১২ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বেগম জিয়ার পতনকাল

  • এম শাহজাহান মিয়া

গত ১৯ মার্চ বেগম জিয়ার কণ্ঠে হঠাৎ উচ্চারিত অত্যন্ত অগণতান্ত্রিক ও অশনিগর্জন সারাদেশে প্রচ- নিন্দার ঝড় তুলেছে। ধৃষ্টতাপূর্ণ ও ঘৃণ্য এ বক্তব্যের প্রতিবাদে গণমানুষের হৃদয়ের গভীর থেকে উৎসারিত স্বতঃস্ফূর্ত ধিক্কারের ঢেউ দেশের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে প্রচ- আক্রোশে আছড়ে পড়েছে। তাই দেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাও নিশ্চুপ বসে থাকতে পারেননি। স্পষ্টবাদী জননেত্রী অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় তাঁর যথাযথ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। সঙ্গত কারণেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটি প্রশ্ন তুলেছেন যে, বেগম জিয়া ‘হাসিনাবিহীন নির্বাচন’-এর কথা বলে আরেকটি ২১ আগস্টের মতো তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্র করছেন কি না। তিনি বলেন, ‘হাসিনাবিহীন নির্বাচনের কথা বলে খালেদা জিয়া আরও ষড়যন্ত্রের ঘোট পাকাচ্ছেন কি না? এছাড়া তার সামনে আর কোন পথ নেই। উনি তো ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত ছাড়া আর কিছুই বোঝেন না। আরেকটি ২১ আগস্টের মতো আবারও গ্রেনেড হামলা করে আমাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করছেন কি না কে জানে। তবে রাখে আল্লাহ মারে কে! শকুনের দোয়ায় কখনও গরু মরে না। আল্লাহ যতদিন জীবন রেখেছেন, ততদিন দেশের মানুষের মঙ্গলের জন্য কাজ করে যাব। কোন ষড়যন্ত্রই আমাকে এ ব্যাপারে রুখতে পারবে না।’

ঐতিহাসিকভাবে সত্য ও স্বীকৃত ৩০ লাখ শহীদের মহান আত্মদানের বিষয়টি নিয়ে জঘন্য প্রশ্ন তুলেছিলেন তিনি। এমন ধৃষ্টতাপূর্ণ উক্তি শহীদদের আত্মার প্রতি অবমাননারই শামিল। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার দীর্ঘ ৪৪ বছর পর মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের সংখ্যা নিয়ে বেগম জিয়ার অমার্জনীয় উক্তি দেশের সর্বস্তরের মানুষকে হতবাক করেছিল। খালেদা জিয়ার ঐ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নির্লজ্জ মিথ্যাচারে দেশের মানুষ ক্ষোভে-বিক্ষোভে ফেটে পড়েছিল। মহান শহীদদের সংখ্যা নিয়ে এমন চরম বিতর্কিত প্রশ্ন তুলে বিএনপি নেত্রী তার নগ্নরূপকে আবারও জাতির কাছে প্রকাশ করেছিলেন। দেশের মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে চরম ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত মুক্তিকামী বাঙালীর হৃদয়ের গভীরে নিদারুণ আঘাত হেনেছিল বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া। দেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে শহীদদের সরকারী ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পরিসংখ্যান অস্বীকার করে বেগম জিয়া তার ধবল সাদা চেহারার আড়ালে লুকিয়ে থাকা কুৎসিত ঘৃণ্য চেহারাটিই উন্মোচন করেছিলেন। তিনি এমন মন্তব্য করে নিজেকে বিকৃতমনা ও বিকারগ্রস্ত মানুষ বলেই প্রমাণ করেছিলেন। দেশের তিনবার (একবার অবশ্যই ভুয়া) প্রধানমন্ত্রী হয়ে যাওয়া বেগম জিয়ার বক্তব্য এ দেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসকে কলঙ্কিত করেছিল। তার বক্তব্যে পাকিস্তানী ও রাজাকারদের বক্তব্যই প্রতিধ্বনিত হয়েছিল। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর চিহ্নিত ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীর বিচারের দাবি এদেশে যখন জোরদার হয়ে উঠছে ঠিক তখনই পাকিস্তানী ও যুদ্ধাপরাধী জামায়াতে ইসলামীর বক্তব্যের প্রতিধ্বনি শোনা যায় খালেদা জিয়ার কণ্ঠে। খালেদার দোসর পাকিস্তানীরা ও তাদের এদেশীয় দোস্ত যুদ্ধাপরাধীদের অপকর্ম হালকা করে দেখানোর হীন অপপ্রয়াস প্রতিভাত হয়ে উঠেছিল বেগম জিয়ার বক্তব্যে। যুদ্ধাপরাধীদের প্রতি সমর্থনও ফুটে উঠেছে তার মন্তব্যে। এটা অত্যন্ত গর্হিত কাজ। ক্ষমার অযোগ্য রাষ্ট্রবিরোধী অপরাধ। একাত্তরে স্বাধীনতাযুদ্ধকালে তিনি তার প্রিয় পাকিস্তানের পাকিস্তানীদের কাছে যেমন পেয়ারের মানুষ ছিলেন, এখনও তাই আছেন বলে আরও একবার প্রমাণ করেছিলেন। পাপী পাকিস্তানী ও যুদ্ধাপরাধী জামায়াতের বক্তব্য তার কণ্ঠে প্রতিনিয়তই প্রতিধ্বনিত হয়। একাত্তরের বিভিন্ন রণাঙ্গনে ও দেশের প্রায় সর্বত্র অকুতোভয় বঙ্গশার্দূল মুক্তিযোদ্ধারা জীবনের মায়া ত্যাগ করে মাতৃভূমিকে শত্রুমুক্ত করতে যুদ্ধ করেছেন। আর খালেদা জিয়া ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে পাকিস্তানী সেনাদের পরম আদর-যতœ-আপ্যায়নে সিক্ত হয়ে আরাম-আয়েশে দিন কাটিয়েছেন। তিনি ছিলেন আনন্দ-উল্লাসে বিভোর, বিহ্বল। তিনি কিভাবে জানবেন যে, দেশের অন্যত্র তখন কি ঘটেছিল, বাঙালীদের জীবনের ওপর দিয়ে কি নিদারুণ ঝড় বইয়ে গিয়েছিল? তাই সবার ধারণা তার পেয়ারে পাকিস্তানীদের নৃশংসতা ও সব দুষ্কর্মের কাহিনী আড়াল করার উদ্দেশ্যেই একাত্তরে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে অবস্থান করে পরম পরিতৃপ্তির সঙ্গে পাকিস্তানীদের মেহমানদারিত্ব উপভোগ করা খালেদা অত্যন্ত সুকৌশলে ও পরিকল্পিতভাবেই ইতিহাস বিকৃতকারী বক্তব্য দিয়েছিলেন।

তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের ধারা অব্যাহত রেখে বেগম জিয়া ১৯৯১-৯৬ সালে পার্লামেন্টে সংসদ নেত্রী হয়েও এক অধিবেশনে বিরোধী দলের এক বিজ্ঞ সদস্যকে বেয়াদব বলার ধৃষ্টতা প্রদর্শন করেছিলেন। ঐ সংসদে একজন সদস্যকে ‘চোরের মতো পালিয়ে যাচ্ছে বলেও মন্তব্য করেছিলেন তিনি। ২০১৩ সালের ২৯ ডিসেম্বর তার বাসার সামনে রুদ্রমূর্তি ধারণ করে প্রচ- উন্মত্ততায় এক নিঃশ্বাসে বেগম জিয়া পুলিশের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘এই যে মহিলা, এখন মুখটা বন্ধ কেন? দেশ কোথায়, গোপালী? গোপালগঞ্জ বলে কিছু থাকবে না। গোপালগঞ্জ জেলার নামই বদলিয়ে দেব, বুঝছেন?’ মহিলা পুলিশদের ওপর তার খবরদারি, গালাগালি ও গলাবাজি ওখানেই শেষ হয়নি। তাদের চুপ বেয়াদব বলেও তার রাগ কমেনি। প্রশ্নটি হলো, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মস্থান গোপালগঞ্জের প্রতি এমন চরম ধৃষ্টতাপূর্ণ উক্তি দেশের টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে প্রচারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সারাদেশে শুরু হয়ে যায় নজিরবিহীন তোলপাড়। দেশের সর্বস্তরের মানুষ ক্ষোভে-বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। বাংলাদেশের স্থপতি স্বপ্নদ্রষ্টার জন্মস্থানের প্রতি চরম অবজ্ঞা প্রদর্শন ও কটূক্তির প্রতিবাদে দেশের সর্বত্র নিন্দার ঝড় ওঠে। বিষয়টি বুঝতে আমি একেবারেই অক্ষম যে বঙ্গবন্ধুর প্রতি খালেদা জিয়ার পাহাড়সম শ্রদ্ধাবোধ থাকার কথা, সেই খালেদা জিয়া কি কারণে বারবার বঙ্গবন্ধুর প্রতি অশ্রদ্ধা প্রকাশ করেন। এ কথা তো দেশের মানুষের কাছে ধ্রুবতারার মতো সত্য যে, যখন অত্যন্ত সঙ্গত কারণে জিয়াউর রহমান তার স্ত্রী বেগম জিয়াকে বাংলাদেশ হওয়ার পরে নিজ ঘরে জায়গা দিতেন না বলে সেদিনের পুতুল (আজকের বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া) বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৩২ নম্বর ধানম-ির বাসায় গিয়ে বসে থাকতেন বাঙালী জাতির গৌরব মহান নেতার সঙ্গে দেখা করার জন্য। বঙ্গবন্ধুর স্ত্রী বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিবের কাছে সব শুনে একদিন বঙ্গবন্ধু জিয়াউর রহমানকে ডেকে সেদিনের পুতুল এবং আজকের খালেদাকে তার স্বামীর হাতে উঠিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, ‘এই জিয়া কি শুনছি, যা, আর যেন কিছু না শুনি। ‘ও’ আমার মেয়ের মতো।’ কথায় আছে লজ্জাহীনদের আর লাজলজ্জার কোন বালাই থাকে না। অনেকে বলেন বেগম জিয়ার বেলায় কথাটি অনেকটাই সত্যি। হিংস্্র হানাদার পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে সম্মুখ সমরসহ দেশের আনাচে-কানাচে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাংলার দামাল ছেলেরা যখন মরণপণ যুদ্ধে লিপ্ত তখন অনেকটা নিরাপদ ঢাকার পাকিস্তানী সেনানিবাসের সুন্দর পরিবেশে প্রাসাদোপম ভবনে বেগম জিয়া মহা শান-শওকতে দিন গুজরান করছিলেন। সীমান্তের ওপারে নিজের স্বামী মেজর জিয়াউর রহমানের কাছে যাওয়ারও এতটুকু চেষ্টা করেননি। জিয়াউর রহমান যেভাবেই হোক যুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন। ভারতেও গিয়েছিলেন। পরের কাহিনী সবারই কমবেশি জানা। প্রাণপ্রিয় সুন্দরী স্ত্রী খালেদাকে (পুতুল) নিজের কাছে নেয়ার জন্য একাধিকবার লোক পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি যাননি।

ঢাকঢোল পিটিয়ে অনেক উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে ছয় বছর পর অনুষ্ঠিত কাউন্সিলে বিএনপি হাইকমান্ড মনে করেছিল তাদের নেত্রী প্রদত্ত ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্যে শুধু দলীয় নেতাকর্মীরাই নয়, সাধারণ মানুষও উদ্দীপ্ত হবে। কিন্তু সে গুড়ে হয়েছে একেবারে বালি। তা একদম মাঠেই মারা গেছে। তারপরও কিছু নেতা চামচার মতো খালেদা জিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য বেশ গলাবাজি করে যাচ্ছেন। দীর্ঘ ছয় বছর পর দলীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হলেও নানাভাবে নানারূপ হিসাব-নিকাশ করে তাদের মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে এখনও ভর করে আছে চরম হতাশা। উপরন্তু জামায়াত, যুদ্ধাপরাধী ও জঙ্গীবাদের সঙ্গে সম্পৃক্ততা সম্পর্কে কাউন্সিল থেকে কোনরূপ ঘোষণা না আসায় দলের সমর্থকরা নাখোশ হয়েছেন। আর বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার মুখ থেকে যুদ্ধাপরাধী ও জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে কোনরূপ বক্তব্য আশা করা দুরাশা মাত্র। এ অবস্থায় মাঠ পর্যায়ে নেতাকর্মীদের চাঙ্গা করার উদ্দেশ্যে খালেদা জিয়ার তরফ থেকে ‘ভবিষ্যত আমাদেরই’ বলে যে ঘোষণা দেয়া হয়েছে তাতেও তেমন কোন কাজ হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না। তদুপরি বিএনপির কাউন্সিলে ঘোষিত ভিশন-২০৩০ খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক বিভ্রান্তি সৃষ্টির একটি পরিকল্পিত অপপ্রয়াস মাত্র। ফাঁকা বুলি ছাড়া আর কিছুই নয়। এটা আসলে অনেক বছর আগেই আওয়ামী লীগ প্রণীত ভিশন-২০২১ ও ভিশন-২০৪১-এর আলোকেই প্রণয়ন করা হয়েছে। বেগম জিয়া দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করার কথা বলেছেন। যা অত্যন্ত হাস্যকর। কারণ, ইতোমধ্যেই বর্তমান সরকার দেশকে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করেছে। ২০২১ সালের মধ্যে দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করার লক্ষ্যে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার মাধ্যমে দৃঢ়ভাবে নানা কার্যক্রম শুরু করে দিয়েছে বর্তমান সরকার। যে যাই বলুক, অনেকের মনেই বিষয়টি বদ্ধমূল হয়ে আছে যে, বিএনপি বিগত নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে যে ভুল করেছে তারই খেসারত দিতে হচ্ছে এখন এই দলটিকে। কথাটি তো দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে, পাকিস্তান প্রেমে মশগুল খালেদা জিয়া পাকিস্তানের ঘৃণ্য গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই এবং এদেশে তার রাজনীতির দোসর জামায়াতে ইসলামীর ইশারায়ই বিএনপি ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির সাধারণ নির্বাচনে অংশ নেয়া থেকে বিরত থাকে। তাছাড়া, তৃণমূল পর্যায়ে কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে হতাশা এতটাই প্রকট হয়েছিল যে, বারবার আন্দোলনের হুমকি দিয়েও তারা সরকারবিরোধী অন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি। উপরন্তু, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানসহ বিএনপির সিনিয়র নেতাদের মধ্যে অনেকেই বিভিন্ন মামলায় ফেঁসে যাওয়ায় তারা এখন চারদিকে অন্ধকার দেখছেন। খালেদা জিয়ার আবোল-তাবোল তর্জন-গর্জন ও প্রলাপ বকা তারই পরিচয় বহন করছে।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট