২১ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অদ্বৈত মল্লবর্মণের স্বদেশ, চেতনা

  • শান্তনু কায়সার

এটা এখন সবাই জানেন ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ তার শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকর্ম হলেও এর আগে তিনি দুটি উপন্যাস, প্রকৃত অর্থে উপন্যাসিকা লিখেছিলেন ‘রাঙামাটি’ ও ‘শাদা হাওয়া।’ ‘রাঙামাটি’ ভূমি ও ভূমিজ প্রসঙ্গ এবং তার তৃণমূল ও সংশ্লিষ্ট মানুষদের নিয়ে লেখা। ‘তিতাস’ যখন লেখেন তখনও ভূমি ও ভূমিজ মানুষেরা তাঁর দৃষ্টি এড়িয়ে যায়নি। বরং অন্যতম প্রধান মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল। সে জন্যই ‘তিতাস’ এ ‘কাটিলে কাটা’ ও ‘মুছিলে মুছা’ যাইবে নাÑ জেলে ও চাষীর মধ্যে এ রকম একটা সার্থক আবিষ্কৃত ও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তিতাসের জল শুকিয়ে গেলে সেই জমি দখল করতে গিয়ে চাষী ও জেলেদের কেউই ‘এক খামচা মাটি’ও ‘পাইল না’, ‘পাইল’ যাদের অনেক জমি তারা। ‘তিতাস’-এ অদ্বৈত প্রধানত ছেলেদের কথা বলেছেন বটে, কিন্তু তারও চেয়ে বেশি বলেছেন তৃণমূলের মানুষ ও কুশীলবদের কথা। জললগ্ন জেলেদের সঙ্গে বন্দে আলী ও করম আলীর মতো ভূমিহীন চাষীদের কোন পার্থক্য নেই। সে শুধু তাদের নিঃস্বতার কারণে নয়, তারা যে ঐতিহাসিক ও ভূমিলগ্ন ভূমিকা পালন করেছে তার জন্যও অবশ্যই। এর ফলে আমাদের ভাষা আন্দোলন পরিণতি পাওয়ার পূর্বেই যে লেখক ১৯৫১-র ১৬ এপ্রিল কলকাতায় প্রয়াত হন তিনি ১৯৪২-এ কিংবা তার পূর্বে লেখা উপন্যাসের জন্য আমাদের কাছে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠেন এবং মুক্তিযুদ্ধের এত বছর পর, তার সুবর্ণজয়ন্তীর সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর স্বদেশ-চেতনা আমাদের উদ্বুদ্ধ করে ও প্রেরণা দেয়।

এক্ষেত্রে দুটি প্রত্যক্ষ উাদহরণের কথা বলা যায়। অদ্বৈত মল্লবর্মণের জীবনের আদলে লেখা গল্প ‘যাত্রী’ (পরিবর্তিত নাম ‘যাত্রাপথ;) এ কল্যাণ যখন লেখক বা শিল্পীর সুনির্দিষ্ট কাজই তার করা উচিত বলে তখন অদ্বৈত-সদৃশ অনন্ত যে জবাব দেয় তাতে অদ্বৈতর স্বদেশ-চেতনা ও এ বিষয়ে তার সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় পাওয়া যায়, ‘শুধু তোমার কেন, ছোট বড় প্রত্যেক লেখকের মনের মতো কাজই তাই, ছোট বড় প্রত্যেক আর্টিস্টের কাজ শুধু ছবি আঁকা। ছোট বড় প্রত্যেক গায়কের মনের মতো কাজ শুধু গান গাওয়া। কিন্তু প্রত্যেকে সে সুযোগ পাবে আমাদের দেশ সেই মনের মতো দেশে গিয়ে পৌঁছতে অনেক দেরি। মাঝে মাঝে আমার সন্দেহ হয় কল্যাণ, সবচেয়ে আগে সব কাজ ফেলে আমাদের সেই মনের মতো দেশ গড়ে তোলাই উচিত কিনা।’

বাস্তবেও অদ্বৈত তাই ভাবতেন বলে মনে হয়। বীরেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়, “সেকালে দক্ষিণ কলকাতা থেকে প্রকাশিত হতো সাপ্তাহিক পত্রিকা। নাম ‘পতাকা’।” অদ্বৈতকে এই পত্রিকা সম্পাদনার আমন্ত্রণ জানিয়ে কর্তৃপক্ষ একে পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়ের মুখপত্র করে তুলতে আহ্বান জানালে তিনি তাতে সম্মত না হয়ে বলেন, ‘অনেক সম্প্রদায়ের পিছিয়ে পড়া সমস্যার সমাধান করতে হলে সারা বাংলা, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মিলিত আন্দোলন প্রয়োজন’, কোন বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়।

বিষয়টির অন্যতর উদাহরণ পাওয়া যাবে অদ্বৈতর জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়ারই ভাষা সংগ্রামী ও মুক্তিযুদ্ধের শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রসঙ্গ থেকে। প্রত্যক্ষভাবে জেলেদের প্রসঙ্গেই তিনি তাঁর ‘আত্মকথা’ লিখেছেন, ‘হিন্দু সমাজের যাহারা কায়িক পরিশ্রম করিত তাহারাই ছিল অস্পৃশ্য, সমাজের যাহারা সম্পদ স্রষ্টা তাহারাই ছিল অবহেলিত। হিন্দু সমাজের ভিতর মৎস্যজীবীদের (কৈবর্ত শ্রেণী)কে সমাজের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ স্রষ্টা বলা যাইতে পারে। কিন্তু আমি ছোটবেলায় দেখিয়াছি, সেইসব লোককে আমরা ‘গাবর’ এই অবহেলাসূচক আখ্যা দিয়াছি।’ তিনি ‘কৃষককুল’কেও বলেছেন ‘সম্পদস্রষ্টা।’ কিন্তু সম্পদস্রষ্টা বলেই উভয় সম্প্রদায় অবহেলিত এবং সমাজের চোখে নিচুদৃষ্টিতে বিবেচিত। কারণ তা না হলে অধিপতিশ্রেণীর পক্ষে নিজেদের মালিক হওয়া ও তার ওপর কর্তৃত্ব ফলানো সম্ভব হয় না।

তাঁর আত্মকথায় ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত এক গ্রামীণ মহিলার কথা বলেছেন। তিনি যেন শরৎচন্দ্রের ‘অরক্ষণীয়া’ উপন্যাসের পোড়ারমুখী। তাঁর গায়ের রঙ কালো, কিন্তু মন ‘স্বচ্ছ ও সুন্দর।’ একইভাবে তিতাস যেমন আটপৌরে নদী, ইতিহাস বা ভূগোলে তার নাম নেই, এর তীরের নারীরাও তেমনি রূপসী না, বরং অত্যন্ত সাধারণ, এটিই তিতাস ও তার তীরের মানুষ ও নারীদের মূল বৈশিষ্ট্য, দৈনন্দিন জীবনের নামে নদীটিকে ডাকা হয় পোশাকী নাম তার জন্য না, এ বরং তাকে দূরে টেনে নেয়। সেজন্য তিতাসের পাড় না থাকার কষ্ট জেলেরা অনুভব করে। শিক্ষিত লোকের দেশে থাকার কী কষ্ট তাও তারা বোঝে। ‘তিতাস’-এ উপন্যাসের শেষ অনন্তর যে ভদ্রলোকী পরিচয় পাওয়া যায় তা তাকে তার স্বজনদের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। ঔপন্যাসিকও একে সমর্থন করেন না, বরং সেখানে তাঁর কটাক্ষ প্রকাশিত হয়। বনমালীর বর্ণনায় এভাবে তার পরিচয় পাওয়া যায়, ‘ইস্টিশনের পশ্চিমে ময়দান।... লুকাইতে গিয়ে দেখি অনন্ত। আরও তিনজনের সঙ্গে ঘাসের উপর বসিয়া তর্ক করিতেছে। পরনের ধুতি ফর্সা, জামা ফর্সা। পায়ের জুতা পর্যন্ত পলিশ করা।’ অন্যত্র ভাইয়ের, বর্ণনা অনুসরণ করে উদয়তারা বাসন্তীকে জানায়, ‘ভদ্রলোকের সঙ্গে থাকে। দেখিতে হইয়াছে ঠিক যেন ভদ্রলোক।’

কিন্তু তিতাস ও ‘তিতাস’-এর মূল ভিত্তি জেলে ও কৃষক। ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের ভাষায় যারা ‘সম্পদস্রষ্টা।’ এরাই অদ্বৈতর মৃত্যুর দুই দশক পরে, ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধের কুশীলব হিসেবে বাস্তবে এসে হাজির হয়। শত্রুপক্ষের বিবরণেও যে তাকে অস্বীকার করা যায় না তা থেকে এর অধিকতর গুরুত্ব প্রতিষ্ঠিত। সিদ্দিক সালিক তাঁর ‘ডরঃহবংং ঃড় ঝধৎৎবহফবৎ’-এ দেখিয়েছেন কীভাবে ছদ্মবেশী মুক্তিযোদ্ধার একজন যদি হয় জেলে তবে অন্যজন কৃষক। এর আগে তিনি বলে নিয়েছেন, ঞযব সধরহ ঢ়ৎড়নষবস রং ঃড় রংড়ষধঃব ঃযব ৎবনবষং ভৎড়স ঃযব রহহড়পবহঃ ঢ়বড়ঢ়ষব. ঞযবু ধৎব ঁংঁধষষু সরীবফ রিঃয ধিঃবৎ’ মুক্তিযুদ্ধের সময় বিশেষভাবে প্রযোজ্য বলে তৃণমূলের দুই সম্প্রদায়ের মানুষই ছিল সাধারণ ও বৃহত্তর মানুষের অংশ ‘তিতাস-এ যেমন তেমনি একাত্তরে। ফলে এটি ছিল তাঁদের পালিত ভূমিকারই সাধারণ পরিণতি এবার সিদ্দিক সালিক উল্লিখিত প্রত্যক্ষ দুই উদাহরণ:

র) অ ৎবনবষ পধৎৎুরহম ধ ংঃবহ মঁহ ঁহফবৎ যরং ধৎস পড়ঁষফ, রহ বসবৎমবহপু, ঃযৎড়ি যরং বিধঢ়ড়হ রহ ঃযব ভরবষফ ধহফ ংঃধৎঃ ড়িৎশরহম ষরশব ধহ রহহড়পবহঃ ভধৎসবৎ.

রর) ঙহ ঃযব ড়ঃযবৎ যধহফ, ধ যধৎসষবংং ষড়ড়শরহম ভরংযবৎসধহ পড়ঁষফ ংঁংঢ়বহফ যরং ড়িৎশ ঃড় ঢ়ষধহঃ ধ সরহব রহ ঃযব ধিু ড়ভ ধহ ধঢ়ঢ়ৎড়ধপযরহম পড়হাড়ু ধহফ ফরংধঢ়ঢ়বধৎ এঁদের সঙ্গেই ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত একাত্মবোধ করতেন। তাঁর আশেপাশের ও সম্প্রদায়ের মানুুষ প্রায় সবাই যখন পাকিস্তান থেকে ভারত চলে যান তখনও তো তিনি স্বদেশ ত্যাগ করেননি এবং শেষ পর্যন্ত একাত্তরে নিজের মৃত্তিকায় শহীদ হন তার মূল কারণ ছিল তৃণমূলের মানুষ। তাঁর ‘আত্মকথা’য় জেলেদের প্রসঙ্গে তিনি নিজেই তা ব্যাখ্যা করেছেন, ‘আমি শ্রীত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী মহাশয়ের বাড়িতে যাওয়ার জন্য কুলিয়ারচর স্টেশনে অতি প্রত্যুষে নামিলাম। সেখান হইতে নৌকাযোগে রওয়ানা হইলে পর একটি কোলাহল শুনিতে পাইলাম। আর এই কোলাহলের কথা মাঝির কাছে শুনিতে চাহিলে সে বলিল, পুয়া মাছের ঘাটা। আমার কথায় নৌকা সেখানে লইয়া যায়। দেখিলাম, এত প্রত্যুষে প্রায় ৫০০/৬০০ মৎস্যজীবী কৈবর্ত সম্প্রদায় মিলিত হইয়াছে। ধনী এবং দরিদ্র, যাহারা মাছ ধরে তাহারা এবং মাছের ব্যবসা যাহারা করে তাহারাÑ সকলেই হিন্দু সম্প্রদায়ভুক্ত মৎস্যজীবী কৈবর্ত। পাকিস্তানের সম্পদস্রষ্টার মধ্যে তাহারা অন্যতম। তাহাদের দেখিয়া আমার চিন্তা হইল, হিন্দু সমাজের বহুসংখ্যক লোক পাকিস্তান ছাড়িয়া যাইতে পারিবে না।’ অতএব তাদের নেতা হয়ে তিনি কী করে তাদের ছেড়ে যান? ফলে তিনি মৃত্তিকা ও তার মানুষের কাছে প্রোথিত হন এবং একাত্তরে শহীদ হয়ে তাঁর অঙ্গীকার পূর্ণ করেন।

দুই.

এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে ‘তিতাস’ লেখার আগে অদ্বৈত ‘রাঙামাটি’ লিখেছেন। সেখানে তাঁর ভূমি ও কৃষিভাবনা প্রকাশিত হয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ারই বিল্পবী উল্লাসকর দত্তের পিতা দ্বিজদাস দত্ত ছিলেন কৃষিবিজ্ঞানী। তিনি তাঁর বিদ্যা গ্রামের কৃষকের কাছে পৌঁছে দিতে এবং তাঁরা যেন ন্যায্য হিস্যা পান সেই বিষয়ের একজন প্রবক্তা ছিলেন এবং এ বিষয়ে বই লিখেছেন। এই জেলার মহেন্দ্র নন্দী কৃষিজাত পণ্যের শিল্পজাত উৎপাদন ও তা বিপণনের বিষয়ে ভেবেছেন ও সে বিষয়ক তৎপরতা চালান। তিনি তাঁর গ্রাম কালীকচ্ছে আয়রন ফাউন্ড্রি প্রতিষ্ঠা করেন। ‘রাঙামাটি’ রচনায় এই দুজনের প্রভাব পড়েছিল। আর প্রভাব পড়েছিল রবীন্দ্রনাথের।

জল ও জেলে বিষয়ে উপন্যাস লেখার আগে তিনি যে ডালার মানুষ তথা চাষীদের কথা ভেবেছিলেন তার কারণ এভাবে জল ও ডালাÑ উভয়ের তৃণমূলের মানুষের মধ্য দিয়ে তিনি একটি সামগ্রিক দৃষ্টিকোণ গড়ে তুলতে চেয়েছেন, যা পরিণামে তাঁর স্বদেশভাবনা ও চেতনার একটি পূর্ণ রূপ হিসেবে গড়ে ওঠে। ‘রাঙামাটি’র হরগোবিন্দের মধ্য দিয়ে এর একটি বিশেষ প্রকাশ ঘটেছে। হরগোবিন্দ্রের ভাবনা, ‘যেখানে আমাদের গভর্নমেন্ট কৃষকদের স্বার্থ সম্বন্ধে উদাসীন’, ‘কৃষকদের অধিকাংশই নিরক্ষর’ এবং ‘জমিদাররা বিলাসী ও স্বার্থপর’ সেখানে নিজে জমিদার হয়েও হরগোবিন্দ একটু ভিন্ন পথে হাঁটতে চেয়েছেন। তিনি উদ্যোগী হয়ে ও ঋণ দিয়ে কৃষকদের বাস্তবতার সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়েছেন যে, কখন যে তাদের ঋণ শেষ হয়ে গেছে সেটা তারা বুঝতে পারেনি। রবীন্দ্রনাথ ১৩২২-এর ৩০ কার্তিক কালীমোহন ঘোষকে যে লিখেছিলেন, ‘আমরা পনেরো বৎসর শান্তিনিকেতনে শিক্ষকতা করিয়াছিÑ এখানে (পতিসরে) যদি দশ বৎসর নিরন্তর কাজ করিতে পারি তবে আমাদের এই চেষ্টার উদ্যম সারাদেশে সম্প্রসারিত হইতে পারিবে।’ বিষয়টি অদ্বৈত মল্লবর্মণকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল বলেই ‘রাঙামাটি’র হরগোবিন্দের মধ্য দিয়ে তিনি তা বাস্তবায়ন করেন, ‘প্রতি গ্রামের বিবেচক লোকদের নিয়ে আমার একটা পরামর্শ সভা আছে। সেখানে তাদের ভালোমন্দ সব আলোচনা এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তাব গ্রহণ করে সেগুলোকে কাজে খাটানোর ভার উপাক্ত লোকদের উপর অর্পিত হয়। মোট কথা সমস্ত কাজই শৃঙ্খলার সঙ্গে হয়ে যাচ্ছে। প্রথম আমাকে যে টাকা খরচ করতে হয়েছে তা আমি ফিরে পেয়েছি। প্রজার উন্নতির সঙ্গে জমিদারির আয়ও বৃদ্ধি পেয়েছে।’

‘তিতাস’ লেখার আগে নিরীক্ষার জন্য হলেও অদ্বৈত ডালার মানুষের প্রান্তিক অবস্থানের মনে রেখে ‘তিতাস’-এর পূর্ণতার কথাও যে ভেবেছিলেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তিতাস পারের ডালার মানুষ ছাড়া এর জলের মানুষের কাহিনীও হতো অসম্পূর্ণ। এই বোধ ও ব্যাপ্তি অদ্বৈতর সম্পূর্ণ দৃষ্টিরই অংশ। ফলে আগে রচিত ‘রাঙামাটি’ও ছিল ‘তিতাসের অংশ, যা পূর্ণ উপন্যাসটিতে পূর্ণ রূপ পেয়েছে।

তিন,

কিন্তু সাতচল্লিশপূর্ব ভারতবর্ষের ইতিহাস খুব সরল ছিল না। ‘শাদা হাওয়া’ অদ্বৈত লিখেছেন, ১৯৪২এ। উপন্যাসের শুরুর বাক্যটিই হচ্ছে ‘১৯৪২ ইংরাজী সাল।’ আর উপন্যাসটি শেষ করে তিনি এর তারিখ দিয়েছেন ১৯-১২-৪২। এই সালটি ভারত-ছাড় আন্দোলনের বছর। তাঁর জীবদ্দশায় অদ্বৈতর যে একমাত্র বই প্রকাশিত হয়েছিলÑ ‘ভারতের চিঠিÑ পার্ল বাক-কে’ তাতে তিনি যে শাদা বমড়রংঃ দৃষ্টির কথা বলেছেন তারই বিরুদ্ধ, তীক্ষè রূপ প্রকাশিত হয়েছে এই উপন্যাসে।

কিন্তু সেটাই শেষ কথা নয়। উপন্যাসের নিন্দিত চরিত্র গোয়েন্দা গোবিন্দ শর্মার পর্যন্ত মনে হয়। পৃথিবী থেকে সৈন্যরা লোপ পেলে কী হবে? ‘তখন তারা কী করছে? ধরবে লাঙল ধরবে লেখনী। আর কারখানায় চালাবে হাতুড়ি।’ অর্থাৎ উৎপাদন তখন সৃজনশীলতার সঙ্গে যুক্ত হবে। লেখাটাও হবে একইসঙ্গে কাজ। সৃজন ও উৎপাদনশীল। শ্রমের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তাহাও হবে ‘শ্রমজীবী।’ হবে না বিছিন্ন ও আয়েশী। ‘হাতুড়ি চালানো’কে তার সঙ্গে যুক্ত করে তিনি সমস্ত কাজটাকে উৎপাদন ও সৃজনশীল করে তুলেছেন।

সৃষ্টির এই ব্যাপারটি সরাসরি উৎপাদনশীলতায় ‘রাঙামাটি’তে যেমন রূপ পেয়েছে তেমনি ভাষা পেয়েছে ‘শাদা হাওয়া’তেও আর এর চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটেছে ‘তিতাস’-এ। এখানে অনন্য সাধারণ অক্ষরসমষ্টিকে যুক্তাক্ষরে পরিবর্তিত হতে দেখে যে আনন্দ পায় তা আসলে শিল্প ও শিল্পীরই আনন্দ। উপন্যাসে স্থ’ূল ও মোটা দাগের বিনোদনের বিরুদ্ধে যে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত হয়েছে তার বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করেই যে শিল্পের উত্তরণ ঘটাতে হয়, ‘তিতাস’ তার প্রত্যক্ষ উদাহরণ ও মূল সাক্ষী। বাসন্তী যে ‘দমিতে জানে না’ এবং তার মধ্যে ‘বিপ্লবী নারী’ বসবাস করে তার আসল অর্থও তাই।

যত উন্নতই হোক, পরের মাতৃভাষা ও পরের সাহিত্যকে নিজের সাহিত্য করে নেওয়ার মধ্যে কোনো গৌরব ত নয়ই, এমনকি অর্জনও যে নেই তা ‘শাদা হওয়া’র ভরতীয় তথা বঙ্গীয় তরুণ অত্যন্ত স্পষ্ট করে বুঝেছে, বুঝেছে ‘রাঙামাটি’র নবকুমারও। আর সবচেয়ে ভালো বুঝেছেন ‘তিতাস’-এর স্রষ্টা অদ্বৈত মল্লবর্মণ। সেজন্য একদিকে তিনি যেমন সামন্তবাদের আন্তঃসারশূন্যতা, তার কূপম-ূকতা ও কুসংস্কারকে বর্জন করতে লিখেছেন তেমনি আবার সাম্রাজ্যবাদের ঔদ্ধত্য ও বাগড়ম্বরকে পরিহার করতেও লিখেছেন। জেনেছেন শাদা দৃষ্টিকে যতই উন্নত মনে করা হোক তা আসলে কেবলই পরিত্যাজ্য। এই স্বচ্ছ ও পরিছন্ন দৃষ্টির কারণে অদ্বৈত ‘শাদা হাওয়া’তে জেলেতে জেলেতে, চাষীতে চাষীতে এবং পরিণামে জেলেতে-চাষীতে ঐক্য ও তার প্রয়োজনের কথা বুঝতে পেরেছেন। বুঝতে পেরেছেন ‘হিন্দুর জঘন্য মুসলিম বিদ্বেষ’ যেমন অর্থহীন তেমনি স্বদেশে বিদেশী হয়ে থাকাও তাই। লাহোর প্রস্তাব উত্তর পাকিস্তান ও না- পাকিস্তানের চেয়ে জরুরী। মানুষের যথার্থ উত্তরণ। ‘শাদা হাওয়া’তে তিনি নেতৃত্বের বাহুল্য কমাবার যে প্রয়োজনের কথা বলেছেন তা সুস্থ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই অর্জন করতে হবে।

সেকারণে সমস্ত হতাশা ও বৈরিতার মধ্যেও অনির্বাণ দীপশিখার মতো ‘তিতাস’র বাসন্তী তার আশার আলো জ্বালিয়ে রাখে। বলে, ‘দয়ালচন্দ্র গিয়াছে, কৃষ্ণচন্দ্র গিয়াছে। আরে মহন, তুই ত কস নাই, তুই আছিস সাধুর বাপ আছে মধুর বাপ আছে। তিন কুড়ি ঘর গিয়াছে, আগেও তিন কুড়ি ঘর আছে। আমরা শেষ পর্যন্ত থাকিব।... যে ক ঘর থাকিব তাই নিয়া আমরা শেষ পর্যন্ত সংগ্রাম করিয়া যাইব।’

এভাবে উপন্যাসটির আঙ্গিকও পরীক্ষার মধ্য দিয়ে উত্তীর্ণ হয়, শাদা বমড়রংঃ দৃষ্টিই শেষ কথা নয়। ‘তিতাস’এর দেশজ রূপই মাটির প্রদীপের মতো জেগে থাকে। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘খোয়াবনামা’র উদাহরণ থেকে তা বোঝা যেতে পারে। পাকিস্তানী শাসকবৃন্দ ও তাদের তাঁবেদাররা পুঁথির মধ্য দিয়ে আমাদের সাহিত্যকে পশ্চাদপদ গন্তব্যে পৌঁছে দিতে চাইলে ‘খোয়াবনামা’য় তাকে বুমেরাং করে তোলেন ইলিয়াস। দেশজ শিল্পরূপকে তিনি অনিবার্য ও অপ্রতিরোধ্য করে তোলেন। যার একধরনের সূচনা করেছিলেন অদ্বৈত মল্লবর্মণ তাঁর ‘তিতাস’এ। পল্লীরমণীর কাঁকনের মত তিতাসের বলয়াকৃতির রূপ তার শিল্পের অন্বিষ্ট ও গন্তব্য। তা থেকে আমাদের স্বদেশকেও চেনা যায়। যার বিশেষ রূপ আমরা দেখেছিলাম উনিশ শ একাত্তরে।

চার.

ভাষা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা আবদুল মতিন তার ‘বাঙালি জাতির উৎস সন্ধান ও ভাষা আন্দোলন’-এ দেখিয়েছিল আর্য ও তুর্কী সমকালেও এদেশের সাধারণ মানুষ বিশ্বাস ও কর্মবিচ্যুত হয়নি। সেজন্য ধর্মান্তরিত হয়েও তৃণমূলের ধারাকে যেমন অক্ষুণœ রেখেছে তেমনি সাতচল্লিশে ছাত্রদের ভাষার দাবিকে সমর্থন এবং একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছে। পূর্ব বাংলার বাংলাদেশ হওয়ার এক প্রক্রিয়া বহু পূর্ব থেকেই শুরু হয়েছিল। তা রাজনীতিতেও যেমন সংস্কৃতিতেও তেমনি। অদ্বৈত ও ‘তিতাস’ তার সাংস্কৃতিক উদাহরণ। একে বোঝা না গেলে তার রাজনীতিকেও বোঝাও সহজ হবে না।