১৪ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

কৃষি সঙ্কট ও সম্ভাবনা

এস এম মুকুল

কৃষি আমাদের সমৃদ্ধির অন্যতম উৎস। বাংলাদেশকে মধ্য আয়ের দেশে উন্নীত করতে হলে কৃষিতে মনোযোগ দিতে হবে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন- গ্রামের বেশিরভাগ মানুষের পেশা কৃষির উন্নয়ন ঘটাতে পারলেই দেশের উন্নতি করা সম্ভব। তিনি কৃষিতে দক্ষতা অর্জন এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের আবশ্যকতা বুঝতে পেরে নিজের ছেলেকে অক্সফোর্ড বা কেমব্রিজে না পাঠিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃষিবিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত কৃষক তৈরি করে বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। দেশের উন্নয়নের চালিকাশক্তি কৃষির সম্ভাবনার কথা বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধুও দৃঢ়ভাবে উপলব্ধি করেছিলেন।

কৃষি মানে এখন শুধু ধান, পাট আর কিছু শস্য উৎপাদনে সীমাবদ্ধ নেই। কৃষি এখন একটি সামগ্রিক উৎপাদন ব্যবস্থার নাম। যেখানে সারা বছর ফলানো হয় সবজি, ফল, মাছ চাষ, গবাদি পশুপালন এমনকি কৃষিভিত্তিক শিল্পস্থাপনাও হচ্ছে। কৃষির অন্যতম সাফল্য হলোÑ দেশে ধান উৎপাদনে এসেছে বিপ্লব। ’৭১-এর দেশ স্বাধীন হওয়ার পর, এদেশের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে ৭ কোটি। বাংলাদেশে বর্তমান জনসংখ্যা সাড়ে ১৬ কোটি ছাড়িয়ে। স্বাধীনতার পর ৪১ বছরে জনসংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে যে পরিমাণ ধান উৎপাদন হতো, এখনও সেই একই পরিমাণ ধান উৎপাদিত হলে, এই দ্বিগুণ জনসংখ্যার অবস্থাটা কী হতো ভাবা যায়!

কৃষিবিদদের মতে, দেশে আবাদযোগ্য পতিত জমিসহ উপকূল ও হাওড় অঞ্চলের জলাবদ্ধ এক ফসলি জমিকে দুই বা তিন ফসলি জমিতে পরিণত করতে পারলে বছরে ৫০ লাখ টন বাড়তি খাদ্য উৎপাদন করা সম্ভব। মতানুযায়ী, দেশের বিস্তীর্ণ জলাবদ্ধ এলাকা চাষের আওতায় আনার পাশাপাশি জলাবদ্ধ সহিষ্ণু ধানের জাত উদ্ভাবন করা গেলে বছরে আরও ৫ লাখ টন অতিরিক্ত খাদ্য উৎপাদন সম্ভব হবে। কৃষিবিজ্ঞানীদের গবেষণায় দেখা গেছে, প্লটের মতো দেশের ৮২ লাখ ২৯ হাজার হেক্টর জমিতে ধান, গমসহ অন্যান্য শস্যের উৎপাদন বাড়াতে পারলে দেশ খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করবে।

কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্যাসেডের জরিপ রিপোর্ট অনুযায়ী, দেশে ৯০ লাখ ৯৪ হাজার হেক্টর জমি আবাদযোগ্য থাকলেও চাষ হয় ৮২ লাখ ২৯ হাজার হেক্টর জমিতে। এই জমির মধ্যে এক ফসলি জমির পরিমাণ ১৮ লাখ ৫৫ হাজার, দুই ফসলি জমি ৪৪ লাখ ৪২ হাজার, তিন ফসলি জমি ১৮ লাখ ৭১ হাজার হেক্টর। তিন ফসলের অধিক ৪০ হাজার হেক্টর জমিতে চাষাবাদ হয়। সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাবে চাষযোগ্য পতিত ৩ লাখ ২৩ হাজার হেক্টর এবং চলতি পতিত ৪ লাখ ৭ হেক্টর জমি চাষের আওতায় আসছে না। কৃষি বিভাগের গবেষণায় বলা হয়, শুধু সেচ সুবিধা নিশ্চিত করতে পারলে এক ফসলি প্রায় ৫ লাখ হেক্টর জমিকে দুই বা তিন ফসলি জমিতে রূপান্তরিত করা যাবে। এছাড়া অস্থায়ী অনাবাসীদের মালিকানাধীন বৃহত্তর সিলেট, নোয়াখালী, বরিশাল ও খুলনা অঞ্চলে পতিত থাকা প্রায় ৭০ ভাগ জমির ৫০ শতাংশে বোরো, আউশ ও আমন ধানের চাষ করা যাবে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, উৎপাদন বাড়ানো লক্ষ্যে পরিত্যক্ত ও পতিত প্রায় ২ লাখ হেক্টর জমি ফসল চাষের আওতায় আনা হয়েছে। উপকূলীয় ১৪ জেলার আবাদযোগ্য ১১ লাখ ৫৫ হাজার ৫৮১ হেক্টর চলতি পতিত জমি চাষের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। গবেষকদের ধারণা, কৃষি উপকরণের পর্যাপ্ত ও সুষ্ঠু ব্যবহার করা সম্ভব হলে উৎপাদন ৩০ শতাংশ বাড়বে। তবে বাংলাদেশের কৃষি খাতের অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। কৃষি জমির পরিমাণ কমছে। মাটি থেকে অধিক পুষ্টি আহরণের কারণে জমির উৎপাদনশীলতা হ্রাস পাচ্ছে। বাংলাদেশে কৃষিপণ্যের চেয়ে কৃষি উপকরণের দাম বেশি হওয়ায় সেচব্যয় প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। তাই উৎপাদন খরচ এ অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি। জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে মাথাপিছু জমির পরিমাণ দিন দিন কমছে। অন্যদিকে নগরায়ন প্রবণতায় কৃষি জমি চলে যাচ্ছে অকৃষি খাতে। আবার মাত্রাতিরিক্ত সার ও বিষ প্রয়োগের ফলে কমছে মাটির উর্বরা শক্তি। কৃষি জমি সংরক্ষণে কার্যকরী আইনি ব্যবস্থা নেই। এশিয়ার প্রতিটি কৃষিনির্ভর দেশে কৃষি জমি সুরক্ষা আইন কঠোরভাবে মেনে চলা হয়। প্রতিবেশী দেশ ভারতের টাটা কোম্পানি পশ্চিমবঙ্গের সিঙ্গরে কৃষি জমিতে কারখানা করতে চাইলে লাভজনক হওয়া সত্ত্বেও সরকার অনুমোদন দেয়নি। আর বাংলাদেশে অনুমোদন বা নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই কৃষি জমির অপব্যবহার হচ্ছে।

ঢাকা থেকে