১৭ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

চামড়া ঢোকেনি ॥ হাজারীবাগের ট্যানারি স্থানান্তরে কঠোর অবস্থানে সরকার

চামড়া ঢোকেনি ॥ হাজারীবাগের ট্যানারি স্থানান্তরে কঠোর অবস্থানে সরকার
  • চার প্রবেশ পথে পুলিশ পাহারা ;###;৩১ মার্চ পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছিল সরকার ;###;স্থানান্তরের প্রস্তুতি হিসেবে অনেক কারখানা বন্ধ

স্টাফ রিপোর্টার ॥ দফায় দফায় সময় বাড়ানোর পরও রাজধানীর হাজারীবাগের ট্যানারিগুলো ব্যবসায়ীরা সাভার চামড়া (ট্যানারি) শিল্পনগরীতে স্থানান্তর না করায় কঠোর অবস্থান নিল সরকার। প্রথমবারের মতো হাজারীবাগে কাঁচা চামড়ার প্রবেশ ঠেকাতে বসানো হয়েছে পুলিশী পাহারা। পুলিশের দাবি, শুক্রবার হাজারীবাগে কোন কাঁচা চামড়া প্রবেশ করেনি। এই এলাকার চারটি প্রবেশপথে ফোর্স মোতায়েন রয়েছে। এছাড়া অন্য কোনভাবেই যেন চামড়া না ঢোকে সেদিকেও নজর রাখা হচ্ছে। দফায় দফায় বাড়ানোর পর সর্বশেষ ট্যানারি স্থানান্তরে মালিকদের ৩১ মার্চ সময় বেঁধে দিয়েছিল সরকার। বলা হয়েছিল, ১ এপ্রিল থেকে হাজারীবাগে কাঁচা চামড়া প্রবেশ করতে দেয়া হবে না। শুক্রবার থেকে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। পরবর্তী নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত কাঁচা চামড়ার প্রবেশ ঠেকাতে প্রবেশপথে পুলিশ ফোর্স মোতায়েন থাকবে বলে জনকণ্ঠকে জানিয়েছেন হাজারীবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মীর আলিমুজ্জামান।

ছোট-বড় মিলিয়ে হাজারীবাগের প্রায় ১৫৫ ট্যানারির সাভারে সরে যাওয়ার কথা। শুক্রবার সকালে হাজারীবাগ এলাকা ঘুরে জানা যায়, সাভারে স্থানান্তরের প্রস্তুতি হিসেবে কিছু ট্যানারি পর্যায়ক্রমে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। কারখানা বন্ধের কারণ হিসেবে শ্রমিকরা বলছেন, কাজ নেই, তাই বন্ধ। তবে সাভারে নেয়া উপলক্ষে অস্থিরতার কারণে কাজ আসছে না বলেও কেউ কেউ জানিয়েছে। কিছু কারখানা চালু থাকলেও শুক্রবার ছুটির দিনে সেখানে কাজ বন্ধ। আবার কিছু কারাখানায় চামড়া প্রক্রিয়াকরণের কাজ চলতে দেখা গেছে, কিন্তু কোন কর্মকর্তাকে সেখানে পাওয়া যায়নি। একটি কারখানার শ্রমিক জানালেন, মাসখানেকের কাঁচামাল তারা আগেই সংগ্রহ করে রেখেছিলেন। সেই কাঁচামাল দিয়েই কাজ চলছে। শ্রমিকরা আরও জানালেন, সকাল থেকে পুলিশের গাড়ি টহল দিচ্ছে। কাঁচা চামড়া ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না। তবে কয়েক এলাকাবাসী অভিযোগ করেন, সকালের দিকে টহল জোরদার থাকলেও জুমার নামাজের ফাঁকে কাঁচা চামড়াবাহী কয়েকটি গাড়ি ট্যানারিতে ঢুকেছে। তবে হাজারীবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মীর আলিমুজ্জামান এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। জনকণ্ঠকে তিনি বলেন, যে কাঁচা চামড়ার কথা বলা হচ্ছে তা কারখানার মজুদ চামড়া। নতুন করে কোন কাঁচা চামড়া কোন কারখানায় প্রবেশ করতে পারেনি। আমরা এ ব্যাপারে সজাগ রয়েছি। কাঁচা চামড়া সরবরাহকারীদের সংগঠন বাংলাদেশ হাইড এ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট এ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোঃ দেলোয়ার হোসেনও স্বীকার করেন, পুলিশের তৎপরতার কারণে শুক্রবার কাঁচা চামড়ার চালান হাজারীবাগে ঢুকতে পারেনি। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে জনকণ্ঠকে বলেন, সরকার আর ট্যানারি মালিকদের টানাপোড়েনের কারণে আমরা চামড়ার সরবরাহকারী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। কাঁচা চামড়া কারখানায় ঢুকতে না দিলে আমরা রাখব কোথায়? এভাবে চামড়া তো বেশিদিন সংরক্ষণ করা যাবে না। চামড়া শিল্পের স্বার্থে সরকার ও ট্যানারি মালিকদের ঐকমত্য হতে হবে। তা না হলে হাজার হাজার কোটি টাকার এ শিল্প ধ্বংস হয়ে যাবে।

৬০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এসব ট্যানারি রাজধানীর পরিবেশ দূষণ করে আসছে। বিভিন্ন সরকারের আমলে এ শিল্প স্থানান্তরের দাবি উঠলেও কার্যকর উদ্যোগের অভাবে তা সম্ভব হয়নি। গত শতাব্দীর চল্লিশের দশকে নারায়ণগঞ্জে দেশের প্রথম ট্যানারি শিল্প গড়ে ওঠে। অল্প সময়ে এ শিল্পের পরিসর বাড়তে থাকায় পঞ্চাশের দশকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকার এ শিল্পকে হাজারীবাগে সরিয়ে নেয়। এই শিল্প বাণিজ্যিক সাফল্য পেলেও ১৯৮৬ সালে তৎকালীন সরকার ‘সবচেয়ে বেশি দূষণকারী’ শিল্প খাত হিসেবে হাজারীবাগের ট্যানারি কারখানাগুলো ‘লাল’ ক্যাটাগরিভুক্ত করে।

এসব শিল্প প্রতিষ্ঠানের দূষণ নিয়ন্ত্রণে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ নিশ্চিত করতে পরিবেশ অধিদফতর, বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় ও শিল্প মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দিয়ে সরকার ওই বছর ৭ আগস্ট পরিপত্র জারি করে। দূষণ মোকাবেলায় কার্যকর সরঞ্জাম ছাড়া নতুন কোন কারখানা যাতে চালু হতে না পারে সে বিষয়টিও নিশ্চিত করতে বলা হয় পরিপত্রে। দূষণ বন্ধে সরকারী নানা উদ্যোগের মধ্যে ২০০১ সালে নির্দেশনা আসে উচ্চ আদালত থেকেও। সাভারে চামড়া শিল্পনগরী করে সেখানে ট্যানারি সরিয়ে নেয়ার উদ্যোগ নেয় সরকার। সাভারের হেমায়েতপুরে ২০০ একর জায়গাজুড়ে পরিবেশবান্ধব চামড়া শিল্পনগরী গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত হয়।

২০০৩ সালের ১৬ আগস্ট একনেক সভায় চামডা শিল্পনগরী প্রকল্পের অনুমোদন হলেও তার কাজ শেষ হতে পেরিয়ে যায় এক যুগ। হাজারীবাগ থেকে সব ট্যানারি সেখানে সরে যেতে ২০১৫ সালের জুন পর্যন্ত সময় দেয়া হয়। কিন্তু কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগারের (সিইটিপি) নির্মাণকাজ শেষ না হওয়ায় সেই প্রক্রিয়া বিলম্বিত হতে থাকে, দফায় দফায় পেছাতে থাকে স্থানান্তর প্রক্রিয়া। সেই সিইটিপি শেষ পর্যন্ত আংশিকভাবে চালু হয়েছে চলতি বছর জানুয়ারিতে। এই শিল্পনগরের ২০৫ প্লটে ১৫৫ কারখানা স্থাপন করার কথা। শিল্প মন্ত্রণালয়ের এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন (বিসিক)। বিসিক ও ট্যানারি মালিকদের দুই সংগঠনের মধ্যে সই হওয়া সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, ট্যানারি মালিকদের ২০১৪ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে হাজারীবাগের সব ট্যানারি সাভারে স্থানান্তরের কথা ছিল। পরে আরও দুই দফা সময় বাড়িয়ে ট্যানারি স্থানান্তরের নতুন সময় গত ৩১ ডিসেম্বর নির্ধারণ করা হয়। এরপর আবারও সময় বাড়ানো হয়। এভাবে এই দীর্ঘ সময়ে ট্যানারি সরাতে কারখানা মালিকদের তাগিদ দেয়া হয়েছে অন্তত ২০ বার।

হাজারীবাগের ২৮ ট্যানারীর মালিককে গত জানুয়ারিতেও উকিল নোটিস পাঠিয়েছে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন (বিসিক)। ট্যানারি স্থানান্তরের নির্দেশনা না মানায় দশ কারখানার মালিককে গত ২৩ মার্চ তলব করে উচ্চ আদালত। মালিকদের গড়িমসিতে ক্ষুব্ধ হয়ে শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু গত ১০ জানুয়ারি বলেন, যেসব ট্যানারি ৭২ ঘণ্টার মধ্যে হাজারীবাগ ছাড়বে না সেগুলো বন্ধ করে দেয়া হবে। অবশ্য পরে শিল্পমন্ত্রী বলেন, মালিকদের তাদের নোটিস পাঠানো হবে। যেহেতু এটা আইনী প্রক্রিয়ার ব্যাপার সেহেতু নোটিসের মাধ্যমেই তা করতে হবে। তাড়াহুড়ো করে করা যাবে না। প্রসঙ্গত, ট্যানারিগুলোর কারণে বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা নদী অব্যাহতভাবে দূষণের শিকার হচ্ছে। বেশিরভাগ ট্যানারি মালিকের সাভারে প্লট আছে। কিন্তু এর পরও তারা সরকারের নির্দেশ মানছেন না। এ প্রসঙ্গে শিল্পমন্ত্রী বলেন, নির্দেশ না মানলে প্লট বাতিল করা হবে। প্লট বরাদ্দ পাওয়ার জন্য বহু ব্যবসায়ী অপেক্ষা করছে, প্রয়োজনে তাদের দিয়ে দেব। পরে ট্যানারি মালিকদের দাবির প্রেক্ষিতে কয়েক দফা সময় বাড়িয়ে ৩১ মার্চ সময় বেঁধে দেয়া হয়। তাতেও টনক না নড়ায় শুক্রবার থেকে ট্যানারিগুলোতে চামড়া সরবরাহ বন্ধের রাস্তায় গেল সরকার।