১৩ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ফিলিপিনো ক্যাসিনোয় যেভাবে অদৃশ্য বাংলাদেশের টাকা

ফিলিপিনো ক্যাসিনোয় যেভাবে অদৃশ্য বাংলাদেশের টাকা

নাজনীন আখতার ॥ ‘এখানে ঢুকুন আর উধাও হয়ে যান’। ফিলিপিন্সের ক্যাসিনো সোলায়রির ছবির নিচে এমনই একটি ক্যাপশন দিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ‘দ্য ইকোনমিস্ট’। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের টাকা চুরির বিষয়টি উল্লেখ করে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিভাবে ব্যাংক চোরেরা এ ধরনের ক্যাসিনো বেছে নেয় হ্যাকিংয়ের কালো টাকা সাদা বানানোর জন্য। এ্যান্টি-মানিলন্ডারিং আইনের ফাঁকফোকর কাজে লাগিয়ে ফিলিপিন্সের রাজনীতিবিদরাও এসব ক্যাসিনোতে কালো টাকা সাদা করছেন দেদার।

দ্য ইকোনমিস্টের ২৬ মার্চ সংখ্যায় বলা হয়েছে, ধনী চীনা নাগরিকরা ফিলিপিন্সে উড়ে আসেন ক্যাসিনোতে জুয়া খেলার জন্য। ম্যানিলার সমুদ্র সৈকতে সোলায়রি রিসোর্ট এ্যান্ড ক্যাসিনো তেমনই একটি স্থান যেখানে এমন দৃশ্য দেখা যায় নিত্যদিন। বিষয়টি আরও আলোচনায় আসে যখন ফেব্রুয়ারির শুরুতে মানি রেমিটেন্স কোম্পানি ফিলরেম বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে হ্যাক করা ৬০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্ধেক অর্থ ক্যাসিনোয় সরবরাহ করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের চুরি হয়েছে মোট ১০১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে ফিলিপিন্সেই এসেছে ৮১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। চুরির অর্থ থেকে মাত্র ২০ মিলিয়ন ডলার উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। হ্যাকার ছাড়াও এই চুরির সঙ্গে জড়িত একাধিক দেশের ব্যাংক, জুয়াড়ি চক্র ও ব্যাংকের কর্মকর্তারা।

প্রতিবেদনে বলা হয়, এই ধরনের ক্যাসিনোয় একবার প্রবেশের পর সেসব অর্থ হাওয়া হয়ে যায়। সে অর্থের বেশিরভাগই চলে যায় আলাদাভাবে চিহ্নিত করতে না পারা গ্যাম্বলিং চিপসে এবং বাকি অর্থ অনলাইন গেমিং ফার্মে। ফিলিপিন্সের এ্যান্টি -মানিলন্ডারিং কাউন্সিলের (এএমএলসি) নির্বাহী পরিচালক জুলিয়া বেকেই-আবাদ সিনেট কমিটির গণশুনানিতে বলেছেন, অর্থ পাচারবিষয়ক বিচারগুলো ক্যাসিনোতে গিয়েই শেষ হয়ে যায়। ফিলিপিন্সের রাজধানী ম্যানিলার মাকাতিতে অবস্থিত দেশটির ফিন্যান্সিয়াল সেন্টারে রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং কর্পোরেশনের (আরসিবিসি) কাঁচেঘেরা রুমে এএমএলসির এই বিচার চলে। সেখানে সিনেট কমিটি জানায়, ব্রাঞ্চ ম্যানেজার ডামি এ্যাকাউন্ট খুলে। ওই এ্যাকাউন্টে চুরির অর্থগুলো গ্রহণ করে। এবং সেখান থেকেই অর্থগুলো মানি রেমিটেন্স কোম্পানিতে ট্রান্সফার করা হয়। কমিটির বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর দিতে অপরাগতা প্রকাশ করেন ম্যানেজার। আর তার উর্ধতন কর্মকর্তাও কিছু প্রশ্ন প্রত্যাখ্যান করেন। যেকোন ব্যাংকেরই তাদের তথ্য গোপন রাখার আইনী অধিকার আছে, এমনকি ভুয়া বা ডামি এ্যাকাউন্টের ক্ষেত্রেও সেই সুযোগই কাজে লাগিয়েছেন ওই কর্মকর্তা।

সিনেটররা যদি জানতেন যে কেন তারা যা জানতে চাইছেন তার উত্তর পাচ্ছেন না! আসলে এর পেছনে রয়েছে ২০১৩ সালে কংগ্রেস সংশোধিত এ্যান্টি-মানিলন্ডারিং এ্যাক্ট। আইনে বেশ কিছু সংশোধনীর কারণে এ সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক ওয়াচডগ দ্য ফিন্যান্সিয়াল এ্যাকশন টাস্ক ফোর্স অবিশ্বস্ততার জন্য ফিলিপিন্সকে কালো তালিকাভুক্ত করতে পারবে না। কারণ, অর্থনৈতিক গতিকে চাঙ্গা রাখতে ফিলিপিন্সের কর্মীরা রেমিটেন্স প্রবাহ সচল রাখছে। ক্যাসিনোগুলো ওই আইনের আওতার বাইরে। আর আইনের এ বিষয়টির কারণে রাজনৈতিকভাবেও তা খুব সুন্দরভাবে অপব্যবহার হচ্ছে। ফিলিপিন্সের রাজনীতিকরা জনগণের কষ্টের অর্থ নিজেদের পকেটে নেয় এবং এভাবেই কালো টাকা সাদা বানায়। দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশটিতে এবং আন্তর্জাতিক মহলে এভাবে চুরির টাকা ফিলিপিন্সের ক্যাসিনোতে ঢেলে সাদা বানানোর এই ঘটনায় তীব্র নিন্দার ঝড় উঠেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গবর্নরও অর্থ পাচার রোধে ফিলিপিন্সের এই আইনী শৈথিল্য নিয়ে অনুতাপ করেছেন। তবে দেশটির সরকারের মুখপাত্রকে এভাবে চুরির অর্থ অদৃশ্য হওয়ার ঘটনায় নির্বিকার দেখা গেছে। তিনি শুধু বলেছেন, আপনারা দেখছেন বিষয়টি নিয়ে কাজ হচ্ছে।