১৮ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

চট্টগ্রামে ড্রিংকিং ওয়াটারের নামে বিক্রি হচ্ছে নদী ও লেকের পানি

  • নগরবাসীর সঙ্গে প্রতারণা

মাকসুদ আহমদ, চট্টগ্রাম অফিস ॥ পানিই জীবন বইয়ের পাতায়। আর পানিই মরণ বাস্তবতায়। কারণ পানি নিয়ে চট্টগ্রামে যে ব্যবসা শুরু হয়েছে তা নগরবাসীর সঙ্গে একদিকে প্রতারণা অন্যদিকে জীবনকে মরণে পরিণত করার অপচেষ্টা বলে অভিযোগ করেছেন নগরবাসী। নগরীর বিভিন্ন স্থানে ওয়াসার পানি, লেকের পানি এমনকি নদীর পানিও ফিটকিরি দিয়ে পরিষ্কার করে জারে ঢুকানো হচ্ছে। চলছে মিনারেল ওয়াটার নামে বিভিন্ন কোম্পানির রমরমা ব্যবসা। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রুহুল আমিনের নেতৃত্বে সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার ৫টি মিনারেল ওয়াটার বা ড্রিঙ্কিং ওয়াটার কোম্পানিকে জরিমানার মধ্য দিয়ে অপরাধীদের ব্যবসা গুটিয়ে দেয়া হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, আবাসিক এলাকার নিচতলায় কয়েকটি কক্ষ বা নগরী থেকে অনেক দূরে অবস্থানরত কোন এলাকা থেকে জারে পানি ভর্তি করে সরবরাহ করা হচ্ছে। নগরবাসীও দেদারছে এসব পানিকে মিনারেল ওয়াটার হিসেবে পান করে প্রতারিত হচ্ছেন। গচ্চা যাচ্ছে অর্থ। ধরা পড়ছে না অপরাধীরা। এমন অভিযোগকে ভিত্তি করে মাঠে নেমেছে জেলা প্রশাসন। ভেজাল পণ্য প্রস্তুতকারী থেকে সরবরাহকারী পর্যন্ত সকলকে আইনের আওতায় আনতে জেলা প্রশাসনের অব্যাহত প্রচেষ্টা গত প্রায় বছর খানেক ধরে। ভোক্তা অধিকার আইন লঙ্ঘন করে এমনকি বিএসটিআই লগো অনুমোদন না নিয়ে মোড়কীকরণে ছাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। গ্রাহকরাও যাচাই বাছাই না করে এমনকি নাম সর্বস্ব ড্রিঙ্কিং ওয়াটার কোম্পানির পানি ভর্তি জারগুলো কিনে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। শুধু আর্থিক ক্ষতিই নয়, শারীরিক, মানসিক ক্ষতিও চলছে সমানতালে। আরও অভিযোগ রয়েছে, নগরীর আনাচে কানাচে ছাড়াও নগরীর বাইরে সীতাকু- থানা এলাকার সলিমপুরে রয়েছে একটি ড্রিঙ্কিং ওয়াটার কোম্পানি। সেখানে ডিপটিউবওয়েলের পানি জারে ঢুকিয়ে নগরীতে সরবরাহের অভিযোগ রয়েছে। সলিমপুর আবাসিক এলাকা হলেও অনেকটা জনমানবহীন। আবাসিক এলাকার শুরুতে স্থানীয়দের কিছু ঘরবাড়ি থাকলেও মূলত এটা জঙ্গল সলিমপুর হিসেবে খ্যাত। চউকে এ আবাসিক এলাকাকে ঘিরে পানি ব্যবসায়ীদের একটি চক্র তৎপর রয়েছে পাহাড়ঘেঁষা শেষপ্রান্তে। ওই এলাকার সাইফুদ্দিন মানিক নামে এক অধিবাসী জানিয়েছেন, প্রতিদিনই পিকআপে করে শত শত জারভর্তি পানি নিয়ে যাওয়া হয় শহরে। দিন শেষে খালি জার ফিরে আসে ওই কারখানায়। প্রায় অর্ধশত পানির কলে জার বসিয়ে ভর্তি করা হয়। পানির মান নিয়ন্ত্রণে নেই কোন ব্যবস্থাপনা।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানানো হয়েছে, ড্রিঙ্কিং ওয়াটার নিয়ে অভিযোগের পাহাড় জমা হয়েছে জেলা প্রশাসন দফতরে। ভিন্ন ভিন্ন নামে ও আকর্ষণীয় ডায়ালগ লেখে বাজারজাত করা হচ্ছে মানুষের জীবন রক্ষাকারী সুপেয় পানির নামে লেক, ওয়াসা ও ফিটকিরিতে পরিশোধিত পানি। নগরীর বাকলিয়া থানাধীন কেবি আমান আলী সড়কের শাবাবা ড্রিঙ্কিং ওয়াটার ও আরওয়া ড্রিঙ্কিং ওয়াটার নামক কারখানায় অভিযান চালানো হয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালতের। বিএসটিআই-এর অনুমোদন ছাড়াই চলছিল শাবাবা কোম্পানি। মালিক পক্ষ স্বীকার করেছেন তাদের ল্যাব আছে কিন্তু কেমিস্ট নেই। অথচ, গত পাঁচ মাসেরও বেশি সময় ধরে তারা কোন ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া পানি সরবরাহ করে আসছে গ্রাহকের কাছে। অপরদিকে, আরওয়া ড্রিঙ্কিং ওয়াটার কোম্পানির লাইসেন্সের মেয়াদ গত বছরের জানুয়ারিতে। তাদের কোন লাইসেন্স যেমন নেই, তেমনি নেই কোন ল্যাবরেটরিও। ফলে কম খরচে অতি মুনাফাভোগী এ প্রতিষ্ঠানটি চলে আসছে মুখের পরিচয়ে। এ দুটি প্রতিষ্ঠান প্রতিদিন অন্তত ৩শ’ জার পানি বিক্রি করে আয় করত প্রায় ১৫ হাজার টাকা। সরবরাহ খরচ মাত্র দেড় থেকে দুই হাজার টাকা। গড়ে প্রতিমাসের আয় দাঁড়ায় প্রায় ৪ লাখ টাকা। শ্রমিক-কর্মচারীর বেতন দিয়ে কোম্পানি মাসে প্রায় ৩ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকা আয় করত। তবে দুটি প্রতিষ্ঠানের মালিকই পানি পরীক্ষার যন্ত্রপাতি সাজিয়ে রেখেছে। কিন্তু পরিচালনার লোকবল না রেখেই প্রতারণার মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছিল।