১৮ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

তৃণমূলের সহস্রাধিক নাট্যকর্মী, রাতভর উৎসব অনুষ্ঠান

তৃণমূলের সহস্রাধিক নাট্যকর্মী, রাতভর উৎসব অনুষ্ঠান
  • শহরে সরব গ্রাম থিয়েটার

মোরসালিন মিজান ॥ সহস্রাধিক নাট্যকর্মী। ঢাকার বাইরে থেকে এসেছেন। তাঁদের প্রাণবন্ত উপস্থিতি বদলে দিয়েছে শিল্পকলা একাডেমির নিত্যদিনের চেহারা। খোলা প্রান্তরে বিপুল লোক সমাগম। দেখে যে কেউ ভুল করবেন। ভাববেন, কোন রাজনৈতিক সমাবেশ। আদতে, বাংলাদেশ গ্রামথিয়েটার কর্মীদের মিলনমেলা। শুক্রবার বিকেল থেকে শুরু হওয়া উৎসব চলে সারারাত। ভোরের আলো ফোটার আগ পর্যন্ত। নাটকের মানুষদের এমন বর্ণিল উৎসব, রাতজাগা, জাগিয়ে রাখার আয়োজনে নাটকই ছিল মুখ্য অনুষঙ্গ।

কেন্দ্রীয় কাউন্সিল ও ৭ম জাতীয় সম্মেলন উপলক্ষে দীর্ঘদিন ধরেই প্রস্ততি নিচ্ছিল গ্রামথিয়েটার। আর তারপর শুক্রবারের বহির্প্রকাশ। মূল ভেন্যু শিল্পকলা একাডেমির বিশাল সবুজ চত্বর। বিকেলে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, কানায় কানায় পূর্ণ! বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এসেছেন নাট্যকর্মীরা। কেউ গ্রামথিয়েটারের লগো আঁকা টি শার্ট পরেছেন। কারও গলায় উত্তরীয়। সেখানে নিজেদের দলের নাম লেখা। যাদের মঞ্চে পারফর্মেন্স আছে তারা প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। বাকিরা হাসি রাশি আনন্দে মেতিছিলেন। ব্যাপক উৎসবের দিন গ্রামথিয়েটার স্মরণ করে বাঙালীর শিল্প-সংস্কৃতি,রাজনীতির বিশিষ্টজনদের। তাঁদের প্রতিকৃতি দিয়ে সাজানো হয় মঞ্চের দুই পাশ। একপাশে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিশাল উপস্থাপনা। পাশেই বাংলা সাহিত্যের প্রাণপুুরুষ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলাম। পরের ছবিতে মহাত্মা লালনের সৌম্য-শান্ত চেহারা। বিপরীত প্রান্তে আবুল কাশেম ফজলুল হক, আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, মনি সিংয়ের মতো নেতার ছবি। কালজয়ী সাহিত্যস্রষ্টা সৈয়দ

ওয়ালিউল্লাহ, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, পল্লীকবি জসীম উদ্দীন, শামসুর রাহমানসহ অনেক প্রিয় মুখ পাশাপাশি। আব্বাস উদ্দীন, হাসন রাজাও ছিলেন। চলচ্চিত্র নির্মাতাদের মধ্যে ছিল মৃণাল সেন, জহির রায়হান, তারেক মাসুদ প্রমুখের ছবি। এত এত আলোকিত মুখ দেখে মন ভরে যায়। ভেতরে কত যে অনুভূতি হয়! প্রতিকৃতিগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে চলছিল ছবি তোলার কাজ। গ্রামথিয়েটারের সভাপতি নাসির উদ্দীন ইউসুফ ৩০ বছরের তরুণটির মতো ছোটাছুটি করছিলেন। কোন্ কাজ কীভাবে করতে হবে নির্দেশনা দিচ্ছিলেন। এসব তদারকি শেষ যখন, শুরু হয় দিনের কর্মসূচী। আমন্ত্রিত অতিথিদের সঙ্গে নিয়ে জাতির জনকের প্রতিকৃতির সামনে গিয়ে দাঁড়ান নাসির উদ্দীন ইউসুফ। সকলে মিলে প্রদীপ জ্বালিয়ে বাঙালীর অবিসংবাদিত নেতাকে স্মরণ করেন। পরে তারা যান গ্রামথিয়েটারের স্বপ্নদ্রষ্টা সেলিম আল দীনের প্রতিকৃতির সামনে। এখানে প্রদীপ প্রজ্বলন শেষে মঞ্চে আসন নেন তাঁরা। সবাই মিলে দাঁড়িয়ে জাতীয় সঙ্গীত গান। পর পরই উৎসব সঙ্গীত। জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন। তার পর আলোচনা পর্ব। প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। উদ্বোধন ষোষণা করেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। বক্তব্য রাখেন আইটিআই সভাপতি রামেন্দু মজুমদার ও মঞ্চ সারথী আতাউর রহমান। নাসির উদ্দীন ইউসুফের সভাপতিত্বে স্বাগত বক্তব্য রাখেন হুমায়ুন কবীর হিমু। বক্তারা অন্যের আচার ভুলে শেকড়ের কাছে ফেরার আহ্বান জানান। ঔপনিবেশিক শিল্পরীতি অনুসরণ না করে বাংলাদেশের জাতীয় নাট্য আঙ্গিক নিয়ে কাজ করার আহ্বান জানান। গ্রামীণ কৃষ্টি-সংস্কৃতি চর্চার নানা সঙ্কটের কথা উঠে আসে আলোচনায়। এসব সঙ্কট দূর করার ওপর জোর দেন তাঁরা।

আলোচনা পর্ব শেষ হতেই শুরু হয় লাঠিখেলা। গ্রামীণ ঐতিহ্যের খেলা মোটামুটি জমিয়ে রাখে। পরিবেশনা শেষ হলে সবাই মিলে রওনা হন শহীদ মিনারের দিকে। ফ্যাস্টুন, প্ল্যাকার্ড হাতে অংশ নেন নাটকের মানুষরা। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে তাঁরা ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। পরে ফিরে আসেন অনুষ্ঠানস্থলে।

সন্ধ্যায় গুরুত্বপূর্ণ বক্তৃতা করেন মফিদুল হক, সলিমুল্লাহ খান, অধ্যাপক আজফার হোসেন, বিনায়ক সেন, আফসার আহমদ প্রমুখ। পরে শুরু হয় সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। লালনের গান পরিবেশন করেন শাহবুল ইসলাম। ধ্রƒপদী সঙ্গীত পরিবেশন করেন শিমুল ইউসুফ। লাইসা আহমেদ লিসা শ্রোতাদের শোনান রবীন্দ্রসঙ্গীত। নজরুল থেকে গান প্রিয়াংকা গোপ। ছিল কবিতার আবৃত্তি। প্রিয় কবির কবিতা নিয়ে মঞ্চে ছিলেন হাসান আরিফ ও ঝর্ণা সরকার। বাঁশির সুরে মাতিয়ে রাখেন উত্তম চক্রবর্তী। ভীষণ উপভোগ্য ছিল ‘রোমিও ও জুলিয়েট’। মঞ্চে আনে ঢাকাথিয়েটার ও লন্ডনের গ্রেআই। গ্রামীণ ঐতিহ্যের সং পালাও বাদ যায়নি। মহাদেব সং যাত্রার দল মুগ্ধ করে রাখে দর্শককে। ঝিনাইদহের দল ভোর হলো পরিবেশন করে ‘রাধার মান ভঞ্জন’। সিরাজগঞ্জের পূরবী থিয়েটার নিয়ে আসে ধুয়া গান। বেহুলা নৃত্যনাট্য পরিবেশন করে বগুড়ার চিন্তক থিয়েটার। কুষাণ পালা নিয়ে আসেন লালমনিরহাটের কৃপা সুন্দর। সাদা পাগলার গান পরিবেশন করে পার্বতীপুরের তিলাই লোকথিয়েটার। ছিল গম্ভীরার পরিবেশনা। পরিবেশন করে ঢাকার আদি গম্ভীরা দল। কবিগানে লড়েন দিনাজপুরের ক্ষিতিশ ম-ল ও মালতী রানী। বাদ যায়নি আদিবাসীদের পরিবেশনা। মহেশপুর আদিবাসী সংগঠন সাঁওতাল নাচ ও গানে মন্ত্রমুগ্ধ করে বাঙালী মনকে। এভাবে গভীর হয় রাত। এক সময় ভোর হয়। কিন্তু রেশটা থেকে যায়। বাংলা সংস্কৃতির এমন ভরপুর উৎসব আরও হোক। তৃণমূলের কাছ থেকে এই শহর-নগর শিখুক। সমৃদ্ধ হোক। সকলের তাই প্রত্যাশা।