১৫ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অবশেষে মহাসচিব হলেন ফখরুল ॥ দুপুরে কারাগারে বিকেলে জামিন

অবশেষে মহাসচিব হলেন ফখরুল ॥ দুপুরে কারাগারে বিকেলে জামিন

স্টাফ রিপোর্টার ॥ অবশেষে বিএনপির মহাসচিব হলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। দীর্ঘ ৫ বছর পর বুধবার ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব থেকে তাকে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব করলেন দলের চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। এদিকে ভারমুক্ত হওয়ার দেড় ঘণ্টার মধ্যেই দুপুর ১টায় নাশকতার মামলায় জামিন না মঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেয় আদালত। এর ৩ ঘণ্টা পর বিকেল ৪টায় জামিন পুনর্বিবেচনার আবেদন মঞ্জুর করায় জামিন পান মির্জা ফখরুল। পদোন্নতির দিনে তার জামিন নিয়ে নাটকীয়তা হয়েছে বলে বিভিন্ন মহল থেকে বলা হচ্ছে। বেলা সাড়ে ১১টায় নয়াপল্টন বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে খালেদা জিয়ার পক্ষে দলের যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী দলের নতুন কমিটির জন্য মহাসচিব হিসেবে মির্জা ফখরুলের

নাম ঘোষণা করেন। এ ছাড়াও তিনি সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব পদে নিজের নাম (রুহুল কবির রিজভী) আর কোষাধক্ষ পদে মিজানুর রহমান সিনহার নাম ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, আমি আপাতত এই তিনটি নাম ঘোষণা করলাম। পরে ধারাবাহিকভাবে অন্যান্য পদে নেতৃবৃন্দের নাম ঘোষণা করব। দলের ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলের ১২দিন পর নতুন নির্বাহী কমিটির এ ৩টি পদের দায়িত্ব পাওয়া নেতাদের নাম থোষণা করল বিএনপি। তবে ১৯ মার্চ ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলের আগেই খালেদা জিয়াকে চেয়ারপার্সন ও তারেক রহমানকে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান পুনর্নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়।

সকাল সাড়ে ১০টায় পল্টন থানার নাশকতার তিন মামলায় ঢাকার সিএমএম আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন নিতে যান মির্জা ফখরুল। আদালতকক্ষে বসেই তিনি পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব হওয়ার খবর পান। আদালত কক্ষেই তাকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান জাতীয়তাবাদী আইনজীবীরা। বেলা ১টায় পল্টন থানার নাশকতার ৩ মামলার একটিতে তার জামিন আবেদন মঞ্জুর হলেও বাকি ২ মামলায় জামিন না মঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন ঢাকার মহানগর হাকিম গোলাম নবী। এরপর এজলাস থেকে তাকে নেয়া হয় কোর্র্ট হাজতখানায়।

এদিকে খবর শুনে নতুন মহাসচিব মির্জা ফখরুলকে শুভেচ্ছা জানাতে ফুল হাতে ছাত্রদল, যুবদল, মহিলা দল ও স্বেচ্ছাসেবক দলসহ বিএনপি নেতাকর্মীরা যখন দলে দলে ফুল হাতে নয়াপল্টন কেন্দ্রী কার্যালয়ে ভিড় করছিলেন, তখনই তাকে কারাগারে পাঠানোর খবরে তাদের মধ্যে হতাশা দেখা যায়। তাদের মধ্যে অনেকেই হতাশা প্রকাশ করে ফুল নিয়ে ফিরে যেতে থাকেন।

বেলা সোয়া ১টায় সাংবাদিকদের সামনে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বিএনপির সদ্য পদোন্নতি পাওয়া সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী মির্জা ফখরুলকে কারাগারে পাঠানোর নিন্দা জানিয়ে বলেন এটি সরকারের গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ। নতুন মহাসচিবকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানানোর সুযোগও দিল না সরকার। ক্ষমতা হারানোর ভয়ে ভোটারবিহীন প্রধানমন্ত্রী বিএনপি মহাসচিবকে কারাগারে পাঠিয়ে এ জঘন্য কাজটি করেছেন। তিনি বলেন, আমরা সরকারকে হুঁশিয়ার করে দিতে চাই, ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে অবিলম্বে মুক্তি না দিলে কঠোর কর্মসূচী ঘোষণা করতে বাধ্য হব। মির্জা ফখরুলকে কারাগারে পাঠানোর খবর শুনে বেলা দেড়টার দিকে নয়াপল্টন বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ করে দলের নেতাকর্মীরা। বেলা সাড়ে ১১টার সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির নতুন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ বলেন, চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া আমাকে অনেক বড় দায়িত্ব দিয়েছেন। আশা করি, সবার সহযোগিতা পেলে সব বাধা অতিক্রম করে সুন্দরভাবে এ দায়িত্ব পালন করতে পারব। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন বিএনপির বিদায়ী কমিটির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক নাজিম উদ্দিন আলম, যুব বিষয়ক সম্পাদক সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক খায়রুল কবির খোকন, সহ-স্বেচ্ছাসেবক বিষয়ক সম্পাদক এবি এম মোশাররফ হোসেন, জাসাস সভাপতি আব্দুল মালেক প্রমুখ। সংবাদ সম্মেলন শেষে পদোন্নতি হওয়ায় দলের নেতাকর্মীরা রুহুল কবির রিজভীকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান এবং তাঁকে মিষ্টি মুখ করান।

বিকেলে কারাগারে নেয়া ঠেকাতে তৎপর হন বিএনপির আইনজীবীরা। অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে জামিন নাকচের আদেশ পুনর্বিবেচনার আবেদন নিয়ে মির্জা ফখরুলের আইনজীবীরা ফের যান আদালতে। সেই আবেদনের শুনানি নিয়ে একই বিচারক বিকেল ৪টার দিকে ফখরুলকে জামিনের আদেশ দেন। এর পর তিনি কারাগারে যাওয়া থেকে রেহাই পান। সন্ধ্যায় তিনি সিএমএম আদালত থেকে বেরিয়ে বিএনপি চেয়ারপার্সনের গুলশান কার্যালয়ে যান। জামিন পাওয়ার পর মির্জা ফখরুলকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান বিএনপির বিভিন্ন স্তরের নেতারা। এর পর সন্ধ্যার পর গুলশান কার্যালয়ে গেলে তাঁকে ফুলের শুভেচ্ছা জানান দলের নেতা কর্মীরা। এক পর্যায়ে তিনি বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান।

নাশকতার মামলায় মির্জা ফখরুলকে গত বছর বেশ কয়েক মাস কারাগারে থাকতে হয়েছিল। এরপর অসুস্থতার কারণে সর্বোচ্চ আদালতের আদেশে জামিন নিয়ে তিনি বিদেশে চিকিৎসাও করিয়ে আসেন। বুধবার ঢাকার সিএমএম আদালতে ফখরুলের জামিন হয় ২০১৫ সারের ৪ জানুয়ারির পল্টন থানার একটি মামলায়। আর ৫ ও ৭ জানুয়ারি দায়ের হওয়া মামলায় জামিনের আবেদন নাকচ হয়। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বর্ষপূর্তিকে ঘিরে ২০১৫ সালের ৬ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ২০ দলীয় জোটের টানা আন্দোলনের মধ্যে নাশকতার এ তিন মামলায় মির্জা ফখরুলকে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দিয়েছিল হাই কোর্ট। এর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপীল বিভাগে গেলে সর্বোচ্চ আদালত রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ফখরুলকে জামিন দিয়ে তারপর তাকে বিচারিক আদালতে আত্মসমর্পণ করতে বলে। গত বছর ২৪ নবেম্বর হাইকোর্ট রুল নিষ্পত্তি করে মির্জা ফখরুলকে তিন মাসের জামিন দেয়। স্থায়ী জামিন না হওয়ায় এরপর আপীলের অনুমতি চান ফখরুল। ওই আবেদনের নিষ্পত্তি করে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের আপীল বেঞ্চ ২৯ ফেব্রুয়ারি ফখরুলকে আত্মসমর্পণের জন্য ১৫ দিনের সময় দেয়।

উল্লেখ্য, ২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে বিএনপির ৫ম জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। এর পর ২০১০ সালের ১ জানুয়ারি ৩৮৬ সদস্যের জাতীয় নির্বাহী কমিটির নাম ঘোষণা করে দলটি। ২০১১ সালের ১৬ মার্চ বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন মারা যান। এর পর ৬ এপ্রিল সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেন চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। সেই থেকে মির্জা ফখরুল দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন এবং আন্দোলনে অংশ নিয়ে বিভিন্ন মামলার আসামি হিসেবে বেশ ক’বার কারাগারে যান। বর্তমানে তার বিরুদ্ধে ৮৮টি মামলা রয়েছে।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর হলেন বিএনপির ৭ম মহাসচিব। ১৯৭৮ সালে ১ সেপ্টেম্বর বিএনপি প্রতিষ্ঠার সময় তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও দলটির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান প্রথম মহাসচিব করেছিলেন ডাঃ একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে। এরপর ১৯৮৬ সালের ১৭ জানুয়ারি দলের চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল মুস্তাফিজুর রহমানকে মহাসচিবের দায়িত্ব দেন। পরের বছর ১৭ মার্চ মহাসচিব পদে আসেন কে এম ওবায়দুর রহমান। এরপর ১৯৮৮ সালের ২২ অগাস্ট তাকে বহিষ্কার করে খালেদা জিয়া মহাসচিব করেন আবদুস সালাম তালুকদারকে। ১৯৯৬ সালের জুনে সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কাছে বিএনপির ভরাডুবির পর সালাম তালুকদার পদত্যাগ করলে মহাসচিব পদে আসেন আবদুল মান্নান ভূইয়া। ২০০৭ সালের ২ সেপ্টেম্বর কারাবন্দী হওয়ার আগ মুহূর্তে খালেদা জিয়া টানা ১১ বছর মহাসচিবের দায়িত্বে থাকা মান্নান ভূঁইয়াকে বহিষ্কার করে খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনকে ওই পদের দায়িত্ব দেন। পরে ২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর জাতীয় কাউন্সিলের পর ২০১০ সালের ১ জানুয়ারি নতুন কমিটিতে খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনকেই মহাসচিব পদে রাখেন খালেদা জিয়া।

বিএনপিকে দুর্বল করতেই খালেদার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা-রিজভী ॥ বিএনপিকে দুর্বল করতেই খালেদার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন দলটির নবনির্বাচিত সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। সন্ধ্যায় নয়াপল্টনের বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, খালেদা জিয়াকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করতেই এ গ্রেফতারি পরোয়ানা। সরকার পতনের ভয়ে আছে বলেই খালেদা জিয়াসহ বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেফতার নির্যাতন করা হচ্ছে ।