১৭ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

২৫ মার্চকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেয়া হোক

  • মুহম্মদ শফিকুর রহমান

দেরিতে হলেও বাংলাদেশে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতের গণহত্যার ইস্যুটি সামনে চলে এসেছে। দাবি উঠেছে সেই ভয়াল গণহত্যার দিনটিকে ‘আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস’ ঘোষণা করতে হবে। জাতিসংঘের কাছে এই দাবি। এ দাবির সমর্থনে হাজারো যুক্তি দেখানো যাবে। কেবল ২৫ মার্চ রাজধানী ঢাকা নগরীতে এক রাতে ৩০ হাজারেরও অধিক লোককে হত্যা করা হয়েছে। হত্যা করেছে তৎকালীন হানাদার পাকিস্তানী মিলিটারি জান্তা। ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নাম দিয়ে তারা ওই দিন রাত সাড়ে ৮টায় প্রথমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পিলখানা বিজিবি হেডকোয়ার্টার (তৎকালীন ইপিআর হেডকোয়ার্টার), রাজারবাগ পুলিশ লাইনে (পুলিশ হেডকোয়ার্টার) হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। ট্যাঙ্ক, ভারি কামানবাহী গান ক্যারেজসহ হাজার হাজার পাকিস্তানী সশস্ত্র মিলিটারি তাতে অংশ নেয়। তারপর থেকে ১৬ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় বিজয় পর্যন্ত দেশের সর্বত্র গণহত্যা চলতে থাকে। এমনি গণহত্যার নজির পৃথিবীতে আছে কিনা জানা নেই। মুক্তিযুদ্ধের ঐ ৯ মাসে ৩০ লাখ বাঙালীকে হত্যা এবং ৫ লক্ষাধিক মা-বোনকে ধর্ষণ ও হত্যা করা হয়েছে। পাকিস্তানী বর্বরদের নৃশংসতা এমন ছিল যে, বাঙালী নারীদের (অপ্রাপ্ত বয়স্ক তরুণীসহ) ক্যাম্পে ক্যাম্পে নিয়ে ধর্ষণ করে করে মেরে ফেলা হয়েছে। মায়ের সামনে মেয়েকে, সন্তানের সামনে মাকে, স্বামীর সামনে স্ত্রীকে ধর্ষণ করে বিকৃত আনন্দ (?) উপভোগ করেছে। মানুষ এমন বিকৃত রুচির হতে পারে ভাবলে আজও গা শিউরে ওঠে। কেবল বাঙালী বা বাংলাদেশ নয়, তাবত পৃথিবী এই গণহত্যা ও গণধর্ষণের খবর জানে।

প্রশ্ন উঠতে পারে এত পরে কেন দাবিটি সামনে আনা হলো। এ প্রশ্নের জবাব হলো, যে কারণে যুদ্ধাপরাধ বিচারটি দেরি হয়েছে, সেই একই কারণে এটিও সামনে আনতে দেরি হয়েছে, নবঃঃবৎ ষধঃব ঃযধহ হবাবৎ. আমরা দাবি করছি জাতিসংঘের কাছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিবেকের কাছে, সভ্যতার কাছে। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর সরকারের কাছে আমাদের আকুল আবেদন- আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দাবিটি উত্থাপন করুন। বিশ্ববিবেক যদি মনে করে মানবজাতি সভ্যতার যুগে বসবাস করছে তাহলে আমাদের দাবি অবশ্যই মেনে নেবে। অপরাধের বিচার না হওয়ার কালচার মানবতাকে হত্যা করে, মানবজাতিকে আবার পেছনে নিয়ে আইয়ামে জাহেলিয়াত বা অন্ধকার অসভ্য যুগে নিক্ষিপ্ত করে।

এই দাবি না মানলে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার, গণতন্ত্র, আইনের শাসন, ধর্মীয় অনুশাসন, সামাজিক অগ্রযাত্রা সব মুখথুবড়ে পড়বে। মানুষ আবার জংলি সমাজে প্রবেশ করবে। মানুষ আর মানুষ থাকবে না। মানুষের সমাজ হয়ে যাবে অমানুষের সমাজ। আমরা জানি মানুষের স্বভাবজাত ধর্ম হলো মানুষ সামনে এগিয়ে চলে। জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসার মানুষের সামাজিক, রাষ্ট্রিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক অগ্রযাত্রা নিশ্চিত করে। এভাবেই সভ্যতা এগিয়ে চলে।

সারা পৃথিবী জানে ও মানে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত এই ৯ মাস পাকিস্তানের তৎকালীন দখলদার মিলিটারি জান্তা বাংলাদেশে গণহত্যা চালিয়েছে। এ কথা বিশ্বাস করে না এমন দেশ নেই, কেবল সেই গণহত্যার জন্য দায়ী জল্লাদ ইয়াহিয়ার পাকিস্তান নতুন করে গণহত্যা অস্বীকার করতে চাইছে। বাংলাদেশ ‘আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের’ মাধ্যমে যখন সেদিনের গণহত্যার জন্য দায়ী পাকিস্তানী মিলিটারি জান্তার সক্রিয় সহযোগী মুসলিম লীগ, জামায়াত, রাজাকার, আলবদর, আল শামস নেতাদের বিচার শুরু করল, তখন পাকিস্তানের বর্তমান পার্লামেন্টে ‘নিন্দা প্রস্তাব’ (?) উত্থাপন হলো এবং পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বললেন, ‘একাত্তরে বাংলাদেশে কোন গণহত্যা হয়নি, কোন নারী নির্যাতন হয়নি, কোন অপরাধ হয়নি। প্রশ্ন করি, তবে কি করেছিল সেদিনের তোমাদের মিলিটারি জান্তা? ৩০ লাখ বাঙালী হত্যা, ৯ মাসব্যাপী ৫ লক্ষাধিক মা-বোনের ইজ্জত লুণ্ঠন ও হত্যা- এসব তবে কি?

‘গণহত্যা’ টার্মটি সামনে আসে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে নাজি গোষ্ঠী যখন ইউরোপ জু’দের বিরুদ্ধে ব্যাপক হত্যাকা- সংঘটিত করে। গণহত্যা মানে ইংরেজী ‘এবহড়পরফব’-এর দিকে তাকালে দেখা যাবে ÔGenocideÕ-Gi w`‡K ZvKv‡j †`Lv hv‡e ÔGenocide, a term used to describe violence against members of a national, ethnical, racial or religious group with the intend to destroy the entire group, came into general usage only after world war II, when the full extend of the atrocities committed by the Nazi regime against the Jews of Europe during that conflict became known. In 1948 the united nations (UNO) declared genocide to be an international crime, the term would later be applied to the horrific acts of violence committed during conflicts in the former yogoslavia and in the african country Rwanda in the 1990’s. An international treaty signed by some 120 counties in 1998 established the international criminal court (ICC) which has jurisdiction to prosecure crimes of Genocide, (Wikipedia).

তাছাড়া বাংলাদেশের গণহত্যা তো হয়েছে হাজার বছর ধরে ভাষা, সংস্কৃতি, আচার-আচরণ, ধর্ম ইত্যাদি চর্চার মাধ্যমে একটি জনগোষ্ঠী একটি জাতিতে রূপান্তর লাভ করে সেই জাতির নির্বাচিত নেতৃত্বের মাধ্যমে ঘোষিত স্বাধীনতা সংগ্রামী সেই জাতির বিরুদ্ধে গণহত্যা। একাত্তরে পাকিস্তানী জেনারেলরা বলেছিল, তারা বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ববাংলা) “হামে মিট্টি চাহিয়ে, আদমি নেহি।” তাদের সেই গণহত্যায় ১৯৫ কর্মকর্তাসহ ৯৩ হাজার পাকি সেনা অংশ নেয়। তাদের সঙ্গে যোগ দেয় বাংলাদেশের দালাল মুসলিম লীগ, জামায়াত, নেজামে ইসলামী প্রভৃতি দল। পাকিস্তানের দ্বারা সংঘটিত সেই গণহত্যার কথা অস্বীকার করে পাকিস্তান নিজেরাই প্রমাণ করল তাদের দেশটি একটি বর্বর ব্যর্থ রাষ্ট্র!

পাকিস্তানের ‘তেহরিক-ই-ইনসাফ’ দলের প্রধান ক্রিকেটার ইমরান খান যুদ্ধাপরাধী সালাউদ্দিন কাদের বা সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইন্যুনালে প্রদত্ত ফাঁসির দ- কার্যকর করার প্রাক্কালে এক ইমেল বার্তায় আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফাঁসি না দেয়ার জন্য অনুরোধ জানিয়েছিলেন। এই অনুরোধ কি রক্ষা করার ব্যাপার? কারণ প্রধানমন্ত্রী ভাল করেই এই ইমরান খানকে চেনেন। এই লোক একাত্তরের গণহত্যার অন্যতম নেতৃস্থানীয় যুদ্ধাপরাধী পাকিস্তানী জেনারেল নিয়াজির আপন ভাইপো বা ভাতিজা। তার কাছ থেকে এর চেয়ে বেশি কিছু আশা করা যায় না, করা উচিতও নয়।

তবে হ্যাঁ, পাকিস্তানেও মানবতাবাদী মানুষ রয়েছেন। পাকিস্তান মানবাধিকার কর্মী ও আইনজীবী আসমা জাহাঙ্গীর বলেছেন, “যুদ্ধাপরাধীদের নিয়ে পাকিস্তান সরকারের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ ও দ্বৈতনীতি এটাই প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের দায়ে যাদের ফাঁসি দেয়া হচ্ছে তারা আসলে ছিল পাকিস্তানের রাজনৈতিক চর।”

কিন্তু বাঙালী এবং বাংলাদেশের একজন মুক্ত নাগরিক হিসেবে আমরা অবাক হই যখন শুনি বিএনপি-জামায়াত জোট নেত্রী যিনি তিনবারের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন এবং তার স্বামী একজন মুক্তিযোদ্ধা, তিনি বলেন- ‘বাংলাদেশে শহীদের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক আছে।’ অর্থাৎ তিনি বোঝাতে চাইছেন পাকিস্তানীরা গণহত্যা চালায়নি। তিনি রেপকে রেপ মনে করেন কিনা জানি না, তবে অবাক হই এ জন্য যে, তিনি পাকিস্তানের পার্লামেন্ট ও পাকি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সুর মিলিয়ে কথাটি বললেন। তাহলে এ কথা কি স্পষ্ট হয়ে ওঠে না যে, বঙ্গবন্ধু হত্যার পর তার স্বামী মিলিটারি জিয়া বাংলাদেশকে ‘মিনি পাকিস্তান’ বানানোর অর্থাৎ আবার পাকিস্তানের ভাবধারায় ফিরিয়ে নেয়ার যে চক্রান্ত শুরু করেছিলেন আজ এত বছর পরও তার স্ত্রী-পুত্র সে পথেই চলছেন। সে কারণেই ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতকে ‘আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস’ ঘোষণার দাবি দিন দিন জোরদার হচ্ছে।

বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের মন্ত্রী মুক্তিযোদ্ধা শাজাহান খান ও মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক আবেদ খানের নেতৃত্বে এরই মধ্যে ‘আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ গণবিচার আন্দোলন’-এর ব্যানারে কিছুদিন থেকে আন্দোলন চলছে। দিন দিন এই আন্দোলন রাজধানী ঢাকা থেকে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। সংগঠনটি প্রাথমিকভাবে চলমান যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও রায় কার্যকর করার পাশাপাশি পাকিস্তান সরকার কর্তৃক তাদের দেশে নিয়ে গিয়ে বিচার করার অঙ্গীকার করা ১৯৫ যুদ্ধাপরাধীর বিচারের দাবি তুলেছে। উল্লেখ করা প্রয়োজন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৭৪ সালে দিল্লীতে অনুষ্ঠিত তিন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে পাকিস্তান অঙ্গীকার করে যে, এই ১৯৫ নেতৃস্থানীয় সেনা কর্মকর্তা যুদ্ধাপরাধী এবং নিজ দেশে নিয়ে পাকিস্তান তাদের বিচার করবে। সে বিচার পাকিস্তান আজও করেনি। ১৯৭৪-এর ৯ এপ্রিল দিল্লীতে অনুষ্ঠিত সেই পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে যে চুক্তি হয়েছিল তাতে স্বাক্ষর করেন বাংলাদেশের পক্ষে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন, ভারতের পক্ষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরদার শারণ সিং ও পাকিস্তানের পক্ষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আজিজ আহমদ। সেই চুক্তির ১৪নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছিল, পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশে এসে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাইবে। তারা অঙ্গীকার করেছিল, আটকেপড়া পাকিস্তানী নাগরিকদের ফিরিয়ে নেবে, পাকিস্তানের কাছে আমাদের পাওনা পরিশোধ করবে। কিন্তু তারা এর কোনটাই পালন করেনি।

অথচ দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ হয়েছে ৭০ বছর আগে। আজও জাপান ভিয়েতনাম, দক্ষিণ কোরিয়া প্রভৃতি দেশের কাছে ক্ষমা চেয়ে চলেছে। এমনকি সেই যুদ্ধকালীন ‘যৌনদাসী’ হিসেবে যাদের ওপর অত্যাচার করেছে তাদেরও ক্ষতিপূরণ দিতে রাজি হয়েছে। সেদিন আর বেশি দূর নয় যেদিন পাকিস্তানও বাংলাদেশের কাছে প্রদত্ত সকল অঙ্গীকার পালন করবে। সেদিন বিএনপি-জামায়াত জোট নেত্রীও অনুশোচনায় দগ্ধ হবেন কিনা বলা সন্দেহ।

ঢাকা : ৩১ মার্চ ২০১৬

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও সভাপতি জাতীয় প্রেসক্লাব

balisshafiq@gmail.com