১৭ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মহাক্রান্তিকালের ভাষাচিত্র

  • সিরাজুল এহসান

...‘মুজিবকে যদি ক্ষমতা দেয়া হতো, যে ক্ষমতা কেড়ে নেয়া হয়েছিল- সেক্ষেত্রে এতসব ঘটনা ঘটত না। তিনি নির্বাচনে জিতেছিলেন, তাঁকে ক্ষমতা না দেয়াটা অন্যায় হয়েছে। ভুট্টো সে ক্ষমতা দিতে দেননি যা তাঁর প্রাপ্য ছিল।’... উদ্ধৃত অংশটুকু একাত্তরে পরাজিত জেনারেল, পাকিস্তানের ইস্টার্ন কমান্ডের জিওসি আমির আব্দুল্লাহ খান নিয়াজীর বক্তব্য। তার এ বোধোদয় ঘটেছে বাংলাদেশের সঙ্গে যুদ্ধে পরাজয়ের প্রায় ৩০ বছর পর। এমন তথ্যের সন্ধান আমরা পাই মুনতাসীর মামুনের ‘মুক্তিযুদ্ধ সমগ্র’ গ্রন্থের তৃতীয় খ-ে। এমন বক্তব্য জেনারেল নিয়াজী রেখেছেন লেখক মুনতাসীর মামুন ও মহিউদ্দিন আহমদ সকাশে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। মুনতাসীর মামুনের এ গ্রন্থটি অন্যান্য প্রকাশনার মধ্যে অনন্য ও ব্যতিক্রম। মুক্তিযুদ্ধের সময় যাদের নেতৃত্বে এ ভূখ-ে গণহত্যা ঘটেছিল, চালিয়েছিল বর্বর নির্যাতন, তাদের কিছু শীর্ষ ব্যক্তির দৃষ্টিভঙ্গি ও সাক্ষাতকার অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এ গ্রন্থে। এসব ব্যক্তির সরাসরি সাক্ষাতকার গ্রহণ করেছেন গ্রন্থের লেখক ও মহিউদ্দিন আহমদ। একেবারে ভেতরের কথা উঠে এসেছে সাক্ষাতকার ও লেখায়।

বিশেষত, রাও ফরমান আলী ও জেনারেল নিয়াজীর কথায় উঠে এসেছে ’৭০-এর নির্বাচন, বঙ্গবন্ধু ও বাংলার স্বাধিকার নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানীদের প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের কথা। বিস্মৃত ও বিকৃত হওয়ার আগেই সংশ্লিষ্ট মানুষদের এ সাক্ষাতকার ইতিহাসের টাটকা উপাদান। ১৯৯৮ সালে ধারণকৃত ‘সেইসব পাকিস্তানী’র এসব সাক্ষাতকারে যেসব উপাদান উঠে এসেছে তা ইতিহাসের অমূল্য সম্পদ। গবেষক ও আগামী প্রজন্মের জন্য অপরিহার্য এসব উপাদান ও অনুষঙ্গ।

গ্রন্থভুক্ত অনেক বিষয়ই আকর্ষণীয়। তবে বিশেষ আকর্ষণ হতে পারে ‘বযলুর রহমানের মুক্তিযুদ্ধের ডায়েরি’টি। পাঠক পড়তে বসলে শেষ না করে উঠতে পারবেন বলে মনে হয় না। এই ডায়েরিটি গ্রন্থের ঐশ্বর্য বাড়িয়েছে। রোজনামচার ৪ মে তারিখে লিপিবদ্ধ হয়েছে এক বীর নারীর বীরত্বগাঁথা। নদীর নামে নাম ভাগিরথী নামের এ নারী পাকিস্তানী সৈন্যদের দ্বারা সম্ভ্রম হারিয়ে যে প্রতিশোধ নিয়েছিলেন তা আমাদের গৌরবের। ১৫ জন পাকসেনা কিভাবে নিহত হয়েছিল ও পরবর্র্তী সময় তার শহীদ হওয়ার করুণ ঘটনা জানতে পড়তে হবে এ গ্রন্থটি। গ্রন্থজুড়ে এমন সব লেখা আর ঘটনার বর্ণনা আছে যা ইতিহাসের অনন্য দলিল।

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কত বিচিত্র আর কৌতূহল জাগানো ও অনুসন্ধিৎসু-যুক্তিপূর্ণ লেখা এ গ্রন্থে রয়েছে সূচিপত্রের দিকে একটু দৃষ্টি দিলেই বোঝা যায়। লেখার শিরোনামগুলো এরকমÑ ‘বযলুর রহমানের মুক্তিযুদ্ধের ডায়েরি, বিজয়ী হয়েও যা পারিনি, নিয়াজীর চিঠিতে গণহত্যার নীলনকশা, ইয়াহিয়া ভালো লোক! মিথ্যা বলতেই অভ্যস্ত পাকিস্তানীরা, খালেদ মোশাররফ বীর উত্তমের অপ্রকাশিত স্মৃতি কাহিনি, যুদ্ধে যাবার বয়স, বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার সেই ওয়ারলেস বার্তাটি, রাও ফরমান আলী, জেনারেল নিয়াজী, পাকিস্তানীদের দৃষ্টিতে পাকিস্তান ভাঙল কেন? পাকিস্তানীদের দৃষ্টিতে বাংলাদেশে গণহত্যা ও অন্যান্য প্রসঙ্গ, বাংলাদেশের কাছে পাকিস্তানের ক্ষমা চাওয়া না-চাওয়া, ৭ মার্চ ছিল অনিবার্য, যুদ্ধাপরাধ : জামায়াতী বয়ান, যুদ্ধাপরাধীদের দল এখন একটি নয় দুটি, ইতিহাস খুন করে মিথ্যা প্রতিষ্ঠা করা যায় না, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আইন ও বিচার বিশ্বে মানবতাবিরোধী বিচারের মান নির্ধারণ, বাচ্চু রাজাকার মামলার রায় : ইতিহাসের অধিকার ফিরে পাওয়া, গোলাম আযমের দ- কি ঠিক হয়নি? মুজাহিদের দ-ের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ অপরাধমূলক রাজনীতি প্রতিরোধ, ৩০ লাখ শহীদ? এ সময়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে কেন? ৪০ বছর এই দিনটির জন্য অপেক্ষা করছিলাম, বন্যেরা বনে সুন্দর রাজাকার পাকিস্তানে’ প্রভৃতি।

মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি যারা করেছেন ও করতে তৎপর তাদের মুখোশ উন্মোচন এবং চিহ্নিত করতে এ গ্রন্থটি সহায়ক ভূমিকা পালন করবে নিঃসন্দেহে। মুনতাসীর মামুনের মহতী উদ্যোগের কথা সর্বজনবিদিত। এ গ্রন্থটিও সেই সাক্ষ্য বহন করে।

পাশাপাশি একাত্তরে মহাক্রান্তিকালের সত্যনিষ্ঠ কথাচিত্র এ গ্রন্থ। এটি ইতিহাসের অপরিহার্য দলিল হিসেবেও পরিগণিত হবে। সুবর্ণ প্রকাশনীর আহমেদ মাহফুজুল হক গ্রন্থটি প্রকাশ করে দায়বদ্ধতার পরিচয় দেখিয়েছেন। প্রচ্ছদ এঁকেছেন মোবারক হোসেন লিটন।