২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

টিভি নাটক ও এ সময়ের বিনোদন

টিভি নাটকের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বেশ আগে থেকেই। দর্শক দেশীয় চ্যানেল দেখছে না, নাটক দেখছে না, ঝুঁকেছে ভারতীয় চ্যানেলেÑ এ বিষয়টি নিয়ে বেশ জোর আলোচনা চলছে। কিন্তু সমাধান কই? সাজ্জাদ কাদির লিখেছেন বিস্তারিত

একটি পুরনো কথা প্রচলিত আছে ‘যায় দিন ভাল, আসে দিন খারাপ।’ আমাদের ক্ষেত্রে এ কথাটি মনে হয় শতভাগ সত্য। আমরা হয়ত অনেক ক্ষেত্রে দারুণভাবে এগিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে অতীতের দিকে তাকাতেই হয়। যেমন টেলিভিশন নাটকের ক্ষেত্রে। ২০-২৫ বছর আগেও আমাদের ছেলেবেলায় একটিমাত্র টেলিভিশন চ্যানেল বিটিভিই ছিল। সে চ্যানেলটিই রাষ্ট্রীয়, সামাজিক বিভিন্ন অনুষ্ঠান করেও উপহার দিত মানুষের জীবনের সুখ-দুঃখ-আশা-ভালবাসার নানা ঘটনাকে উপজীব্য করে দারুণ সব নাটক। সেগুলো দেখার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়তেন সব শ্রেণী-পেশার বাঙালী দর্শক। বাঙালী দর্শক এই কারণে বলা হচ্ছে, অনুষ্ঠানগুলো পশ্চিমবঙ্গের বাংলা ভাষাভাষীদের কাছেও ছিল তুমুল জনপ্রিয়।

‘সকাল সন্ধ্যা’, ‘এই সব দিনরাত্রি’, ‘অয়োময়’, ‘বহুব্রীহি’, ‘সংশপ্তক’, ‘ঢাকায় থাকি’, ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘রূপনগর’ এ রকম অসংখ্য বিটিভি নাটকের কথা বলা যায় যেগুলো দেখার জন্য দুই বাংলার দর্শকই সাপ্তাহিক রুটিন করে রাখতেন। কতটা জনপ্রিয় হলে একটি নাটকের চরিত্র বাকের ভাইকে ফাঁসি না দেয়ার জন্য আন্দোলন পর্যন্ত হতে পারে! এগুলো সবই এখন ইতিহাস।

১৯৯৩ সালে বিটিভিতে বেসরকারী উদ্যোগে নাটক নির্মাণের ধারা চালু হয়। ২০০০ সাল পর্যন্ত মোটামুটিভাবে বলা যায় বিটিভির নিজস্ব এবং বেসরকারী দু’ভাবেই নাটক নির্মাণের ভাল প্রচেষ্টা অব্যাহত ছিল। ১৯৯৭ সালের দিকে আমাদের দেশে এটিএন বাংলার মাধ্যমে বেসরকারী স্যাটেলাইট চ্যানেলের যাত্রা শুরু হয়। শুরুর দিক থেকেই নিম্নমানের নাটক প্রচারের কারণে কোনভাবেই প্রথম বেসরকারী স্যাটেলাইট চ্যানেল হিসেবে এটি নাটকের দর্শকদের আকৃষ্ট করতে পারেনি। ১৯৯৯-এর দিকে আরও ১টি চ্যানেল- চ্যানেল আইয়ের যাত্রা শুরু হয়। এটির অবস্থাও প্রথমটির মতোই ছিল। ২০০০ সালে বাংলা টেলিভিশনে ভিন্ন ধারা নিয়ে আসে টেরিস্টোরিয়াল চ্যানেল একুশে টিভি। শুরু থেকেই ভাল গল্প আর ভাল নির্মাণের নাটক দিয়ে তুমুল জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ধীরে ধীরে বিটিভির জনপ্রিয়তা দখল করে এই চ্যানেলটি। খুব অল্পসময়ে ‘বন্ধন’, ‘বিপ্রতিপ’সহ বেশকিছু ভাল নাটক দর্শকদের উপহার দেয়। মাত্র ২ বছরের কিছু সময় পেরিয়ে আইনী জটিলতায় চ্যানেলটি বন্ধ হয়ে যায়। আবারও আশাহত হন দর্শক। ২০০৩ সালে আসে এনটিভি। শুরু থেকেই ঝকঝকে ছবি আর সুন্দর সাউন্ড কোয়ালিটির কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়া একুশে টেলিভিশনের জনপ্রিয়তার এক বড় অংশ নিজেদের আয়ত্বে নিতে সক্ষম হয় চ্যানেলটি। ‘রঙের মানুষ’, ‘রমিজের আয়না’র মতো বেশকিছু ভাল নাটকও উপহার দেয় চ্যানেলটি। সেসঙ্গে এটিএন বাংলা এবং চ্যানেল আইও তাদের অনেকটা উন্নয়ন ঘটিয়ে কিছু ভাল নাটকের মাধ্যমে দর্শক টানতে সক্ষম হয়।

পরবর্তীতে একের পর এক টেলিভিশন চ্যানেল আসতে থাকে। স্বাভাবিকভাবেই নাটকের চাহিদা তৈরি হয়। কিন্তু দেশীয় চ্যানেল এলেও আমাদের দর্শক দেখতে শুরু করে ভারতীয় টিভি সিরিয়াল। গবেষণা রিপোর্ট নাকি বলে বর্তমানে আমাদের ৭০% দর্শক এখন আর বাংলাদেশী টিভি চ্যানেল দেখে না। এর পেছনে যদিও অনেক কারণ আছে। প্রশ্ন হচ্ছেÑ আমাদের নাটক কেন দেখে না? এর একটিই উত্তর দেখার মতো নাটক তৈরি হচ্ছে না। তবে এ কথাও বলে রাখা ভাল, এখনও ২০% ভাল নাটক তৈরি হচ্ছে, প্রচার হচ্ছে- তাতে কোন সন্দেহ নেই। এই ভালগুলো খারাপের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে, নয়তো দর্শক বঞ্চিত হচ্ছে মাত্রাতিরিক্ত বিজ্ঞাপনের কারণে। এখন অসংখ্য চ্যানেলের চাহিদার কারণে অসংখ্য নাটক তৈরি হচ্ছে। কিন্তু এগুলো আসলে কী তৈরি হচ্ছে? যে নাটকে জীবনের গল্প নেই, জীবনকে স্পর্শ করতে পারে না, সুস্থ বিনোদন দিতে পারে না এগুলো আসলে কী? এখন বেশিরভাগ নাটক মানেই গ্রামীণ পটভূমির খিস্তি-খেউড় আর ভাঁড়ামো। আমাদের গ্রামগুলো সব সময়ই নির্মল হাসি-আনন্দে ভরপুর ছিল, কিন্তু তাই বলে গ্রামের সব চরিত্রগুলো নাটকে যেভাবে উপস্থাপিত হচ্ছে, সেটি দুঃখজনক। অত্যন্ত শঙ্কার বিষয় হচ্ছে, এখন এদেশে ভারতীয় সিরিয়ালগুলোর কপি করার চেষ্টা চলছে। আশার কথা হচ্ছে, দেশীয় টিভি নাটক ইন্ডাস্ট্রিতে যেমন অসংখ্য মেধাহীন মানুষ আছেন, তেমনি অনেক মেধাবী নাট্যকার, নির্মাতা, অভিনেতা কাজ করে যাচ্ছেন। যাদের দিয়ে টিভি নাটকের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনা যেতে পারে। চ্যানেল কর্তৃপক্ষের উচিত বিষয়টি নিয়ে এখনই ভাবনা-চিন্তা করা, কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া। অন্যথায় যেভাবে একসময় এদেশের সিনেমা হল একের পর এক বন্ধ হয়ে গেছে, সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি পার করছে মুমূর্ষু সময়; ঠিক তেমনিভাবে টিভি চ্যানেলগুলোও বন্ধ হয়ে যাবে। যেটি কখনোই কাম্য নয়। আমরা চেষ্টা করলে পারি না এমন কিছু মনে হয় নেই। শুধু সবার সদিচ্ছা প্রয়োজন। গৃহস্থালি বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম টেলিভিশন ভাল ভাল নাটকে ভরে উঠুক, সে প্রত্যাশাই রাখছি সংশ্লিষ্ট সবার নিকট।