১৪ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সরেজমিন মুন্সীগঞ্জের ইউপি নির্বাচন

স্টাফ রিপোর্টার, মুন্সীগঞ্জ ॥ কুকুটিয়া উত্তরপাড়া গ্রামের বাহাত্তোর বছরে বৃদ্ধা জামিলা বেগম ভোট কেন্দ্রের বারান্দায় বসা। বেশী বয়স্ক বলে তাকে আগে ভোট দেয়ার সুযোগ দেয়া হবে বলে বসিয়ে রাখা হয়েছে। পাশের আরেক বৃদ্ধা একই গ্রামের মনোয়ারা বেগম। আর লাইনে লাড়িয়ে পচাত্তোর বছরের আব্দুল হামিদ। সকলেরই একই কথা ভোট টা দিতে পারলে একটা দায়িত্ব সম্পন্ন হয়। বৃদ্ধ বয়সেও তাদের ভোট দেয়ার বেশ আগ্রহ লক্ষ্য করা গেছে। কেন্দ্রটির প্রিজাইডিং অফিসার কৃষি ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার মোঃ রফিকুল ইসলাম বলেন, সব বয়সী মানুষেরই ভোট দেয়ায় এরকম খায়েস কাজ করে। তবে কিছু আগেই একটি গোপন বুথের ফ্লোর ধসে এক নারী ভোটার আহত হয়। পরে বুথটি সরিয়ে নেয়া হয়। সুরুদিয়া গ্রামের মুক্তা বেগম (৪৫) সামান্য আহত হন। তাকে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। এর আগে আটপাড়া ইউনিয়নের কল্লীগাঁও সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভোটারের সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। সরু রাস্তা এবং কেন্দ্রে পাশে খালি জায়গা না থাকায় পাশের জমিতেই প্রার্থীরা চেয়ার টেবিল নিয়ে বসেন ভোটার স্লিপ দেয়ার জন্য। সকাল ৯টায় চালের দোকানী আব্দুল করিম (৬০) লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে। এই লাইনে রয়েছেন তিনগাঁও গ্রামের সাত্তার শেখ (৭০)। আর নারী ভোটার লাইনে দাঁড়ানো একই গ্রামের নতুন ভোটার টুম্পা দত্ত (২০)। সরকারী শ্রীনগর কলেজের স্নাতক প্রথম বর্ষের ছাত্রী। টুম্পা ভোট দিতে এসে আনন্দে উদ্বেলিত। এই প্রতিবেদককে বলেন, প্রথম ভোট দেয়ার আনন্দ আমি বুঝছি। এর মধ্যে আলাদা ভালো লাগা আছে। আর উৎসব মুখর পরিবেশে এসে স্বপ্নের মার্কায় ভোট দিব। তার পাশে দাঁড়ানো আনোয়ারা বেগম (৬০) মুচকি হেসে বলেন, জীবনে কতবার ভোট দিলাম, তারপর ভোট দিতে ভালো লাগে আর প্রথম ভোট তো ভালো লাগবেই। এই কেন্দ্রে হুমায়ুন কবির নামের এক যুবক বুকে নৌকা মার্কার ব্যাচ লাগিয়ে ৩ নম্বর বুথে প্রভাব সৃষ্টির চেষ্টা করছিল। তখনই হাজির হন এডিএম একেএম শওকত আলম মজুমদার। তিনি তাৎক্ষনিক কেন্দ্র থেকে বের করে দেন। এতে অন্য ভোটারা খুশি হয়ে বলেন, যখনই সমস্যা তখনই সমাধান। এমনটি আর এর আগে দেখা যায়নি। কেন্দ্রটির প্রিজাইডিং অফিসার শ্রীনগর সরকারী কলেজের প্রভাষক আবুল ফাত্তাহ কবলেন, পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি, ম্যাজিস্ট্রেট সবই প্রস্তুত। তাই কোন ভয় আতঙ্ক নেই।

বেলা পৌনে ১১টার দিকে শ্রীনগর উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্সে এসেই দেখা যায় যেন ভোটের মেলা বসেছে। উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনটিই ভোট কেন্দ্র। আর এর বাইরে পুরো এলাকায়ই প্রার্থীদের নানান ব্যস্ততা। ভোটারদের মন জয়ে প্রার্থী ও কর্মীরা প্রাণন্তকর প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। কেন্দ্রের বাইরে সজ্জিত ক্যাম্প করে চেয়ার টেবিল বসে সেখান থেকে ভোটারদের পরিচিতি নাম্বার দেয়া হচ্ছে। ধানের শীষ নৌকাসহ নানা প্রকীত সাজিয়ে রাখা হয়েছে ক্যাম্পগুলোতে। আর সমানের প্রসস্ত রাস্তায় পোস্টার আর পোস্টার। যেন কোন জায়গাই ফাকা নেই। সারি সারি রশিতে ঝুলছে ছবি আর মার্কা সম্বলিত সাদা কালো পোস্টার। ভেতরের প্রবেশের করতেই দেখা গেল লম্বা লাইন কেন্দ্রের সিমানা ছাড়িয়ে গেছে। নারী ভোটারদের লাইন এখানেও লম্বা। বাঘড়া ইউনিয়নটি নানা কারণেই দেশে আলোচিত। স্বাধীনতার পরে বর্তমান চেয়ারম্যান ছাড়া এই ইউনিয়ননের সব চেয়ারম্যানই খুন হয়েছেন। আর বেঁচে থাকা একজন আইয়ুব আলী চেয়ারম্যানের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে নির্বাচনযঞ্জ চলাকালেই গত ১৫ মার্চ। আইয়ুব আলী ফাইভ মার্ডার মামলায় জেলা খানায় আটক থেকেই চেয়ারম্যান হয়েছিলেন গত টার্মের আগের টার্মে। বাঘড়ার কাঠাঁলবাড়ি হাফিজিয়া মাদ্রাসা কেন্দ্রে দুপুর পৌনে ১২টায় নারী-পুরুষের লম্বা লাইন। এখানে তখন পুরুষ ভোটারের লাইন ছিল বেশী লম্বা। কেন্দ্রটির প্রিজাইডিং অফিসার জনতা ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার উজ্জ্বল মজুমদার বলেন, ২০৫৪ ভোটের মধ্যে তখন পর্যন্ত ৭শ’র বেশী ভোট কাস্ট হয়েছে। প্রিজাইডিং অফিসার বলেন, নানা কারণেই এই কেন্দ্রে আতঙ্কে ছিলাম। ভোট শেষ না হওয়া পর্যন্ত কিছু বলতে পারছি না। নির্বাচন পূর্ব সহিংসতার জন্য গণমাধ্যমের শিরোনাম হওয়া কোলাপাড়া ইউপিতে গিয়ে দেখা গেল ভিন্ন চিত্র। তখন বেলা পৌনে ১টা। ভোটারের কোন লাইন নেই। ২/৪ জন বিচ্ছিন্নভাবে এসে ভোট দিচ্ছে। ১৮৬৪ ভোটের মধ্যে তখন পর্যন্ত কাস্ট হয়েছে ৯৮৭ ভোট। প্রিজাইডিং অফিসার বুথ ঘুরে এসে এই তথ্য দেন। তিনি কাগজে নোট দেখে বলেন সকাল সাড়ে ৮ টায় ভোট পড়ে ছিল ১৪৪টি। আর ১১টা ২০ মিনিট পর্যন্ত ভোট কাস্ট হয়েছিল ৮ শ’ ৩০টি। এখান থেকে শ্রীনগরের ফিরতেই ঝুপ করে বৃষ্টি। বেলা ২টা থেকে টানা সাড়ে ৩ টা পর্যন্ত ভাড়ি বৃষ্টি হয়। এরপর বৃষ্টি থামলেও আবার বৃষ্টি হয়। বৃষ্টি চলাকালেই বিকাল সাড়ে ৩টায় শ্রীনগর মিলনায়তন কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায় বৃষ্টি উৎসব মাটি করে দিলেও বিচ্ছিন্ন ভাবে ভোটার আসছিল। তখন প্রায় ৮০ শতাংশ ভোট কাস্ট হয়েছে। তখন কেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেল অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক, শিক্ষা ও আইসিটি) মোহা. হারুন-অর-রশীদ অবস্থান করছেন। তিনি বিভিন্ন কেন্দ্রে পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে বলেন, নির্বাচন হয়েছে উৎসব মুখর। কেন্দ্রের বাইরে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া সুষ্ঠু ভোট গ্রহন হচ্ছে। শ্রীনগর উপজেলা কন্ট্রোল রুমের দায়িত্বে থাকা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মোছা. সাজেদা সরকার বিকাল সাড়ে টায় জানান, ৮০ শতাংশেরও বেশী ভোট পড়েছে। শ্রীনগর উপজেলার ১২৬টি কেন্দ্রের মধ্যে ৯ কেন্দ্রের বাইরে বিশৃঙ্খলা হয়েছে। তবে তাৎক্ষনিক ব্যবস্থা নেয়া ভোট গ্রহনে সমস্যা হয়নি। পুলিশসহ বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে এসব বিশৃঙ্খলায় একজন গুলিবিদ্ধসহ ১৫ জন আহত হয়েছে।

মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোঃ সাইফুল হাসান বাদল ভোট গ্রহনের পরে জানান, জেলা সবচেয়ে ঝুকিপূর্ণ ইউনিয়নগুলোতে ভোট গ্রহন হয়েছে অত্যন্ত সুষ্ঠু ও উৎসব মুখরভাবে। বিচ্ছিন্ন ঘটনায় ভোটে প্রভাব ফেলতে পারেনি। তাৎক্ষনিক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

সিরাজদিখান উপজেলার ইছামতি সরকারী প্রথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বিশৃঙ্খলা ঘটে। নৌকা প্রতীকের প্রার্থী আনোয়ার হোসেনের সমর্থকরা কেন্দ্রে হামলা চালিয়ে ব্যালট পেপার ছিনিয়ে নেয়। তাতে সিল মেরে ভোট ডাকাতির চেষ্টা করে। এ সময় ভোটাররা দ্বিকবিদ্বিগ ছোটাছুটি শুরু করে। তবে আই শৃঙ্খলা বাহিনীর তরিৎ হস্তক্ষেপে আধা ঘন্টার মধ্যেই কেন্দ্রেটিতে আবার ভোট গ্রহন শুরু হয়। এসময় নৌকা প্রতীকের সীল মারা ১টি ব্যালট বই ও মেম্বার প্রার্থী বই প্রতীকের একটি ব্যালট বই উদ্ধার হয়। কেন্দ্রটি প্রিজাইডিং অফিসার সমীর কুমার বসু জানিয়েছেন, উদ্ধারকৃত ব্যলট বই দুটি বাতিল করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার শ্রীনগর উপজেলার ১৪টি এবং সিরাজদিখান উপজেলার ৪টি ইউনিয়নে সম্পন্ন হয়। ১৬৬ কেন্দ্রের মধ্যে ১শ’ কেন্দ্রই অধিক ঝুকিপূর্ণ ও ৫৬টি কেন্দ্র ঝুকপূর্ণ চিহ্নিত করে ব্যাপক নিরাপত্তা বলায় তৈরী করা হয়েছিল। ১৮টি ইউনিয়নে ১৬৬ জন বিজিবি, ৫১ জন র‌্যাব, ৯৩৬ পুলিশ সদস্য এবং ২ হাজার ৮৫০ জন আনসার দায়িত্ব পালন করবে। এছাড়াও ১৫ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও ২ দুই জন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, দুই ইউএনও, তিন এডিসি ও ডিসি-এসপি মাঠে ছিলেন। ব্যাপক নিরাপত্তা বলয়ের কারণে এলাকায় শঙ্কা কেটে যায়।

১৮টি ইউপিতে ৬৭৮ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। এর মধ্যে চেয়ারম্যান প্রার্থী রয়েছেন ৬৪ জন। ইতোমধ্যেই শ্রীনগরের উপজেলার ষোলঘর এবং সিরাজদিখান উপজেলার কেয়াইন ইউপিতে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগ প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছে। সহকারী পুলিশ সুপার মো. শামসুজ্জামান জানান, গত কয়েক দিনের নির্বাচন পূর্ব সহিসংসতার ঘটনায় শ্রীনগর থানায় ১২টি মামলা হয়েছে। এসকল মামলায় অর্ধশতাধিক লোককে আসামী করা হয়েছে। আগেই কাঠোর অবস্থান নেয়ায় ভোটের দিনে তেমন সমস্যা হয়নি।