২০ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

লালমনিরহাটে মিঠা পানির উৎস গিদারী ও ধরলা এখন মৃত

  • সীমান্তের ওপারে বাঁধ নির্মাণ করে ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহার

জাহাঙ্গীর আলম শাহীন, লালমনিরহাট থেকে ॥ লালমনিরহাটের দুর্গাপুর ও মোগলহাট সীমান্তে মিঠা পানির উৎস গিদারী ও ধরলা নদী পানিশূন্য হয়ে পড়েছে। গিদারী নদীতে ভারত দুর্গাপুর সীমান্তের বিপরীতে বাঁধ নির্মাণ করে একতরফা পানি প্রত্যাহার করে নিয়েছে। এতে করে শতবর্ষী নদীটি এখন শুকিয়ে গেছে। নদীটির অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গেছে। নদীতে চাষ হচ্ছে বোরোধান। বোঝার উপায় নেই এখানে এক সময় প্রমত্তা গিদারী নদী ছিল। ধরলা নদীর পানি প্রবাহ শতবর্ষে কখনও শুকিয়ে যায়নি। এবারেই প্রথম ধরলা নদীর পানি প্রবাহ শুকিয়ে গেছে। স্র্রোতধারা নেই। বিশাল বিশাল বালুচর দেখা দিয়েছে। লালমনিরহাট জেলায় সীমান্তের ওপারে কুচবিহার ও গিতালদহর অবস্থান। গিদারী ও ধরলা নদী দুটি ভারত হতে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। গিদারী নদী ভারত হতে হাতীবান্ধা উপজেলার দৈইখাওয়ায় প্রবেশ করে। আবার ভারতের ভিতরে ঢুকে যায। এভাবে প্রায় ৭-৮ বার ভারতের ভূখ- স্পর্শ করে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। নদীটি ছিল নিয়ন্ত্রিত ও খুবই খরস্র্রোতা। এটি লালমনিরহাটবাসীর জন্য এক সময় ছিল আশীর্বাদ। এই নদীর পানি ব্যবহার হরে কৃষি কাজ চলে আসছিল। কিন্তু এখন গিদারী প্রায় মৃত। যেখানে ভারতের অংশ আছে সেখানে গিদারী নদীতে পানি আছে। বাংলাদেশের অংশে পানি নেই। ভারত পরিকল্পিতিভাবে গিদারী নদীর পানি একতরফা প্রত্যাহার করে নিয়েছে। সর্বশেষ দুর্গাপুর সীমান্তে বাংলাদেশের সীমান্ত সংলগ্ন গ্রামের পাশে ভারতের অভ্যন্তরে সীমান্ত হতে ঢিলছোড়া দূরত্বে ভারতীয় বিএসএফ বাহিনী গিদারী নদীতে বাঁধ দিয়েছে। বাঁধ দেয়ার প্রায় তিন বছর হয়ে যাচ্ছে। এই তিন বছরে দুর্গাপুর হতে মোগলহাট পর্যন্ত গিদারী নদী সম্পূর্ণ মরে গেছে। প্রায় ৬০ কিলোমিটার গিদারী নদীটি বিলপ্ত হয়ে গেছে। এখন সেখানে ধানসহ নানা শষ্য আবাদ হচ্ছে। গিদারী নদীটি মোগলহাটে ধরলা নদীর সাথে মিশে প্রবাহিত হয়ে আসছিল। গিদারী নদীর পানি একতরফা প্রত্যাহারের ফলে ধরলা নদীতে পানির উৎস অনেক কমে গেছে। ধরলার পানিও ভারত প্রত্যাহার করছে। ফলে এ বছর শুষ্ক মৌসুমে ধরলা নদী পানিশূন্য হয়ে পড়েছে। জেগেছে বিশাল বিশাল চর।

ধরলা ও গিদারী নদীতে পানি প্রবাহ না থাকায় জীববৈচিত্র্য নষ্ট হয়ে গেছে। মিঠা পানির উৎস কমে গেছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে গেছে। শুষ্ক মৌসুমে বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ কমে গেছে। বাতাসে ধুলাবালির পরিমাণ বেড়ে গেছে। তাই শুস্ক মৌসুমে ধুলাবালিজনিত রোগবালাই বেড়ে গেছে। গিদারী ও ধরলা নদীর পাড়ে জলজ প্রাণী ও মিঠা পানির মাছের পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে। ধরলা পাড়ের মাঝিটারী গ্রামের মৎস্যজীবী মোঃ রমজান আলী (৬০) জানান, ছোট বেলা হতে ধরলা নদীতে জাল ফেলে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে আসছি। নদীতে সব সময় পানি ছিল। এ বছর নদীতে পানি নেই। তাই মাছ নেই। বেকার সময় কাটাতে হচ্ছে। তিনি জানান, এক সময় ধরলা নদীতে বর্ষা মৌসুমে প্রচুর পরিমাণে ইলিশ মাছ পাওয়া যেত। এখন ইলিশ মাছের কোন দেখা নেই। ধরলার পাবদা, শৈল, বাইগর, চেলা মাছ প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে। ধরলার সরপুঁটি, ছ্যাপপুঁটি, বউরাঙ্গা, সিঁদুরিয়া মাছ প্রায় বিলুপ্তির পথে। ধরলায় শুশুক, ভোদড় এখন আর নেই।

ধরলা নদীর পানি প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। এই পানি প্রবাহ না থাকায় ধরলা নদী তার নাব্য হারিয়ে ফেলেছে। এখন সামান্য বর্ষায় নদীর দুইপাড় উপচে বন্যার সৃষ্টি হয়। শুষ্ক মৌসুমে পানি থাকে না। ধরলা ও গিদারী নদীর পানি প্রবাহ না থাকায় লালমনিরহাট জেলার একাংশ মরুভূমিতে পরিণত হয়ে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে, খুব দূরে নয় লালমনিরহাট জেলা শরু ভূমিতে পরিণত হয়ে যাবে।

কয়েক বছর আগে লালমনিরহাটে ১০-১৫ ফুট গভীরে নলকূপ বসালে পানযোগ্য মিঠা পানি পাওয়া যেত। এখন মিঠা পানি ও পানযোগ্য পানি পেতে কমপক্ষে ৪৫-৬০ ফুট গভীরে নলকূপ বসাতে হয়। এই অবস্থার জন্য পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়াকে দায়ী করা হচ্ছে। জেলার দইখাওয়া, কালীগঞ্জসহ কোথাও কোথাও বোরো মৌসুমে সেচ দিতে গর্তখুঁড়ে শ্যালো মেশিন ও পাম্প মেশিন বসাতে হয়েছে। তবেই পানি উঠছে। জেলার হাতীবান্ধা উপজেলার ভেলাগুড়ি ইউনিয়নের পূর্বকদমা গ্রামের অবসর প্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ও প্রসিদ্ধ হোমিও চিকিৎসক রফি উদ দ্বারা রফু জানান, বর্তমানে বাড়িতে ব্যবহার করার নলকূপগুলো হতে পানি পাওয়া যাচ্ছে না। খুব কষ্ট করে শক্তি ব্যবহার করে অগভীর নলকূপ হতে খাবার পানি সংগ্রহ করতে হয়।

লালমনিরহাট মহিষখোঁচা মহা বিদ্যালয়ের প্রাণী বিদ্যার অধ্যাপক মোঃ ঈমান আলী জানান, পানি জীবন। জীবন মানেই পানি। দেশে প্রাণিজ সম্পদ, জলজপ্রাণী সম্পদ ও কৃষি সম্পদ রক্ষা করতে হলে অবশ্যই পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে এখনই ভাবতে হবে। তা না হলে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে পড়তে হবে। দেশে এখন মরু প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে।