১৬ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

এগিয়ে চলো নারী ॥ কাজের পাশাপাশি লেখাপড়া

  • একটা সময় নারীর দৌড় ছিল পাঠশালা পর্যন্ত

একটা সময় এ দেশের নারী শিক্ষার জন্য মক্তব ও পাঠশালা পর্যন্ত যেতে পেরেছে। ষাটের দশকের প্রথম ভাগেও মাধ্যমিক শিক্ষা থেকে উচ্চ শিক্ষার প্রবেশ পথ ছিল বনেদি ও শিক্ষিত পরিবারে। এ নিয়ে তৎকালীন একশ্রেণীর মোল্লা-মাতবর কম কথা বলেনি। গত শতকের ’৭০-এর দশকেও গ্রামীণ পরিবারে ছেলে শিশুকে যতœাদি করে প্রাথমিক স্কুলে পাঠানো হয়েছে। মেয়েশিশুর স্থান ছিল হেঁসেলে বা চুলার পাড়ে। মৌলবাদ অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে (যেমন বগুড়ার পশ্চিমাংশের কাহালু নন্দীগ্রাম এলাকা, জয়পুরহাটের কিছু এলাকা) মেয়েদের লেখাপড়ার দিকে দৃষ্টি দেয়া হয়নি। খুব বেশি হলে নিজেদের বাড়ির কাছের মাদ্রাসার পঞ্চম পাঠ পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিল। এর বাইরে নারী ঘর থেকে বের হতেও পারেনি। সামাজিক কোন অনুষ্ঠানে যেতে হলে কালো রঙের এমন বোরকা পরানো হয়েছে, দেখার জন্য দুই চোখের গোলাকৃতি ছোট অংশটুকুও মশারির কাপড় দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়েছে।

শহরাঞ্চলের শিক্ষিত বনেদি পরিবারের মেয়েরা পঞ্চাশের দশকের শেষভাগ থেকেই স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায় পা রাখে। দিনে দিনে দেশের পূর্ব-উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের শহর এলাকাগুলোতে নারী শিক্ষার সঙ্গে নারীর এগিয়ে চলার পালা শুরু হয়। ষাটের দশকে দেশের প্রতিটি অঞ্চলেই নারী শিক্ষার ব্যপ্তি পেতে থাকে। গত শতকের আশির দশকের মাঝামাঝি হতে নারীর ক্ষমতায়নের সঙ্গে মধ্যবিত্ত পরিবারের নারীরা নিজেদের উচ্চশিক্ষায় নিয়ে যেতে কখনও লেখাপড়ার পাশাপাশি চাকরি করতেও থাকে। নারীর এই চাকরি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে এগিয়ে নেয়ার পথ হিসেবেই মনে করা হয়। যে অবস্থা এখনও বিদ্যমান।

বর্তমানে দেশের প্রতিটি সরকারী অফিসে দফতরে বিসিএস নারী অফিসার, শিক্ষিত নারী অফিসার ও কর্মচারীর সংখ্যা কম নয়। বেসরকারী প্রতিষ্ঠানেও নারী এক্সিকিউটিভ থেকে শুরু করে অফিস সহকারী পর্যন্ত আছে। জনপ্রশাসন, পুলিশ ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিটি ধাপে নারীর অংশগ্রহণ দেশকে দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। গত বছর জাতিসংঘ ঘোষিত মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোলে (এমডিজি) বাংলাদেশের নারী উন্নয়নের চিত্র অনেকদূর এগিয়েছে। এই অর্জনকে ধরে রেখে আরও এগিয়ে যেতে জাতিসংঘ ঘোষিত সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোলে (এসডিজি) নারীর আরও এগিয়ে চলার পথের ব্যপ্তি বাড়ছে। এই অধ্যায়ে বর্তমানে অনেক নারী কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অবস্থায় কোন না কোন চাকরি জুটিয়ে আগামীর প্রতিষ্ঠার পথ চলায় নিজেদের গুছিয়ে নিচ্ছে। এই বিষয়ে নারীদের সাফ কথা : পুরুষ শাসিত সমাজ ব্যবস্থায় নারী যেভাবে বন্দী হয়ে থাকে, এই শিকল ভাঙতে হবে উচ্চশিক্ষিত হয়ে এবং পুরুষের পাশাপাশি কাজ করে। কেউ আগামীর পথে অভিজ্ঞতা অর্জনে কেউ নিজের লেখাপড়ার খরচ চালাতে সম্মানজনক চাকরি করছে। তাদের কথা, বর্তমানে প্রতিটি চাকরিতেই অভিজ্ঞতা চেয়ে বসে। লেখাপড়া করার সময় অভিজ্ঞতাটুকু অর্জন করলে লেখাপড়া শেষ করার সঙ্গে সঙ্গে চাকরির দরজা খুলে যাবে। এদেরই ক’জনের সঙ্গে কথা হয়Ñ

জিনিয়া ফারজানা ॥ এ যুগের চটপটে তরুণী। বগুড়া সরকারী মুজিবর রহমান মহিলা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশের পর ইংরেজীতে অনার্স পড়ার সময়ই কমিউনিটি রেডিওতে পা রাখেন। পাঁচ বছর ধরে তিনি কাজ করছেন বগুড়ার রেডিও মুক্তিতে। এর আগে স্কুলের শিক্ষার্থী অবস্থায় সাংস্কৃতিক অঙ্গন কাঁপিয়েছেন। বগুড়া থিয়েটারের নাট্যশিল্পী হয়ে অনেক নাটকে অভিনয় করেছেন। লেখাপড়ার পাশাপাশি এই এক্সট্রা কারিকুলাম এ্যাকটিভিটিজ তাঁকে কমিউনিটি রেডিওতে ঢুকতে সহায়তা করে। একদিকে রেডিওর অনুষ্ঠান আরেকদিকে একাডেমিক শিক্ষা দুই-ই সামলেছেন। এর মধ্যেই ইংরেজীতে মাস্টার্স করে আরও উচ্চশিক্ষা নিতে এমফিলের প্রস্তুতি নিয়েছেন। জিনিয়া ফারজানা বর্তমানে রেডিও মুক্তির স্টেশন ইনচার্জের দায়িত্ব পালন করছেন। অনুষ্ঠান পরিকল্পনা প্রযোজনা ও প্রচারে যাওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ধাপেই দায়িত্ব পালন করতে হয়। লেখাপড়ার গবেষণায় এই কাজ তাকে সহায়তা করছে। যে কারণে তিনি উভয় দিকে মনোযোগী হতে পারছেন। আইনজীবী বাবা জহিদুর রহমান ও গৃহিণী মা সাইদা রহমানের মেয়ে সুন্দর কণ্ঠের জিনিয়া ফারজানার ইচ্ছা এবং আত্মবিশ্বাস আগামীতে ভাল ব্রডকাস্টার হবেন। সেই পথ ধরেই এগোচ্ছেন।

সোনিয়া আক্তার ॥ বগুড়া শহরের মালতিনগরে বাড়ি। বাবা শমসের শেখ গত হয়েছেন। মা আকলিমা বেগম গৃহবধূ। তিন ভাই এক বোনের ছোট সোনিয়া ২০০৮ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাসের পরই নিজেকে আরও শিক্ষিত করে এগিয়ে নিতে চাকরি নেন পৌরসভার দ্বিতীয় আরবান হেলথ কেয়ারে। প্রকল্পের কাজের মধ্যেই তিনি লেখাপড়াকে এগিয়ে নেন। বগুড়া সরকারী মুজিবর রহমান মহিলা কলেজ থেকে ইসলামিক স্টাডিজে দ্বিতীয় শ্রেণীতে অনার্স পাসের পর মাস্টার্স করতে সরকারী আজিজুল হক কলেজে ভর্তি হন। পৌরসভার প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার পর বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে কিছুদিন কাজ করে ২০১২ সালে অফিস নির্বাহী হিসেবে যোগদান করেন জার্নালিস্ট ইনস্টিটিউট অব বগুড়ায়। ক্লাস থাকলে তিনি অফিস থেকে কয়েক ঘণ্টার ছুটি নেন। লেখাপড়ায় প্রতিষ্ঠানের মালিক সহযোগিতা করেন। সোনিয়া এ বছর মাস্টার্সের ফাইনাল পরীক্ষার্থী। মাস তিনেক হয় পরিণয়ে আবদ্ধ হয়েছেন। স্বামী ফিরোজ আহম্মেদও চান স্ত্রী আরও শিক্ষিত হয়ে ভাল চাকরি করুন। সোনিয়া আশাবাদী লেখাপড়া শেষ করার পর আরও ভাল চাকরি পাবেন। নিজেকে গড়ে তুলবেন।

মিতু রায় ॥ বাড়ি বগুড়া শহরের ঠনঠনিয়ায়। বগুড়া সরকারী আজিজুল হক কলেজের বিবিএ দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। মা প্রতিমা রায় ও বাবা মৃতুঞ্জয় রায়ের তিন মেয়ের মেজো মিতু। স্কুলজীবনেই বগুড়ার সংশপ্তক নাট্যগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে সুনাম অর্জন করেন। সাংস্কৃতিক অঙ্গনের এই বিচরণ তাঁকে ব্র্যাকের এডুকেশন এ্যাডলোসেন্ট ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের চাকরি পেতে সহায়তা করে। এই কাজের মধ্যে সময় বের করে বিবিএর ক্লাস করেন। বললেন, সময় থেকে সময় ধার নিয়ে লেখাপড়ার পর চাকরি করে সেই সময় শোধ করেন। চাকরির প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্যমাত্রা পূরণের কোচ হওয়ায় লেখাপড়া ও চাকরি দুই-ই সমন্বয় করতে পারেন। এরই মধ্যে নাটকের চর্চাও অব্যাহত আছে। বর্তমানে টিআইবির সনাকের ইয়েস গ্রুপের নাটকের সদস্য হয়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণে মেধায় পুরস্কৃত হয়েছেন। মিতু রায় বললেন, নারী শিক্ষিত হয়ে জীবনের শুরুতেই স্বাবলম্বী হওয়া শিখলে পরিবার ও দেশের মঙ্গল বয়ে আনবে। তাহলে মেয়েরা কখনও বাল্যবিয়ের ফাঁদে পা দেবে না। নিজেকে গড়ে নিয়ে তারপর ঘর-সংসার।

বর্তমানে দেশের অনেক নারী চাকরি ও লেখাপড়া একসঙ্গে করছে। বিশেষ করে নারীদের শিক্ষাকে এগিয়ে নেয়ার পথ করে দিয়েছে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়। যে নারী অল্প লেখাপড়া করে কোন নি¤œপদে চাকরি করছে, তারাও এখন উচ্চশিক্ষা নিতে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হচ্ছে। এদের ক’জন তামান্না, মুক্তা ও অকিলা। বললেন মাধ্যমিক পাসের পর মনে করেছিলেন আর বুঝি লেখাপড়া হবে না। পরে সাহস নিয়ে ভর্তি হলেন উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে। ইচ্ছে আছে উচ্চ মাধ্যমিকের পর অনার্স করে যতটা এগিয়ে যাওয়া যায়। উচ্চশিক্ষা পেলে ভাল চাকরিও মিলবে। অনেক নারী চাকরির অর্থ থেকে কিছু অংশ লেখাপড়ার কাজে ব্যয় করছে।

Ñসমুদ্র হক, বগুড়া থেকে