ফেরত সিকান্দর আলীকে ধানের শীষের প্রার্থী দেয় বিএনপি। স্থানীয় বিএনপির নেতারা জানিয়েছে, সেকান্দর আলীকে বিএনপির প্রার্থী করা নিয়ে তুমুল সমালোচনা হয় দলের ভেতরে বাইরে। অনেক নেতাকর্মী প্রকাশ্যেই অবস্থান নেয় দলের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে।

রবিবার অনুষ্টিত নির্বাচনে সাবরাং ইউপিতে বিএনপির প্রার্থী সোলতান আহম্মদ (মেম্বার) প্রতিদ্বন্দ্বি চারজনের মধ্যে তৃতীয় স্থানে ছিলেন। এ জন্য বিএনপি নেতা মো: ইসমাঈল মেম্বার বিদ্রোহী প্রার্থী হিসাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করাকে দায়ী করেছেন দলের নেতাকর্মীরা।

সেন্টমার্টিন ইউনিয়নে বিএনপির প্রার্থী মৌলানা আব্দুর রহমান চরমভাবে হেরেছেন। এ ইউনিয়নে সাবেক চেয়ারম্যান বিএনপি নেতা মাওলানা ফিরোজের মনোনয়নের ব্যাপারে তৃণমূল থেকে দাবী ওঠলেও তাতে কান দেয়নি জেলা নেতারা। ফলে সেন্টমার্টিনে ‘আব্দুর রহমান ঠেকাও’ আওয়াজ তুলে কাজ করেছে বিএনপি ঘরানার অনেক নেতাকর্মী। টেকনাফ সদরেও শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী শাহজাহান মিয়ার কাছে হেরে যায় বিএনপির প্রার্থী জিয়াউর রহমান জিহাদ। এ প্রসঙ্গে জেলা বিএনপির সভাপতি শাহজাহান চৌধুরী বলেন, দলের প্রাথী মনোয়নবোর্ডে যারা আবেদন করেছে, তাদের কাছ থেকে বাছাই করে প্রার্থীতা নিশ্চিত করা হয়েছে। অনেক এলাকায় জোর করে প্রার্থী দেয়া হয়েছে।

টেকনাফ উপজেলা ৬ টি ইউনিয়নের মধ্যে ২২ মার্চ নির্বাচনে ৪ টি ২৭মার্চ ২টির একটি ইউনিয়নে সূষ্ট ভোটে আওয়ামী লীগ সমর্থিত ও দলের বিদ্রোহী প্রার্থীরা জয়লাভ করেছে। টেকনাফ সদর ইউনিয়নে নির্বাচিত হয়েছেন তরুণ প্রার্থী শাহজাহান, সাবরাং ইউপিতে নুর হোসেন, সেন্টমার্টিন ইউপিতে নুর আহাম্মদ এবং বাহারছড়া ইউনিয়নে মৌলভী আজিজ ও হ্নীলায় এইচকে আনোয়ার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন।