১৬ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

কিংবদন্তি এক বাঙালী

  • মোজাম্মেল খান

বাঙালীর জাতীয় ইতিহাসে দু’হাজার বছরেরও বেশি সময়ে ক্রান্তিলগ্ন এসেছে বহুবার, কিন্তু স্বর্ণ অধ্যায় আসেনি বারবার। এ দুইয়ের সংমিশ্রণ হয়েছে শুধু একবারই- আর সেটা ঘটেছে ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে। আমাদের ইতিহাসের এটাই একমাত্র গৌরবময় কাহিনী। এ কাহিনীর স্মৃতিচারণ তাই ঘটবে বারবার; হয়তবা অনাদিকাল ধরে। যতদিন না আর এক গৌরবময় অধ্যায়ের অভ্যুদয় ঘটে, যেটা কিনা এটাকে ম্লান করে দেয়ার শক্তি রাখে।

বাঙালীর মতভেদ আর বিভাজনময়তার সুযোগে বাংলাশাসিত হয়েছে পরদেশীদের দ্বারা হাজার বছরের বেশি সময় ধরে। বাঙালীর জাতীয় চরিত্রের চিরন্তন এ রীতির প্রথম ব্যতিক্রম ঘটেছিল একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে-বাঙালীর ইতিহাস উল্টানো একতার মধ্য দিয়ে। আর এ ব্যতিক্রম ঘটানোর অসাধ্য কাজটি সংঘটিত করার সিংহভাগ কৃতিত্ব যে মহান বাঙালী সন্তানের পাপ্য তিনি আর কেউ নন, তিনি আমাদের ইতিহাসের রাখাল রাজা- শেখ মুজিবুর রহমান। সে মহান পুরুষের সমুদ্রসীমা দেশপ্রেম, সীমাহীন ত্যাগ, অমিত সাহস আর বজ্রকণ্ঠ (‘আমি যদি হুকুম দিবার না পারি...’) শুধু বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমার মধ্যে আবদ্ধ বাঙালীদেরই নয়, বিশ্বের প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থানরত বাঙালী সন্তানদের ধমনীতে দেশপ্রেমের বহ্নিশিখা প্রজ্বলিত করেছিল। তুচ্ছ করার মতো ব্যতিক্রম ছাড়া, সেদিন বিশ্বের যে যেখানে বাঙালী ছিলেন, সবারই চিন্তা, শক্তি আর শ্রম মিশে গিয়েছিল একই মোহনায়- যে মোহনার নাম ছিল মুক্তিযুদ্ধ।

আজকের এ নিবন্ধের স্বল্প পরিসরে আমি এমন একজন বাঙালীর একাত্তরের ভূমিকার কথা কিঞ্চিত উল্লেখ করব যিনি বিশ্বসভায় তাঁর কৃতিত্বের দ্বারা কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছেন। তাঁর নাম শোনেননি এমন বাঙালীর দেখা মেলা ভার। তিনি ছিলেন প্রকৌশলী ড. ফজলুর রহমান খান, এফ আর খান নামে যিনি সমধিক পরিচিত ছিলেন। তিনি ছিলেন শিকাগোর বাসিন্দা এবং স্কিডমোর, ওয়িং এবং মেরিল নামক বিশ্বখ্যাত স্থাপত্য এবং প্রকৌশল কোম্পানির অংশীদার এবং প্রধান স্থপতি। পরবর্তীতে এক বিশেষ স্ট্রাকচারাল পদ্ধতির উদ্ভাবন ও ব্যবহারের মধ্য দিয়ে তৎকালীন বিশ্বের সর্বোচ্চ বিল্ডিং শিকাগোর সিয়ার্স টাওয়ারের নির্মাতা হিসেবে তিনি বিশ্বখ্যাতি অর্জন করেন। কয়েক বছর আগে কায়রোতে মুসলিম বিশ্বকে উদ্দেশ করে দেয়া ভাষণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা উল্লেখ করেছিলেন, ‘একজন আমেরিকান মুসলমানই নির্মাণ করেছেন আমাদের দেশের সর্বোচ্চ টাওয়ারটি।’ সে ভাষণে তিনি যে মুসলমানকে ইঙ্গিত করেছিলেন তিনিই আমাদের কিংবদন্তি, প্রতিটি বাঙালীর গর্ব ড. এফ আর খান।

একাত্তরে ২৬ মার্চ মিলিটারি ক্রাকডাউন শুরু হবার পরপরই ড. এফ আর খান যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা বাঙালীদের অনুভূতি আর শক্তিকে সংগঠিত করার নেতৃত্ব প্রদান করেন। প্রখ্যাত কিছু আমেরিকানের সহায়তায় তিনি ইমার্জেন্সী ওয়েলফেয়ার আপীল নামে একটা ফান্ড গঠন করেন। এছাড়া তিনি বাংলাদেশ ডিফেন্স লীগও গঠন করেন। নিজের পেশার শত ব্যস্ততা সত্ত্বেও তিনি এ দুটো প্রতিষ্ঠানেরই চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন।

পাকিস্তানের ওয়াশিংটন দূতাবাসে এবং জাতিসংঘ মিশনে তখন বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ বাঙালী কর্মকর্তা ছিলেন। এদের মধ্যে জাতিসংঘ মিশনের ভাইস কন্সাল এসএ মাহমুদ আলী (বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী) ২২ এপ্রিল মুজিবনগর সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন। অন্যদের মধ্যে ছিলেন এসএ করিম এবং এনায়েত করিম (যথাক্রমে বাংলাদেশের দ্বিতীয় এবং তৃতীয় পরারাষ্ট্র সচিব), পরবর্তীতে আততায়ীর গ্রেনেডে নিহত এসএএমএস কিবরিয়া এবং বর্তমান অর্থমন্ত্রী এএমএ মুহিতও ছিলেন। তাদের সবাই গোপনে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করলেও একমাত্র জনাব মুহিতই ৩০ জুন দূতাবাস ত্যাগ করে মুজিবনগর সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন। তবে তারা সবাই মিলে একযোগে আগস্ট মাসে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করার কথা ভাবছিলেন। যদিও যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বাঙালী সক্রিয়রা এবং মুজিবনগর সরকারের তরফ থেকে তাদেরকে অতি শীঘ্র আনুগত্য প্রকাশের জন্য চাপ এবং তাগাদা দেয়া হচ্ছিল। এ ব্যাপারে কূটনীতিবিদদের অর্থনৈতিক গ্যারান্টি একটা সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সে সময় প্রবাসী মুজিবনগর সরকার যদিও কূটনীতিবিদদের ক্ষমতামাফিক মাসোহারা দিতে প্রস্তুত ছিলেন, কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় সেটা ছিল অপ্রতুল। ড. এফ আর খান তখন যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ মিশন অতি শীঘ্র খোলার ব্যাপারে ভীষণভাবে আগ্রহী ছিলেন এবং সে উদ্যোগ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আনুগত্য প্রকাশে আগ্রহী সমস্ত বাঙালী কূটনীতিকদের সঙ্গে একযোগে মিলিত হয়ে মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জিত না হওয়া অবধি তিনি তাদের অর্থনৈতিক প্রয়োজন মেটানোর দৃঢ় প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন এবং নিউইয়র্ক এবং ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাস খোলা হলে তার সমস্ত ব্যয়ভার বহনের প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন। সেদিনের পরিস্থিতিতে নিজের মাতৃভূমি এবং তার মানুষের জন্য কতটুকু দরদ থাকলে এমন বিশাল অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতি দেয়া সম্ভব সেটা অনুধাবন করা সহজ।

মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের পর স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর বিশেষ আমন্ত্রণে তিনি বাংলাদেশে গিয়েছিলেন। ১৯৯৯ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে প্রথম সরকারের শাসনে তাঁকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পদক প্রদান করা হয়।

সত্তর দশকের প্রথম দিকে সে সময়কার যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয়ে পড়তে আসলে এ বিশাল হৃদয়ের বাঙালীর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। তিনিও আমার মতো ফরিদপুরের অধিবাসী ছিলেন বিধায় আমাকে তিনি আর একটু বেশি আদর করতেন এবং ঘটনাক্রমে ড. এফ আর খানের পরে আমি প্রথম বাঙালী ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল থেকে ডক্টরেট লাভ করি। আমারও নামের শেষে খান থাকাতে ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুলের অনেক পুরনো অধ্যাপক জানতে চাইতেন আমরা একই পরিবার থেকে এসেছি কিনা। সে সময়ে তিনি ঞধষষ ইঁরষফরহম উবংরমহ নামে একটা কোর্স পড়াতেন আমাদের ক্যাম্পাস থেকে আশি মাইল দূরে স্প্রিংফিল্ড শহরে ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ের আর একটি ক্যাম্পাসে। আমি সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র না হয়েও ঐ বিভাগে অধ্যয়নরত আমার ভারতীয় রুমমেটের সঙ্গে ঐ কোর্সটা এটেন্ড করতাম।

তৎকালীন বিশ্বের সর্বোচ্চ বিল্ডিং শিকাগোর সিয়ার্স টাওয়ারের নির্মাণের মাধ্যমে বিশ্বখ্যাত হওয়ার পর (যেটাকে নিউজউইক বলেছিল খানের সিয়ার্স টাওয়ার এবং ’৭৩ সালের সেরা ইঞ্জিনিয়ারিং আবিষ্কার) তিনি আরও কয়েকটি বিখ্যাত বিল্ডিং ডিজাইন করেন যার মধ্যে রয়েছে জন হ্যানকক টাওয়ার এবং জেদ্দার হজ টার্মিনাল।

কেউ যদি ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয়ের ওয়েবসাইট বা ওয়াইকিপেডিয়া যান তাহলে দেখতে পাবেন যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৭ জন প্রাক্তন ছাত্র নবেল পুরস্কার পেয়েছেন তাদের সবাইকে ডিঙ্গিয়ে ড. এফ আর খানকে ’ঘড়ঃধনষব অষঁসহর’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। উপরন্তু তাকে স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের আইনস্টাইন হিসেবে এবং বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। এ বিরল সম্মান আর কোন বাঙালীর ভাগ্যে জুটেছে বলে আমার জানা নেই।

আমাদের তথা বিশ্বের স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং চরম দুর্ভাগ্য যে ১৯৮২ সালের ২৭ মার্চ মাত্র ৫৩ বছর বয়সে এ কিংবদন্তি মানুষটি আকস্মিকভাবে চিরবিদায় নেন। তাঁর মৃত্যু সংবাদে মুক্তিযুদ্ধের আর এক প্রবাসী নেতৃত্ব বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী মক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদানের কথা স্মরণ করে এমনভাবেই তাঁর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন, ‘সাধনার উচ্চতম স্তরে উপনীত এই দেশপ্রেমিক মানুষটির নিরহংকার ব্যবহার আমাকে মুগ্ধ করে। দেশ থেকে দূরে সমস্ত জীবন কাটালেও দেশের মানুষের প্রতি তাঁর এই ভালবাসার কথা তারা কি করে জানবেন, উপলব্ধি করবেন, এক নির্মম বেদনা তাঁকে যেন অস্থির করে তুলেছিল। তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। ধন্যবাদের অপেক্ষা করেননি, বিদায় নেবার সুযোগ দেননি। তাঁর কথা লিখতে গিয়ে চোখ দুটি আমার আজ যেমন সজল হয়ে উঠছে, তাঁর অম্লান স্মৃতি যতদিন বেঁচে থাকবে আমাকে এমনি করেই নাড়া দেবে।’

লেখক : ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয়ের প্রাক্তন ছাত্র এবং বর্তমানে কানাডা প্রবাসী অধ্যাপক