১৭ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

নারী ভোটারের আধিক্য

নারী ভোটারের আধিক্য
  • দু’একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া সর্বত্র পরিবেশ ছিল সুষ্ঠু, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রামে মহিলা ভোটারের উপস্থিতি ছিল নজরকাড়া, মুন্সীগঞ্জে ভোটের মেলা, নীলফামারীতে ভোটাররা গণপিটুনি দেয় সন্ত্রাসীকে

সমুদ্র হক/আবু জাফর সাবু/রাজু মোস্তাফিজ/ মীর নাসিরউদ্দিন উজ্জ্বল/ তাহমিন হক ॥ চৈত্রের মাঝপথে রোদের তাপ তেমন না থাকায় মৃদুমন্দ ফুরফুরে বাতাসে ভোটাররা স্বাচ্ছন্দ্যেই কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে পেরেছেন। দুয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া পরিস্থিতি ছিল শান্তিপূর্ণ। এলাকাবাসীর কথা : দুই পক্ষের ধাওয়া এখন স্বাভাবিক বিষয়। যতটা না ঘটনা তার চেয়ে ছোটাছুটি হয় বেশি। বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় দফায় বগুড়ার শিবগঞ্জ ও সোনাতলা উপজেলার ১৮ ইউনিয়নের ভোটগ্রহণ শেষ সময় পর্যন্ত সুষ্ঠুভাবেই শেষ হয়েছে। বড় কোন অঘটন ঘটেনি।

সকাল দশটায় শিবগঞ্জ ইউনিয়নের শিবগঞ্জ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়ে চোখে পড়ে ভোটপ্রদানের জন্য সারিবদ্ধ হয়ে আছেন ভোটাররা। কোন হৈচৈ নেই। ভোট কক্ষের সামনে দাঁড়ানো আনসার সদস্যরা কক্ষে প্রবেশে সহযোগিতা করছেন। ভোটাররা এখন এতটাই সচেতন যে দ্রুতই পোলিং অফিসারের কাছ থেকে ব্যালট পেপার বুঝে নিয়ে গোপন কুঠুরিতে গিয়ে সিল দিয়ে বাক্সে ভরে দিচ্ছেন। প্রিসাইডিং অফিসার মাহবুবুর রহমান বললেন, কেন্দ্রের মোট ভোটার ২ হাজার ২শ’১৪ জনের মধ্যে ওই সময়ে ৩০ শতাংশ ভোটগ্রহণ হয়েছে।

বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শিবগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে কিছুটা পাকা পথে যাওয়ার পর পূর্ব দিকের প্রায় ৩ কিলোমিটার কাঁচা পথ ধরে নিভৃত গ্রাম দেবিপুরে চোখে পড়ল মেলায় যাওয়ার মতো লোকজন ছুটছে সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এই কেন্দ্রেই গ্রামের ২ হাজার ৩শ’ ভোটারের ভোটপ্রদানের ব্যবস্থা হয়েছে।

উথুলি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোট কেন্দ্রের কাছাকাছি আরেকটি বেসরকারী স্কুলে ভোট কেন্দ্র করা হয়েছে। বেলা ১১টায় সরকারী প্রাথমিক স্কুল কেন্দ্রে গিয়ে চোখে পড়ে নারী ভোটাররা বেশি এসেছেন। ভোটার রাশেদা বেগম বললেন, আগে ভোট দিয়ে তারপর গৃহস্থালি কাজ করবে তাই সকালেই তারা আসেন। দেখা গেল নারী-পুরুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করছেন।

বগুড়া জেলা সদর থেকে উত্তর-পশ্চিমে প্রায় ২২ কিলোমিটার দূরে শিবগঞ্জ উপজেলা। সেখানে থেকে চারদিকে ১০/১৫ কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে ১২টি ইউনিয়ন। বেলা বারোটার দিকে মাঝিহট্ট ইউনিয়ন থেকে খবর আসে দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া শুরু হয়েছে। দ্রুত পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে। এলাকার লোকের কথা এই ধাওয়াগুলোকেই তারা সহজ হিসেবে নিয়েছেন। কিছু সময়ের মধ্যে সবই স্বাভাবিক হয়ে যায়।

এদিকে সোনাতলা উপজেলার ৬ ইউনিয়নের মধ্যে পাকুল্লা ইউনিয়ন পরিষদের পদ্মপাড়া প্রাথমিক স্কুল ভোট কেন্দ্রের বাইরে বাগ্বিত-ায় এক ব্যক্তি ছুরিকাহত হন। তিনি বিএনপির মনোনয়নের চেয়ারম্যান প্রার্থীর চাচাত ভাই বলে জানা যায়। বেলা আড়াইটার দিকে সোনাতলা সদর ইউনিয়নের রানীরপাড়া সরকারী প্রাথমিক স্কুল কেন্দ্রে দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া শুরু হলে র‌্যাব গিয়ে লাঠিচার্জ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

বগুড়ার দুই উপজেলার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের সার্বিক চিত্র হলো : ভোটগ্রহণের শেষ সময় পর্যন্ত সুষ্ঠুভাবেই আনন্দঘন পরিবেশেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে।

গাইবান্ধা ॥ গাইবান্ধায় প্রথম দফা ইউপি নির্বাচনে সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ১২টি ইউনিয়নে বিপুলসংখ্যক ভোটারের উপস্থিতিতে এবং উৎসাহ-উদ্দীপনায় শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ করা হয়। বৃহস্পতিবার সরেজমিনে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত বিভিন্ন ভোট কেন্দ্র পরিদর্শন করে এ তথ্য জানা যায়।

প্রতিটি কেন্দ্রে বিশেষ করে সকাল ৮টা থেকে ১১টা পর্যন্ত ধোপাডাঙ্গা ইউনিয়নের ধোপাডাঙ্গা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, ধোপাডাঙ্গা পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্র, বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের খামার মনিরাম, বামনডাঙ্গা বালিকা বিদ্যালয় এবং ছাপড়হাটি ইউনিয়নের খামার পাঁচগাছি, উত্তর মরুয়াদহ, শোভাগঞ্জ মডেল হাইস্কুল ও হাজীর স্কুল ভোট কেন্দ্রে সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করে প্রতিটি কেন্দ্রে বিপুলসংখ্যক মহিলা ভোটারের উপস্থিতি পরিলক্ষিত হয়। তবে ভোটগ্রহণ পদ্ধতি অত্যন্ত মন্থর হওয়ায় প্রতিটি কেন্দ্রে প্রখর রোদে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ভোট দিতে গিয়ে ভোটারদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। এছাড়া শান্তিরাম ইউনিয়নের পাঁচগাছি শান্তিরাম, খামার ধুবনী, রামজীবন ইউনিয়নের বাজারপাড়া বিদ্যালয় ভোট কেন্দ্রে দুপুর ২টার মধ্যে শতকরা প্রায় ৬০ ভাগ ভোট প্রদত্ত হয়েছে বলে পরিলক্ষিত হয়। ভোটগ্রহণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ৭৫ থেকে ৮০ ভাগ ভোট প্রদত্ত হবে। এ খবর লেখা পর্যন্ত কোন ভোট কেন্দ্রে কোন গোলযোগের খবর পাওয়া যায়নি।

জেলার ৮২টি ইউনিয়নের মধ্যে প্রথম দফায় সুন্দরগঞ্জের ১৫টি ইউনিয়নের মধ্যে ১২টি ইউনিয়নে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ইউনিয়নগুলো হচ্ছেÑ বামনডাঙ্গা, সর্বানন্দ, রামজীবন, সোনারায়, ধোপাডাঙ্গা, তারাপুর, দহবন্দ, বেলকা, শ্রীপুর, ছাপরহাটি, শান্তিরাম ও কঞ্চিবাড়ী। এর মধ্যে হরিপুর ইউনিয়নে মেয়াদোত্তীর্ণ না হওয়ায় এবং কাপাসিয়া ও চন্ডিপুর ইউনিয়নে সীমানা নির্ধারণসংক্রান্ত জটিলতায় উচ্চ আদালতের আদেশে নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে।

এসব ইউনিয়নে ১১৫টি কেন্দ্রের ৭৫৪টি বুথে ভোটগ্রহণ করা হয়।

কুড়িগ্রাম ॥ সারাদেশের ন্যায় দ্বিতীয় দফায় কুড়িগ্রামের ২টি উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নে বৃহস্পতিবার ভোটগ্রহণ করা হয়। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার কারণে অবাধ ও শান্তিপূর্ণভাবে গ্রহণ শেষ হয় ভুরুঙ্গামারী ও চিলমারী উপজেলায়। সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত টানা ভোটগ্রহণ কালে কোথাও কোন অপ্রীতিকর ঘটনার সংবাদ পাওয়া যায়নি। দুই উপজেলায় মহিলা ভোটারদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। র‌্যাব, বিজিবি, পুলিশ এবং আনসারসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যাপক তৎপরতা চোখে পড়ে। ১৩টি ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে ৫৯ জন ও কাউন্সিলর পদে ৪৩৩এবং সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর পদে ১৬৬ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেন জানান, জেলার ৩টি উপজেলার মধ্যে ২টি উপজেলায় নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠিত হয়। সীমানাসংক্রান্ত মামলায় হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা থাকায় রাজিবপুর উপজেলায় ৩টি ইউনিয়নের নির্বাচন কার্যক্রম স্থগিত রাখা হয়েছে।

ভোটার, প্রার্থী, এজেন্ট সবার মধ্যে ছিল সৌহার্দ্যপূর্ণ ভাব। প্রচ- রোদ উপেক্ষা করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে দেখা যায় নারী ভোটারদের। এছাড়াও বেশিরভাগ বুথ ছিল ছোট পরিসরে ও অন্ধকারাচ্ছন্ন। ফলে প্রথম দুইঘণ্টা ভোটের গতি ছিল মন্থর। এছাড়াও ভোট সেন্টারে সরবরাহকৃত সিল ও কালি নি¤œমানের হওয়ায় ভোটের গতি শ্লথ হয়ে পড়েছিল।

মুন্সীগঞ্জ ॥ “ভোট দিতে পারলে খুশি লাগে...” বলেই অট্টহাসি দেন বাসাইলভোগ গ্রামের বৃদ্ধা সুফিয়া বেগম। ছোট ভাইয়ের স্ত্রী শামীমা চৌধুরীর কাঁধে ভর করে কেন্দ্রে এসেছেন। বয়সের ভারে ন্যুব্জ সুফিয়া বেগম আরও বলেন, জীবনে বহুবার ভোট দিয়েছি। এইবারও ভোট দিলাম। ভোট কেন্দ্রটি দেইখ্যা মনটা ভাল হইয়া গেছে। কত মানুষ হাসিমুখে লাইনে, এমন চিত্র দেইখ্যাই বুঝবার পারছি ভোটের দাম আছে। পঁচাত্তর বছর বয়সী সুফিয়ার মতো বাসাইলভোগ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে নানা বয়সী মানুষের ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। কেন্দ্রটি মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার পাটাভোগ ইউনিয়নের। তখন বেলা ১০টা। পাশের সুরদিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেল আরও উৎসবমুখর। এটি কুকুটিয়া ইউনিয়ন। দলে দলে ভোটাররা কেন্দ্রে আসছে। নারী ভোটারের সংখ্যাই বেশি। সাজুগুজু করে সবাই যেন ভোট কেন্দ্রমুখী। কুকুটিয়া উত্তরপাড়া গ্রামের বাহাত্তর বছরের বৃদ্ধা জামিলা বেগম ভোট কেন্দ্রের বারান্দায় বসা। বেশি বয়স্ক বলে তাকে আগে ভোট দেয়ার সুযোগ দেয়া হবে বলে বসিয়ে রাখা হয়েছে। পাশের আরেক বৃদ্ধা একই গ্রামের মনোয়ারা বেগম। আর লাইনে দাঁড়িয়ে পঁচাত্তর বছরের আব্দুল হামিদ। সকলেরই একই কথাÑ ভোটটা দিতে পারলে একটা দায়িত্ব সম্পন্ন হয়। বৃদ্ধ বয়সেও তাদের ভোট দেয়ার বেশ আগ্রহ লক্ষ্য করা গেছে। আটপাড়া ইউনিয়নের কল্লীগাঁও সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভোটারের সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। সরু রাস্তা এবং কেন্দ্রে পাশে খালি জায়গা না থাকায় পাশের জমিতেই প্রার্থীরা চেয়ার টেবিল নিয়ে বসেন ভোটার স্লিপ দেয়ার জন্য। সকাল ৯টায় চালের দোকানি আব্দুল করিম (৬০) লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে। এই লাইনে রয়েছেন তিনগাঁও গ্রামের সাত্তার শেখ (৭০)। আর নারী ভোটার লাইনে দাঁড়ানো একই গ্রামের নতুন ভোটার টুম্পা দত্ত (২০)। সরকারী শ্রীনগর কলেজের ¯œাতক প্রথম বর্ষের ছাত্রী। টুম্পা ভোট দিতে এসে আনন্দে উদ্বেলিত। এই প্রতিবেদককে বলেন, প্রথম ভোট দেয়ার আনন্দ আমি বুঝছি। এর মধ্যে আলাদা ভাল লাগা আছে। আর উৎসবমুখর পরিবেশে এসে স্বপ্নের মার্কায় ভোট দিব।

বেলা পৌনে ১১টার দিকে শ্রীনগর উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্সে এসই দেখা যায় যেন ভোটের মেলা বসেছে। উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনটিই ভোট কেন্দ্র। আর এর বাইরে পুরো এলাকায়ই প্রার্থীদের নানান ব্যস্ততা। ভোটারদের মন জয়ে প্রার্থী ও কর্মীরা প্রাণন্তকর প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। কেন্দ্রের বাইরে সজ্জিত ক্যাম্প করে চেয়ার টেবিল বসে সেখান থেকে ভোটারদের পরিচিতি নাম্বার দেয়া হচ্ছে। ধানের শীষ নৌকাসহ নানা প্রতীক সাজিয়ে রাখা হয়েছে ক্যাম্পগুলোতে। আর সামনের প্রশস্ত রাস্তায় পোস্টার আর পোস্টার। যেন কোন জায়গাই ফাঁকা নেই। সারি সারি রশিতে ঝুলছে ছবি আর মার্কা সংবলিত সাদা কালো পোস্টার। ভেতরের প্রবেশ করতেই দেখা গেল লম্বা লাইন কেন্দ্রের সীমানা ছাড়িয়ে গেছে। নারী ভোটারদের লাইন এখানেও লম্বা। বাঘড়া ইউনিয়নটি নানা কারণেই দেশে আলোচিত। বাঘড়ার কাঁঠালবাড়ি হাফিজিয়া মাদ্রাসা কেন্দ্রে দুপুর পৌনে ১২টায় নারী-পুরুষের লম্বা লাইন। এখানে তখন পুরুষ ভোটারের লাইন ছিল বেশি লম্বা। লাইনে দাঁড়ানো কাঁঠাল বাড়ি গ্রামের শেখ জামাল উদ্দিন বলেন, আমাগো নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা যতই থাক এবার নিশ্চিন্তায় ভোট দিচ্ছি। দোকানের কাজ গুছিয়ে কেন্দ্রে আসতে দেরি হয়ে গেল। ভাবলিছাম চাপ কম। একই গ্রামের উম্মেহানি বলেন, ভোট আর চেয়ারম্যান-মেম্বার নিয়া অনেক দিন ধইরা নানান অশান্তি। এইবারের ভোট দিতে আইছিল শান্তি করতে।

৬ মাসের জেল ॥ মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচন চলাকালে বৃহস্পতিবার দুই ব্যক্তিকে জেল দিয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। সিরাজদিখানের নয়াগাঁও সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ব্যালট পেপার ছিনতাইয়ের অভিযোগে কামাল হোসেন (৪০) নামে এক ব্যক্তিকে ৬ মাসের জেল দিয়েছে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ইমরুল ইসলাম। অপর দিকে শ্রীনগরের হোসেন আলী উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে এক ভোটারের ব্যাটল নিয়ে তাতে সিল মারার অপরাধে মোঃ আজিককে (২২) ১০ দিনের জেল দিয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ফারুক আহমেদ।

মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলা কোলাপাড়া মাদ্রাসা কেন্দ্রে ভোট গ্রহণের সময় এক মহিলাকে লাঠি পেটার কারণে জনতা এক পুলিশকে আটক করে। দুপুর আড়াইটার দিকে যখন মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছিল তখন ওই ভোট কেন্দ্রের আশপাশে থাকা লোকজন বৃষ্টি হতে বাঁচতে মাদ্রাসা ভোট কেন্দ্রটিতে আশ্রয় নিতে ছুটে আছে। এ সময় দায়িত্বরত সিদ্দিক নামে এক পুলিশ সদস্য জনতাকে লাঠি পেটা করে ধাওয়া করে। রাশিদা বেগম নামে এক মহিলা তার কোলের ছোট শিশুকে নিয়ে যখন ওই কেন্দ্র আশ্রয়ের জন্য যায় তখন ওই পুলিশ রাশিদাকে লাটি দিয়ে আঘাত করলে লাঠির আঘাত গিয়ে লাগে তার কোলের ছোট শিশুর শরীরে। এতে উপস্থিত জনতা ক্ষুব্ধ হয়ে ওই পুলিশ সদস্যকে ঘেরাও করে আটক করে রাখে। এ সম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরে অতিরিক্ত পুলিশ এসে বিক্ষুব্ধ জনতাকে লাঠিপেটা করে ছত্রভঙ্গ করে ওই পুলিশ সদস্যকে উদ্ধার করে।

মোমের আলোতে ভোট ॥ সিরাজদিখান ও শ্রীনগরে দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনে বৃষ্টির কারণে মোমের আলোতে ভোট গ্রহণ হয়েছে। দুপুর ২টার দিকে টানা বৃষ্টি শুরু হলে দেখা দেয় বিদ্যুত বিভ্রাট। অন্ধকার হয়ে যায় দুটি উপজেলা। বিদ্যুত না থাকায় গোপন বুথ হয়ে পড়ে ঘুটঘুটে আন্ধকার আচ্ছান্ন। তাই আলোর জন্য মোমের বাতি জ্বালানো হয়। আর তাতেই ভোটারদের ভোট দান সম্পন্ন হয়।

খেলার মাঠে তাঁবুর নিচে ভোট কেন্দ্র ॥ মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানের চিত্র কোট ইউনিয়নে খেলার মাঠে তাঁবুর নিচে ভোট কেন্দ্রে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। নয়া গাঁও গ্রামের একটি খেলার মাঠে মাথার ওপর ত্রিপল ও তিন দিকে তাঁবুতে ঘেরা ওই কেন্দ্রে ভোটার সংখ্যা ছিল ৮৫১ জন। গোপন বুথ তৈরি করা হয়েছিল তিনটি। খোলা আকাশের নিচে তাঁবুর ঠিক বাইরে বসেছিল পুলিং এজেন্টরা। সকাল ৯টার দিকে ওই কেন্দ্র তেমন কোন ভোটারের উপস্থিতি দেখা যায়নি। তবে দুপুর হতে মুষলধারে বৃষ্টির কারণে ওই কেন্দ্র ভোট গ্রহণ ব্যাহত হয়েছে। প্রিসাইডিং অফিসার মোঃ রফিকুল ইসলাম জানালেন, কোন প্রকার ঝামেলা ছাড়াই শান্তিপূর্ণ ভোট হচ্ছে। ভোটারা ধীরে ধীরে আসছে। খোলা আকাশের নিচে তাঁবুর এই কেন্দ্র ভোট গ্রহণে এক অন্যরকম পরিবেশে ভালই লাগছে।

সিল বিড়ম্বনা ॥ দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনে মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর ও সিরাজদিখানে সিল নিয়ে বিড়ম্বনা হয়েছে। দুই ঘণ্টা নির্বাচন চলার পর প্রায় কেন্দ্রগুলোতে সিল বিড়ম্বনা হয়েছে। সিলের রাবারের অংশটি কাঠের বাঁট থেকে ছুটে যাওয়ায় এ বিভ্রাট দেখা দেয়। কোন কোন কেন্দ্রে সুপারগুলো দিয়ে এ সিল জোড়াতালি দিয়ে ভোট চালানোর চেষ্টা করা হয়। তবে এ কারণে ভোট গ্রহণে নানা জটিলতার সৃষ্টি হয়।

বৃষ্টিতে ভোট ব্যাহত ॥ মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান ও শ্রীনগরে দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনে বৃহস্পতিবার বৃষ্টির জন্য ভোট গ্রহণ ব্যাহত হয়েছে। সকালে উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট গ্রহণ শুরু হলেও বৃষ্টির কারণে তা ভেস্তে গেছে। দুপুরে মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হলে মুহূর্তের মধ্যেই ভোট কেন্দ্রগুলো ফাঁকা হয়ে পড়ে। ভোটার শূন্য হয়ে পড়ে কেন্দ্রগুলো। প্রায় ২ ঘণ্টা চলে প্রবলবৃষ্টিপাত। তবে এই সুযোগটি কাজে লাগাতে ভুল করেনি প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা। বৃষ্টির মধ্যে শ্রীনগরের তন্তর, কুকুটিয়াসহ কয়েকটি ইউনিয়নের বেশ ক’টি ভোট কেন্দ্র দখলে মরিয়া চেষ্টা চালায় কিছু আওয়ামী লীগ প্রার্থীর লোকজন।

নীলফামারী ॥ ‘আমার ভোট আমি দিছি দেখে শুনে বুঝি দিছি।’ কায় জিতিবে কায় হারিবে ওইটা মোর (আমার) বড় কথা নোহায় (না)। মোর ভোট মুই (আমি) নিজে দিছু (দিয়েছি)।

নির্বাচন করিবার আসি যায় নির্বাচনোক ভোট ডাকাতির কথা কইবে তাদের কোমড়ে দড়ি বাঁধি জেলেও পাঠাবার লাগিবে। ভোট কাক, কয় এইবার হামরা দেখুনি বাহে। ভোট কেন্দ্র কায় (কে) দখল করিবে। গু-াপা-া সন্ত্রাসী-ওমরা কেনে, পিপড়া মাছিও সেন্দাবার (প্রবেশ) পারে নাই। শেখের ব্যাটি শেখ হাসিনার সরকার এইবার দেখে দিলো অবাধ সুষ্ঠু ভোট।

দ্বিতীয় দফায় বৃহস্পতিবার নীলফামারীর জেলা সদর উপজেলার ৫টি ইউনিয়নের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচন চলাকালীন এই কথাগুলো বলছিলেন লক্ষ্মীচাপ ইউনিয়নের শীশাতলী বাজারে রূপাকান্ত রায় নামের এক ৬৫ বছরের বৃদ্ধ।

ওই এলাকার বিমল নামের এক দোকানদার বললেন ভোটার হওয়ার পর তিনি এবারসহ ৫টি নির্বাচন দেখেছেন। কিন্তু বিগত সব নির্বাচনকে হার মানিয়ে দিয়েছে এবারের ইউপি নির্বাচন। ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ বিজিবি, র‌্যাব, আনসার বাহিনীর যে কড়াকড়ি ছিল তাতে কারও বাপের সাধ্য নেই ভোট ডাঙ্গে নেয়। সকাল থেকে ভোটাররা সকলে ছুটে গেছে ভোট কেন্দ্রে। লাইনে দাঁড়িয়ে নিজের ভোট প্রদান করে বাড়ি ফিরেছে।

ওই ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায় ভোট কেন্দ্রে বা বাইরে ছিল না কোন জটলা। নিজের ভোট দিয়ে যারা বাড়ি ফিরে গেছে তারা নিজ নিজ বাড়ির সামনে বসে গল্প করছিল। এমন গল্পের আসরে গিয়ে কথা বলি দুবাছরি গ্রামের মমতাজুলের সঙ্গে। তিনি বলেন জীবনে একটা ভোট দেখলাম। আমি খুশি সুষ্ঠু ভোট দেখলাম। এর পরেও যদি বিএনপির লোকজন বলে ভোটে কারচুপি হইছে তাহলে এইবার জনগণ তাদের উচিত শিক্ষা দেবে।

বিভিন্ন ভোট কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায় দুপুর একটার মধ্যেই গড়ে ৭০ ভাগ ভোট প্রদান করে ভোটাররা। দুপুরের পর ধাপে ধাপে এক-দু’জন করে এসে তাদের নিজের ভোট দিয়ে যাচ্ছিল।

প্রশাসনের কড়কড়ি এমন নজরদারিতে স্বাগত জানায় সাধারণ ভোটাররা।

ঠাকুরগাঁও ॥ ইউনিয়ন পরিষদ নিবাচনের দ্বিতীয় ধাপে বৃহস্পতিবার ঠাকুরগাঁও জেলার হরিপুর উপজেলার ৬টি ও রানীশংকৈল উপজেলার ৫টি ইউনিয়নে ২/১টি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়াই শান্তিপূর্ণভাবে ভোট গ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে।

তবে ভোট চলাকালে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে হরিপুর উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের তোররা হাফিজিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে ৪৫টি ব্যালট পেপার এবং বেলা ১টার দিকে দেহট্ট ভবানন্দপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট বাক্স ভাংচুর করে ৩শ’ ব্যালট পেপার ছিনতাই করে সন্ত্রাসীরা। এ সময় র‌্যাবের সদস্যরা উপস্থিত হয়ে সন্ত্রাসীদের ধাওয়া দিলে তারা কয়েটটি ধারালো অস্ত্র ফেলে পালিয়ে যায়। একই ইউনিয়নের মনিপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ব্যালট বাক্স ছিনতাই করতে না পেরে বাক্স ভাংচুর করে। এ সময় একজন সন্ত্রাসীকে গণপিটুনি দেয় সাধারণ ভোটাররা। এই সময় তোররা হাফিজিয়া উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে জেলা প্রশাসক মূকেশ চন্দ্র বিশ্বাস ও পুলিশ সুপার ফারহাত আহমেদ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে এসব ভোটকেন্দ্রে প্রায় দেড় ঘণ্টা ভোট গ্রহণ স্থগিত রাখেন। পরে বেলা ৩টার দিকে বিশেষ ব্যবস্থায় ভোট কেন্দ্রগুলো চালু করা হয়। এদিকে রানীশংকৈল উপজেলার কাশিপুর ইউনিয়নের বৈলোঞ্চা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ২ মেম্বার সমর্থকদের মাঝে সংঘর্ষের ঘটনায় উভয় পক্ষের ৪ জন গুরুতর আহত হলে তাদের বালিয়াডাঙ্গী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

প্রতিটি কেন্দ্রের ফলাফল ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত ব্যাপক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য বিশেষ টহল দল মোতায়েন ছিল।

হরিপুর উপজেলার ছয়টি ইউনিয়ন পরিষদের ভোট কেন্দ্র ছিল ৫৪টি, মোট ভোটার সংখ্যা ৯৭ হাজার ৪শ’ ১ জন। এখানে চেয়ারম্যান পদে ২৭ জন, কাউন্সিলর পদে ২৩১ জন ও মহিলা সংরক্ষিত ৬৯ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।

নির্বাচিত সংবাদ