২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

নিরীহ মানুষ ও ব্লগার হত্যা মুক্তমতের প্রতি আক্রমণ

  • ঢাবির বক্তৃতা অনুষ্ঠানে মার্কিন আন্ডার সেক্রেটারি সারাহ সুয়ল

কূটনৈতিক রিপোর্টার ॥ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বেসামরিক নিরাপত্তা, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি ডক্টর সারাহ সুয়ল বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চেয়ে সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে জঙ্গী ও সন্ত্রাসবাদ দমন করা সহজ। এছাড়া মতপ্রকাশের স্বাধীনতা না থাকলে জঙ্গীবাদ মাথাচাড়া দেয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন। বাংলাদেশে সব ধর্মের নাগরিকদের প্রতি আইনের সমান প্রয়োগের আহ্বান জানান সারাহ সুয়ল। ঢাকায় সফররত মার্কিন আন্ডার সেক্রেটারি সারাহ সুয়ল বুধবার একাধিক অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন। এদিকে বাংলাদেশ এক সময়ের খাদ্য আমদানিকারক থেকে এখন রফতানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই বিসওয়াল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আন্ডার সেক্রেটারি সারাহ সুয়ল বুধবার সকালে ঢাকায় পৌঁছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘জঙ্গী ও সন্ত্রাসবাদ দমনে আমাদের সংগ্রাম’ শীর্ষক বক্তৃতা দেন। এরপর তিনি ঢাকেশ্বরী মন্দিরে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। সেখানে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন সুয়ল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ আয়োজিত ‘জঙ্গী ও সন্ত্রাসবাদ দমনে আমাদের সংগ্রাম’ শীর্ষক বক্তৃতায় ডক্টর সারাহ সুয়ল বলেন, প্রতিটি দেশকেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা না থাকলে জঙ্গী বা সন্ত্রাসবাদ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। তবে আমরা দেখেছি, যেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে, সেখানে জঙ্গী ও সন্ত্রাসবাদ ঠাঁই পায়নি।

তিনি বলেন, জঙ্গী ও সন্ত্রাসবাদ এখন বিশ্বে সবচেয়ে বড় একটি সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। তবে জঙ্গী ও সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধে বিভিন্ন দেশ নানা ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে। আমরা দেখেছি অনেক সরকারই সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকে। তবে এটা ঠিক যে, সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চেয়ে সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে তা দমন করা সহজ। কেননা সামাজিক আন্দোলনে সকল নাগরিকের অংশগ্রহণ থাকে। সবার সম্মিলিত অংশগ্রহণের মাধ্যমে জঙ্গীবাদ দমনে এগিয়ে আসতে হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। জঙ্গীবাদ প্রতিরোধে তরুণসমাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলেও জানান সারাহ সুয়ল।

সারাহ সুয়ল বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আরও বিভিন্ন দেশও জঙ্গীবাদ দমনে একযোগে কাজ করছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একযোগে কাজ করছে। দুই দেশ একযোগে কাজ করলে অবশ্যই জঙ্গী ও সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধ সম্ভব হবে। তিনি বলেন, জঙ্গী ও সন্ত্রাসবাদ এখন কোন দেশই এককভাবে প্রতিরোধ করতে সক্ষম নয়। এটা এখন একটি বৈশ্বিক সমস্যা। তাই বৈশ্বিকভাবেই এ সমস্যার সমাধান করতে হবে।

বাংলাদেশে সম্প্রতি নিরীহ মানুষ ও ব্লগার হত্যার বিষয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশে যেসব নিরীহ মানুষ ও ব্লগার হত্যা হয়েছে, এটা শুধু বাংলাদেশের মানুষের প্রতি আক্রমণ নয়। এটা বাংলাদেশের ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ও মুক্তমতের প্রতিও আক্রমণ। তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, সন্ত্রাসীদের কোন ধর্মীয় পরিচয় নেই।

মার্কিন আন্ডার সেক্রেটারি বলেন, বাংলাদেশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জঙ্গী ও সন্ত্রাসবাদ দমন ছাড়াও বিভিন্ন ক্ষেত্রে একযোগে কাজ করছে। দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক গভীর ও বিস্তৃত হচ্ছে। আমরা আশা করব দিন দিন এই সম্পর্ক আরও গভীর ও বিস্তৃত হবে। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। এ সময় ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের চেয়ারম্যান এহসানুল হক উপস্থিত ছিলেন।

মার্কিন আন্ডার সেক্রেটারি ডক্টর সারাহ সুয়ল ঢাকেশ্বরী মন্দির পরিদর্শন করেন। মন্দির পরিদর্শন শেষে সেখানে তিনি হিন্দু সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। মতবিনিময় শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে সারাহ সুয়ল বলেন, বাংলাদেশে সব ধর্মের নাগরিকদের প্রতি আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত হওয়া উচিত। তিনি বলেন, যারা ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপরে আক্রমণ করে তাদের ব্যাপারে কোন দায়মুক্তি কাম্য নয়। তাদের অবশ্যই বিচারের আওতায় আনতে হবে।

সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে মতবিনিময়ের বিষয়ে তিনি বলেন, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় সকল নাগরিকদের সমান অধিকার নিশ্চিত চায়। তারা বাংলাদেশকে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র দেখতে চায়। যেখানে সকল ধর্মের নাগরিকরা আইনগতভাবেই সমান অধিকার ভোগ করবে।

এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, বাংলাদেশের সংবিধান মতেই সকল ধর্মের নাগরিকদের সমান অধিকার রয়েছে। এই অধিকার সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে। সকল ধর্মের নাগরিকদের সমান নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ ঐতিহ্যগতভাবেই ধর্মীয় সম্প্রীতির দেশ। এখানে দীর্ঘদিন ধরেই সকল ধর্মের নাগরিকরা সম্প্রীতির সঙ্গে বসবাস করছে। তবে তারপরও হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। সে কারণে সকলের প্রতিই আইনের সমান প্রয়োগ করতে হবে।

মতবিনিময় অনুষ্ঠানে সংখ্যালঘু ধর্মীয় নেতারা মার্কিন আন্ডার সেক্রেটারিকে জানান, দেশে আইন আছে তবে এই আইন সবার প্রতি সমানভাবে প্রয়োগ হয় না। যেটি খুবই জরুরী। তারা এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। মতবিনিময় অনুষ্ঠানে মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি কাজল দেবনাথ, পূজা উদযাপন পরিষদের ঢাকা মহানগর সাধারণ সম্পাদক নারায়ণ সাহা মনি, এ্যাডভোকেট তাপস পাল প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আন্ডার সেক্রেটারি সারাহ সুয়ল ৬ দিনের সফরে ২৫ মার্চ থেকে বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ড সফরে রয়েছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে তিনি থাইল্যান্ড হয়ে ঢাকায় এসেছেন। আজ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তিনি ঢাকা ত্যাগ করবেন।

বাংলাদেশ দূতাবাসে নিশা দেশাই ॥ এদিকে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই বিসওয়াল বলেছেন, জঙ্গী ও সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশ একযোগে কাজ করছে। দেশের নাগরিকদের রক্ষা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নিতে পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে আমরা কাজ করছি। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র দু’দেশের মানুষের ডিএনএতেই রয়েছে গণতন্ত্রের বসবাস। বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাস ভবনের বঙ্গবন্ধু মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এক সুধী সমাবেশে বক্তব্য দেন নিশা দেশাই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতর থেকে তার বক্তৃতা প্রকাশ করা হয়েছে।

এ সময় নিশা দেশাই বলেন, দারিদ্র্যবিমোচন, খাদ্য নিরাপত্তা এবং মাতৃস্বাস্থ্য নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বিশেষ সাফল্য দেখিয়েছে বাংলাদেশ। পাশাপাশি বিশ্ব অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক শান্তি প্রতিষ্ঠায়ও বাংলাদেশের অবদান আজ সকল মহলে সমাদৃত হচ্ছে।

নিশা দেশাই দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সহায়তা প্রসঙ্গে উল্লেখ করেন, প্রতি বছরই বাংলাদেশে উৎপাদিত ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ক্রয় করছে। ঢাকার ইউএসএইড মিশন প্রতি বছর ২০০ মিলিয়ন ডলার করে ব্যয় করছে বাংলাদেশের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমে, জীবনমানের উন্নয়নে। তিনি বলেন, যেখানেই ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদের ঘটনা ঘটছে সেখানেই আমরা যৌথ উদ্যোগে মোকাবেলা করছি। বাংলাদেশ, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের মানুষের মানবাধিকার সমুন্নত রাখার ক্ষেত্রেও আমরা সাহসিকতার সঙ্গে কাজ করে চলেছি। তিনি বলেন, আমেরিকার জনসাধারণ সবসময় বাংলাদেশের পাশে রয়েছে।

তিনি বলেন, সুষ্ঠু ও প্রতিশ্রুতিশীল নির্বাচনে বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের ভোট দেয়ার অধিকারকে সমর্থন করে যুক্তরাষ্ট্র। পাশাপাশি মুক্তভাবে কথা বলা, মুক্তভাবে ধর্ম চর্চা, শান্তিপূর্ণভাবে সমাবেশ করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নাগরিকদের অধিকারের প্রতিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন রয়েছে।

নিশা দেশাই বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবসের শুভেচ্ছা জানান। তিনি আশা প্রকাশ করেন বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হবে। তিনি বলেন, ৪৫ বছর আগে বাংলাদেশ স্বাধীনতা ঘোষণা করে। এর বেশ কয়েক মাস পর সব বাধা পেরিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করে বাংলাদেশ। এ সময় নিশা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অগ্রগতির প্রশংসা করেন।

তিনি বলেন, গত কয়েক দশকে খাদ্য আমদানিকারক থেকে খাদ্য রফতানিকারকে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ। বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশগুলোর অন্যতম এ দেশটি খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে সহায়তা করছে। ২০ বছর ধরে প্রতি বছর এ দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রায় শতকরা ৬ ভাগ। এর মধ্য দিয়ে লাখ লাখ মানুষকে দারিদ্র্য থেকে টেনে তোলা হয়েছে।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন, বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত ড্যান মজেনা, জেমস মরিয়ার্টি প্রমুখ।