২০ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

রুদ্ধশ্বাস ম্যাচে ভারতকে হারিয়ে ফাইনালে উইন্ডিজ

রুদ্ধশ্বাস ম্যাচে ভারতকে হারিয়ে ফাইনালে উইন্ডিজ

মিথুন আশরাফ, মুম্বাই থেকে ॥ সেমিফাইনালে ভারত না ওয়েস্ট ইন্ডিজ জিতবে? সেই প্রশ্নের চেয়ে যেন বিরাট কোহলি আর ক্রিস গেইলের যুদ্ধে কে জিতবে? এ প্রশ্নটিই সবার মুখে মুখে ছিল। বৃহস্পতিবার রাতে সেই প্রশ্নের উত্তরও মিলে যায়। কোহলির সামনে পাত্তাই পেলেন না গেইল! কোহলি যেখানে ৪৭ বলে ১১ চার ও ১ ছক্কায় অপরাজিত ৮৯ রান করলেন, সেখানে ৫ রান করেই আউট গেইল! কোহলি সাফল্য পেয়েছেন আবারও। গেইল ব্যর্থ হয়েছেন। তাতে কিন্তু ওয়েস্ট ইন্ডিজ হেরে যায়নি। লেন্ডল সিমন্সের অপরাজিত ৮৩, জনসন চার্লসের ৫২ ও আন্দ্রে রাসেলের অপরাজিত ৩৩ রানে ৭ উইকেটে জিতে ভারতকে বিদায় করে দিয়ে ফাইনালে খেলা নিশ্চিত করে নিয়েছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। রবিবার ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কলকাতার ইডেন গার্ডেনে শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে মুখোমুখি হবে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে হেরে স্বাগতিক ভারতের বিশ্বকাপ সেমিফাইনালেই শেষ হয়ে গেল।

ভুজেলায় কান ঝালাপালা। ঢোল-তবলার শব্দে কান ঝালাপালা। ‘ইন্ডিয়া, ইন্ডিয়া’ আওয়াজেও কান ঝালাপালা। মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে সেমিফাইনালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে আরেকটি নাম এত জোড়ে শোনা গেছে যে তাতেও কান ঝালাপালা! সেই নামটি বিরাট কোহলি। যিনি বিশ্বকাপটাকে আসলে পুরোপুরিভাবে মাতিয়ে রেখেছেন। ভারতের ক্রিকেটপ্রেমীদেরও আমোদে রেখেছেন। বিশ্বকাপটাকে নিজের করে তুলেছেন। আর একের পর এক ম্যাচ ভারতকে একাই জিতিয়ে চলেছেন। কিন্তু সেমিফাইনালে আর জেতাতে পারলেন না। উল্টো গেইলের ব্যাটিং ঝড় ছাড়াও সিমন্স, চার্লস ও রাসেল জিতিয়ে দিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজকে।

টস জিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ফিল্ডিং করার সিদ্ধান্ত নেয়। বোঝাই যায়, টার্গেট অতিক্রম করার পথেই হাঁটে ক্যারিবীয়রা। আবার শিশিরও পরে রাতে। তাতে করে বোলারদের বল করতে সমস্যা হয়। সেই সুবিধা নিতে চায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। কিন্তু ভারত যে কোহলির দুর্দান্ত ব্যাটিংয়ে ২০ ওভারে ২ উইকেট হারিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে টি২০তে ১৯২ রান করে, সেখানেই তো আসলে ভারতের জয়ের রাস্তা তৈরি হয়ে যায়। এরপর যখন ওয়েস্ট ইন্ডিজ ইনিংসের দ্বিতীয় ওভারের প্রথম বলেই গেইলকে বোল্ড করে দেন বুমরাহ, কানায় কানায় পূর্ণ স্টেডিয়াম যেন গর্জে ওঠে। সেখানেই যেন জয় নিশ্চিত হয়ে যায়। কিন্তু কে জানত, ম্যাচে এত উত্তেজনা তখনও অপেক্ষা করছে। জনসন চার্লস ও লেন্ডল সিমন্স মিলে এমন ব্যাটিংই করেন, তার সঙ্গে রাসেলের মারমুখী ব্যাটিংয়ে হেরেই গেল ভারত। ২ বল বাকি থাকতেই ৩ উইকেট হারিয়ে ১৯৬ রান করে জিতে যায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ।

গেইলের পর যখন ১৯ রানে স্যামুয়েলস (৮) আউট হন, দর্শকদের নাচানাচিই শুরু হয়ে যায়। অপেক্ষা থাকে শুধু ওয়েস্ট ইন্ডিজের ইনিংসটি শেষ হওয়ার। কিন্তু জনসন চার্লস ও লেন্ডল সিমন্স এমন ব্যাটিংই শুরু করেন, নাড়িয়ে দেন সবাইকে। একের পর এক বাউন্ডারি হাঁকাতে থাকেন দুজনই। এমন অবস্থা হয়, ভারতের চেয়ে রানের গতি বেড়ে যায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের। ভারত যেখানে ৭৬ বলে গিয়ে ১০০ রান করে, সেখানে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ৬৯ বলেই তা করে ফেলে। ১১৬ রানে গিয়ে অবশেষে ৩৬ বলে ৭ চার ও ২ ছক্কায় ৫২ রান করা চার্লসকে থামান কোহলি। চার্লস ও সিমন্স মিলে ৯৭ রানের জুটি গড়ে ফেলেন। কোনভাবেই যখন উইকেট পড়ছিল না। তখন ‘ব্রেক থ্রু’ যদি মিলে যায়, এই ভরসায় কোহলির হাতে বল তুলে দেন ধোনি। উইকেটও শিকার করে ফেলেন কোহলি! তখন আবার কিছুটা স্বস্তি ফিরে ভারত শিবিরে। কিন্তু মুহূর্তেই তা উধাও হয়ে যায়। সিমন্স যে আরও বিধ্বংসী হয়ে ওঠেন। চার্লস যখন আউট হয় তখন সিমন্সের স্কোরবোর্ডে ৩১ বলে ৪৭ রান জমা থাকে। দ্রুতই ৩ রান নিয়ে অর্ধশতক করেন সিমন্স। কিছুটা এরপর ঝিমিয়েও যান। কিন্তু আন্দ্রে রাসেল ব্যাট হাতে নেমে যেন ভারত বোলারদের দুমড়ে মুচড়ে দিতে থাকেন। ১৪তম ওভারে যেখানে ১২০ রান করে ওয়েস্ট ইন্ডিজ, সেখানে ১৫তম ওভারেই আরও ১৮ রান যোগ হয়ে যায়। পান্ডের বলে রাসেল এমন এক ছক্কা হাঁকান, যা ৯৯ মিটার দূরত্বে যায়। সবার উপরের গ্যালারিতে গিয়ে পড়ে। পান্ডের করা ১৫তম ওভারে দুই ছক্কা ও এক চার হাঁকিয়ে দেন রাসেল। হু হু করে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ইনিংসে রান জমা হতে থাকে। বুমরাহর করা ১৬তম ওভারে গিয়ে নো বলের জন্য একবার নিশ্চিত আউট হওয়া থেকে বাঁচা সিমন্সও চার-ছক্কা হাঁকিয়ে দেন। ১৮ বলে গিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের জিততে ৩২ রান দরকার থাকে, এমন সময়ে বুমরাহ দুর্দান্ত বল করেন, ১৮তম ওভারের চতুর্থ বলে গিয়ে সিমন্সকে আউট করানোর সুযোগও আসে; কিন্তু আবার সেই সিমন্স বেঁচে যান। ছক্কা হয়ে যায়। ক্যাচটি ধরেন ঠিকই জাদেজা। কিন্তু পা দড়িতে লেগে যায়। তাতে সিমন্স আবার বাঁচেন। ছক্কাও হয়। ওভারের শেষ বলে বাউন্ডারি হাঁকানোতে ১২ বলে গিয়ে তখন জিততে ২০ রানের প্রয়োজন থাকে।

ভারতকে জেতাতে সবাই উঠে পড়ে লাগে। মাইকে বার বার ‘জিতেগা ভাই জিতেগা’ বলা হয়, ‘বন্দে মাতরম’ গান চালানো হয়, ‘ইন্ডিয়া ওয়ালে’ গান চালানো হয়, ‘মা তুঝে সালাম’ গান চালানো হয়; দর্শকও মাতে তাতে, কিন্তু কোন লাভ হয় না। ১৯তম ওভারের শেষ দুই বলে চার ও ছক্কা হাঁকিয়ে দেন রাসেল। স্ট্রেইট যে ছক্কাটি হাঁকান রাসেল, তা গিয়ে প্রেস বক্সের কাচে লাগে। এতটাই জোড়ে মারেন এবং এতটাই দূরত্বে আসে বলটি। শেষ পর্যন্ত গিয়ে ৬ বলে ৮ রানের দরকার থাকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের। কোহলি আবার বল হাতে তুলে নেন। প্রথম দুই বলে ১ রান হয়। তৃতীয় বলেই বাউন্ডারি হাঁকিয়ে দেন। ৩ বলে যখন জিততে ৩ রান প্রয়োজন। ছক্কা হাঁকিয়ে দেন ২০ বলে অপরাজিত ৪৩ রান করা রাসেল। ছক্কা হাঁকিয়েই দৌড় শুরু করেন রাসেল, তার সঙ্গে সঙ্গে একাধিকবার ‘নতুন জীবন’ পেয়ে ৫১ বলে অপরাজিত ৮৩ রান করা সিমন্সও জয়ের আনন্দে দৌড় শুরু করেন। ভারতের বিশ্বকাপ শেষ হয়ে যায়।

শিখর ধাওয়ানকে এদিন বসিয়ে রাখা হয়। তার পরিবর্তে অজিঙ্কে রাহানেকে ওপেনিংয়ে খেলানো হয়। আর যুবরাজ সিং তো ইনজুরির জন্য বিশ্বকাপ থেকেই বাদ পড়ে গেছেন। তার পরিবর্তে মানিষ পান্ডেকে নেয়া হয়। রাহানে শুরুতেই ঝলক দেখিয়ে দেন। ধাওয়ান যে ব্যর্থতার বেড়াজালে ছিলেন, রাহানে এসে সেই স্থান যেন নিয়ে নেন। সেমিফাইনালের মতো ম্যাচে এসেই খেলতে নামেন রাহানে। তাতে নৈপুণ্যও দেখিয়ে দেন। ৩৫ বলে ৪০ রান করে আউট হওয়ার আগে রোহিত শর্মার সঙ্গে ৬২ ও বিরাট কোহলির সঙ্গে ৬৬ রানের জুটি গড়েন। ওপেনিং জুটি পরিবর্তন করতেই ভারত সাফল্য পেয়ে যায়। ৬ ওভারে ৫৫ রান করে ভারত। যা এবার বিশ্বকাপে পাওয়ার প্লেতে ভারতের করা সর্বোচ্চ রান। সেটি অবশ্য সম্ভব হয় রোহিতের ধুন্ধুমার ব্যাটিংয়ে। শুরু থেকেই রোহিত কী ব্যাটিংটাই না করেন! দল যে ৬ ওভারে ৫৫ রান করে, তাতে রোহিতেরই অবদান ৪১ রান। কী মারমুখী ব্যাটিংই না করেছেন রোহিত। এ সময়ের মধ্যেই ৩টি ছক্কা ও ৩টি চার হাঁকিয়েছেন। ভারত যে তৃতীয় ওভারের প্রথম বলে গিয়ে বাউন্ডারির দেখা পেয়েছে, সেটি ব্রেথওয়েটের বলে লং অন দিয়ে রোহিতের ছক্কা মারাতেই মিলেছে। এরপর রোহিত যেন বিধ্বংসী রূপে হাজির হন। পরের ওভারেই সুলেমান বেনের করা চতুর্থ ও পঞ্চম বলে দুটি চার হাঁকিয়ে দেন রোহিত। ৫ ওভারে যখন ভারতের স্কোরবোর্ডে ৩৫ রান জমা হয়, এমন সময়ে ষষ্ঠ ওভারের দ্বিতীয় বলে আন্দ্রে রাসেল ফুলটস দেন। রোহিত লং লেগ দিয়ে ছক্কা হাঁকিয়ে দেন। সেই বলটি নো হওয়াতে ‘ফ্রি হিট’ও মিলে। স্ট্রেইট ছক্কা হাঁকিয়ে দেন রোহিত। কী দুর্দান্ত সব শট খেলতে থাকেন। পঞ্চম বলে গিয়ে আরেকটি বাউন্ডারি হাঁকিয়ে দলকে এক ওভারেই ২০ রান এনে দেন রোহিত। অবশেষে ৩১ বলে ৪৩ রান করে স্যামুয়েল বাদরির বলে এলবিডব্লিউ হয়ে থামেন রোহিত।

রোহিত থামার পর ব্যাট হাতে নামেন এ বিশ্বকাপের সেরা ব্যাটসম্যান কোহলি। কোহলির কাজই হচ্ছে এখন শুরুতে ধরে খেলা, শেষে গিয়ে দ্রুত রান তোলা। সুযোগ পেলে বাউন্ডারি মারা। সেই কাজটি করতে থাকেন কোহলি। আরেকদিকে রাহানেও একই রকম খেলতে থাকেন। যখন রাহানে আউট হয়ে যান, ততক্ষণে কোহলিও ৪০ রানে চলে যায়। এ ৪০ রান যে কোহলি করেন তাতে মাত্র ৪টি চারের মার থাকে। বাকি রান দৌড়ে নেন। রাহানে আউটের পর যখন মহেন্দ্র সিং ধোনি ব্যাট হাতে নামেন, তখন পুরো স্টেডিয়ামে ‘এমএসডি, এমএসডি’ রব উঠতে থাকে। ১৬ ওভারে তখন দল করে ১৩৩ রান। ব্রেথওয়েটের বলে ১৭তম ওভারের প্রথম বলে এমন একটি শট খেলেনে ধোনি, অফ স্ট্যাম্পের অনেক বাইরে গিয়ে হাঁটু গেড়ে শট ফাইন লেগ দিয়ে বাউন্ডারি হাঁকান। তাতে প্রায় ৩৫ হাজার ধারণ ক্ষমতার স্টেডিয়ামে আসা দর্শকরা যেন চিৎকারে ফেটে পড়েন। কানায় কানায় পূর্ণ স্টেডিয়ামে শুধু ‘ইন্ডিয়া, ইন্ডিয়া’ আওয়াজই শোনা যায়।

ধোনি যখন এমন শট খেলেন, তখন কী আর বসে থাকতে রাজি কোহলি? একই ওভারে দুটি বাউন্ডারি হাঁকিয়ে দেন কোহলি। এ বিশ্বকাপে তৃতীয় অর্ধশতকও করে ফেলেন। ১৭ ওভারে ১৫০ রান করে ফেলে ভারত। এরপর যে কোহলির কী হয় প্রতি ওভারেই দুটি করে বাউন্ডারি হাঁকাতে থাকেন। এর মধ্যে আবার ছক্কাও থাকে! ১৯ ওভারেই ১৮০ রান হয়ে যায় ভারতের। রাসেলের করা এ ওভারে দুটি চার ও এক ছক্কাসহ ১৮ রান নিয়ে নেন কোহলি। শেষ ওভারেও একটি বাউন্ডারি মেরে ৪৭ বলে ১১ চার ও ১ ছক্কায় অপরাজিত ৮৯ রান করেন ৫৫ ও ৮১ রানে রানে ক্যাচ আউট ও ১ রানে রান আউট হওয়া থেকে বাঁচা কোহলি। ধোনি তাকে সঙ্গ দিয়ে যান। অপরাজিত ১৫ রানও করেন। ভারত বড় স্কোরই গড়ে। কিন্তু এ স্কোরও যে ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে দুধ-ভাত তা বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। একগাদা আউট হওয়া থেকে বেঁচেছেন কোহলি। একই অবস্থা হয়েছে সিমন্সেরও। কিন্তু ম্যাচ জেতার ভাগ্য জুটেছে সিমন্সেরই। কোহলি- গেইল যুদ্ধে কোহলি জিতলেও, ভারত-ওয়েস্ট ইন্ডিজ যুদ্ধে ওয়েস্ট ইন্ডিজেরই জয় হয়েছে। তাতে করে ভারতকে হারিয়ে ফাইনালে খেলার টিকেট পায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ।

এই মাত্রা পাওয়া