২১ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সমন্বিত সহযোগিতার বিকল্প নেই

  • জয়ন্ত রায়

যে কোন দুই প্রতিবেশীর ক্ষেত্রে বহু সমস্যা থাকাই স্বাভাবিক। কিন্তু সমস্যাসমূহে ভুল বোঝার সম্ভাবনা যতটা, তার চেয়ে অনেক বেশি সম্ভাবনা সহযোগিতা দ্বারা সমাধান আনা বা হ্রাস করা। যেমন ধরা যাক অসরকারী বাণিজ্য, শ্রুতিকটু প্রতিশব্দ না হয় না-ই ব্যবহার করলাম। এই বাণিজ্যের একটা কারণ অপ্রয়োজনীয় এবং পরিত্যাজ্য কিছু সরকারী বিধিনিয়ম। এছাড়া অন্যতম হেতু খুব তাড়াতাড়ি বক্রপথে অতিরিক্ত লাভের সন্ধানে অপরাধমূলক প্রচেষ্টা। এক্ষেত্রে দুই দেশের সীমান্ত প্রহরীদের মধ্যে সততা ও সহযোগিতা থাকলে মধ্যরাতে যে অপরাধী নিষিদ্ধ দ্রব্য নিয়ে যাতায়াত করছে তার বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ ও জীবননাশ এড়ানো যায়। দুই দেশের সরকারের রাজস্বও বৃদ্ধি করা যায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, অপরাধীদের মধ্যে মাদকদ্রব্য ও আগ্নেয়াস্ত্রের আদান-প্রদান, যা সন্ত্রাস প্রবর্ধনে সহায়ক তাও রোধ করা যায়।

ভারত একটি বিশাল দেশ এবং অনেক রাজ্যের সমন্বয়ে একটি যুক্তরাষ্ট্র। কেন্দ্র-রাজ্য সমন্বয় সঠিকভাবে এবং সময়মতো না হলে কিছু কিছু আন্তর্জাতিক সমস্যার সমাধানে বিলম্ব ঘটে। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশের সঙ্গে স্থলসীমান্ত চুক্তি ১৯৭৪ সালে স্বাক্ষরিত হলেও শেষ পর্যন্ত কাজে পরিণত হয় ১ আগস্ট ২০১৫ সালে। এর একটা প্রধান কারণ ছিল, পশ্চিমবঙ্গের একজন রাজনৈতিক নেতা এর বিরুদ্ধে বিচারালয়ের শরণাপন্ন হন; মামলা মিটতে বেশ কয়েক বছর ব্যয় হয়। কিন্তু তারপরেও দীর্ঘকাল যে ঐ চুক্তি নিয়ে অগ্রগতি হয়নি তার কারণ যদি আমাদের প্রশাসনিক রাজনৈতিক ঔদাসীন্য বলা যায়, সেটা বোধ করি অন্যায় হবে না। কিন্তু স্থলসীমান্তের ব্যাপারে এখনও অনেক কাজ অসম্পূর্ণ আছে। ছিটমহল বিনিময় অবশ্যই তাৎপর্যপূর্ণ। কিন্তু সীমান্ত এখনও চিহ্নিত হয়নি। এজন্য ধ্বংসপ্রাপ্ত সীমান্ত স্তম্ভগুলোর পুনর্নির্মাণ বিধেয়। বাংলাদেশের দিনাজপুর জেলার কিছু জমি-জরিপ দলিল ভারতের দক্ষিণ দিনাজপুরে আছে, তেমনি দক্ষিণ দিনাজপুরের কিছু দলিল বাংলাদেশে আছে। এগুলোর আদান-প্রদানও অত্যাবশ্যক। এতদ্ব্যতীত, স্থলসীমান্তে পরিকাঠামো উন্নয়ন বিশেষ জরুরী। স্থল শুল্ক কেন্দ্র, স্থল বন্দর, ইত্যাদি প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে প্রচেষ্টা অব্যাহত। সমন্বিত যানবাহন সামগ্রী অভিবাসী পরীক্ষা কেন্দ্র স্থাপনের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ঘটেছে। প্রসঙ্গত, ১৫ জুন ২০১৫ সালে স্বাক্ষরিত বাংলাদেশ-ভুটান-ভারত-মিয়ানমার মোটরগাড়ি চলাচলের চুক্তির সম্ভাবনাও বিশাল।

এভাবেই প্রচলিত অভিযোগ-প্রভিযোগের বৃত্ত অতিক্রম করে সহযোগিতার পথ যে ক্রমাগত প্রশস্ত করা হচ্ছে সেটা হয়ত যথাযথ প্রচার লাভ করে না। বাংলাদেশ যে আমদানি-রফতানির ক্ষেত্রে প্রক্রিয়া ও কাগজপত্রের ভার অনেকটা লঘু করেছে সেটা অনুকরণযোগ্য, কিন্তু তারও যথেষ্ট প্রচার নেই। ভারত যে বৈদ্যুতিক তথ্য বিনিময়ে পদক্ষেপ নিয়েছে সেটাও অনুসরণীয়। ভারতের মিজোরাম, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সড়ক যোগাযোগ সম্প্রসারণের জন্য আন্তর্জাতিক অর্থভা-ার যে ঋণমঞ্জুর করেছে সেটাও এই প্রসঙ্গে মনে রাখতে হবে।

ভারত-বাংলাদেশ জলপথে যোগাযোগ দীর্ঘদিন সমস্যা জর্জরিত ছিল। সুদূুর কলম্বো-সিঙ্গাপুর বন্দর মারফত বাণিজ্য পরিচালিত হতো। বৃহদাকার জাহাজ ব্যবহৃত হতো। সম্প্রতি সমুদ্র যান চলাচলের ব্যয় হ্রাস ও বাণিজ্য বৃদ্ধির সুযোগ উন্মুক্ত হয়েছে। ক্ষুদ্রাকার জাহাজ ভারতের পূর্বাঞ্চলের বন্দর থেকে সরাসরি চট্টগ্রাম ও অন্যান্য বন্দরে যাতায়াতে সক্ষম। উপকূল এলাকায় যাতে নদীপথের উপযোগী নৌযান বাণিজ্যে ব্যবহৃত হয়, সে ব্যবস্থাও হয়েছে। কিছু কিছু নদীপথের মাটি-কাদা উত্তোলনের বন্দোবস্ত হলে বাণিজ্য অধিকতর সুগম হবে। বাংলাদেশের বন্দর দিয়ে ভারি যন্ত্রপাতি আনার সুযোগ লাভ করায় ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য পালাটানায় যে বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণ করেছে, তার জন্য বাংলাদেশে ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত সরবরাহ সম্ভব হয়েছে। ভারত থেকে ডিজেল প্রেরণও আয়ত্তাধীন। এভাবে আবারও দেখা যায় যে সহযোগিতার পথে নানা প্রতিবন্ধক দূর করা যায়।

এবারে নদীর জলবণ্টন সমস্যার দিকে দৃষ্টিপাত করা যাক। যদিও গঙ্গায় জলপ্রবাহের পরিমাণ সংশ্লিষ্ট কিছু প্রশ্ন অমীমাংসিত, তথাপি গঙ্গার সমস্যা যেন পশ্চাদভূমিতে চলে গিয়েছে। এখন সামনে এসেছে তিস্তা। এক্ষেত্রেও অভিযোগের অডিশনে সহযোগিতার অভিসারের বাস্তব সম্ভাবনা উপেক্ষিত। অন্যতম ভারতীয় রাজ্য সিকিমের উত্তরাঞ্চলে হিমালয়ের হিমবাহ হ্রদ থেকে তিস্তার উৎপত্তি। এরপরও পূর্ব ও পশ্চিম সিকিমের কয়েকটি নদী তিস্তাকে সমৃদ্ধ করেছে। পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশের পূর্বে তিস্তা মধ্য সিকিমের ৩২০ সেমি বৃষ্টিপাতে সমৃদ্ধ হয়ে (সেভকের করোনেশন ব্রিজের দক্ষিণে) যে সুবিশাল আকার ধারণ করেছে, তা পর্যবেক্ষণ করলে শুষ্ক ঋতুতে পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাঞ্চল ও বাংলাদেশের প্রয়োজন মেটানোর আশা সঞ্চার হবে। পার্বত্য জলপ্রবাহকে সেচের কাজে ব্যবহার করা যায় না। অতএব জলবিদ্যুত উৎপাদন সিকিমের কাছে অপরিহার্য। কিন্তু শুষ্ক ঋতুতে জলবিদ্যুত উৎপাদনের জন্য যে বাঁধ-জলভা-ার ইত্যাদি নির্মাণ আবশ্যক, সিকিম তা করেনি। অতএব, মে মাসের পর থেকে বিশাল পরিমাণ তিস্তার জল সিকিমের নিচে প্রবাহিত হয়। বাস্তবে, তিস্তার প্রধান অংশীদার সিকিম বঞ্চিতই থেকেছে। তিস্তার সম্পদের সম্পূর্ণ ব্যবহারের জন্য প্রয়োজন প্লাবন খাল নির্মাণ। তিস্তা এবং তার পূর্বের ও পশ্চিমের নদীগুলোর সঙ্গে বন্যাপ্রবাহ সংরক্ষণ ও বণ্টনের এক বিন্যাস গড়ে তুললে বাংলাদেশের আত্রাই, করতোয়া ইত্যাদি নদীগুলোও পুষ্ট হবে। বর্ষার বন্যা পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাঞ্চল ও বাংলাদেশকে ভীতিপ্রদভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ প্লাবনকালীন জলের ব্যবহার দুই দেশকে সমানভাবে উপকৃত করতে পারে।

প্রকৃতপক্ষে, ন্যূনতম ২০০ সেমি বার্ষিক বৃষ্টিপাতের এলাকায় জলের ঘাটতি থাকতে পারে না। প্রশাসনিক রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কর্মোদ্যোগের প্রয়োগে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন সমন্বিত পরিকল্পনা বিবেচিত না হওয়ায় আপাত অভাব-অভিযোগের মানসিকতা উদ্ভূত হয়েছে।

শেষত নিরাপত্তা। এর সঙ্গে জড়িত আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ। আন্তর্জাতিক সীমান্ত বরাবর জঙ্গীদের নিয়মিত যাতায়াত সুবিদিত। নিষিদ্ধ মাদক ব্যবসা জঙ্গীগোষ্ঠীসমূহের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক ভিত্তি। ভারত আফিম চাষ নিয়ন্ত্রণে মোটামুটি সক্ষম, এটা বলা যায়। কিন্তু বাংলাদেশ কতটা সফল, আমার জানা নেই। অথচ নতুন নতুন জঙ্গী সংস্থা, যেমন আইএস, এই উপমহাদেশে যাতে ঘাঁটি তৈরি করতে না পারে, সে জন্য মাদকদ্রব্যের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ একটি অত্যাবশ্যক পদক্ষেপ।

ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোতে জঙ্গী কার্যকলাপ দমনে ও প্রশমনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান বাংলাদেশ সরকার যে ব্যাপক ব্যবস্থা নিয়েছে সেটা ভূয়সী প্রশংসার দাবি রাখে। এখন প্রয়োজন দুই দেশের কারাবন্দী প্রত্যর্পণ নীতি অনেক বেশি শক্তিশালী ও সংহত করা। দুই দেশের কারাগারেই অপর দেশের অপরাধীরা বন্দী রয়েছে। তাদের তালিকা বিনিময়ও হয়েছে। কিন্তু তৎপরবর্তী বন্দোবস্ত আমার জানা নেই। দুই দেশের নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা বাহিনীর মধ্যে জঙ্গী দমনে কতটা সমন্বয় আছে, সেটাও আমার অজানা। এ ব্যাপারে দুই দেশের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ ও পদক্ষেপ দৃশ্যমান হওয়া জরুরী। সমন্বিত সহযোগিতার বিকল্প নাই এই উপলব্দি সবার মাঝে জাগতে হবে।

লেখক : ভারতের জাতীয় অধ্যাপক