১৮ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

শুধু ফার্নেস অয়েলের দাম কমালে সুফল পাবে না কেউ

শুধু ফার্নেস অয়েলের দাম কমালে সুফল পাবে না কেউ
  • বিদ্যুতের মূল্য হ্রাসেই সুবিধা পাবে জনগণ

রশিদ মামুন ॥ জ্বালানি তেলের দাম কমানো নিয়ে বিভ্রান্তিতে পড়েছে সাধারণ মানুষ। সরকারের পক্ষ থেকে গত সপ্তাহে জ্বালানি তেলের দাম কমানোর ঘোষণা আসে। কিন্তু বৃহস্পতিবার শুধু ফার্নেস অয়েলের দাম কমিয়ে গেজেট প্রকাশ করা হয়। কেবল ফার্নেস অয়েলের দাম পুনর্নির্ধারণে সরকারের ভর্তুকি সমন্বয় ছাড়া সাধারণ মানুষের কোন লাভ হবে না। বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ কমায় দাম সমন্বয়ের কোন চিন্তা নেই সরকারের। জ্বালানি তেলের দাম কমানোকে এক ধরনের আইওয়াশ মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

দেশে বিদ্যুত উৎপাদনের ক্ষেত্রে অন্তত দুই হাজার ৭০০ মেগাওয়াট উৎপাদন করা হয় ফার্নেস অয়েল দিয়ে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয়ের সময় প্রতিলিটার ফার্নেস অয়েলের দাম ৬০ টাকা ধরে হিসাব করা হয়। কিন্তু এখন সরকার দাম কমিয়ে ৪২ টাকায় নির্ধারণ করেছে। প্রথা অনুযায়ী জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পেলে বিদ্যুত উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি করা হয়। সঙ্গত কারণে জ্বালানির দাম কমলে নৈতিকভাবে কমানোর উদ্যোগ নেয়া উচিত বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমশিনের।

কমিশন কি চিন্তা করছে তা জানা যায়নি। কমিশনের চেয়ারম্যানকে শুক্রবার কয়েক দফা ফোন করেও পাওয়া যায়নি। যদিও আইন অনুযায়ী বিদ্যুত উন্নয়ন বোর্ড প্রস্তাব দিলেই কমিশন ওই প্রস্তাব যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত জানায়। কমিশন আইনে বিদ্যুত জ্বালানি খাতের সার্বিক বিষয় দেখভালের ক্ষমতা দেয়া হলেও কোন দিনই বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের তেমন কোন উদ্যোগ কারো চোখে পড়েনি।

জানতে চাইলে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক নুরুল ইসলাম বলেন, জ্বালানি তেলের দাম কমানোর বিষয়কে আমরা স্বাগত জানাই। সরকার দেরিতে হলেও একটি ভাল উদ্যোগ নিয়েছে। এর সুফল পেতে হবে জনগণকে। তিনি বলেন, দেশে এখন বিদ্যুত উৎপাদনের একটি বড় অংশে ফার্নেস অয়েল ব্যবহার হয়। এখন যদি বিদ্যুতের দাম কমানো হয় তাহলে জনগণ সুবিধা পাবে। বিইআরসির উচিত সেই উদ্যোগ নেয়া। কিন্তু আমাদের বিইআরসির অবস্থা এমন যে সরকার যখন বলবে ঘুম থেকে ওঠ তখন তারা চোখ মেলবে। এমন অবস্থা হলে এর কোন সুফল সাধারণ মানুষ পাবে না।

বিদ্যুত বিভাগ বলছে, বেসরকারীভাবে যেসকল কোম্পানি বিদ্যুতের জন্য তেল আমদানি করছে তাদের প্রতিলিটার ফার্নেস অয়েলের জন্য পিডিবিকে দিতে হচ্ছে সর্বোচ্চ ৩০ টাকা (প্রণোদনাসহ)। অন্যদিকে এখনও বিপিসির জন্য যে দাম নির্ধারণ করা হয়েছে তা ওই মূল্যের চেয়ে ১২ টাকা বেশি। দাম বৃদ্ধির গেজেটের সঙ্গে উদ্যোক্তাদের আমদানি মূল্যেরও একটি পার্থক্য চোখে পড়ছে। দেখা যায় গেজেটে প্রতি লিটার ফার্নেস অয়েলের করপূর্ব মূল্য দেখানো হয়েছে ৩৪ টাকা ৭০ পয়সা।

বিদ্যুত বিভাগ সূত্র জানায়, গ্রীষ্মে বিদ্যুত উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য তরল জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হয়। দেশে তিন হাজার মেগাওয়াট তরল জ্বালানি বিদ্যুত কেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে ফার্নেস অয়েলে চলে প্রায় দুই হাজার ৭০০ মেগাওয়াট কেন্দ্র। পিডিবি দৈনিকভিত্তিতে জ্বালানি তেল কিনে বিদ্যুত কেন্দ্রে সরবরাহ করে। দেখা যায় এখন ৪৩ কোটি টাকার জ্বালানি তেল কেনা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, চলতি বছর গ্রীষ্মে দৈনিক ৫০ কোটি টাকার তরল জ্বালানির প্রয়োজন হবে কেন্দ্রগুলোর। তবে গ্যাসের স্বল্পতায় দিন-রাত একই হারে কেন্দ্রগুলো চালানো হলে বাড়তে পারে এই খরচ।

বিদ্যুত উন্নয়ন বোর্ড সূত্র বলছে, এখনও তারা প্রতি ইউনিট বিদ্যুত উৎপাদনে গড়ে এক টাকা লোকশান হচ্ছে বলে সরকারকে জানিয়েছে। এমনকি বিদ্যুতের দামও বৃদ্ধির জন্য বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের কাছে তারা নতুন প্রস্তাব দিয়েছে। বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের নিম্নমুখী প্রবণতায় সব দেশ জ্বালানি এবং বিদ্যুতের দাম কমাচ্ছে। ঠিক তার উল্টোপথে হাঁটছে সরকার। বিশেষত সরকারের তরফ থেকে জ্বালানি তেলের দাম কমানোর ঘোষণা আসায় সাধারণ মানুষ খুশি হয়েছিল। কিন্তু বৃহস্পতিবার শুধু ফার্নেস অয়েলের দাম কমিয়ে অন্যগুলোর বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত না আসায় সকলে হতাশ হয়েছে।

সাধারণ মানুষ ডিজেল, পেট্রোল এবং অকটেন বেশি ব্যবহার করে। অন্য জ্বালানি তেল খুব বেশি বাজারকে প্রভাবিত করে না। বিভিন্ন দাতাসংস্থা এবং আন্তর্জানিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) পর্যন্ত সরকারকে জ্বালানি তেলের দাম কমনোর পরামর্শ দিয়েছে। তারা বলছে, জ্বালানি তেলের দাম কমালে অর্থনৈতিক কর্মকা- বৃদ্ধি পাবে, এতে প্রবৃদ্ধিও বাড়বে।

দেশে সর্বশেষ জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি করা হয় ২০১৩ সালের ৪ জানুয়ারি। তখন আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের দাম ১২০ থেকে ১২৫ মার্কিন ডলারে ওঠানামা করছিল। তখন দেশে দাম বাড়িয়ে প্রতি লিটার অকটেন ৯৯ টাকা, পেট্রোল ৯৬, ডিজেল ও কেরোসিন ৬৮ এবং ফার্নেস অয়েল ৬০ টাকা করা হয়। বিগত ২০১৪ সালের জুন মাস থেকে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম অব্যাহতভাবে কমতে শুরু করে। অব্যশ্য আন্তর্জাতিক বাজারে দরপতনের মধ্যে বিপিসি তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে জ্বালানি তেল বিক্রিতে তারা লাভ করেছে ১০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা। আর জ্বালানি তেলের বর্তমান দাম বজায় থাকলে বিপিসি চলতি অর্থবছরে লাভ করবে ১২ হাজার কোটি টাকা।

খোদ বিপিসি সরকারের কাছে জমা দেয়া প্রতিবেদনে বলছে, এখন ৬৮ টাকা প্রতি লিটার ডিজেল এবং কেরোসিন বিক্রি করে বিপিসি সরকারকে ভ্যাট-ট্যাক্স দেয়ার পরও ২৬ থেকে ২৭ টাকা লাভ করছে। একই হারে লাভ ছিল ফার্নেস অয়েছে। এখন তা ১২ টাকায় নেমে এলো। অন্যদিকে পেট্রোল ৯৬ টাকা আর অকটেন ৯৯ টাকায় বিক্রি করে লাভ করছে ৩৬ থেকে ৩৭ টাকা।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শামসুল আলম এ প্রসঙ্গে জনকণ্ঠকে বলেন, দরপতনের ফলে দাম সমন্বয় হলে সাধারণ মানুষ সুবিধা পেত। জ্বালানির মূল্য কমলে সকল পণ্যের দাম কমত এতে মানুষের ক্রয় ক্ষমতাও বৃদ্ধি পেত। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক কর্মকা- এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেত। ফার্নেস অয়েলে এখনও অসম প্রতিযোগিতার কথা উল্লেখ করে বলেন, উদ্যোক্তারা ফার্নেস অয়েল সরাসরি আনলে তাদের কোন কর দিতে হয় না। কিন্তু বিপিসির দিতে হয়।