১৫ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির শক্তি -স্বদেশ রায়

২৮ মার্চ জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ একটি হরতাল ডেকেছিল। ওই দিন ব্যক্তিগত কিছু কাজ ছিল ঢাকার নানান প্রান্তে। আগে থেকেই পরিকল্পনা ছিল, হঠাৎ জামায়াত হরতাল ডাকলে একটু চিন্তিত হয়ে পড়ি, কারণ তারা একটি সেনসেটিভ ইস্যুর সুযোগ নিয়ে এ হরতাল ডাকে। এর আগে হেফাজতও একই ইস্যু নিয়ে মাঠ গরম করার চেষ্টা করেছে। এ সব ব্যক্তিগত বা পারিবারিক কাজে আমি খুব পটু নই। জীবনের বন্ধুটিকে সঙ্গে নিয়েই করতে হয়, আরও সত্য বলতে তাকে সঙ্গ দিয়ে যতটুকু পারি সাহায্য করি। তাই চিন্তা আরও একটু বেড়ে গেল- আসলে সোমবার দিনটি বাদ দেব কিনা? কাজগুলো বুধবারে শিফট করি। উপদেষ্টা সম্পাদক তোয়াব ভাই আশির কোটা পার করেছেন তিন বছর আগে। অভিজ্ঞতার ঝুলি তাঁর সাগরসম। তাঁকে জিজ্ঞেস করি, এদিনটি কাজের জন্য বেছে নেব কিনা? তিনি হেসে বললেন, জামায়াতের আবার হরতাল হয় নাকি? ঠিক সে সময়ে নিউজের সর্বশেষ অবস্থা জানতে সম্পাদক নিউজ রুমে আসেন। তাঁর কাছে পরামর্শ চাই, কী করতে পারি। তিনি তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বললেন, দুই শ’ পার্সেন্ট নিশ্চিত, কোন হরতাল হবে না।

এর পরেও সোমবার সকালের দিকে একটু চিন্তা ছিল অফিসের কাজগুলো না হয় সারলাম। শপিংমল কি খুলবে? গুলশান এলাকায় খুলতে পারে কিন্তু অন্য এলাকায় কি খুলবে? যাহোক, ব্রেকফাস্ট সেরেই ধীরে সুস্থে বের হলাম। মনে করলাম আর যাই হোক রাস্তা ফ্রি পাব। না, ঢাকার রাস্তায় ছিল যথারীতি জ্যাম। বাসায় ফিরে সাড়ে ছয়টায় লাঞ্চ ও ডিনার এক সঙ্গে করতে হয়। সরকারী, বেসরকারী অফিসে ও শপিংমলে যেখানে গিয়েছি, চিত্রা কাজ সারেন, আর আমি আমার কাজ অর্থাৎ রিপোর্টিংই করতে থাকি। সরকারী অফিসের অতি সাধারণ অফিস সহকারীকে বলি, বাবা তুমি আজ কখন এসেছো অফিসে। সে উত্তর দেয়, স্যার নয়টার কিছু আগে এসেছি। বেসরকারী অফিসের সর্বোচ্চ ব্যক্তিটির সঙ্গে কথা বলেও জানতে পারি তিনি অন্যদিন যে সময়ে আসেন সে সময়েই এসেছেন। সর্বশেষ প্রতিটি শপিংমলেও সেলসম্যানদের কাছে, মালিকের কাছে জানতে পাই তারাও অন্যান্য দিনের মতোই তাদের শপ ওপেন করেছেন।

এদিকে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে যেতেই রাস্তার জ্যাম ঘন হয়। যাকে বলে বাম্পার টু বাম্পার। না, কোথাও কোন হরতালবিরোধী মিছিল দেখিনি। অর্গানাইজডভাবে কোথাও হরতাল প্রতিরোধের কোন ব্যবস্থাও দেখিনি। এমনকি আর্ধেক ঢাকা শহর ঘুরে কোথাও বাড়তি পুলিশও দেখিনি। তাহলে কে এই হরতাল রুখে দিল? কারও মুখ দেখে মনে হলো না, কেউ নিজেকে প্রশ্ন করছেন, কে এই হরতাল রুখে দিল। বরং স্বাভাবিক অন্য পাঁচটা দিনের মতো তারা কাজ করে যাচ্ছেন। বিএনপির নেতারাও মাঝে মাঝে বলেন, এই সরকার রাজপথে এত নিষ্ঠুর ব্যবহার করে যে কারণে তারা রাজপথে কোন আন্দোলন গড়ে তুলতে পারছে না। আওয়ামী লীগ সরকার রাজপথে নিষ্ঠুর বলে বিএনপি অনেক প্রচার করে। তাদের পক্ষে অনেক ব্যক্তিও এ কথা বলেন। কিন্তু বাস্তবে, ভারত, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, সাউথ আফ্রিকা, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, নরওয়ে সর্বোপরি আমেরিকার পুলিশ রাজপথে যতটা কঠোর অবস্থান নেয় বিশৃঙ্খলাকারী বা রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংসকারীদের প্রতি, তার শত ভাগের এক ভাগ কি বর্তমান বাংলাদেশ সরকার নেয়? একটু বিদেশী মিডিয়ায় চোখ রাখলেই মনে হয় বিএনপির পক্ষে যারা একথা বলেন, তারা এর উত্তর পাবেন। তাছাড়া সরকার যদি আরও নমনীয় হয়, তাহলেও কি বিএনপি রাজপথে লোক আনতে পারবে? গাড়ি ভাঙ্গার জন্য, দোকানপাট বন্ধ করার জন্য লোক পাবে (কয়েকজন হাতেগোনা গু-া ছাড়া)? যেমন ছোট্ট উদাহরণ দেই, ২০১৩ তে আন্দোলন চলাকালে সর্বোচ্চ এক পুলিশ অফিসারকে ফোন করেন বিএনপির উচ্চ পর্যায়ের ডাক সাইটে নেতা। তিনি বেশ শক্তভাবেই বললেন, ওই পুলিশ অফিসার কি আর বাংলাদেশে চাকরি করবেন না? তিনি কেন এভাবে বিএনপির প্রতি কঠোর হচ্ছেন। ওই পুলিশ অফিসার অত্যন্ত শিক্ষিত ও বিনয়ী। তিনি তার উত্তরে বলেন, স্যার আমাকে ভবিষ্যতে যেমন চাকরি করতে হবে বর্তমানেও তো চাকরি করতে হচ্ছে। আমি এক স্পটে পুলিশ নামাই এক শ’, আপনাদের লোক জড়ো হয় দশ থেকে পনেরো জন। আমি যদি পনেরো জনকে এক শ’ পুলিশ দিয়ে হটিয়ে না দিতে পারি তাহলে আমি বর্তমানে চাকরি করব কীভাবে? স্যার আপনারা অন্তত এক শ’ পুলিশের বিপরীতে দশ হাজার মানুষ নামান, তাহলে তো আমাদের একটা মুখ থাকে। বিএনপির ওই নেতা কোন উত্তর দিতে পারেননি।

এখন প্রশ্ন হলো, কেন জামায়াত পারছে না, বিএনপি পারছে না এমনকি যে লক্ষণ দেখা যাচ্ছে তাতে ভবিষ্যতে কেউ আর রাজপথে অরাজকতা বা হরতাল করতে পারবে না। কোন্ শক্তি বাংলাদেশকে ওই স্থানে নিয়ে যাচ্ছে? বাংলাদেশকে ওই স্থানে নিয়ে যাচ্ছে মূলত বাংলাদেশের অর্থনীতি। কারণ, দেশ এখন আর শুধু বিদেশী রেমিট্যান্স, কিছু কৃষিপণ্য রফতানি আর গার্মেন্ট রফতানির ভেতর সীমাবদ্ধ নেই। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি যে কিভাবে ডালপালা মেলেছে তা কিন্তু বাস্তবে এখনও মিডিয়ায় আসছে না। কি গ্রামে, কি শহরে সর্বত্রই অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির নানান চাকা ঘুরতে শুরু করেছে। যার ফলে প্রতিটি মানুষ ব্যস্ত তার অর্থনৈতিক কর্মকা- নিয়ে। তাই কেউ চায় না যে একদিন অর্থনৈতিক কর্মকা- দেশে বন্ধ থাকুক। শহরতলির একটি ছোট্ট স্কুলের সামনে যে লোকটি রান্না করা নুডলস বিক্রি করছে সে প্রতিদিন কমপক্ষে পাঁচশ’ টাকা লাভ করছে। অর্থাৎ মাসে পনেরো হাজার টাকা। গ্রামগুলোতে এখন লেগেছে শহরের ছোঁয়া। গ্রামের একজন বৃদ্ধা এখন সকালে পরোটা ও ভাজি নাস্তা নিয়ে রাস্তার মোড়ে ছোট্ট একটি রেস্টুরেন্ট খুলেছেন। মানুষ সেখানে যাচ্ছে। অর্থাৎ গ্রামের বৃদ্ধা থেকে শহরতলির ওই নুডলস বিক্রেতা সবাই এখন দিনের অধিকাংশ সময় অর্থনৈতিক কর্মকা-ের সঙ্গে জড়িত। অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির এই সামান্য ধাক্কায় কিন্তু রাজনীতি ইতোমধ্যে এই স্থিতিশীলতা পেয়েছে।

তাই রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এখন ক্রমেই বাংলাদেশের অতীত ইতিহাসের একটি অংশ হয়ে যাবে। শেখ হাসিনা যে স্বনির্ভর অর্থনীতির পথ নিয়েছেন, এই পথেই কিন্তু বাংলাদেশ স্থিতিশীল রাজনীতির দেশ শুধু নয়, খুব দ্রুতই উন্নত অর্থনীতির দেশে পৌঁছাবে। যেমন এ মুহূর্তে অনেকে চিন্তিত, মালয়েশিয়ায় শ্রমবাজার নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, শ্রমবাজার নষ্ট হয়ে যাচ্ছে সৌদি আরবে, এর ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতি ধাক্কা খাবে। বিষয়টি আদৌ তা নয়। সরকার কিভাবে চিন্তা করছে, অর্থনীতিবিদরা কিভাবে দেখছেন তা পরিষ্কার জানা নেই। তবে প্রাকটিক্যাল অর্থনীতি যা বলে, তাতে মালয়েশিয়া বা সৌদি তাদের লোক নেয়ার ক্ষেত্রে অপটিমাম পর্যায়ে চলে গেছে। তাদের কাছে শ্রম বিক্রি করার খুব সুযোগ আর নেই। তবে এ নিয়ে চিন্তিত হওয়ার কোন কারণ নেই। শুধু পদ্মা সেতু নয়, মহেশখালী বিদ্যুত হাবসহ নানান মেগা প্রজেক্ট বাংলাদেশ সরকার হাতে নিয়েছে। এ বছরই মেগা প্রজেক্টগুলোর আলাদা বাজেট হবে। দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার যখন বাড়ছে তখন ডাইরেক্ট ও ইনডাইরেক্ট রাজস্ব আদায়ের ভেতর দিয়ে সরকারের হাতে আরও অনেক অর্থ আসবে। আমাদের বাজেট আরও বড় হবে। তাছাড়া এ কলামে বহুবার উল্লেখ করেছি, বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে সুবিধাপ্রাপ্ত (জিওগ্রাফিক্যালি ব্লেসড) একটি দেশ। তাই শেখ হাসিনা যেভাবে তাঁর অর্থনৈতিক কর্মকা- এগিয়ে নিচ্ছেন তাতে বাংলাদেশের মানুষকে শ্রম বিক্রি করতে অদূর ভবিষ্যতে আর বাইরে যেতে হবে না। বরং যে উর্ধগামী এবং উর্ধ থেকে নিম্নগামী কর্মসুবিধা এখানে অর্থনৈতিক কর্মকা- ঘিরে হবে সেখানেই বাংলাদেশের মানুষ নানানভাবে কাজে নিয়োজিত হবে। এর পাশাপাশি ইস্ট এশিয়ার কিছু অংশ এবং ভারত, নেপাল, ভুটান ও বাংলাদেশ ঘিরে যে আঞ্চলিক অর্থনীতির একটি জোন খুব দ্রুত বেড়ে উঠবে এখানেই বাংলাদেশের বিশাল বাজার তৈরি হবে। ভারত না চাইলেও অর্থনীতির নিজস্ব গতিতে ভারতে তৈরি পোশাক বাজারের বড় অংশ দখল করবে বাংলাদেশ। আর স্বাভাবিক নিয়মেই তখন ট্যাক্স সমস্যা মিটে যাবে। এগুলো অর্থনীতির স্বাভাবিক গতি। তখন ইউরোপকে এসে বসে থাকতে হবে বাংলাদেশের কাছে। এই বিশাল অর্থনৈতিক শক্তি বাংলাদেশ হতে যাচ্ছে।

যে কোন দেশ যখন অর্থনীতির বড় শক্তি হয়ে ওঠে বা বড় শক্তির পথে এগোয় তখন তার জন্য দরকার হয় আশাবাদী ও সাহসী নেতৃত্ব। পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য যোগ্য ও শিক্ষিত সর্বোপরি ভবিষ্যতমুখী উদার অর্থনীতির মানুষ। বাংলাদেশ ভাগ্যবান তার এই অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সময় শেখ হাসিনার মতো সাহসী নেত্রী পেয়েছে। কিন্তু আগামী বিশ ত্রিশ বছরের জন্যও শেখ হাসিনা ও তাঁর পথানুসারী সাহসী ও উদার নেতৃত্ব বাংলাদেশের জন্য দরকার। অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির শক্তিটি আগামী দুই তিন বছরের ভেতর আরও দৃশ্যমান হবে বাংলাদেশে।

swadeshroy@gmail.com