১৬ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

কঠোর নজরদারিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের দুই কর্মকর্তা

কঠোর নজরদারিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের দুই কর্মকর্তা
  • রিজার্ভের টাকা চুরি

গাফফার খান চৌধুরী ॥ রিজার্ভের টাকা চুরির ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের আলোচিত দুই উর্ধতন কর্মকর্তা কঠোর নজরদারিতে রয়েছেন। এই দুই কর্মকর্তা টাকা চুরির পর পরই ফিলিপিন্সে গিয়েছিলেন। তারা সেখানে ফিলিপিন্সের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গর্বনরসহ উর্ধতন ব্যাংক কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এরপর ওই দুই কর্মকর্তার সঙ্গে ফিলিপিন্সের রাষ্ট্রীয় তরফ থেকেও যোগাযোগ হয়। ফিলিপিন্সের তরফ থেকে চুরি যাওয়া টাকা স্বল্প সময়ের মধ্যে ফেরত দেয়ার আশ্বাস দেয়া হয়েছিল। এমন আশ্বাসের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গর্বনর আতিউর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট উর্ধতন ব্যাংক কর্মকর্তারা টাকা চুরির বিষয়টি গোপন রাখেন। কিন্তু পরবর্তীতে স্বল্প সময়ের মধ্যে ফিলিপিন্স থেকে টাকা ফেরত না আসায় এবং সেদেশটির গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হওয়ায় তোলপাড় শুরু হয়। আর তাতেই পরবর্তীতে পদত্যাগ করেছিলেন গর্বনর আতিউর রহমান ও দুই ডেপুটি গর্বনরসহ অনেকে। চুরি যাওয়া টাকা উদ্ধারের বিষয়ে বিশেষ নজরদারিতে থাকা সেই দুই কর্মকর্তাকে আবারও ফিলিপিন্সে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে। চুরি যাওয়া টাকার অধিকাংশই এখনও ফিলিপিন্সেই রয়েছে বলে তদন্তকারী সংস্থাগুলোর ধারণা। আলোচিত দুই কর্মকর্তাকে তদন্তকারী একাধিক সংস্থা জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। আর জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে এসেছে এমন তথ্য।

প্রসঙ্গত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের জমা রাখা অর্থের মধ্যে ৮শ’ কোটি টাকা চুরির ঘটনায় গত ১৫ মার্চ রাজধানীর মতিঝিল থানায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব ও বাজেট বিভাগের যুগ্ম পরিচালক জোবায়ের বিন হুদা অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেন। মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনে দায়েরকৃত মামলাটি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) তদন্ত করছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের যোগাযোগ রাখার সরাসরি সার্ভার স্টেশন রয়েছে। যেটি বাংলাদেশ ব্যাংকে স্থাপিত। সার্ভার স্টেশনে ২২ জন প্রযুক্তিবিদ কাজ করেন। যাদের মধ্যে মাত্র ২ জন প্রযুক্তি বিষয়ে খানিকটা পারদর্শী। চব্বিশ ঘণ্টা সার্ভার স্টেশনটি মনিটরিং করার কথা। কিন্তু তা হচ্ছিল না। এমন সুযোগটিকে কাজে লাগিয়ে টাকা চুরি করে হ্যাকাররা। মূলত টাকা চুরির ঘটনাটি ঘটে গত ৪ থেকে ৬ ফেব্রুয়ারির মধ্যে। বাংলাদেশ ব্যাংক বিষয়টি জানত না। ফিলিপিন্সের তরফ থেকে যোগাযোগ করা হলে হুঁশ ফেরে বাংলাদেশ ব্যাংকের।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, বিষয়টি জানার পর গত ১৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের উর্ধতন কর্মকর্তারা বৈঠক করেন। বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৬ থেকে ১৮ ফেব্রুয়ারি তিন দিনের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের এ্যাকাউন্টস এ্যান্ড বাজেটিং বিভাগের ডিজিএম জাকের হোসেন ও বিএফআইইউ (বাংলাদেশ ফিন্যান্স ইন্টেলিজেন্স ইউনিট) এর যুগ্ম পরিচালক মোহাম্মদ আবদুর রবকে ফিলিপিন্সে পাঠানো হয়। তারা সেখানে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘ব্যাংকো সেন্ট্রাল এনজি ফিলিপিনাস’ (বিএসপি) ও এ্যান্টি মানি লন্ডারিং কাউন্সিলের (এএমএলসি) সঙ্গে আলাদা আলাদ বৈঠক করেন। বৈঠকে হ্যাকার গ্রুপকে চিহ্নিত করা হয়।

তদন্তকারী সংস্থা সূত্রে জানা গেছে, ওই দুই ব্যাংক কর্মকর্তার সঙ্গে ফিলিপিন্সের সেন্ট্রাল ব্যাংকের গবর্নর ও সেদেশটির রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও যোগাযোগ হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের দুই কর্মকর্তা দ্রুত টাকা ফেরত পাওয়ার বিষয়ে ফিলিপিন্সের সহযোগিতার কথা জানায়। দুই কর্মকর্তাকে স্বল্প সময়ের মধ্যেই টাকা ফেরত দেয়ার আশ্বাস দেয়া হয় সে দেশটির সেন্ট্রাল ব্যাংক ও এ্যান্টি মানি লন্ডারিং কাউন্সিল এং ফিলিপিন্সের রাষ্ট্রীয় তরফ থেকে।

এমন আশ্বাস পেয়ে ওই দুই কর্মকর্তা দেশে ফেরত আসেন। তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গর্বনর আতিউর রহমানসহ উর্ধতন কর্মকর্তাদের বিষয়টি অবহিত করেন। পরে এ বিষয়ে গবর্নরসহ সংশ্লিষ্ট উর্ধতন কর্মকর্তারা ঘন ঘন বৈঠক করতে থাকেন। বৈঠকে টাকা চুরির বিষয়টি প্রকাশ না করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। কারণ গবর্নরসহ সংশ্লিষ্টদের ধারণা ছিল, স্বল্প সময়ের মধ্যেই যেহেতু টাকা ফেরত পাওয়া যাচ্ছে, সেক্ষেত্রে এমন খবর সরকার বা সংশ্লিষ্টদের না জানানোই ভাল। জানালে ব্যাংক ছাড়াও সরকারের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণœ হবে। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের সাইবার নিরাপত্তা বিষয়েও নানা প্রশ্ন উঠবে। বৈঠকের এমন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী টাকা চুরির বিষয়টি সরকারের উর্ধতনদের আর জানানো হয়নি।

কিন্তু বিপত্তি দেখা দেয় গত ২৯ ফেব্রুয়ারি ফিলিপিন্সের ইনকোয়ার পত্রিকায় এ সংক্রান্ত রিপোর্ট প্রকাশের পর। এরপরই বাংলাদেশ ব্যাংকের টাকা চুরির বিষয়টি প্রকাশ্যে চলে আসে। শুরু হয় তুমুল হৈচৈ।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ওই দুই কর্মকর্তাকে একাধিক তদন্তকারী সংস্থা দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। জিজ্ঞাসাবাদে তারা ঘটনার আদ্যোপান্ত বর্ণনা করেছেন। তাদের বর্ণনা মোতাবেক বাংলাদেশ ব্যাংকের অনেককেই জিজ্ঞাসাবাদ করেছে তদন্তকারী সংস্থাগুলো। এখন পর্যন্ত তদন্তে টাকা চুরির সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোন কর্মকর্তার সরাসরি সম্পৃক্ততার তথ্য মেলেনি। তবে ব্যাংকটির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের চরম অবহেলা ও গাফিলতির প্রমাণ মিলেছে। এমন অবহেলা ও গাফিলতি টাকা চুরির উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে করা হয়েছিল কিনা তা স্পষ্ট নয়।

সিআইডি সূত্রে জানা গেছে, টাকা লুটের সঙ্গে হ্যাকার ছাড়াও অন্তত একাধিক দেশের ব্যাংক ও জুয়াড়ি চক্র জড়িত। এরমধ্যে ১৪ জন বিদেশীর জড়িত থাকার বিষয়ে তথ্য মিলেছে। যাদের ৮ জনই ফিলিপিন্সের। বাকি ৬জন শ্রীলঙ্কার। শ্রীলঙ্কার ছয়জন শালিকা ফাউন্ডেশন নামের একটি এনজিও’র পরিচালক। তাদের দেশ ত্যাগের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন সেদেশটির আদালত।

এদিকে ফিলিপিন্সের রিজাল ব্যাংকের উর্ধতন কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততার কথা জানিয়ে ব্যাংকটির জুপিটার শাখা ব্যবস্থাপক মায়া দেগুইতো নিজের দোষও স্বীকার করেছেন। এছাড়া কিম অং ঘটনার মূল নায়ক বলে ইতোমধ্যেই তদন্তে বেরিয়ে এসেছে। তিনি চুরি করা টাকার কিছু অংশ যা তার কাছে তা ফেরত দিতে ফিলিপিন্সের সিনেটের কাছে স্বীকার করেছেন। তবে শনাক্ত হওয়া অপরদের মধ্যে মাইকেল ফ্রান্সিসকো ক্রুজ, জেসি ক্রিস্টোফার লাগ্রোসাস, আলফ্রেড সান্তোস ভারজারা, এনরিকো তিয়োডোরো ভাসকুয়েজ ও উইলিয়াম সো গোর কোন বক্তব্য মেলেনি। শনাক্ত হওয়াদের আইনের আওতায় আনতে ইন্টারপোলের মাধ্যমে সহায়তা চাওয়া হয়েছে।

ওদিকে বাংলাদেশের টাকা চুরির ঘটনা নিয়ে বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, ফিলিপিন্স ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও বিশ্বের অনেক দেশই তদন্ত করছে। কারণ ওইসব দেশের প্রচুর অর্থ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওই ব্যাংকে জমা রয়েছে। ওইসব দেশ তদন্তে সহায়তা করতে বাংলাদেশের সিআইডির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে যাচ্ছে।

এছাড়া সুইফটের তরফ থেকে করা তদন্তের একটি প্রতিবেদন বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। সেই প্রতিবেদনের অনুলিপি সিআইডির কাছে হস্তান্তরের কথা থাকলেও তা করা হয়নি। সুইফটের কৌশল প্রকাশ হওয়ার আশঙ্কা থাকায় তদন্ত প্রতিবেদন হস্তান্তর করা হচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

এদিকে সিআইডি ইতোমধ্যেই বাংলাদেশ ব্যাংকের নেটওয়ার্ক সিস্টেমের আওতায় থাকা সাড়ে ৪ হাজার কম্পিউটারের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের সঙ্গে যুক্ত কম্পিউটারের মধ্যে গুরুত্ব বিবেচনা করে ৫০টির ডাটা ক্লোন করে নিয়ে পর্যালোচনা শুরু করেছে।

এ ব্যাপারে সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার মীর্জা আবব্দুল্লাহেল বাকী জনকণ্ঠকে বলেন, রিজার্ভের টাকা চুরির ঘটনায় বৃহস্পতিবার পর্যন্ত অনেক আলামত জব্দ করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে অনেককেই। প্রয়োজনে আরও অনেককেই জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে। অনেকেই নজরদারিতে রয়েছেন। তবে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত টাকা চুরির সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোন কর্মকর্তার জড়িত থাকার অকাট্য প্রমাণ মেলেনি। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের অবহেলা ও গাফিলতি থাকার বিষয়টি বার বারই প্রকাশ পাচ্ছে।