১৬ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পাখির বৃহত্তম নীড়

আফ্রিকার দক্ষিণাঞ্চলে এক প্রজাতির পাখি আছে। নাম সোশ্যাবল উইভার। জীবতাত্ত্বিক নাম ফিলেটাইরাস সোশ্যাস। বিশালাকায় কমিউনাল বাসা তৈরির জন্য এরা সর্বাধিক পরিচিত। এমন বড় আকারের নীড় পক্ষীজগতের এক বিরল ঘটনাই শুধু নয়, উপরন্তু পৃথিবীতে কোন পাখির নির্মত এটাই হলো সবচেয়ে বড় নীড়। সারা বছর ব্যবহারের জন্য নির্মিত এমন নীড়ে এক শ’ থেকে দেড় শ’ পক্ষী পরিবার এবং আরও সুনির্দিষ্ট সংখ্যায় প্রকাশ করলে চার শ’ থেকে পাঁচ শ’ পাখির ঠাঁই হতে পারে।

বিশালাকায় এমন কমিউনাল বাসায় অসংখ্য কক্ষ, প্রবেশপথ ও সুরঙ্গ থাকে। শুকনো ঘাস, খড়কুটো এবং উদ্ভিদের নরম উপাদান দিয়ে এসব বাসা নির্মিত। এই বিশাল বাসা নির্মাণের সময় সোশ্যাবল উইভারদের অনেকে কাজে ফাঁকি দেয়। তাদের চিহ্নিত করা ও শাস্তি দেয়ার জন্য থাকে মারমুখী মেজাজের সুপারভাইজার। ঐ অলস প্রকৃতি পাখিরা যারা গোটা বাড়ি তৈরির পরিবর্তে তাদের নিজ নিজ কক্ষ নির্মাণেই বেশি দৃষ্টি দেয় সুপারভাইজাররা তাদের ঠোকর মেরে তাড়িয়ে দেয়। এই অলস পাখিরা আবার ফিরে এলে তাদের অনেক বেশি সহযোগিতার ভূমিকায় দেখা যায়। তারা অসমাপ্ত কক্ষগুলো তৈরির কাজে মনোনিবেশ করে।

সোশ্যাবল উইভার পল্লীতে এমনি রাগী ও বদমেজাজী পাখি থাকার কারণেই অভিন্ন কল্যাণে একত্রে এমন বিশাল কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হয়ে ওঠে। তাদের আগ্রাসী আচরণই এমন বিশাল নীড় তৈরিতে চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। ২০১৪ সালে নামিবিয়ায় ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক সোসাইটির সহায়তাপুষ্ট এক গবেষণা সমীক্ষায় এসব তথ্য প্রকাশ পেয়েছে।

এবার দেখা যাক সেই পাখির বাসাগুলো কেমন। বাসাগুলোর এক একটির ওজন হয় এক টন কি তারও বেশি। চওড়া হয় ২০ ফুট অবধি। বাসাটিতে পাখিদের যৌথ পরিবারের থাকারও ব্যবস্থা আছে। সেখানে ঘুমানোর ও ডিম পাড়ার আলাদা আলাদা কক্ষ থাকে। পাখিরাও যে স্থাপত্যশিল্পে কত পারদর্শী এ তার প্রমাণ।

পরিবারগুলোর সবই যদি পরস্পরের নিকটাত্মীয় না হয় তাহলে পাখিদের কারোর কারোর এই যূথবদ্ধ নীড়ের কেবল সুবিধাটুকু নেয়ার এবং নীড় তৈরির দায়িত্বটা অন্যদের হাতে ছেড়ে দেয়ার প্রবণতা পেয়ে বসে। সেকারণেই এই বিশাল বিনিয়োগকে রক্ষা করতে ও অন্য সকলের সহযোগিতা নিশ্চিত করতে এই জবরদস্তি বা শক্তি প্রয়োগের ব্যাপারটা এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়।

কিন্তু যুক্তরাজ্যের শেফিল্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক রেনে ভ্যান ডিজুক এ ব্যাপারে এত নিশ্চিত নন। তিনি বলেন “ব্যাপারটা বড়ই কৌতূহলোদ্দীপক। তবে আমার মনে হয় যূথ নীড় নির্মাণে এটা চালিকাশক্তি হিসাবে কাজ করে এমনটা না হওয়ারই সম্ভাবনা।” তাঁর অভিমত হলো, এই আগ্রাসী বা আক্রমণাত্মক আচরণ তুলনামূলকভাবে বিরল নীড় তৈরির কাজটা শতকরা মাত্র প্রায় ৫০ ভাগ পাখি করে থাকে এবং তাদেরও আবার সিংহভাগই পুরুষ। ফলে কাজ ফাঁকি দেয়া বা আদৌ গায়ে গতরে না খাটা পাখির সংখ্যা তো অনেক যাদের শাস্তি দেয়া প্রয়োজন। এত বিপুলসংখ্যক পাখির আচরণ তদারক করা এবং তাদের ঠোকর মেরে তাড়িয়ে দেয়া সর্দার পাখিদের পক্ষে কিভাবে সম্ভব সেই প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।

তবে মার্কিন গবেষক গেভিন লেইটন বলেন, নীড় তৈরির কাজে নিয়োজিত পাখিদের প্রায়ই তিনি আশপাশের গাছের ডালে বসে জিরিয়ে নিতে দেখেছেন। তিনি বলেন, সম্ভবত তারা অন্য পাখিদের ক্রিয়াকলাপের ওপরও এ সময় নজর রাখে।

গবেষণার ফলাফল সঠিক হলে সোশ্যাবল উইভারের বাসাগুলো যতটা প্রয়োজন তার চেয়ে আরও বড় হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাজ্যের এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ম্যাথু পাকেট। তার মতে, নীড় নির্মাণে জবরদস্তির যদি কোন ভূমিকা থাকে তাহলে আমরা কল্পনা করতে পারি যে আক্রমণ পরিহারের জন্য এই পাখিরা তাদের প্রকৃতই যতটা প্রয়োজন তার চেয়ে বড় বাড়ি নির্মাণ করবে।

সমষ্টির কল্যাণে সহযোগিতা বৃদ্ধির জন্য রাগারাগি মারধর ইত্যািদ প্রয়োগের ঘটনা পাখিদের ক্ষেত্রে এই প্রথম জানা গেল। আরেক গবেষক বলেন, সামাজিক প্রাণীদের মধ্যে এমন আচরণ বিরল। তবে এক জাতের ইঁদুর আছে যারা বেয়াড়া সদস্যদের এমনিভাবে শাস্তি দেয়।

লেইটন এ প্রসঙ্গে সোশ্যাবল উইভার সেস্টের সঙ্গে এ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সের তুলনা করেছেন এবং সেই সঙ্গে পাখির আচরণের সঙ্গে মানুষের আচরণেরও। এ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সের অভিন্ন অংশের রক্ষণাবেক্ষণে যাদের সবচেয়ে বেশি ভূমিকা থাকে এ্যাপার্টমেন্টের বিভিন্ন ইস্যুতে তারাই সব থেকে বেশি কথা শুনিয়ে থাকে এবং যারা কেবল নিজেদের এ্যাপার্টমেন্ট নিয়েই ব্যস্ত কথাগুলো তাদেরকেই শুনতে হয় বেশি।

সূত্র : সায়েন্স ডেইলি, বিবিসি