১৬ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পদ্মা সেতুর কর্মযজ্ঞ ক্রমশ প্রসারিত, ট্রায়াল পাইপ স্থাপনে সফল

  • বর্ষায় কাজ চালু রাখতে সাপ্লিমেন্টারি কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ড স্থাপন চলছে

মীর নাসিরউদ্দিন উজ্জ্বল, মুন্সীগঞ্জ ॥ পদ্মা সেতুর কর্মযজ্ঞের তরঙ্গ ক্রমশ প্রসারিত হচ্ছে। বৃহস্পতিবার জাজিরা প্রান্তে ট্রায়াল পাইল সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। ৩৯ ও ৩৮ নম্বর পিলারের মাঝখানে এই ট্রায়াল পাইল স্থাপন সফল হওয়ায় এই প্রান্তে মূল পাইলের কাজ শুরু এখন সময়ের ব্যাপার। তাই ৩৯ ও ৩৮ নম্বর পিলারে মঞ্চ তৈরি হয়ে গেছে। পাইল ড্রাইভ করার জন্য অন্যান্য উপকরণেরও সমবেশ করা হয়েছে। এদিকে বর্ষায় সেতুর কাজ চলমান রাখতে করলী চরে সাপ্লিমেনটারি কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ড স্থাপনের কাজ চলছে দ্রুত গতিতে। ইতোমধ্যেই ইয়ার্ডটির ৪০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এদিকে কাওড়াকান্দি ফেরিঘাট সরিয়ে আনতে নৌ পরিবহন মন্ত্রী শাহজাহান খান বৃহস্পতিবার সরেজমিন পরিদর্শন করেছেন। এই সময় নৌ সচিব, পদ্মা সেতুর প্রকল্প পরিচালক, বিআইডব্লিউটিএ’র উর্ধতন কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন। এই পরিদর্শনের পর আরও স্পট হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ কাওড়াকান্দি ঘাটটি কাঁঠালবাড়িতে সরিয়ে আনার বিষয়টি। ডিসেম্বরের মধ্যে ফেরিঘাটটি সরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। কাঁঠালবাড়ি ঘাট থেকে খুলনা সড়কে যোগাযোগের সুবিধার্থে নববর্মিত পদ্মা সেতুর ৮ কিলোমিটার এ্যাপ্রোচ রোড যথা সময়ে খুলে দেয়া হবে। এদিকে গড়ে পদ্মা সেতুর কাজ প্রায় ৩২ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

শুক্রবার প্রধানমন্ত্রীর এপিএস মোঃ জাহাঙ্গীর আলম ও মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোঃ সাইফুল হাসান বাদল পুরো প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেছেন। পরিদর্শন শেষে বিকেলে জেলা প্রশাসক জানান, অগ্রগতি সন্তোষজনক। প্রতিটি ধাপেই অবিরাম কাজ চলছে যথাযথভাবে। তাই নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সেতুটির কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা তাদের জানিয়েছেন।

পদ্মা সেতু প্রকল্পের অফিসিয়াল ডকুমেন্টরির জন্য মাওয়া প্রান্তে অফিস করা হয়েছে। কুমারভোগের পুনর্বাসন প্রকল্পের ভেতরে একটি ভবনে নেয়া হয়েছে এই অফিস। ইমপ্রেস টেলিফিল্ম এই ডকুমেন্টরিটি তৈরির দায়িত্ব পেয়েছে। ডকুমেন্টরিটি ১৫ মিনিট, ৩০ মিনিট, ৪৫ মিনিট ও ২ ঘণ্টার করা হবে। ছয় মাস অন্তর আপডেট হবে। সময় অনুযায়ী উপযোগী স্থানে এটি প্রকাশ হবে। পাঁচ বছর মেয়াদী এই প্রকল্পে বৈচিত্র্যময় পদ্মায় তৈরি হওয়া সেতুটির সকল ধাপ উঠে আসবে। বর্ষা আসন্ন হওয়ায় সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে নদী শাসনের কাজ। নদী শাসনের জন্য কাঁঠালবাড়ি থেকে কাওড়াকান্দি পর্যন্ত নদী তীর ঘেঁষে মাটির রাস্তা তৈরি সম্পন্ন হয়েছে। এই রাস্তা ব্যবহার করে নদী শাসনে ব্লক স্থাপন এবং জিও ব্যাগ ফেলাসহ নানান কাজ সহজ হবে। ইতোমধ্যে নদী শাসনে মাওয়া এবং জাজিরা প্রান্তের এ বছরের ড্রেজিং সম্পন্ন হয়ে গেছে। কাওড়াকান্দিতে ড্রেজিংয়ের প্রস্তুতি চলছে। ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপ লাইন স্থাপন করে ড্রেজিংয়ের বালু মাঝের চরে ব্লক-১২তে ফেলা হবে। মাওয়া প্রান্তে নদীর তলদেশে গভীর গর্ত পূরণে ফেলা বালুভর্তি প্লাস্টিকের ব্যাগ ফেলার কাজ চলতি মাসেই সম্পন্ন হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

এছাড়া এ্যাপ্রোচ রোডসহ সব প্যাকেজেই এখন কাজ আর কাজ। আজ শনিবার পদ্মা সেতুর নিয়মিত সভা বসছে দোগাছির সার্ভিস এরিয়ার মিলনায়তনে। এই সভায় কাজের নানা দিক উঠে আসবে।

পদ্মা সেতু ঘিরে এলাকার চিত্র ক্রমেই পাল্টাচ্ছে। তাই পর্যটকও বাড়ছে এখানে জমিজমার দামও বাড়ছে পাল্লা দিয়ে। পাল্টেছে এলাকার আর্থ সামাজিক অবস্থার। সেতু এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের জীবন জীবিকায়ও পরিবর্তন এসেছে। প্রকল্প এলাকায় ভিটে মাটি দেয়া কিছু পরিবারের ঠিকানা এখন পদ্মা সেতু পুনর্বাসন কেন্দ্রে। সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হচ্ছে তাদের। তবে পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা পেলেও নিরাপত্তাহীনতা এবং দীর্ঘ মেয়াদে জমির মালিকানা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে তাদের মধ্যে। প্রকল্পে যাদের ভিটে জমি কিংবা ফসলি জমি গিয়েছে পদ্মা সেতু প্রকল্পে। পরিবর্তে তাদের পছন্দমতো পুনর্বাসন কেন্দ্রে প্লট এবং নগদ অর্থ প্রদান করা হয়েছে। সে টাকায় তাদের কেউ কেউ টিনের ঘর তুলেছেন, কেউ কেউ বানিয়েছেন বহুতল ভবন। সরকারী উদ্যোগে গড়ে তোলা হয়েছে মসজিদ, প্রাথমিক বিদ্যালয়। দেয়া হয়েছে পানি বিদ্যুতের সংযোগও। আগের সেই চেনা পরিবেশ, স্বজন ছেড়ে নতুন এলাকায় নতুন জীবনে অভ্যস্ত হতে শুরু করেছে তারা। সেখানকার পরিবেশ বেশ গোছাল। কুমারভোগ এলাকায় নানাবিধ সুবিধাসহ করা বিদ্যালয়টি এখনও চালু হয়নি। তবে এখানে এটি চালুর প্রক্রিয়া চলছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এছাড়া স্বাস্থ্য সেবারও সুযোগ থাকবে। প্রকল্প শেষ হয়ে গেলেও এখানকার মানুষদের কর্মসংস্থানের জন্য দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নেয়া হবে। স্কুল ও স্বাস্থ্য কেন্দ্র জাতীয়করণ করার কথা রয়েছে। নব নিযুক্ত ম্যানেজমেন্ট কনসালটেন্ট পদ্মা সেতুর তদারকি করে যাচ্ছে। যুক্তরাজ্যের হাই পয়েন্ট রেন্ডেল নামের প্রতিষ্ঠানটি নির্মাণ কাজের ব্যবস্থাপনায় আরও উন্নতি করার চেষ্টা চালাচ্ছে। পদ্মা সেতুর নির্বাহী প্রকৌশলী দেওয়ান আব্দুল কাদের জানিয়েছেন, ৩৯ ও ৩৮ নম্বর পিলারের মাঝখানে ট্রায়াল পাইল সফলভাবে স্থাপন হওয়ায় জাজিরা প্রান্তে মূল সেতুর পাইলিং ড্রাইফ শীঘ্রই শুরু হচ্ছে। এছাড়া বর্ষায় মূল সেতুর কাজ চলমান রাখতেও সব প্রস্তুতি চলছে।