১৭ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

তনুর লাশের দ্বিতীয় দফা ময়নাতদন্ত সম্পন্ন

তনুর লাশের দ্বিতীয় দফা ময়নাতদন্ত সম্পন্ন

মীর শাহ আলম, কুমিল্লা থেকে ॥ কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে বুধবার সন্ধ্যায় ঘটনার ১০দিন পর কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজছাত্রী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনুর পুনঃ ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। এর আগে দুপুরের দিকে জেলার মুরাদনগর উপজেলার মির্জাপুর গ্রামের পারিবারিক কবরস্থান থেকে তনুর লাশ উত্তোলন করা হয়। এছাড়া দুপুরে কুমিল্লা সেনানিবাসের ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন গণমাধ্যম কর্মীরা। এ সময় তনুর পিতা ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের অফিস সহায়ক ইয়ার হোসেন সাংবাদিকদের নিকট তনু মৃত্যু ও লাশ উদ্ধারের বর্ণনা দেন এবং ওই রাতে ঘটনাস্থলের পাশে অজ্ঞাতনামা ৩ ব্যক্তিকে ছোটাছুটি করতে দেখেন বলে সাংবাদিকদের জানান। তিনি প্রধানমন্ত্রীর নিকট তার মেয়ের হত্যাকারীদের গ্রেফতার ও সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে তনু হত্যাকা-ের জন্য দুঃখ প্রকাশসহ হত্যাকারীদের গ্রেফতার ও মামলার সুষ্ঠু তদন্তে সকল প্রকার সহায়তার আশ্বাস দেয়া হয়।

জানা যায়, গত ২০ মার্চ রাতে তনুকে দুর্বৃত্তরা খুন করে তার বাসার অদূরে সেনানিবাসের পাওয়ার হাউস রোডের পাশের একটি জঙ্গলে ফেলে যায়। এ ঘটনার পরদিন তার বাবা ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের কর্মচারী ইয়ার হোসেন বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে কোতোয়ালি মডেল থানায় মামলা দায়ের করে। শুরুতে মামলা তদন্ত করে ক্যান্টনমেন্ট পুলিশ ফাঁড়ির এসআই সাইফুল ইসলাম। পরে মামলাটির অধিকতর তদন্তের জন্য গত ২৫ মার্চ রাতে মামলাটি জেলা গোয়েন্দা বিভাগে ন্যস্ত করা হলেও এর কোন কূলকিনারা না হওয়ায় মামলাটি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডিতে হস্তান্তরে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এদিকে ডিএনএ পরীক্ষা, সুরতহাল প্রস্তুতসহ পুনঃ ময়নাতদন্তের জন্য গত সোমবার মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা জেলা গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) ওসি একেএম মনজুর আলমের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কুমিল্লার অতিরিক্ত চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট জয়নাব বেগম তনুর লাশ উত্তোলনের নির্দেশ দেন। আদালতের আদেশে হত্যাকা-ের ১০ দিন পর বুধবার দেশের বহুল আলোচিত কলেজছাত্রী সোহাগী জাহান তনুর লাশ মুরাদনগরের মির্জাপুর গ্রামের পারিবারিক কবরস্থান থেকে বেলা এগারোটা ৪০ মিনিটের দিকে উত্তোলন করা হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন প্রথম শ্রেণীর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লুৎফুন নাহার, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আজগর আলী, কুমিল্লার পুলিশ সুপার মোঃ শাহ আবিদ হোসেন, সিআইডি-কুমিল্লার বিশেষ পুলিশ সুপার ড. নাজমুল করিম খান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আলী আশ্রাফ, আবদুল্লাহ আল মামুন, সিআইডি-কুমিল্লার সহকারী পুলিশ সুপার জালাল উদ্দিন, মোজাম্মেল হক, পরিদর্শক খন্দকার শাহনেয়াজ, মোজাম্মেল হোসেন, গাজী ইব্রাহিম, ঢাকার সিআইডি ক্রাইম সিনের এএসপি আবদুস সালামের নেতৃত্বে ৭ পরিদর্শকসহ একটি প্রতিনিধিদল, কুমিল্লার মুরাদনগর সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার ইকবাল হোসেন হাজারী, জেলা ডিবির ওসি একেএম মনজুর আলম, মুরাদনগর থানার ওসি মিজানুর রহমান, বাঙ্গরাবাজার থানার ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনসহ পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা।

লাশ উত্তোলনের সময় কবরের পাশে হাজারও মানুষের বিক্ষোভ ॥ তনুর নিজ গ্রাম জেলার মুরাদনগর উপজেলার মির্জাপুর গ্রামে পুনরায় ময়নাতদন্তের জন্য তার লাশ উত্তোলনের সময় কবরের পাশে জড়ো হয় হাজারও শোকার্ত জনতা। এ সময় তারা তনুর হত্যার বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ শুরু করে। পরে কুমিল্লার পুলিশ সুপার শাহ আবিদ হোসেন শোকার্ত জনতার উদ্দেশে বক্তব্য রাখেন। এ সময় পুলিশ সুপার তনু হত্যার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতারের আশ্বাস দিয়ে শোকার্ত জনতাকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দফতর অধিক গুরুত্ব দিয়ে প্রতিদিন মামলার খোঁজখবর নিচ্ছে। অপরাধীরা অবশ্যই গ্রেফতার হবে বলে তিনি জানান। এ সময় উপস্থিত ছিলেন তনুর বাবা ইয়ার হোসেন ও ভাই নাজমুল হাসান রুবেল।

সুরতহাল রিপোর্ট ॥ মামলার তদন্তকারী সূত্র জানায়, সিআইডির তত্ত্বাবধানে ডিবি তনুর লাশ উত্তোলনের পর দ্বিতীয়বার সুরতহাল রিপোর্ট প্রস্তুত করে। এ সময় তার ২ হাতে, পায়ে, গলার পেছনের অংশে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে।

প্রথম ও দ্বিতীয় সুরতহালে গড়মিল ॥ সিআইডির একটি সূত্র জানায়, তনুর প্রথম সুরতহাল রিপোর্টে তার হাতে ও পায়ে কোন জখমের বিষয় উল্লেখ ছিল না। বুধবার লাশ কবর থেকে উত্তোলনের পর দ্বিতীয় দফায় সুরতহালে তনুর হাতে ও পায়ে জখমের চিহ্ন রয়েছে এবং গলার পেছনের অংশে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়।

কুমেক পুনঃ ময়নাতদন্তে ৩ সদস্যের টিম ॥ বুুধবার সন্ধ্যায় কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক কামাদা প্রসাদ সাহার (কেপি সাহা) নেতৃত্বে গঠিত ৩ সদস্যের ডাক্তারের একটি টিম তনুর ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করে। কমিটির অপর সদ্যসরা হচ্ছেন কুমেকের সহযোগী অধ্যাপক ডাঃ করুণা রানী কর্মকার, প্রভাষক ডাঃ ওমর ফারুক। এ সময় কুমিল্লার পুলিশ সুপার মোঃ শাহ আবিদ হোসেন, সিআইডি-কুমিল্লার বিশেষ পুলিশ সুপার ড. নাজমুল করিম খান, সিআইডির ক্রাইম সিনের এএসপি আবদুস সালামের নেতৃত্বে ৭ পরিদর্শকসহ একটি প্রতিনিধিদল, ডিবির ওসি একেএম মনজুর আলমসহ জেলা পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার অন্যান্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। পরীক্ষা- নিরীক্ষার জন্য ক্রাইম সিন তনুর মাথার চুল, হাতের নখসহ কিছু অংশ নিয়ে যায়। এর আগে তনুর লাশ উত্তোলনের পর পুনরায় ময়নাতদন্তের জন্য একটি লাশবাহী এ্যাম্বুলেন্সযোগে মরদেহ দুপুর দুটার দিকে কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগে নেয়া হয়। পুনঃ ময়নাতদন্ত শেষে কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক কামাদা প্রসাদ সাহা সাংবাদিকদের জানান, আদালতের নির্দেশে তনুর দ্বিতীয়বারের মতো ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করা হয়েছে এবং ডিএনএ টেস্টের জন্য শরীরের বিভিন্ন অংশ সংগ্রহ করা হয়েছে। প্রথমবার ময়নাতদন্ত করেছিল একজন ডাক্তার এবং এবার ময়নাতদন্ত করেছে ৩ সদস্যের একটি মেডিক্যাল বোর্ড। বিষয়টি স্পর্শকাতর হওয়ায় রিপোর্ট পাওয়ার আগে টেকনিক্যাল বিষয়ে কোন মন্তব্য করা যাবে না।

তনুর লাশ ফের গ্রামের বাড়িতে ॥ সন্ধ্যা ছয়টার দিকে পুনঃ ময়নাতদন্ত শেষে তনুর লাশ পুলিশের তত্ত্বাবধানে পুনরায় দাফনের জন্য তার গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় সঙ্গে ছিলেন তনুর বড় ভাই নাজমুল হোসেন ও ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) একেএম জামাল।

যে কারণে পুনঃ ময়নাতদন্ত ॥ সোহাগী জাহান তনুকে হত্যার পর তার বাবা ইয়ার হোসেন সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় ময়নামতি সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নিয়ে যায়। কোতোয়ালি থানার এসআই সাইফুল ইসলাম হাসপাতালে গিয়ে লাশ উদ্ধার করে সুরতহাল শেষে কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্তের জন্য প্রেরণ করে। এ সময় ময়নাতদন্ত ও লাশের সুরতহালে বেশ কিছু অসঙ্গতি ছিল বলে তদন্তকারী সংস্থা জেলা গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) পক্ষে জানানো হয়। পুলিশ শুরুতে মরদেহে সৃষ্ট জখম থেকে অপরাধী শনাক্তে ডিএনএ নমুনাসহ মরদেহ থেকে অন্যান্য আলামত সংগ্রহে প্রক্রিয়াগত ভুলের কারণে মামলাটি গত ২৫ মার্চ ডিবিতে স্থানান্তর করা হয়। পরে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিবির ওসি একেএম মনজুর আলমের আবেদনের প্রেক্ষিতে গত (২৮ মার্চ) সোমবার বিকেলে কুমিল্লার অতিরিক্ত চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট জয়নাব বেগম নিহত তনুর লাশ কবর থেকে উত্তোলন করে পুনঃ ময়নাতদন্ত করার নির্দেশ দেন।

১০ দিনেও তদন্তে অগ্রগতি নেই ॥ তনুর হত্যাকা- নিয়ে পুলিশ, র‌্যাব ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ১০দিন অতিবাহিত করলেও তদন্তে কোন অগ্রগতি না হওয়ায় ক্রমেই ক্ষোভ বাড়ছে। কুমিল্লা জেলা ছাড়াও দেশব্যাপী প্রতিদিনই এ হত্যাকা-ের প্রতিবাদে বিক্ষোভ-মানববন্ধন অব্যাহত। তবে একাধিক সূত্র জানায়, চাঞ্চল্যকর এ মামলার তদন্ত নিয়ে র‌্যাব, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের মাঝে সমন্বয়হীনতার কারণে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তিন সংস্থার জেরার মুখে তনুর পরিবারের এখন ত্রাহি দশা।

মামলা সিআইডিতে, মনিটরিং করবেন বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আবদুল কাহহার আকন্দ ॥ থানা পুলিশ, ডিবির পর এবার মামলা সিআইডিতে হস্তান্তরের আদেশ হয়েছে। রাত সাড়ে সাতটায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত মামলাটি সিআইডি কুমিল্লায় হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছিল। সূত্র জানায়, স্থানীয়ভাবে সিআইডির পরিদর্শক গাজী ইব্রাহিম তদন্ত কর্মকর্তা নিযুক্ত হবেন এবং বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ঢাকার সিআইডি পুলিশের বিশেষ পুলিশ সুপার আবদুল কাহহার আকন্দ মামলাটি মনিটরিং করবেন।

কুমিল্লা সেনানিবাসের ঘটনাস্থলে গণমাধ্যমকর্মীরা ॥ আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতরের (আইএসপিআর) আমন্ত্রণে প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার গণমাধ্যমকর্মীরা বুধবার দুপুরে কুমিল্লা সেনানিবাসের ঘটনাস্থলে যান। এ সময় কুমিল্লা সেনানিবাসের স্টেশন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কাজী শওকাত আলম, আইএসপিআর’র সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ রেজা-উল করিম শাম্মী, ডিজিএফআইয়ের কর্নেল জিএস মোঃ সাজ্জাদ হোসেন, ৩৩ পদাতিক ডিভিশনের কর্নেল স্টাফ মোঃ মাসুদুর রহমান, ক্যান্টেনমেন্ট বোর্ডের এক্সিকিউটিভ অফিসার মোঃ মনিরুল ইসলামসহ সেনাবাহিনীর অন্যান্য কর্মকর্তারা সাংবাদিকদের ঘটনাস্থলে নিয়ে যান এবং সেখানকার পারিপার্শ্বিক অবস্থার বর্ণনা দেয়া হয়। ঘটনাস্থলের পাশে সেনানিবাসের সীমানা প্রাচীর না থাকায় ওই জঙ্গলের ভেতর দিয়ে সেনানিবাসের সীমান্ত থেকে ৪/৫শ’ গজ দূরে পার্শ¦বর্তী বদুইর গ্রামে সহজে যাতায়াত করা যায়। জানা গেছে, কুমিল্লা সেনানিবাসের নাজিরাবাজার থেকে অলিপুর পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৫ কিলোমিটার সীমানা রয়েছে। এ এলাকায় প্রায় ৬ মাস আগে থেকে সীমানা প্রাচীর নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। ঘটনাস্থলের পার্শ¦বর্তী প্রায় ২২শ’ ফুট এলাকা এখনও অরক্ষিত। ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড সূত্র জানায়, সীমানা প্রাচীর নির্মাণের কাজ চলমান ছিল। তনু হত্যাকা-ের পর আলামত নষ্ট হয়ে যাওয়া ও তদন্ত কার্যক্রমে বিঘœ ঘটার আশঙ্কায় সীমানা প্রাচীর নির্মাণের চলমান কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। সহসাই সীমানা প্রাচীরের কাজ নির্মাণ সম্পন্ন হবে।

সেনানিবাসে আইএসপিআর’র প্রেসব্রিফিং ॥ সেনানিবাসের সীমানা সংলগ্ন এলাকায় তনুর মৃতদেহ পাওয়া যায়। দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে তাদের কার্যক্রম শুরু করেছে। এরই মধ্যে জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন, আইন শালিস কেন্দ্র ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও তনুর পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাত করেছেন। দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী প্রথম থেকেই সকল তদন্তকারী সংস্থাকে সর্বাত্মক সহযোগিতা আন্তরিকতার সঙ্গে প্রদান করছে। অথচ কিছু স্বার্থান্বেষী মহল এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সেনাবাহিনী সম্পর্কে অনুমাননির্ভর বক্তব্য প্রদান/প্রচার করছে এবং জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে, যা মোটেই কাম্য নয়। সোহাগী জাহান তনুর পিতা ইয়ার হোসেন ৩০ বছর যাবত কুমিল্লা সেনানিবাস ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের একজন বেসামরিক কর্মচারী। যিনি আমাদের সেনা পরিবারেরই সদস্য এবং তনু কুমিল্লা সেনানিবাসে বড় হয়েছেন ও আমাদেরই সন্তান। তার এহেন মর্মান্তিক মৃত্যুতে প্রতিটি সেনাসদস্য দারুণভাবে ব্যথিত ও মর্মাহত। সেনাবাহিনী জনসাধারণেরই অংশ এবং দেশের প্রচলিত আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। এ ব্যাপারে দায়িত্বশীল বক্তব্য/প্রচার একান্তভাবে কাম্য। সেনাবাহিনীও প্রত্যাশা করে দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে দোষী ব্যক্তিদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হোক। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তদন্ত প্রক্রিয়ায় আন্তরিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার জন্য দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। কুমিল্লার সেনানিবাসের ময়নামতি অফিসার্স ক্লাবের হলরুমে আয়োজিত প্রেসব্রিফিংয়ে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতরের (আইএসপিআর) পরিচালকের পক্ষে সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ রেজা-উল করিম শাম্মী লিখিত বক্তব্যে এ তথ্য জানান।

ওই রাতে ঘটনাস্থলের পাশে ছোটাছুটি করছিল ৩ ব্যক্তি ॥ তনু হত্যাকা-ের ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে বিকেলে সেনাবাহিনী গণমাধ্যমকর্মীদের তনুদের বাসার সামনে নিয়ে যান। এ সময় সেখানে ছিলেন তনুর বাবা ইয়ার হোসেন, মা আনোয়ারা বেগম, ভাই ও চাচাত বোন লাইজু। কান্নাজড়িত কণ্ঠে গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে তনুর বাবা সেনানিবাসে তার মেয়ের বেড়ে ওঠা, শৈশব থেকে শুরু করে স্কুল-কলেজ জীবনের বর্ণনা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ঘটনার রাতে স্থানীয় ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড বয়েজ হাইস্কুলের শিক্ষক ‘শিকদার স্যার’কে নিয়ে মেয়েকে খোঁজাখুঁজি করার সময় ঘটনাস্থলের পাশে ৩ ব্যক্তিকে ছোটাছুটি করতে দেখতে পান। এ সময় সাংবাদিকরা তাদের পরিচয় জানতে চাইলে তিনি তাদের পরিচয় জানতে পারেননি বলে জানান। তিনি প্রধানমন্ত্রীর নিকট মেয়ে হত্যাকারীদের গ্রেফতারসহ ঘাতকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।

কুমিল্লা মহানগরীসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ অব্যাহত ॥ কুমিল্লা মহানগরী ও জেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তনু হত্যার বিচার দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেছে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। বুধবার দুপুরে এ মানববন্ধন ও বিকেলে নগরীর বিভিন্ন স্থানে দোয়ার আয়োজন করা হয়। গত ২৭ মার্চ কুমিল্লা নগরীতে অনুষ্ঠিত প্রতিবাদ সমাবেশে গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ডাঃ ইমরান এইচ সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী বুধবার জেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ রেখে ১ ঘণ্টা মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচী পালন করা হয়। ভিক্টোরিয়া কলেজ তনু মঞ্চে বুধবার দিনব্যাপী বিক্ষোভ হয়েছে। এছাড়া ভিক্টোরিয়া কলেজ থিয়েটার তনুর আত্মার মাগফিরাত কামনায় মিলাদমাহফিলের আয়োজন করে।

এদিকে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে অধ্যয়নরত চৌদ্দগ্রাম উপজেলার মিয়াবাজার এলাকার ছাত্রছাত্রীদের উদ্যোগে তনু হত্যার সুষ্ঠু বিচারের দাবিতে মিয়াবাজার ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। মানববন্ধনে মিয়াবাজার মিয়াবাজার ডিগ্রী কলেজ, মিয়াবাজার লতিফুন্নেসা উচ্চ বিদ্যালয়, বালিকা বিদ্যালয়, প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কয়েক হাজার শিক্ষার্থী ছাড়াও রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ অংশগ্রহণ করেন। এছাড়া জেলার তিতাস উপজেলার গৌরীপুর-হোমনা সড়কের গাজীপুর বাস স্টেশনে দুপুর ১২ থেকে এক ঘণ্টা মানববন্ধন করেছে গাজীপুর খান হাইস্কুল এ্যান্ড কলেজের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। কলেজের প্রভাষক মাহফুজুল ইসলাম সাইমুম, শওকত হোসেন টুলু, নজরুল ইসলাম, মেহেদী মাসুদ, আনোয়ার জাহিদের নেতৃত্বে ৫ শতাধিক শিক্ষার্থী ১ ঘণ্টা মানববন্ধন করে। ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলায় মানববন্ধন করেছে ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার আবদুল মতিন খসরু মহিলা কলেজ ও ব্রাহ্মণপাড়া ওশান হাইস্কুল। দুপুরে কুমিল্লা-ব্রাহ্মণপাড়া-মিরপুর সড়কের আবদুল মতিন খসরু মহিলা কলেজের সামনে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। মানববন্ধন করেছে বুড়িচং উপজেলার পারুয়ারা আবদুল মতিন খসরু কলেজের শিক্ষার্থীরা।

উল্লেখ্য, গত ২০ মার্চ সন্ধ্যায় টিউশনি করে বাসায় ফেরার পথে কুমিল্লা সেনানিবাস এলাকায় নৃশংসভাবে খুন হন সোহাগী জাহান তনু। ২১ মার্চ নিহতের বাবা ইয়ার হোসেন কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন।